
(পুর্ব প্রকাশিতের পর)
বিচারপতি নিয়োগ: কখনও আপোশে রফা, কখনও কাজিয়া
সাংবিধানিক আদালতগুলোতে বিচারপতি নিয়োগ বিবাদের এক জটিল ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। বিজেপি সরকার অত্যন্ত সচেতনভাবেই দু’ভাবে বিদ্যমান কলেজিয়াম প্রথার ভিত্তিকে দুর্বল করে তুলছে। প্রথমত, তারা এমন বিচারপতিদের নিয়োগের চেষ্টা করছে যারা তাদের স্বার্থের প্রতি সহানুভূতিশীল। এবং দ্বিতীয়ত, কলেজিয়ামের সুপারিশ করা যে বিচারপতিদের কেন্দ্রীয় সরকার সম্পর্কে সমালোচনামূলক মনোভাব রয়েছে তাদের মনোনয়নকে প্রত্যাখ্যান করছে।
বিচারপতি নিয়োগে প্রাধান্য নিয়ে সরকার ও বিচারবিভাগের মধ্যে সংঘাত কখনই সাম্প্রতিক সময়ের বিষয় নয়। স্বাধীনতার পর সরকারই ঠিক করত বিচারপতি কারা হবে। প্রাথমিকভাবে ছোটখাটো কিছু বাদবিতন্ডার পর এই সংঘাত ১৯৭৩ সালে তীব্র আকার নেয় যখন ইন্দিরা গান্ধী প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে গিয়ে পদমর্যাদার তালিকায় থাকা চতুর্থ জনকে প্রধান বিচারপতি হিসাবে নিয়োগ করেন। এরপর বিচারপতি এইচ আর খান্নার ঊর্ধ্বে আরোহণকে আটকানো হয়, যেটা ছিল এডিএম জব্বলপুর মামলায় তাঁর বিরোধী মত পোষণের জন্য শাস্তি। এই সমস্ত প্রশাসনিক পদক্ষেপ বিচারপতিদের নিয়োগ এবং ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি তাঁদের আনুগত্যের মধ্যে বন্ধনকে সুস্পষ্ট রূপেই দেখিয়ে দেয়।
বিচারপতি নিয়োগে সরকারের এই আধিপত্য চলে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত। এরপর সুপ্রিম কোর্ট একটা রায়ের মাধ্যমে কলেজিয়াম ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা নিজেদের অধিকারে নেয়। এই কলেজিয়াম ব্যবস্থা হল পদমর্যাদায় সর্বোচ্চ বিচারপতিদের নিয়ে গঠিত একটা ফোরাম যাঁরা সাংবিধানিক আদালতগুলোতে নতুন বিচারপতি নিয়োগ করেন। এই ব্যবস্থা অবশ্যই ত্রুটিতে জর্জরিত — উৎকট স্বজনপোষণের সাথেই দলিত, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, নারী ও অন্যান্য প্রান্তিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব থাকে যৎসামান্য; এইভাবে বিচারবিভাগ হয়ে ওঠে পুরুষ আধিপত্য, উচ্চশ্রেণী, উচ্চবর্ণ সমন্বিত, হিন্দু ধারণার এক প্রতিষ্ঠান।
বিচারবিভাগের এই পটভূমি সত্ত্বেও বিচারবিভাগে আধিপত্য করতে চাওয়ার মোদী সরকারের উন্মুখতা বিচারবিভাগীয় স্বাধীনতায় আরও বিপর্যয়ই ঘটাবে। ক্ষমতায় আসার পর মোদী সরকার জাতীয় বিচারপতি নিয়োগ কমিশন আইন এনে বিচারবিভাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েমের চেষ্টা করে। সুপ্রিম কোর্ট অবশ্য অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে এই আইনকে খারিজ করে দেয়।
মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই সুপ্রিম কোর্টের কলেজিয়াম পূর্বতন সলিসিটার জেনারেল গোপাল সুব্রনিয়মকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি পদে উন্নীত করার প্রস্তাব দেয়, কিন্তু মোদী সরকার তাঁর মনোনয়নকে প্রত্যাখ্যান করে। সুপ্রিম কোর্টের কয়েকটি মামলাতেই তিনি ছিলেন আদালত বান্ধব এবং সোহরাবুদ্দিন শেখ, কৌসর বাই ও তুলসি রাম প্রজাপতি ভুয়ো সংঘর্ষ হত্যা মামলায় কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন, যে মামলাগুলোতে অমিত শাহকে চার্জশিট দেওয়া হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি পদে তাঁর মনোনয়নকে প্রত্যাখ্যানের পর তিনি ঐ পদে উন্নতিতে তাঁর সম্মতি প্রত্যাহার করে নিয়ে বলেন, “আমি এই বিষয়ে সম্পূর্ণ সচেতন যে আইনজীবী হিসাবে আমার স্বাধীনতা এই সংশয়ের সৃষ্টি করছে যে আমি সরকারের নির্দেশ মানতে বাধ্য থাকব না। এই ঘটনাটাই আমার নিয়োগের প্রত্যাখ্যানে নির্ধারক হয়ে দেখা দিয়েছে।”
