পুঁজিবাদী কৃষি এবং কোভিড-১৯ : একটি প্রাণঘাতী সংমিশ্রণ

নতুন করোনাভাইরাস বিশ্বকে এক প্রচন্ড ধাক্কার মুখোমুখি করিয়েছে। অতিমারীটি কেউ সংক্রমিত এটা জানার আগেই তা অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে এবং এভাবে খুব কম জায়গাই সম্ভবত সংক্রমণমুক্ত থাকতে পারে। ....

hh

-- মৃনাল চট্টোপাধ্যায়

নতুন করোনাভাইরাস বিশ্বকে এক প্রচন্ড ধাক্কার মুখোমুখি করিয়েছে। অতিমারীটি কেউ সংক্রমিত এটা জানার আগেই তা অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে এবং এভাবে খুব কম জায়গাই সম্ভবত সংক্রমণমুক্ত থাকতে পারে। কোভিড-১৯ চারশো কোটি লোককে সংক্রামিত করলে ১% প্রাণহানি নথিভুক্ত হতে পারে অর্থাৎ সংখ্যাটা ৪ কোটি! একটি বৃহৎ সংখ্যার একটি ছোট অনুপাতও একটি বড় সংখ্যা। অবশ্যই আমরা প্রাদুর্ভাবের শুরুতেই আছি। এটি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ যে মহামারীর সময় নতুন সংক্রমণ তার অবস্থার পরিবর্তন ঘটায়। প্রাথমিক পর্যায়ে সংক্রমণ অপেক্ষাকৃত কমে যেতে পারে। অন্যদিকে, অজান্তেই প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ১৯১৮ এর বসন্তে ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীর প্রথম তরঙ্গ ছিল অপেক্ষাকৃত হালকা সংক্রমণ। শীতকালে এর দ্বিতীয় এবং তৃতীয় তরঙ্গ আসে যা ১৯১৯ সালে লক্ষ লক্ষ লোককে হত্যা করেছিল।

প্রতিটি নতুন প্রাদুর্ভাবের আসল বিপদটি হলো একে আটকাতে না পারার ব্যর্থতা। কোভিড-১৯ এর মতো প্রতিটি প্রাদুর্ভাবের কোনোটাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। নতুন প্রাদুর্ভাব যখন বেড়ে ওঠে, তখন সরকার, মিডিয়া এবং এমনকি বেশিরভাগ চিকিত্সা সংস্থা প্রতিটি পৃথক প্রাদুর্ভাবের জরুরি অবস্থার প্রতি এতটাই মনোনিবেশ করে যে একাধিক প্রান্তিক রোগজীবাণুগুলি হঠাৎ কেন একের পর এক বিশ্বব্যাপী এমন প্রাদুর্ভাব সৃষ্টি করছে, তার কাঠামোগত কারণগুলি তারা এড়িয়ে যায়। ভাইরাস ঘটিত প্রাদুর্ভাবের ক্রমবর্ধমান ঘটনাগুলি খাদ্য উত্পাদন এবং বহুজাতিক কর্পোরেশনের মুনাফার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। ভাইরাসগুলি কেন আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে তা বোঝার জন্যে অবশ্যই কৃষি উৎপাদনের শিল্প মডেল এবং আরও নির্দিষ্ট করে বললে প্রাণীসম্পদ উত্পাদন পদ্ধতির তদন্ত করা দরকার।

মূলত শিল্পজাত-কৃষি এর জন্যে দায়ী, তবে আরো অনেক কারণ হতে পারে। বিশ্বব্যাপী প্রাইমারি ফরেস্ট বা জনগণের ছোঁয়ার বাইরে থাকা গভীর বন থেকে প্রান্তিক কৃষকদের ক্ষুদ্র কৃষি জমি সমস্ত দখলে নেতৃত্ব দিচ্ছে পুঁজি। এই পুঁজি বিনিয়োগগুলির বনভূমি উজাড় করে দেয়া এবং তথাকথিত উন্নয়ন বিভিন্ন রোগের আবির্ভাব ঘটাচ্ছে। ভূমির এইসব বিশাল এলাকার কার্যকরী বৈচিত্র্য এবং জটিলতার পরিবর্তন বনভূমিতে আটকে থাকা জীবাণুগুলির স্থানীয় প্রাণিসম্পদ এবং মানব সম্প্রদায়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার পথ মসৃন করে তুলেছে। সংক্ষেপে, পুঁজির কেন্দ্রগুলি আমাদের প্রাথমিক ভাবে রোগের লক্ষণ দেখা দেয়ার কেন্দ্র হিসাবে বিবেচনা করা উচিত। 

