খণ্ড-26 / সংখ্যা 34 / কৃষকদের সম্মিলিত প্রতিবাদ

কৃষকদের সম্মিলিত প্রতিবাদ

২০১৮-র ফেব্রুয়ারীতে, রাজস্থানের হুনুমানগড় জেলার ছান্নিবারি গ্রামে গ্রামবাসীরা স্থানীয় স্টেট ব্যাঙ্কের শাখার সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেলন। কারণ, ওই ব্যাঙ্কটি কিষাণ ক্রেডিট কার্ডে দেয় ঋণের উপর অতিরিক্ত সুদ আদায় করেছে।

টানা ৫৪ দিন প্রতিবাদ-বিক্ষোভের পর অবশেষে ব্যাঙ্ক ৩৫০টি কিষান ক্রেডিট কার্ডের অ্যাকাউন্টে ১৬,৫২,০০০ টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু আজও ওই গ্রামের হাজারে হাজারে কৃষকেরা টাকা ফেরতের আশায় অধীরভাবে অপেক্ষা করছেন।

“এই ছান্নিবারি গ্রামে স্থানীয় এসবিআই শাখায় ৩,৮০০টি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। আর, প্রায় প্রতিটি অ্যাকাউন্ট থেকে বাড়তি টাকা ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ কেটে নিয়েছে। ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের ধারণা হয়েছিল, গ্রামবাসীরা তো সব্বাই মুখ্যু লোক, তাই সহজেই তাদের বোকা বানানো যাবে। যদি কৃষকদের দাবি অযৌক্তিক হতো, তবে ব্যাঙ্ক কেনই বা সেই বাড়তি টাকা ফেরত দেবে?” বললেন বলওয়ান পুনিয়া, সারা ভারত কিষাণ সভার জেলা সভাপতি।

লাল চাঁদের কথাই ধরা যাক। রামগড়ের এসবিআই শাখায় তাঁর কিষাণ ক্রেডিট কার্জের অ্যাকাউন্ট রয়েছে। তাঁর কাছ থেকে ব্যাঙ্ক সুদ বাবদ ৪০,০০০ টাকা অতিরিক্ত আদায় করে। পরে, আবার ৩৩,৪০৯ টাকা ফেরত দেয়। যা, প্রাপ্য সুদের ছয় গুণ বেশি।

মজার ব্যাপার হল, যাদের কিষাণ ক্রেডিট কার্ড রয়েছে, সরকার তাদের খয়রাতি দেয়। কিন্তু এখানকার স্টেট ব্যাঙ্কের শাখায় শ’য়ে শ’য়ে অ্যাকাউন্টে সেই টাকার পরিমাণে গণ্ডগোল হওয়ার জন্য কৃষকরা অতিরিক্ত হাজার হাজার টাকা দিতে বাধ্য হন।

“এই তালিকা অনেক অনেক দীর্ঘ। ছান্নিবারি গ্রামের এক কৃষক রোহতাস-এর রয়েছে কিষাণ ক্রেডিট কার্ড। তার কাছ থেকে ব্যাঙ্ক বাড়তি সুদ আদায় করেছে ৫৯,৭৬৬ টাকা। কিন্তু হাজারে হাজারে কৃষক এখনো তাদের টাকা ফেরতের দাবিতে একরোখা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে” জানালেন ওই গ্রামের বিনোদ ধুরা।

পরবর্তীতে, স্টেট ব্যাঙ্কের ওই শাখার ম্যানেজার, সুভাস গুপ্তা সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার করেন যে, সরকার থেকে প্রাপ্য কিষাণ ক্রেডিট কার্ডের উপর যে খয়রাতি পাওয়া যায়, তার হিসাবের গরমিলের জন্যই নাকি গোলমাল হয়, যা তারা এখন শুধরে নিয়েছেন।

খরা প্রবণ এই অঞ্চলে কৃষকেরা ছিটে ফোঁটা বৃষ্টি ও নাম-কা ওয়াস্তে সেচ ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। এরকম অবস্থায়, ফলন বরাবরই লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক কম হয়। আর লোকসানের বোঝা সামাল দেওয়ার সমস্ত দায়টা কৃষকদের ঘাড়ের উপরই এসে পড়ে। ফলে, নিরুপায় হয়ে কৃষকেরা বেছে নিচ্ছেন আত্মহত্যার পথ। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা-এর মতো গ্রামীণ ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা কৃষকদের কাছ থেকে আদায় করছে অতিরিক্ত সুদ, ঠকিয়ে অথবা ভুলভাল হিসাব করে।

ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক ফর এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ডেভেলমেন্ট-এর তরফ থেকে কিষাণ ক্রেডিট কার্ডের উদ্ভাবনকে কৃষকদের স্বার্থরক্ষার্থে এক দারুণ মাধ্যম হিসাবে গণ্য করা হয়, যা নাকি ঠিক সময়ে ঝঞ্ঝাটমুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রাখছে। কিন্তু বাস্তব এটাই যে, ঋণ পাওয়া শর্তগুলো দিনের পর দিন আরও কঠিন ও জটিল হচ্ছে, নানা লাল ফিতের ফাঁসে যতটা ঋণ পাওয়া যায়, তাও এখন আর মিলছে না।

