প্রতি
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী
বিষয়: কোভিড-১৯ মোকাবিলায় ভারতকে প্রয়োজনীয় শক্তি ও সামগ্রী জুগিয়ে প্রস্তুত করুন
প্রধানমন্ত্রী মহাশয়,
আপনার ঘোষিত ২৫ মার্চ শুরু হওয়া লকডাউনের সময়কাল শেষের পথে। ইতিমধ্যেই শোনা যাচ্ছে যে, কিছু কিছু রাজ্যে লকডাউনের সময়সীমা আবার বাড়তে চলেছে এবং করোনার তীব্র প্রকোপের চিহ্নিত এলাকাগুলিকে (হটস্পট) সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা হবে। গত তিন সপ্তাহের অভিজ্ঞতা একদম সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করে দিয়েছে যে কোভিড-১৯ মহামারী ও লকডাউনের যৌথ প্রভাব বৃহত্তর সংকটের জন্ম দিয়েছে। গভীর হওয়া এই সংকটকে স্বীকার করা ও তাকে সামগ্রিকতায় মোকাবিলা করা এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।
এই অভূতপূর্ব ও ব্যাপকবিস্তৃত বহুমুখী সংকটের পাঁচটি মূল বিন্দু নিম্নরূপ:
ক) একদিকে চূড়ান্ত অপ্রতুল চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রায় বরাদ্দ-বিহীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা, আর অন্যদিকে জনগণের বিপুল অংশের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য-সতর্কতা গ্রহণের পক্ষে প্রতিকূল পরিবেশে কাজ ও জীবনযাত্রা – এই দুইয়ে মিলে জনস্বাস্থ্যের এক তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ার মুখে; খ) কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষ আচমকা জীবিকা হারিয়েছেন। এদের অনেকেই বাড়ি থেকে অনেক দূরে কোনও কাজ ও উপার্জন ছাড়াই আটকে পড়েছেন। অনেকেই বাড়ি ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে পড়েছেন; গ) দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে ক্ষুধা আর নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সংকট; ঘ) এই সংকট মোকাবিলায় যখন আমাদের আরও বেশি ঐক্য ও সংহতি প্রয়োজন, যখন যুক্তিবুদ্ধি, সচেতনতা ও সঠিক তথ্য সম্প্রচার দরকার তখন ঘৃণা, কালিমালেপন ও গুজব এবং তৎসহ কুসংস্কার ও মিথ্যা নিরাময় প্রচার এক অশুভ মাত্রা নিয়েছে; এবং ঙ) যখন এই সংকট মোকাবিলায় স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ কার্যনীতির মাধ্যমে আরও ব্যাপক জনতার সমর্থন দরকার, অর্থাৎ ব্যাপক সক্রিয় অংশগ্রহণ ও তৃণমূল স্তরের গণতন্ত্র দরকার, তখন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে ক্ষমতার ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীকরণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহন ও তা কার্যকর করার ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচার আর নিপীড়ক পুলিশী কার্যকলাপ ও দমনমূলক প্রশাসন।
এই প্রেক্ষাপটে কিছু বিষয়ে জরুরি যৌথ হস্তক্ষেপ ও দৃঢ়সংকল্প উদ্যোগ নেওয়ার জন্য আমরা কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকারগুলির এবং উদ্বিগ্ন গণমানসের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই ।
কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে লড়তে ভারতকে প্রয়োজনীয় শক্তি ও সরঞ্জাম জোগান দাও
পারস্পরিক পরামর্শ ও সহযোগিতাই পথ, নিপীড়ন নয়
১। ট্রেড ইউনিয়ন ও সমস্ত নিপীড়িত অংশের প্রতিনিধি সহ সব সংশ্লিষ্ট পক্ষকে যুক্ত করে মতামত আদানপ্রদানের মাধ্যমে বিশ্বাস ও স্বচ্ছতা গড়ে তোল।
২। লকডাউনের নামে পুলিশ ও প্রশাসনের কোনরকম নিপীড়ন চলবে না: শারীরিক দূরত্ব বিধি ফলপ্রসূ করতে ধৈর্য সহকারে বোঝানো ও সহমর্মিতার হাত বাড়ানো দরকার, নিপীড়ন নয়।
৩) ডিটেনশন সেন্টারগুলি ফাঁকা করে দাও, কারাগারগুলির ঠাসাঠাসি ভিড় এড়াতে সমস্ত বিচারাধীন, দুর্বল ও অক্ষম বন্দীদের প্যারোলে মুক্তি দাও, কাশ্মীরের সকল বন্দী সহ সমস্ত রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দাও। সিএএ বা অন্যান্য জনস্বার্থে আন্দোলনকারী বিরোধী কন্ঠ স্তব্ধ করতে আর নতুন করে কাউকে কারাগারে নিক্ষিপ্ত করা চলবে না।
পরিযায়ী শ্রমিক ও অন্যান্য দুর্বল অংশ
