
সম্প্রতি বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত নিন্দনীয় ভাষায় অধ্যাপক অমর্ত্য সেনকে তাঁর শান্তিনিকেতন বাসভবন প্রতীচী থেকে উচ্ছেদ করার হুমকিসহ নোটিশ জারি করেছেন মাত্র কয়েক ছটাক অবৈধ জমি ৬ মে’র মধ্যে ফেরত দেবার আদেশ দিয়ে। ক্ষমতাসীন দলই কিন্তু ২৫ বছর আগে তাঁকে শ্রেষ্ঠ খেতাব ‘ভারতরত্ন’ দিয়েছিল।
কলকাতায় জনা পাঁচেক লেখক বুদ্ধিজীবী একটি উদ্যোগ নিয়েছিলেন যাতে এমন অন্যায় ও অশোভন আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ধ্বনিত হয় এবং কর্তৃপক্ষ এরকম কাজ থেকে নিজেদের বিরত রেখে অধ্যাপক সেনের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন। প্রতিবাদে সরব হতে তাঁরা সমাজের কাছেও আবেদন রেখেছেন। এই উদ্দেশে গত ২৮ এপ্রিল ২০২৩, নন্দনের তিন নম্বর প্রেক্ষাগৃহে অনীতা অগ্নিহোত্রী এবং অচিন চক্রবর্তী সহ কয়েকজন সময়ের প্রয়োজনে সভাটি আহ্বান করেন। বৃষ্টি বাদল উপেক্ষা করে সত্তরের বেশি ক্ষুব্ধ, লজ্জিত ও ব্যথিত বিশিষ্ট মানুষ এতে সাড়া দেন। অমিয় দেব, রুদ্র প্রসাদ সেনগুপ্ত, উমা দাসগুপ্ত, দেবশঙ্কর হালদার, সৌরীন ভট্টাচার্য, কুমার রাণা, অনির্বাণ ভটতাচার্য, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, অনিল আচার্য, গৌতম হালদার, বিকাশ সিনহা প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
জমি সংক্রান্ত আইনি ব্যাপারটা তাঁদের কাছে বিবেচ্য মনে হয়নি। এটি নিছক একটা কুৎসিত অজুহাত মাত্র। বক্তারা বলেন, আসল লক্ষ্য ছিল তিনি জাতির কাছে যে শ্রদ্ধার আসন অর্জন করেছেন তাঁর কথায় ও কাজে, তাকে কেন্দ্রের শাসকেরা ভয় পেয়েছে। মানুষের মতামতকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে প্রফেসর সেনের ভুমিকা কী এবং বিপদ কী তা ওরা ভালোভাবেই জানে। এই প্রভাবকে ওরা ভয় দেখিয়ে, আতঙ্ক ছড়িয়ে ধ্বংস করতে চাইছে। সমাজকর্মী মনীষা ব্যানার্জি এদের হাউই’এর সঙ্গে তুলনা করেছেন, যারা তারার মুখে ছাই দিতে উড়ে যায় কিন্তু সেগুলি ফিরে আসে তাদেরই পিছু পিছু। আসলে শুরু থেকেই অধ্যাপক সেন প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনায় মুখর অনেকের মতোই। নোটবন্দী, জিএসটি, নয়া নাগরিকত্ব আইন, ৩৭০ ধারা বিলোপ, বেকারত্ব সব কিছুতেই তিনি ভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন সোচ্চারে। এর জন্যই তাঁকে নিশানা করা। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে নতুন ভাবনা প্রয়োগ করতে গিয়ে তাঁকে পাকেচক্রে সরে যেতেই হল। আদানিকে নিয়ে একটার পর একটা খেলা চলছে। সুপ্রিয় ঠাকুরদের মতো আশ্রমিকরা ‘আচার্য’ মোদীকে অভিযোগ জানাতে গেলে তিনি মৌনব্রত অবলম্বন করেন। নাট্যকার রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত মনে করেন আমাদের আরও সজাগ এবং একত্রিত হতে হবে। কী কী খেলা চলছে বুঝতে হবে। কলকাতায় একটা প্রতিবাদ ধ্বনিত হচ্ছে না এটা অসম্ভব ব্যাপার। সবাই একজোট হলেই এই রাজকে ধাক্কা দেওয়া যাবে। লিখিত বক্তব্যে বিকাশ সিংহ বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, এত বড় গর্বের মতো আইকনের সাথে এরকম ব্যবহার করা যায়? অনেক দিন মানুষ চুপচাপ আছে বলে আক্ষেপ করলেন অনুস্টুপের অনিল আচার্য। তিনি প্রশ্ন তোলেন, আমরা কি রাজনৈতিক সমাজের কাছে আত্মবলিদান করেছি? আমাদের ভয় দেখানো হচ্ছে, আমরা নিশ্চুপ হয়ে পড়ছি। এরকম একজন সম্মানিত ব্যক্তিকে এমন লাগাতার হেনস্থা করা যায়? শ্রদ্ধার জায়গাটা সুকৌশলে ধ্বংসের চেষ্টা চলছে না তো?