কলেজিয়াম ব্যবস্থায় ঐ ধরনের ফাটলের আর একটা গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হল বিচারপতি অখিল কুরেশির ঘটনাটা, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি পদে উন্নীত না হয়েই যাঁকে অবসর নিতে হয়েছিল, যদিও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি পদে উন্নীত হওয়া অন্যান্যদের তুলনায় তাঁর পদমর্যাদায় জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতা কিছু কম ছিল না। বিচারপতি কুরেশি ছিলেন স্বাধীনচেতায় একনিষ্ঠ এবং সোহরাবুদ্দিন শেখ ভুয়ো সংঘর্ষ হত্যা মামলায় বর্তমান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে ২০১০ সালে পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার নির্দেশ দেন। তাঁকে খোলাখুলিভাবেই নিশানা বানিয়ে প্রথমে গুজরাট হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হওয়া থেকে বিরত করতে বদলি করা হয় বোম্বে হাইকোর্টে; এরপর কলেজিয়াম তাঁকে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগের সুপারিশ করলে মোদী সরকার তাতে মান্যতা দিতে অস্বীকার করে। সুস্পষ্ট রূপেই দেখা যাচ্ছে যে, বিচারবিভাগ সরকারের কাছে নত হলো এবং তাঁকে ত্রিপুরা হাইকোর্টে বদলির সুপারিশ করল। পদমর্যাদায় অনেক এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও তাঁকে সুপ্রিম কোর্টে উন্নীত করা হয়নি।
তিন বিজেপি নেতার ঘৃণা ভাষণের পরিণামে দিল্লীতে দাঙ্গা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং দিল্লী পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে এফআইআর না করায় দিল্লী হাইকোর্টের বিচারপতি মূরলিধর তাদের তীব্র ভর্ৎসনা করেন; যেদিন তিনি তা করেন সেদিন মাঝ রাতেই তাঁকে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টে বদলি করা হয়।
সম্প্রতি তিন আইনজীবীকে হাইকোর্টের বিচারপতি হওয়ার সুপারিশ করা হলেও মোদী সরকার তাদের নিয়োগকে আটকে রেখেছে। বোম্বে হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট সোমোশেখর সুন্দরেসানকে এখনও নিয়োগ না করার কারণ হল তিনি মোদী সম্পর্কে সমালোচনামূলক একটি রচনাকে সমর্থন করেছিলেন। মাদ্রাজ হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট জন সথ্যনকে নিয়োগ না করার কারণ হলো তিনি নাকি মোদী সরকারের কর্মনীতির সমালোচক। আর দিল্লী হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট সৌরভ কৃপালের নিয়োগ আটকে থাকার কারণ হল যৌনতা সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এবং সমকামিতার অধিকারের প্রতি তাঁর সমর্থন। মোদী সরকারের তোলা আপত্তিগুলোকে কলেজিয়াম প্রত্যাখ্যান করে এবং তাঁদের নিয়োগের কথা পুনরায় বলে, এ সত্ত্বেও নিয়োগগুলোকে আটকে রাখা হয়েছে।
এর বিপরীতে ভারতীয় জনতা পার্টি মহিলা মোর্চার সাধারণ সম্পাদিকা ভিক্টোরিয়া গৌরিকে মাদ্রাজ হাইকোর্টের বিচারপতি রূপে নিয়োগ করা হয়েছে, এবং তাঁর নিয়োগের বিরুদ্ধে পেশ হওয়া একটি আবেদন খারিজ হয়ে গেছে।
অবসর গ্ৰহণের পর প্রাপ্ত সুবিধা
