মুজাফ্ফরনগর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় অভিযুক্ত বিজেপি নেতাদের শাস্তি থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা আদিত্যনাথ সরকারের

দেশের বিচার ব্যবস্থা আরো একবার প্রহসনের সাক্ষর রাখল গত ২৫ মার্চ, যেদিন উত্তরপ্রদেশের মুজাফ্ফরনগরের বিশেষ আদালতের বিচারপতি রাম সুধ সিং ২০১৩ সালে ...

Muzaffarnagaru Riot

দেশের বিচার ব্যবস্থা আরো একবার প্রহসনের সাক্ষর রাখল গত ২৫ মার্চ, যেদিন উত্তরপ্রদেশের মুজাফ্ফরনগরের বিশেষ আদালতের বিচারপতি রাম সুধ সিং ২০১৩ সালে সংঘটিত মুজাফ্ফরনগর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় অভিযুক্ত বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়ার উত্তরপ্রদেশের যোগী সরকারের আবেদনে সায় দিলেন। মোদী সরকার ২০১৪ সালে কেন্দ্রীয় সরকারে বসার পর বারবারই দেখা গেছে -- অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো বিচার বিভাগও বিজেপি ঘেঁষা হয়ে বিজেপি যেমন চায় সেরকম রায় দেওয়াতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। আদালতের এই ধরনের রায়দানের ফলে দাঙ্গা সংঘটনে, পুলিশের সঙ্গে ভুয়ো সংঘর্ষে নাগরিক হত্যার চক্রান্তে অভিযুক্ত বিজেপি নেতারা যেমন রেহাই পেয়েছেন, তারই সাথে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মামলায় আদালতের দিক থেকে ন্যায়বিচারের তোয়াক্কা না করার প্রবণতাও প্রকট হয়ে সামনে এসেছে। মুজাফ্ফরনগর দাঙ্গা সংঘটিত হয় ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে, ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে, যখন নরেন্দ্র মোদী ইতিমধ্যেই বিজেপি’র প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী রূপে ঘোষিত হয়েছেন। মুজাফ্ফরনগরের নাগলা মাণ্ডোরে গ্ৰামে অনুষ্ঠিত মহাপঞ্চায়েত থেকে (যা অনুষ্ঠিত হয় ৭ সেপ্টেম্বর) সলতে পাকানো শুরু হয় দাঙ্গার। ‘বেটি বহু ইজ্জত বাঁচাও’ নাম দিয়ে সেই মহাপঞ্চায়েতে ‘লাভ জেহাদ’কে ইস্যু করে বিজেপি নেতারা মুসলিম ছেলেদের হাতে হিন্দু মেয়েদের ইজ্জত বিপন্ন হওয়ার আষাড়ে গল্প ফেঁদে উস্কানিমূলক বক্তৃতা দিয়ে পরিস্থিতিকে উত্তেজনাময় করে তুললেন। একটি মুসলমান ছেলের হিন্দু মেয়ের পিছু নেওয়ার আজগুবি অভিযোগকে কেন্দ্র করে এবং মুসলিম ছেলেটিকে হত্যা করা বীরত্বপূর্ণ কাজ বলে জাহির করার মধ্যে দিয়ে যে দ্বন্দ্বর শুরু তা অবশেষে ভয়াবহ দাঙ্গায় পরিণতি লাভ করল। একটা ভিডিও ইউ টিউব এবং ফেসবুকের মত সামাজিক মাধ্যমে ঘুরতে লাগল। সেই ভিডিও দেখাল – দুই হিন্দু যুবককে মুসলিমরা পিটিয়ে মারছে। এই দুই ভাইয়ের মৃত্যুর বদলা ও ন্যায়বিচারের জিগির তুলে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্বেষকে তীব্র করে তোলা হল। পরে পুলিশ তদন্ত করে জানাল যে ভিডিওতে দেখানো ঘটনা আদৌ উত্তরপ্রদেশের কাওয়াল গ্ৰামের নয় এবং ভিডিওটা দু’বছরের পুরনো। ঐ ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে তুলেছেন বলে অভিযুক্ত হলেন বিজেপি বিধায়ক সঙ্গীত সোম। সুপরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘু মহল্লাগুলোতে ও পরিবারগুলোর ওপর চালানো হল পৈশাচিক আক্রমণ, ৬০-এর বেশি মানুষ নিহত হলেন, ৫০,০০০-এরও বেশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ ঘরবাড়ি থেকে উৎখাত হয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হলেন সরকারের বানানো বিভিন্ন শিবিরে। এই দাঙ্গার পিছনে  মূল মাথা হিসাবে অমিত শাহ কাজ করেছিলেন বলেই জনশ্রুতি। দাঙ্গা থেকে বিজেপি বিপুল লাভ তুলল, সমাজবাদী পার্টি ও বিএসপি’কে ধরাশায়ী করে উত্তরপ্রদেশে ৮০টা সংসদীয় আসনের মধ্যে বিজেপি একাই দখল করল ৭১টা আসন। বিজেপি’র কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় আসা এবং নরেন্দ্র মোদীর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে মুজাফ্ফরনগর দাঙ্গার ভূমিকা এইভাবে বড় হয়ে দেখা দিল। সেদিন যারা মুজাফ্ফরনগরে দাঙ্গা বাধানোয় মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন, যোগী সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে সেই নেতারা বেকসুর খালাস পাবেন। সেই নেতাদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান যোগী মন্ত্রীসভার মন্ত্রী সুরেশ রাণা, বিধায়ক সঙ্গীত সোম, পূর্বতন বিজেপি সাংসদ ভরতেন্দু সিং, বর্তমান মন্ত্রিসভার রাষ্ট্রমন্ত্রী কপিল দেব আগরওয়াল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ নেত্রী সাধ্বী প্রাচী, প্রমুখ। এদের জাতীয় সুরক্ষা আইনে গ্ৰেপ্তার করা হয় এবং পরে জাতীয় সুরক্ষা উপদেষ্টা বোর্ড তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে নিলে তাদের জামিন পেতে অসুবিধা হয় না।

