কোভিড-১৯ এবং লকডাউন সৃষ্ট বিপর্যয়ের মধ্যে আম্বেদকর স্মরণ

এবছর আমরা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া এক ঘাতক মহামারী সৃষ্ট বিপন্নতা এবং দেশব্যাপী বলবৎ লকডাউনের চাপানো অসহনীয় ভারের পরিস্থিতির মধ্যে আমবেদকর জয়ন্তী উদযাপন করছি। সবাই সমবেত হয়ে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের মতো অবস্থা নেই, ....

h6

এবছর আমরা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া এক ঘাতক মহামারী সৃষ্ট বিপন্নতা এবং দেশব্যাপী বলবৎ লকডাউনের চাপানো অসহনীয় ভারের পরিস্থিতির মধ্যে আমবেদকর জয়ন্তী উদযাপন করছি। সবাই সমবেত হয়ে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের মতো অবস্থা নেই, তবে সব সময়েই যা করেছি, এবারও সে রকম ভাবেই আমাদের তাঁর মুক্তিকামী সংগ্ৰাম, চিন্তাধারা ও উত্তরাধিকার থেকে অনুপ্রেরণা নিতে হবে। “শিক্ষিত কর, আন্দোলন কর, সংগঠিত কর” – তাঁর এই আদর্শমন্ত্র থেকে আজকের এই বিপুল সংকটের মোকাবিলায় আমাদের সঞ্জিবীত হতে হবে; করোনা ভাইরাসের সঙ্গেই সক্রিয় থাকা নিপীড়ন ও অবিচারের সামাজিক ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই এবং জাত প্রথাকে ধ্বংস করার তাঁর উদাত্ত আহ্বান থেকে আমাদের উজ্জীবিত হতে হবে; এবং তাঁর সভাপতিত্বে রচিত আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনায় উল্লিখিত ন্যায়, স্বাধীনতা, সমতা ও ভ্রাতৃত্বের লক্ষ্যগুলো অবশ্যই আমাদের উদ্যোগ ও লড়াইগুলোকে পথ দেখাতে থাকবে।

ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার জন্য আমেরিকা ও ইউরোপের বর্ণবাদী শক্তিগুলো চীনকে দোষারোপ করছে, এবং ভারতে সংঘবাহিনী ও গোডি মিডিয়া এরই সাথে মুসলিমদেরও দায়ী করছে। মনুবাদী সামাজিক ব্যবস্থা ঐতিহাসিক ভাবে দলিতদের বিরুদ্ধে যে অস্পৃশ্যতাকে চালিয়ে এসেছে, আজ তাকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে, অন্য রাজ্যে কর্মরত বা অধ্যয়ন রত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষদের বিরুদ্ধে, ভাইরাসে আক্রান্ত বলে সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে এবং এমনকি কোভিড আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা করা ডাক্তার ও পরিচর্যাকারীদের বিরুদ্ধেও সম্প্রসারিত করা হচ্ছে। কোভিড-১৯ অতিমারি এইভাবে নতুন রূপের অস্পৃশ্যতার অভিব্যক্তির মাধ্যম হয়ে উঠেছে; আমরা যারা সবসময়েই সামাজিক উৎপীড়ন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে এসেছি, তাদের সর্বশক্তি দিয়ে এই সাম্প্রদায়িক ভাইরাস এবং বিদ্বেষ প্রসূত সামাজিক বর্জনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

সংবিধান আমাদের এই স্বীকৃতি দেয় যে – আমাদের বুনিয়াদি অধিকার আছে, আমরা সার্বভৌম ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষের নির্মাতা। মোদী সরকার কিন্তু ভারতবাসীদের তাদের হাতের পুতুল বলেই গণ্য করে যাদের প্রতারিত করার কায়দাবাজি এবং কুসংস্কার দিয়ে অদৃশ্য সুতোর টানে নাচানো যায়, এবং তাদের এমন দরিদ্র বলে মনে করে যারা শুধুই তুচ্ছ কিছু সংখ্যা, যাদের জন্য খাদ্য বা রেশনের ব্যবস্থা না করেই, কোনো ভাতা বা জীবনধারণের উপায় ছাড়াই লকডাউনের পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দেওয়া যায়। বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য লক্ষ-লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিককে পায়ে হেঁটে শত-শত কিমি পথ পেরোতে বাধ্য করা হয়েছে, এবং আরও লক্ষ-লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিককে খাদ্য বা টাকাপয়সা না থাকা অবস্থায় সহায়সম্বলহীনভাবে আটকে থাকতে হচ্ছে। গ্ৰাম ও শহরের দরিদ্রেরও একই রকম দুরবস্থা, সরকারের দাবির বিপরীতে তাদের কাছে কোনো রেশন বা ত্রাণ পৌঁছচ্ছে না। আমবেদকার থাকলে নাগরিক হিসাবে আত্মঘোষণা করার পরামর্শ আমাদের দিতেন, আমাদের অধিকার ও ন্যায্য অংশ দাবি করতে বলতেন, এবং বিজ্ঞান মনস্কতা ও মনুষ্যসুলভ বিচারবুদ্ধি দিয়ে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বলতেন।