উমা দাশগুপ্ত বললেন, গোপাল গান্ধীর সময়েও অনেক মাপজোক হয়েছে। অনিল চন্দ, রাণী চন্দের বাড়ি মাপামাপি হয়েছে, কোনো অশান্তি হয়নি তো? গৌতম হালদার জিজ্ঞেস করলেন, ওনার অপমান মেনে নিলে আমাদের গর্ব করার কিছু আর বাকি থাকে? শ্লেষের সঙ্গে তিনি বললেন, তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে! নিজের কানুনগো থাকার অভিজ্ঞতা থেকে সাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্তী বললেন, আগে যখন জমি মাপা হত চেন দিয়ে, তখন সাত বিঘে চার কাঠা হলে সাত বিঘেই লেখা হত। কোনো ব্যাপার না। এ আঘাত সুস্থতা বোধের উপর। অমর্ত্য সেন হলেন সুস্থতাবোধের স্তম্ভের মতো। অভিনেতা দেবশঙ্কর ছিলেন শেষ বক্তা। তিনি বললেন, ভয় ও আতঙ্কের প্রবণতাকে সবাই একসঙ্গে ধাক্কা দিলে কাজ হতে পারে। প্রতিবাদের ধরণের মধ্যে জোর খুঁজে বার করতে হবে। সেটা হল ভেতরের জোর। প্রতাপশালীদের ক্ষমতামত্ততা শেষ কথা নয়। তিনি শঙ্খ ঘোষের প্রাসঙ্গিক কবিতা ‘গোয়েবলস’ থেকে কয়েক লাইন উচ্চারণ করলেন। শেষে প্রস্তাবে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের অন্যায় আচরণের তীব্র নিন্দা করে বলা হয়, অধ্যাপক সেন কেবল পরম সমাদৃত এবং বিশ্ববিশ্রুত পন্ডিতই নন। বিশ্বভারতী পরিবারের যারা আজও আছেন তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য। তাঁর অপমান এবং বিড়ম্বনা ঘটিয়ে তাদের নিজেদের ভাবমূর্তির উপরই বড় রকমের আঘাত পড়ছে। বাঙালি সমাজের অসম্মান হয়ে আমাদের মাথা হেঁট হয়ে গেছে। তাঁরা অবিলম্বে এই আচরণ থেকে বিরত হয়ে অধ্যাপক সেনের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করুন। ৫ মে ২০২৩ তাঁর বাসভবনের সামনে ধর্নায় বসা হবে প্রয়োজন হলে। অমর্ত্য সেন সীমাহীন হেনস্থার শিকার হয়েছেন শুধু সরকারী নীতির সমালোচনা করেছিলেন এই জন্য। নোটিশ দেওয়া হয়েছে, ঐ জমি থেকে অমর্ত্য সেন এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে উচ্ছেদ করা হবে। এই উচ্ছেদ-যুদ্ধকে কেন্দ্র করে গোটা ভারতের ছবিটাকে চমৎকার মিলিয়েছেন কমরেড দীপঙ্কর ভট্টাচার্য তাঁর বিবৃতিতে। যোগী শাসনে এই যুদ্ধ সবচেয়ে গর্বের প্রতীক। বুলডোজার রাজ। গরিব ও মুসলমানরা এই যুদ্ধের সাধারণ নিশানা। রাহুল গান্ধী লোকসভা থেকে বিতাড়িত হয়ে সাংসদ আবাস থেকে উচ্ছেদ-যুদ্ধের অন্তর্গত হলেন। ‘তর্কপ্রিয় ভারতীয়’ অধ্যাপক সেন ধর্মনিরপেক্ষতা ও বৈচিত্রের সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে আপনাকে অনেক মূল্য চোকাতে হচ্ছে। কমরেড দীপঙ্করের থেকে শব্দ ধার করে বলি, যে দেশ বা জাতি, তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের সঙ্গে এমন আচরণ করতে পারে, তার পরিণাম হবে ভয়াবহ। প্রফেসর সেন, এই যুদ্ধে, নিপীড়ক রাজত্বের বিরুদ্ধে আমরা আপনার সাথে সম্পূর্ণ একাত্মতা জ্ঞাপন করছি।
- অসিত রায়