শুরুতে আদালতের রায়ে বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত বিজেপি নেতাদের রেহাই পাওয়ার যে উল্লেখ করা হয়েছে তার দু’একটার দিকে তাকানো যাক। নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আট মাস পরই গুজরাটের সোহরাবুদ্দিন সেখ সংঘর্ষ হত্যা মামলা থেকে খালাস পেলেন অমিত শাহ – অত্যন্ত বিতর্কিত পরিস্থিতিতে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে মামলা গুজরাটের বাইরে নিয়ে এসে চালানো হচ্ছিল মুম্বাইয়ে সিবিআই-এর বিশেষ আদালতে। যে বিচারপতি আদালতে শাহর উপস্থিতি নিয়ে কড়া মনোভাব নিয়েছিলেন তাঁকে বদলি করা হল, আর বদলি করা হল সিবিআই-এর সেই অফিসারদের যারা সোহরাবুদ্দিন হত্যা মামলার তদন্ত করছিলেন। বিচারপতি বদলি হওয়ার পর যিনি বিচারপতি হয়ে এলেন, সেই বিচারপতি ব্রিজগোপাল হরকিসান লোয়ার মৃত্যু হল রহস্যজনক পরিস্থিতিতে। তাঁকে মেরে ফেলার ভয় দেখানো হয়েছিল বলে অভিযোগ এবং আরো অভিযোগ বোম্বে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি স্বয়ং তাঁকে ঘুষের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এরপর যিনি অমিত শাহ মামলার বিচারপতি হয়ে এলেন, সেই এম ভি গোসাভি কোনো বিচার না করেই এক মাসেরও কম সময়ে অমিত শাহকে বিচার প্রক্রিয়া থেকে অব্যাহতি দিলেন। এই মামলায় অমিত শাহর রেহাইয়ের সঙ্গেই অভিযোগ মুক্ত হয়ে খালাস পেলেন রাজস্থানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী গুলাব চাঁদ কাটারিয়া ও ভুয়ো সংঘর্ষ হত্যায় অভিযুক্ত গুজরাটের পুলিশ অফিসাররা।

বাবরি মসজিদ ধ্বংস মামলায় চূড়ান্ত উদ্ভট যুক্তিতে বিশেষ আদালতের বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার যাদব যে বিজেপি নেতা-নেত্রীদের রেহাই পাওয়ার পথ প্রশস্ত করলেন তাদের মধ্যে ছিলেন এল কে আদবানি, মুরলি মনোহর যোশী, উমা ভারতি ও আরো অনেকে। সর্বসমক্ষে যা সংঘটিত হয়েছিল, টিভিতে যা সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছিল, তা জানিয়েছিল যে বিজেপি’র সর্বোচ্চ নেতাদের উপস্থিতিতেই ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদকে ধ্বংস করা হয়েছিল। মসজিদ যখন চূর্ণ করা হচ্ছিল তখন কিছু নেতার উল্লাস প্রকাশের ছবি ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল। আরো ধরা পড়েছিল বিজেপি নেতা-নেত্রীদের দেওয়া ‘এক ধাক্কা আউর দো’র মতো শ্লোগান। লিবারহান কমিশন তাদের রিপোর্টে জানিয়েছিল যে, বাবরি মসজিদ ‘নিখুঁতভাবে ছকা পরিকল্পনা’র মধ্যে দিয়েই ধ্বংস করা হয়েছিল, আর সেই পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল সংঘ ও বিজেপি নেতৃবৃন্দের। এগুলো বিশেষ আদালতের বিচারপতির কাছে কোনো গুরুত্বই পেল না। বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার যাদব রায়ে অবলীলায় বললেন, “সমাজবিরোধী লোকজন কাঠামোটাকে ভেঙ্গেছে। অভিযুক্ত নেতারা তাদের থামানোর চেষ্টা করেছিলেন”। এরচেয়ে আজগুবি যুক্তি আর কি হতে পারে!

মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর আদিত্যনাথ নিজেরই বিরুদ্ধে চলা বেশ কিছু মামলা প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, উত্তরপ্রদেশের বড় হিন্দুত্ববাদী নেতা হিসাবে আদিত্যনাথ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানো, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্বেষ সৃষ্টি করা, অন্য সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্থান নিয়ে অশালীন মন্তব্য করা, শান্তি বিঘ্নিত করা ও আরো নানান অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, ন্যায়বিচারকে বানচাল করতেই তারা সিদ্ধহস্ত।

অযোধ্যা জমি মালিকানা মামলার রায়ের উল্লেখও এখানে অপ্রাসঙ্গিক হবে না এই জন্য যে, উপরে উল্লেখিত রায়গুলোর মতো এই রায়ও বিচারের বিপথগামিতাকে নির্দেশিত করে নরেন্দ্র মোদী জমানার আর একটা বিচারবিভাগীয় ‘বিজয়’এর নজির হয়ে রয়েছে। ১৯৪৯ সালে চুপিসারে বাবরি মসজিদের ভিতর রামলালার মূর্তি ঢুকিয়ে শুরু হয়েছিল ষড়যন্ত্রের একটা প্রক্রিয়া। ২০১৯এর নভেম্বরে প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ সহ সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চের রায়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত বাবরি মসজিদের স্থলে রামমন্দির নির্মাণের জন্য হিন্দুদের হাতে তুলে দেওয়ার মধ্যে দিয়ে সেই বৃত্তের পূর্ণতাপ্রাপ্তি ঘটল। এই ধরনের রায় যে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুত্ববাদী সামাজিক বুনটকে প্রচণ্ডভাবে ক্ষতবিক্ষত করতে পারে, বিচারপতিদের বিবেচনা তাকে একটুও স্পর্শ করতে পারল না।

বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে চলা মামলা তুলে নেওয়ার সুপারিশ করতে গিয়ে আদিত্যনাথের সরকার বলছে, এটা করা হচ্ছে ‘জনস্বার্থে’। জনস্বার্থ বলতে তো জনগণের স্বার্থকেই বোঝায়। যে নেতারা জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে, জাল ভিডিও দেখিয়ে দাঙ্গা সংঘটিত করলেন, তাদের রেহাই দেওয়া কোন ধরনের জনস্বার্থ? দাঙ্গায় যে বহু সংখ্যক মানুষ নিহত হলেন আর যে হাজার-হাজার মানুষকে ঘরবাড়ি থেকে উৎখাত হয়ে শিবিরে আশ্রয় নিতে হল, তাদের ন্যায়বিচারের বঞ্চনাটা কোন্ জনস্বার্থকে নির্দেশিত করে? আদিত্যনাথ সরকারের এই পদক্ষেপের মধ্যে দিয়ে এই বার্তাই বেরিয়ে আসছে যে -- রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত ও তার কাছাকাছি থাকা ব্যক্তিরা ঘৃণ্য অপরাধ করলেও শাস্তি থেকে অব্যাহতি পাবে, যে উদ্দেশ্যে দাঙ্গা সৃষ্টির মতো ন্যক্কারজনক কাজ, তার রাজনৈতিক ফসল তাদের কুড়োতে দেওয়া হবে।

সিপিআই(এমএল)-এর উত্তরপ্রদেশ শাখা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় অভিযুক্ত বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা তুলে নেওয়ার রাজ্য সরকারের প্রস্তাবে মুজাফ্ফরনগরের জেলা আদালতের সায় দেওয়াটা দুর্ভাগ্যজনক। বিবৃতিতে দাবি জানানো হয়েছে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে উচ্চতর আদালতকে স্বীয় উদ্যোগে মামলাগুলি বিচারযোগ্য বলে গণ্য করতে হবে, মামলাগুলোকে পুনরায় শুরু করতে হবে, দাঙ্গায় নিহত ও ক্ষতিগ্ৰস্তদের ন্যায়বিচার দিতে হবে। উল্লেখ্য, কর্ণাটকে বিজেপি সরকারও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় অভিযুক্ত বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে ২১টা মামলা তুলে নেওয়ার আবেদন জানায়। সেই প্রসঙ্গে কর্ণাটক হাইকোর্ট বলে, “কোনো আদালতই সরকারের করা মামলা তুলে নেওয়ার সুপারিশে সায় দিতে বাধ্য নয়। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩২১ ধারায় আবেদন করা হলেও আদালত প্রাথমিকভাবে এই মূল্যায়ন করতে বাধ্য যে মামলা প্রত্যাহারের যুক্তিগ্ৰাহ্যতা ঠিক আছে কি নেই, এবং সরকারের সুপারিশকে খারিজ করার ক্ষমতা আদালতের রয়েছে।” অতএব, মুজাফ্ফরনগর দাঙ্গায় অভিযুক্তদের ক্ষেত্রেও মামলা পুনরায় শুরু করার ক্ষমতা উচ্চতর আদালতের আছে, এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থে তা করাও উচিৎ।

Published on 09 April, 2021