লকডাউনের শততম দিন এবং ৩০ জুন প্রধানমন্ত্রী মোদীর প্রতারণামূলক প্রচার

লকডাউনের ৯৮তম দিনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আরও একবার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন। মহামারী দেখা দেওয়ার পর এটা তাঁর ষষ্ঠ ‘করোনা স্পেশ্যাল’ ভাষণ। কিন্তু আগের পাঁচটা ভাষণের মত এবারের ভাষণেও তিনি দেশের কোভিড-১৯ ....

lok

লকডাউনের ৯৮তম দিনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আরও একবার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন। মহামারী দেখা দেওয়ার পর এটা তাঁর ষষ্ঠ ‘করোনা স্পেশ্যাল’ ভাষণ। কিন্তু আগের পাঁচটা ভাষণের মত এবারের ভাষণেও তিনি দেশের কোভিড-১৯ ব্যাধির পরিস্থিতি নিয়ে যৎসামান্য বললেন এবং মহামারীর নিয়ন্ত্রণে তাঁর সরকার কি করছে সে সম্পর্কে একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না। লকডাউনের প্রথম পর্যায়ে তাঁর নির্বাচনী ক্ষেত্র বারানসির জনগণের উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি কোভিড১৯-এর বিরুদ্ধে লড়াইকে মহাভারতের মহাকাব্যিক লড়াইয়ের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী গুরুত্বের সঙ্গে বলেছিলেন, মহাভারতের লড়াই জেতা হয়েছিল ১৮ দিনে, আর কোভিড১৯-এর বিরুদ্ধে লড়াই জেতা হবে ২১ দিনে।

২১ দিনের নির্দিষ্ট সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার ৭৭ দিন পর দেখা যাচ্ছে, কোভিড-১৯ সংক্রমণের ক্ষেত্রে ভারত এখন চতুর্থ স্থানে রয়েছে (তৃতীয় স্থানের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবধান দ্রুত কমে আসছে), সংক্রমণের সংখ্যা ৬ লক্ষর কাছাকাছি; আর কোভিড ১৯ ব্যাধিতে মৃত্যুর নিরিখে ভারতের স্থান এখন অষ্টম, ঘোষিত মৃত্যুর সংখ্যা ১৭ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। তাঁর ভাষণে প্রধানমন্ত্রী কোভিড-১৯ প্রসঙ্গে যেটুকু বললেন তাতে তিনি নাগরিকদের মনে করিয়ে দিলেন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে তাদের কী কী করতে হবে এবং কোন স্বাস্থ্যবিধিতে তাদের অভ্যস্ত হতে হবে; এবং মৃত্যুর হার যে কম হচ্ছে তার কারণ হিসাবে লকডাউনের কথা বলে নিজে তার কৃতিত্ব নিলেন। ইউরোপের দেশসমূহ এবং আমেরিকার সঙ্গে তুলনা করে ভারতে মৃত্যুর হার কম বলে দেখিয়ে লকডাউনের সাফল্য দাবি করাটা সরকারের প্রচারের সাধারণ কৌশল হয়ে উঠেছে। এর চেয়ে প্রতারণাময় আর কিছু হতে পারে না।

ext

 

অনেক বিশেষজ্ঞ প্রথম থেকে বলে আসছেন যে, সৌভাগ্যক্রমে ভারতে মৃত্যুর হার অনেক কম হবে, কারণ, ফ্লুর সঙ্গে লড়াইয়ে গড়পড়তা ভারতবাসীর সংক্রমণ প্রতিহত করার ক্ষমতা বেশি রয়েছে এবং বিশ্বের এই অংশে ভাইরাস প্রজাতিটির ভয়াবহতাও কম বলে দেখা যাচ্ছে। পরিসংখ্যানগত দিক থেকে ভারতের সাফল্য বেশি দেখানোর জন্য সরকার উদাহরণগুলোকে বেছে-বেছে হাজির করছে। জনসংখ্যার দিক থেকে বিচার করলে আমাদের পরিসংখ্যান বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ চীনের চেয়ে অনেক খারাপ, কোভিড ব্যাধিতে আক্রান্তের বিচারে চীনের স্থান এখন ২২তম। আমাদের পরিসংখ্যানকে পশ্চিমের এবং পূবের প্রতিবেশিদের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে মৃত্যুর হার (২ শতাংশ) ভারতের (৩ শতাংশ) তুলনায় বেশ কম। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যেও মৃত্যুর হারে প্রভূত ফারাক রয়েছে—ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স এবং গ্ৰেট ব্রিটেন যেমন সর্বোচ্চ হারের, ১০-২০ শতাংশের গ্ৰুপে পড়ছে, জার্মানিতে মৃত্যুর হার ৫ শতাংশের নীচে এবং রাশিয়াতে ২ শতাংশের বেশ কিছুটা কম।