এই প্রক্রিয়াটিতে বহুজাতিক সংস্থাগুলির ভূমিকা কী? বায়োমাস অর্থাৎ যেসব জৈব পদার্থকে শক্তিতে রূপান্তরিত করা যায় এবং জমি, এই উভয় ক্ষেত্রে এই পৃথিবী হলো মূলত প্ল্যানেট ফার্ম বা খামারে প্রযুক্তি প্রয়োগে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিণত স্থান। কৃষি উৎপাদন ব্যবসার লক্ষ্য হলো খাদ্যপণ্যের বাজারকে পুরোপুরি কব্জায় নিয়ে আসা। অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশগুলির জমি ও সম্পদের উৎসকে হাতিয়ে নিতে শিল্পোন্নত দেশগুলির বিভিন্ন সংস্থা নয়া-উদারনৈতিক প্রকল্পকে কেন্দ্র করে সংগঠিত হয়েছে, যা প্রায় সম্পূর্ণ। এর ফলস্বরূপ, দীর্ঘকালের বিবর্তনে জঙ্গলের বাস্তুতন্ত্র যেসব জীবাণুগুলিকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলো তারা অবাধে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, পুরো বিশ্বকে হুমকির মধ্যে ফেলেছে। ভারতবর্ষেও সাম্প্রতিক কালে স্যাঙাত পুঁজিপতিদের হাতে আমাদের গভীর বন তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কৃষির ব্যবসায়িক উত্পাদন পদ্ধতির ফলে এই জীবাণুগুলির ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। পুঁজি-নিয়ন্ত্রিত কৃষি প্রাকৃতিক বাস্ততন্ত্রকে ঠিক এমনভাবে বদলে দেয় যার ফলে রোগ জীবাণুগুলি নিজেদেরকে আরো তীব্র ক্ষতিকর ও সংক্রামক গঠনে বদলে ফেলে। কোনো মারাত্মক রোগের চাষ করার জন্যে এর থেকে আর ভালো পরিকল্পনা আর হয় না। গৃহপালিত পশুদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান genetic monoculture, বা একই ধরনের পশুপালের মড়ক তাদের মধ্যে সংক্রমণকে মন্থর করার জন্যে যে স্বাভাবিক প্রতিরোধী দেয়াল থাকে তাকে সম্পূর্ণ ভেঙে দেয়। বৃহৎ সংখ্যক পশু এবং ঘনত্ব, সংক্রমণের হার বৃদ্ধিকে সহজতর করে। এইরকম ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশ অনাক্রম্য বা প্রতিরোধী প্রতিক্রিয়াকে মন্দীভূত করে দেয়। উচ্চ উৎপাদন হার, যা যে কোনও শিল্প উত্পাদনের অংশ, কার্যকরী অংশগুলোকে বারবার পুনর্নবীকরণ করে উৎপাদন চালাতে থাকে যা রোগজীবাণুর ক্রমবিবর্তনে ইন্ধন দেয়। অন্য কথায়, কৃষির শিল্পোদ্পাদন পদ্ধতিতে মুনাফার প্রতি এতটা মনোনিবেশ করা হয়েছে যে এর ফলে একশো কোটি মানুষকে হত্যা করতে পারে এমন ভাইরাস যদি উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাহলেও সেই উৎপাদন পদ্ধতি একটি গ্রহণযোগ্য ঝুঁকি হিসাবে বিবেচিত হয়।

tee

 

এই সংস্থাগুলি তাদের মহামারীর সম্ভাবনাপূর্ণ বিপজ্জনক অপারেশনের পরিনাম অন্য সকলের বিপদে পরিণত করে দিতে পারে। পশু থেকে শুরু করে, খামারি শ্রমিক, স্থানীয় পরিবেশ তথা বিচার ব্যবস্থার এক্তিয়ার পর্যন্ত সরকার, এই সকলকেই। ক্ষয়ক্ষতিগুলি এতটাই বিস্তৃত যে তাদের এই চাপিয়ে দেয়া ক্ষতির মূল্য চোকানোর সামর্থ্য কোনো সংস্থার নেই।

উহানের হুনান হোলসেল সি ফুড মার্কেট যেখানে বন্য প্রাণী বিক্রি হতো সেই পর্যন্ত সংক্রমণের সংযোগ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। পরিবেশগত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাজারের পশ্চিম প্রান্তের যেখানে বন্যপ্রাণী ছিল সেই অঞ্চলটিকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