সুপ্রিম কোর্টের যে সমস্ত বিচারপতির রায়ে মোদী সরকারের নীতিমালা ও সংঘ পরিবারের এজেন্ডা নির্দিষ্ট রূপে সুরক্ষিত হয়েছে, অবসর গ্ৰহণের পর সেই সমস্ত বিচারপতিদের কর্মভার প্রদানই রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের এক প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ একবার বলেছিলেন যে, “এমন একটা অভিমত আছে যে অবসর গ্ৰহণের পর নিয়োজিত হওয়া ব্যাপারটাই বিচারবিভাগের বিচারকোচিত স্বাধীনতার ওপর এক কলঙ্ক চিহ্ন।” তিনিই আবার অবসর গ্ৰহণের মাত্র চারমাস পরই বিজেপি সরকার মনোনীত রাজ্যসভার সদস্যপদ গ্ৰহণ করেন। বিচারপতি হিসাবে কর্মকালে তিনি এমন কিছু রায়ের অংশীদার ছিলেন যেগুলো থেকে মোদী সরকার সুবিধা পেয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে বাবরি মসজিদ ধ্বংস মামলা, রাফাল যুদ্ধবিমান ক্রয় চুক্তি এবং গুরুত্বের দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হল আসামের এনআরসি রায়।
আর এক যে বিচারপতির অনেক রায় মোদী সরকারকে সুবিধা দিয়েছে এবং অবসর গ্ৰহণের পর যাঁকে নিয়োগ করা হয়েছে, তিনি হলেন বিচারপতি অরুণ মিশ্র যিনি এখন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারপার্সন। তাঁকে নিয়োগ করার জন্য মোদী সরকার ১৯৯৩ সালের মানবাধিকার আইন সংশোধন করার পথেও গেছে। মোদী সরকারের সুবিধা করে দেওয়া নির্লজ্জ রায়গুলো ছাড়াও তিনি প্রকাশ্যে এই কথা ঘোষণা করে কুখ্যাত হয়েছেন যে, মোদী হলেন “আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এক দ্রষ্টাপুরুষ যিনি বৈশ্বিকভাবে চিন্তা করেন এবং স্থানীয় ভিত্তিতে কাজ করেন।”
একেবারে হালফিলের আর এক সুবিধাপ্রাপক হলেন বিচারপতি আবদুল নাজির, যাঁকে অবসর গ্ৰহণের মাত্র ৩৯ দিন পর অন্ধ্রপ্রদেশের রাজ্যপাল করা হয়। বিচারপতি নাজির এমন সমস্ত রায়ের অংশীদার ছিলেন যেগুলোতে সরকারকে সুবিধা প্রদানের প্রবল প্রবণতা দেখা গেছে এবং সেই রায়গুলোর মধ্যে রয়েছে বাবরি মসজিদ ধ্বংস মামলা, বিমুদ্রাকরণ মামলা এবং ঘৃণা ভাষণের সেই মামলা যাতে তিনি বলেন যে মন্ত্রীদের দেওয়া ঘৃণা ভাষণের জন্য সরকারকে পরোক্ষে দায়বদ্ধ করা যায় না।
পরিশেষে
আমাদের চারপাশে ফ্যাসিবাদের বিস্তার ঘটে চলায় বিচারবিভাগের বিচার বিশ্লেষণ জরুরি হয়ে উঠেছে। বরিষ্ঠ আইনি উপদেষ্টা ইন্দিরা জয়সিং তাঁর সাম্প্রতিক এক বক্তৃতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, বর্তমান সরকার সংবিধান সংশোধন না করেই সংবিধানের কেন্দ্রীয় মূল্যবোধকে পাল্টে দিয়েছে, এবং এটাকে তিনি অত্যন্ত মর্মস্পর্শীভাবে সংবিধানকে অবজ্ঞা করা থেকে তাকে বর্জন করার পদক্ষেপ বলে বর্ণনা করেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে পাশ হওয়া কিছু রায় ভারতের আইন বিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক মোহন গোপালের প্রকাশ করা সন্ধিগ্ধতাকেই যথার্থ বলে প্রতিপন্ন করে। তিনি বলেছেন, আদালতগুলোকে এখন ‘পুরোহিত সদৃশ বিচারপতি’ দিয়ে ভরিয়ে তোলা হচ্ছে যাঁরা বিপথগামী হয়ে সংবিধানকে হিন্দু সংবিধান রূপে ব্যাখ্যা করছেন। এখানে আমরা আরএসএসের আইনজীবী সংগঠন অখিল ভারতীয় অধিবক্তা পরিষদের (এবিএপি) সমবেত প্রয়াসের কথা স্মরণ করতে পারি। তারা প্রথমত তাদের মতাদর্শের স্বার্থে আইনজীবীদের মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তোলে, এবং দ্বিতীয়ত, যারা তাদের এজেন্ডার প্রতি সহানুভূতিশীল তারা যাতে সাংবিধানিক আদালতগুলিতে যায় সেটা সুনিশ্চিত করে। বিচারবিভাগে বিপর্যয় সৃষ্টির এই সম্মিলিত প্রয়াসের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই চালাতে হবে, এবং তা করতে হবে সংবিধান সভায় আম্বেদকরের উল্লেখযোগ্য ঘোষণাকে সুরক্ষিত করার জন্য, আর সেটা হল — বিচারবিভাগের অবশ্যই স্বাধীনতা থাকতে হবে, ভয়ের বশবর্তী না হয়ে অথবা পক্ষপাতিত্ব না দেখিয়ে ন্যায়বিচার প্রয়োগের জন্য যেটার প্রয়োজন।
– অবনি চোক্সি ও ক্লিফটন ডি রোজারিও (লিবারেশন, জুলাই ২০২৩ সংখ্যা থেকে)