যে সত্যিটাকে মোদী কখনই স্বীকার করেননি তা হল, লকডাউন পর্বে ভারতের ফলাফলই সবচেয়ে নিকৃষ্ট হয়েছে। বিশ্বের কোনো দেশকেই লকডাউন প্রসূত এমন ধরনের ও এরকম মাত্রার সংকটের মোকাবিলা করতে হয়নি যার ধাক্কায় ভারত এখনও টলমল করছে। কোনো দেশকেই দলে-দলে পরিযায়ী শ্রমিকদের নিষ্ক্রমণ দেখতে হয়নি যেমনটা ভারতে দেখা গেছে। লকডাউনের কারণে ঘটা শতশত মৃত্যুর শোচনীয় আখ্যানের, যে মৃত্যুগুলোকে সম্পূর্ণরূপে এড়ানো যেত, মুখোমুখিও অন্য কোনো দেশকে হতে হয়নি। ভারতের তুলনামূলক কম মৃত্যু হারকে দেখিয়ে মোদী সবকিছুই ধামাচাপা দিতে চান। মৃত্যু হারের দিক থেকে সবচেয়ে ওপরে থাকা সাতটা দেশ হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, গ্ৰেট ব্রিটেন, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, মেক্সিকো। এই দেশগুলোর তুলনায় ভারতের মৃত্যু হার কম দেখিয়ে তিনি চান যে, আমরা যেন তাঁর সরকার এবং তার চাপিয়ে দেওয়া চূড়ান্ত নির্মম এবং নিতান্তই অরাজক লকডাউনের গুণগান করি। এটা দুরভিসন্ধিমূলক এবং প্রতারণাময় প্রচার নামাতে মহামারীকে কাজে লাগিয়ে নেওয়া ভিন্ন অন্য কিছু নয়।

aaa

 

মোদীর ৩০ জুনের নিজের পিঠ চাপড়ানো আত্মপ্রচারের সবচেয় নিকৃষ্ট এবং অশোভন বিষয়টা উঠে এল সরকার যেটাকে বলছে ‘গরিব কল্যান অন্ন যোজনা’ তাকে কেন্দ্র করে। যে কর্মসূচীর অধীনে প্রতিটি পরিবার মাসে এক কেজি ডাল এবং পাঁচ কেজি গম বা চাল (পরে উল্লিখিত শস্যটি আবার মাথাপিছু ভিত্তিতে) বিনামূল্যে পাচ্ছে, সেই কর্মসূচীটিকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত সম্প্রসারিত করার কথা তিনি ঘোষণা করলেন। এই কর্মসূচীটাকে তিনি এমন একটা বিষয় বলে বর্ণনা করলেন যা ‘গোটা দুনিয়াকে চমকে দিয়েছে’, আরও একবার সুবিধা প্রাপকদের সংখ্যাকে হাজির করলেন ছোট দেশগুলোর জনসংখ্যার গুণিতকের ভিত্তিতে (প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া হিসেব অনুসারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার ২.৫ গুণ, গ্রেট ব্রিটেনের জনসংখ্যার ১২ গুণ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দুগুণ)। প্রধানমন্ত্রী আরও জানালেন, উৎসবের মরশুমের কথা মাথায় রেখেই তিনি এই সম্প্রসারণ ঘটিয়েছেন, বেশ গুরুত্ব দিয়েই উল্লেখ করলেন দেওয়ালি আর ছটের কথা (অক্টোবর আর নভেম্বরে বিহারে নির্বাচন হওয়ার কথা)।

লকডাউনের শুরু থেকেই ব্যাপক মানুষের দাবি ছিল লকডাউন প্যাকেজ নিশ্চিত করার যে প্যাকেজে থাকবে আয়কর সীমার নীচে অবস্থানকারী সমস্ত পরিবারের জন্য অন্ততপক্ষে ১০ কেজি চাল/গম ও অন্যান্য অপরিহার্য রেশন এবং সরাসরি নগদ ট্র্যান্সফারের মাধ্যমে মাসে ৭৫০০ টাকা উপার্জন সহায়তা। সরকার কেবল সামান্য কিছু রেশন দেওয়ার মধ্যেই নিজেকে সীমিত করেছে যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাস্তবে কোনও সুরাহা করতে পারেনি কারণ অভাবী পরিবারগুলির হাতে কোনো নগদ সরবরাহ না থাকায় রান্না করার জন্য অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনা অসম্ভব হয়ে উঠেছে। লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবি ও গরিব পরিবারের উপার্জন সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেছে। হাতে যৎসামান্য যা সঞ্চয় ছিল তাও খরচ করে ফেলতে বাধ্য হয়েছে। ফ্রি রেশন মানে তো একেক পরিবারে মাসে বড়জোর ৬০০-৭০০ টাকার জোগান যা আসলে এসব পরিবারের এক দিনের রোজগার, লকডাউনে যে রোজগার হারিয়েছেন তাঁরা।

far

 