তবে আমাদের কতদূর পিছনে এবং কতটা ব্যাপকভাবে তদন্ত করা উচিত? বাজারটির ওপর সমস্ত দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল, ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে ওয়াইল্ড ফুড বা বন্য কৃষির উত্স এবং তার ক্রমবর্ধমান প্রভাব সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। বিশ্বব্যাপী এবং চীনে ওয়াইল্ড ফুড অর্থনৈতিক ক্ষেত্র হিসাবে আরও বৈধ হয়ে উঠছে। তবে শিল্পজাত কৃষির সাথে এর সম্পর্ক একই বাজার ভাগ করে নেওয়ার বাইরেও প্রসারিত। শূকর, হাঁস-মুরগি এবং এগুলির মতো প্রাণীর শিল্প উৎপাদন গভীরতর বনাঞ্চলে প্রসারিত হতে থাকে, এটি বন্য খাদ্য সংগ্রাহকদের জঙ্গলের আরো গভীরে গিয়ে বন্য খাদ্য তুলে আনতে বাধ্য করে, যা কোভিড-১৯ সহ নতুন রোগজীবাণুগুলিকে পৃষ্ঠতল থেকে উঠে আসতে এবং ব্যাপক হারে বৃদ্ধি ঘটাতে সাহায্য করে। এই মুহূর্তে কোনো রোগ জীবাণুই নেই যা পুঁজির প্রভাব মুক্ত। এমনকি সর্বাধিক দূরবর্তী স্থানগুলিও প্রভাবিত, সে যত দুরেরই হোক। ইবোলা, জিকা, করণা ভাইরাস, পুনরায় হলুদ জ্বরের প্রত্যাবর্তন এবং শূকরদের মধ্যে আফ্রিকান সোয়াইন ফ্লু – অনেক ভাইরাসের মধ্যে থেকে এরা বেরিয়ে আসার পথ তৈরি করে নিচ্ছে, দূরবর্তী উপকূল ভাগ থেকে শহর সংলগ্ন এলাকা, সেখান থেকে আঞ্চলিক রাজধানী এবং তারপর গ্লোবাল ট্রাভেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে, মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কঙ্গোর ফ্রুট ব্যাট নামক বাদুড় থেকে মিয়ামি সানবাথারদের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে।

china

 

কোভিড-১৯ ই চীনে প্রথম ভাইরাসের বিকাশ নয় যাকে সরকার আড়াল করার চেষ্টা করেছিল। তবে হ্যাঁ, এটি কোনো চীনা ব্যতিক্রমও নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ নতুন ইনফ্লুয়েঞ্জার জন্য গ্রাউন্ড জিরো হিসাবে কাজ করেছে, সাম্প্রতিককালের H5N2 এবং H5Nx ভাইরাসের কথা মনে করুন। তাদের বহুজাতিক এবং নয়া-ঔপনিবেশিক প্রতিনিধিরা পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলা এবং ব্রাজিলে জিকা ভাইরাসের উত্থান ঘটিয়েছে। কৃষিজাত শিল্প ব্যবসার স্বার্থে ২০০৯ এর H1N1 এবং H5N2 প্রাদুর্ভাবকে মার্কিন জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তারা আড়াল করেছিলেন।

এর হাত থেকে বাঁচতে আমাদের আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। নতুন ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব হ্রাস করতে, খাদ্য উৎপাদন পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। কৃষকের কর্ম স্বাধীনতা এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রায়ত্ব ক্ষেত্র পরিবেশের ক্রমাগত ক্ষয় এবং অনিয়ন্ত্রিত সংক্রমণকে রোধ করতে পারে। খামার এবং আঞ্চলিক উভয় স্তরেই বিভিন্ন ধরনের গৃহপালিত পশু এবং ফসল উৎপাদনের পুরোনো কৌশল ফিরিয়ে আনতে হবে। খাদ্য প্রাণীদের শারীরিক অনাক্রম্যতা নিশ্চিত হতে একমাত্র নির্দিষ্ট জায়গাতেই পুনরুৎপাদনের অনুমতি দিতে হবে। সরবরাহের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উৎপাদন হার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কৃষি সহায়ক মূল্যে এবং বাস্তুতন্ত্রের নিয়ম মেনে যে কৃষি উৎপাদন পদ্ধতি তাতে ভর্তুকি দিতে হবে। যে পরীক্ষাগুলি নয়া-উদারনৈতিক অর্থনীতি সমভাবে ব্যক্তি ও সম্প্রদায়ের উপর চাপিয়ে দিয়েছে এবং পুঁজি-নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন ও হুমকির মুখোমুখি করেছে এই উভয় ক্ষেত্রেরই জোর-জবরদস্তির মোকাবিলা করতে হবে। সামগ্রিকভাবে, অবশ্যই আমাদের অর্থনীতি ও বাস্তুশাস্ত্রের সমন্বয়কে ধ্বংসকারী মেটাবলিক রিফ্ট অর্থাৎ সমাজিক ব্যবস্থা ও পরিবেশের মধ্যে সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট বাস্তুতন্ত্রের গভীর ক্ষতকে নিরাময় করতে হবে। মোটের ওপর, আমাদের এই প্রানপ্রিয় গ্রহে মানবতার জয়ধ্বজা ওড়াতেই হবে।  

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : মার্কস ২১ পত্রিকা, বিজ্ঞানী ড. রব ওয়ালেস

Published on 17 April, 2020