মিলছে না ন্যায়সঙ্গত প্রাপ্য ক্লেইম

২০১৭ সালের খারিফ ফসলের সময় রাজস্থানের হুনুমানগড় জেলার রামগড় উজ্জ্বলবাস, ভুরারকা আর গোখানা গ্রামগুলোর ৩,০৫২ জন কৃষকের কিষাণ ক্রেডিট কার্ড থাকা সত্ত্বেও ক্লেইম থেকেতাঁরা বঞ্চিত হন। বাজাজ অ্যালাইয়ন্স  বীমা সংস্থা তাদের জানায়, স্টেট ব্যাঙ্ক তাদের কাছে কৃষকদের প্রিমিয়াম জমা দেয়নি।

এসবিআই-এর রামগড় উজ্জ্বলবাসের শাখা যে কম্মোটি করেছে, তা হল, বাজাজ অ্যালাইয়ন্সকে প্রিমিয়ামের টাকা না পাঠিয়ে এগ্রিকালচার ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি অফ ইন্ডিয়া লিঃ-এর অ্যাকাউন্টে তা পাঠিয়ে দেয়। যখন এগ্রিকালচার ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি টাকাটা ফেরত পাঠায়, ততদিনে প্রিমিয়াম জমা দেওয়ার শেষ সময়সীমা পার হয়ে যায়। বাকি দুটো শাখা, ভুকারকা এবং গোখানা প্রিমিয়ামটাই জমা দেয়নি।

একজনকে দুবার কোতল করা হল

রামগড় উজ্জ্বলবাসের এসবিআই শাখার ম্যানেজার মুকেশ কুমার স্বীকার করেছেন, সময়মতো বীমা সংস্থাকে প্রিমিয়ামের টাকা মেটানো যায়নি। অত্যধিক কাজের চাপে, ভুল বশতঃ প্রিমিয়ামের টাকা বাজাজ অ্যালাইয়ন্স-কে দেওয়ার বদলে তা ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক ফর এগ্রিকালচার-কে দিয়ে দেওয়া হয়। যখন আমরা ভুলটাকে সনাক্ত করে সঠিক জায়গায় টাকা পাঠালাম, তখন তারা জালানো যে মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় ওই টাকা আর জমা নেওয়া যাবে না।”

এদিকে, ২০১৭-এর খারিফ ফসলের প্রাপ্য তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, ওই জেলায় খরার জন্য ফসলের হানি হয়েছে। আর প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনার আওতায় থাকার জন্য তাঁদের ফসল বীমা পাওয়ার কথা। অপরদিকে, কিষাণ ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ব্যাঙ্ক যে ঋণ দেয় তার থেকে অতিরিক্ত সুদ কেটে নিচ্ছে।

একজন যুবক এলেন পরিত্রাতার ভূমিকায়

৩৫ বছরের অঞ্জনি বনশল অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। কিন্তু হিসাব কষতে তার রীতিমতো দক্ষতা রয়েছে। সে দিনের পর দিন দেখছে তার বাবা কিষাণ ক্রেডিট কার্ডের ঋণ পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে। বাবার ব্যাঙ্কের পাস বই থেকে চটপট হিসাব কষে দেখল যে ব্যাঙ্ক অতিরিক্ত সুদ নিচ্ছে। সে তখন এসবিআই শাখার ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করে। ম্যানেজার ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে এমন যুক্তিজাল বিস্তার করতে থাকলো যে তাতে তাঁর সন্দেহ বাড়ল বই কমলো না।

সে তখন এই বিষয়টা নিয়ে খোঁজ খবর নেওয়া শুরু করল। তার চোখ কপালে উঠল যখন সে দেখল যে শুধু তাঁর বাবার ক্ষেত্রেই নয়, অনেকের অ্যাকাউন্টে এই সমস্ত গরমিলগুলো রয়েছে।

তারপর বেশ কিছু প্রমাণ যোগাড় করে বনশল দেখা করলো কালেক্টার গ্যানা রামের সঙ্গে। তিনি তারপর ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে নিয়ে একটা বৈঠক ডাকেন। ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ নিজেদের নির্দোষ হিসাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করলে বনশল অঙ্ক কষে দেখিয়ে দেয় কিভাবে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ কৃষকদের ঠকাচ্ছে। এরপর ব্যাঙ্ক তাদের ভুল স্বীকার করতে বাধ্য হয়। যদিও এখনো পর্যন্ত বহু কৃষকের কাছ থেকে কেটে নেওয়া অতিরিক্ত সুদের টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি।

কৃষকদের কাছে যে প্রশ্নটা ঘোরাফেরা করছে, এটা কি নিছক ভুল নাকি মুখ্যু সুখ্যু কৃষকদের ঠকানোর এক সচেতন প্রচেষ্টা? ব্যাঙ্ক গ্রামবাসীদের কাছে আশা ভরসার প্রতিষ্ঠানের বদলে ঠকানোর প্রতিষ্ঠান হিসাবে প্রতিপন্ন হয়েছে আম কৃষক জনগণের কাছে।

এর থেকে বড় ট্রাজেডি আর কিবা হতে পারে!!

Published on 01 November, 2019