আমবেদকরের সারা জীবনটাই অধিকার ও স্বাধীনতার  জন্য লড়াইতে ব্যয়িত হয়েছে – শ্রমিকদের অধিকার, নারীদের সমতা এবং নাগরিকদের স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে। মোদী সরকার আজ কষ্টার্জিত আমাদের সমস্ত অধিকারের প্রতি চূড়ান্ত নির্মমতা দেখাচ্ছে। লকডাউন ঘোষণা করতে গিয়ে যে আইনটার আশ্রয় সরকার নিয়েছে সেটা ১২৩ বছর আগের ঔপনিবেশিক আমলের একটা আইন – ১৮৯৭ সালের দানবীয় মহামারী ব্যাধি আইন যা নাগরিকদের সমস্ত আইনি রক্ষাকবচ ও সুরক্ষা হরণে রাষ্ট্রকে যে কোন স্বৈরাচারী পদক্ষেপ ঘোষণার অনুমোদন দেয়। প্রতিদিনের কাজের শিফটকে আট ঘণ্টা থেকে বাড়িয়ে বারো ঘন্টা করার চেষ্টা হচ্ছে। ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণ পরীক্ষাকে – যা কন্যা ভ্রূণ হত্যাকে সহজসাধ্য করে তোলে – নিষিদ্ধ করা সম্পর্কিত আইনকে অতিমারীর জন্য চিকিৎসার ওপর অত্যধিক চাপ পড়ার অছিলায় মুলতুবি করা হয়েছে। নিয়োগকর্তারা মজুরি হ্রাস এবং বিপুল আকারের কর্মী ছাঁটাইয়ের দাবি জানাচ্ছেন আর ভারতের প্রধান বিচারপতি বলছেন যে, লকডাউনের মধ্যে শ্রমিকদের যখন খাবার দেওয়া হচ্ছে তখন তাদের মজুরি দেওয়ার প্রয়োজনটা কোথায়।

মানবাধিকার, বিশেষভাবে নিপীড়িত অংশগুলির অধিকার এবং সরকার বিরোধী মতো প্রকাশকারী নাগরিকগণ এবং সরকারের সমালোচকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ভারতবর্ষে কখনই সুরক্ষিত বলে দেখা যায়নি। আজ সেগুলো বিশেষ করে বিপন্ন হয়ে উঠেছে এই জন্য যে, মোদী সরকার সমালোচনামূলক প্রতিটি কণ্ঠকেই দমিয়ে দিতে চাইছে। অতিমারী চলা অবস্থায় সমস্ত রাজনৈতিক বন্দীকে মুক্তি দেওয়া এবং সমস্ত বিচারাধীন বন্দী এবং বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী বন্দীদের জামিনে ও শর্তাধীনে মুক্তি দেওয়াটাই যখন সরকারের উচিত, ভারতীয় রাষ্ট্র তখন সমাজ আন্দোলনের আরও কর্মীদের গ্ৰেপ্তার ও নির্যাতন করার পথেই যাচ্ছে। আনন্দ তেলতুমদে ও গৌতম নঔলাখার মতো বিদ্বজ্জন ও লেখক থেকে সিদ্ধার্থ বরদরাজন ও সিএএ-র বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো মানুষজন – এদের সবাইকেই নির্যাতিত হতে হচ্ছে; আর জিএন সাইবাবা, ভারভারা রাও, সুধা ভরদ্বাজ এবং কৃষি শ্রমিকদের বেশ কয়েকজন নেতা এবং ভারতের বিভিন্ন স্থানে দলিত ও আদিবাসীদের সুরক্ষা যোগানো ব্যক্তিদের এখনও জেলে পচতে হচ্ছে। আমরা যখন ডঃ ভীমরাও আম্বেদকরের মুক্তিকামী উত্তরাধিকারকে স্মরণ করব, আমাদের তখন অবশ্যই সমস্ত নাগরিকের মানবাধিকার ও সাংবিধানিক স্বাধীনতার পরিপূর্ণ সুরক্ষার দাবি জানাতে হবে।

 ( এম-এল আপডেট সম্পাদকীয়, ১৪ এপ্রিল ২০২০)

Published on 18 April, 2020