পিএম ভারতের কৃষকদের এবং সৎ কর-দাতাদের ধন্যবাদ জানালেন ফ্রি রেশন প্রকল্প চালাতে সরকারকে সাহায্য করার জন্য। পিএম কৃষকদের ধন্যবাদ জানাচ্ছে, অথচ ভারতের কৃষকদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতি একবার ফিরেও তাকাচ্ছেন না। বাস্তবে রাজ্যকেন্দ্রিক এপিএমসি নেটওয়ার্কে অন্তর্ঘাত চালিয়ে ও অবলুপ্ত করে সরকার ফসলের ন্যায্য মূল্য সুনিশ্চিত করার দায় ঝেড়ে ফেলতে শুরু করেছে। আর সৎ কর-দাতা বলতে তো ভারতের ধনকুবেরদের বোঝায় না যাদের ওপর অত্যন্ত নিম্নহারে কর ধার্য্য হয় আর ছলেবলে কৌশলে যারা করের টাকা চুরি করার মাস্টার। ঘুরে ফিরে সেই সাধারণ মানুষই তো সরকারকে কর জোগায় সরকারের অমূলক জিসটি ও আবগারি শুল্কের স্বেচ্ছাচারি রাজত্বে। মোদি সরকারের আমলে ভারতের আভ্যন্তরীণ পণ্যের ওপর নির্ধারিত শুল্ক (আবগারি শুল্ক) যে আসলে জনতাকে নিংড়ে নেওয়ার ব্যবস্থা তা একটা উদাহরণেই যথেষ্ট হবে। নজর করুন, পেট্রল কেনার ক্ষেত্রে লিটার পিছু আবগারি শুল্ক ৯.২০ টাকা (মে ২০১৪) থেকে বেড়ে ৩২.৯৮ টাকা (জুন ২০২০) হয়েছে, আর লিটার পিছু ডিজেলে এই শুল্ক লকডাউনের তিন মাসে ৩.৪৬ টাকা থেকে লাফিয়ে হয়েছে ৩১.৮৩ টাকা।

tra

 

এখন আমরা লকডাউনের চতুর্থ মাসে প্রবেশ করছি (সরকার অবশ্য একে আনলক-২ বলছে, যদিও শহরতলির লোকাল ট্রেন পুরোপুরি বন্ধ আছে এবং দূরপাল্লার ট্রেন হাতে গোণা কয়েকটি মাত্র চলছে), এখন একদিকে কোভিড-১৯ সংক্রমণ আরও বিস্তৃত হচ্ছে আর অন্যদিকে অর্থনৈতিক মন্দার মার আরও তীব্র হচ্ছে। এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকে মুক্তির কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার বদলে সরকার বেসরকারীকরণ অভিযানের সুযোগ হিসেবে এই সংকটকে ব্যবহার করতে উঠেপড়ে লেগেছে। সর্বশক্তি নিয়ে প্রতিরোধ গড়া ছাড়া ভারতের শ্রমজীবী জনতার আর কোন রাস্তা খোলা নাই। ৩০ জুন ছিল মহান সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৬৫তম দিবস। হুল দিবসের দিনটাও মোদি মিথ্যা ভাষণের দিন হিসেবেই ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু ভারতের শ্রমজীবী ও আদিবাসী মানুষের কাছে দিনটা ছিল কর্পোরেট লুটের বিরুদ্ধে এবং পরিবেশপ্রকৃতি ও মানুষের অধিকার রক্ষায় নতুন করে লড়ায়ের শপথ নেওয়ার দিন। এবং লড়াইয়ের সেই সুরেই জুলাই মাসটা শুরু হবে কয়লা শিল্পে ২-৪ তিনদিন ব্যাপী বেসরকারীকরণ-বিরোধী ধর্মঘট ও ৩ জুলাই কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলির দেশব্যাপী প্রতিবাদের মধ্যে দিয়ে।

Published on 04 July, 2020