৪। পরিযায়ী শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও বেঁচে থাকার জন্য জরুরি অথচ অবহেলিত বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে দেখভাল করার জন্য একটি পরিযায়ী শ্রমিক অ্যাকশন প্ল্যান গড়ে তুলতে হবে: ক) গ্রাম ও পঞ্চায়েতের সাথে সমন্বয় গড়ে পরিযায়ী শ্রমিক ও তাদের পরিবারের তালিকা বানিয়ে ফেলতে হবে এবং তাদের সকলের একাউন্টে সরাসরি নগদ অর্থ প্রদান করতে হবে, খ) যে যেখানে আটকে আছে সেখানে তাদের সকলকে সাহায্য ও সুরক্ষা দিতে হবে; বিশেষত বিচ্ছিন্ন করে রাখা এলাকায় খাদ্য সরবরাহ সুনিশ্চিত করতে হবে, গ) স্বনিযুক্ত পরিযায়ী শ্রমিক সহ সমস্ত শ্রমিকের মজুরি ও জীবনধারণের ভাতা অবশ্যই অব্যাহত রাখতে হবে, ঘ) এই কর্মপ্রকল্পের সুচারু রূপায়নের জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও নিয়োগকারীদের কঠোরভাবে দায়বদ্ধ করতে হবে।
৫। অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মী, যৌনকর্মী, রূপান্তরকামী, অক্ষম, বয়স্ক ও অন্যান্য যারা এই লকডাউনে চরম বিপর্যয়ে পড়েছেন তাদের জন্য নির্দিষ্ট ত্রাণ ও সাহায্যের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
ক্ষুধার্ত, আশ্রয়হীন ও জীবিকাহারা মানুষ
৬। দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে রান্না করা খাবার, রেশন, জ্বালানি ও অন্যান্য অপরিহার্য সামগ্রী ও পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া সুনিশ্চিত করতে হবে, তাদের রেশন কার্ড, ওয়েলফেয়ার বোর্ডের রেজিস্ট্রেশন, আধার বা অন্য কোনও কাগজপত্র থাকুক বা না থাকুক। সব অঞ্চলে কমিউনিটি (সামূহিক) রান্নাঘর গড়ে তুলতে হবে। শ্রমিক ও কৃষকদের বিভিন্ন সংগঠন, যুব সংগঠন ও বিভিন্ন সামাজিক ও গোষ্ঠিগত সংগঠন বা গ্রুপের ত্রাণ উদ্যোগকে সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্যই স্বাগত জানাতে হবে ও সহযোগিতা করতে হবে যাতে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ত্রাণকার্য ফলপ্রসূ করে তুলতে এক দক্ষ ও প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গড়ে উঠতে পারে।
৭। সমস্ত অব্যবহৃত বাড়ি, হোটেল, অনুষ্ঠান ভবন ইত্যাদিকে আশ্রয়হীনদের আশ্রয়ের জন্য ব্যবহার করতে হবে।
৮। ভাড়া ও ঋণ থেকে মুক্তি দিতে হবে, ইএমআই পরিশোধ স্থগিত রাখতে হবে, আর কাগজপত্রের বাছবিচার না করে সকলকে মহামারিতে টিকে থাকার ভাতা দিতে হবে।
৯। এই মহামারীর সময়ে রেশনে খাদ্য প্রদান ও এমএনআরইজিএ-কে অপরিহার্য পরিষেবা হিসেবে রূপান্তরিত করতে হবে এবং এই আপৎকালীন পরিস্থিতিতে অর্থ প্রদানের পরিমাণ বাড়াতে হবে।
১০। মজুরি কাটা, ছাঁটাই, কর্মচ্যুতি ও আশ্রয়ের সুরক্ষা হারানো রুখতে এবং গরিবদের জন্য জলের যোগান এবং ইন্টারনেট পরিষেবা অব্যাহত রাখতে ব্যবস্থা নিতে হবে। আইটি, আইটিনির্ভর ক্ষেত্র, ফিনটেক, পরিষেবা ক্ষেত্র, ট্যুরিজম ও এমএসএমই শিল্পে শ্রমিক ছাঁটাইএর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে।
কৃষি সংকট
১১। জমির পাকা ফসল তুলতে অবিলম্বে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ এবং লাভজনক মূল্যে কৃষকের কাছ থেকে সমস্ত ফসল কেনার ব্যবস্থা করে ঘনীভূত হতে থাকা কৃষি সংকটকে আরও গভীর হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে হবে।
স্বাস্থ্য সেবা ও চিকিৎসা পরিকাঠামো
১২। সমস্ত প্রাইভেট হাসপাতাল অধিগ্রহণ করে ও পরীক্ষাকেন্দ্র ও অন্যান্য সমস্ত চিকিৎসা সংক্রান্ত সুযোগ-সুবিধাগুলি ও ওষুধ উৎপাদক সংস্থার ওপর কঠোর সরকারী নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে গণস্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যবস্থাকে জরুরি ভিত্তিতে শক্তিশালী করতে হবে যাতে সকলের জন্য বিনামূল্যে কোভিড-১৯ টেস্ট ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়; পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটর, পিপিই ও মাস্ক সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
১৩। কোভিড-১৯ টেস্টের হার ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে; পরীক্ষা কর, সংস্পর্শ চিহ্নিত কর, চিকিৎসা কর। মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত জরুরি পরামর্শ ব্যবস্থা সকলের জন্য বিনামূল্যে সরবরাহ করতে হবে।
১৪। এই মহামারীর সময়ে অন্যান্য রোগের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরিষেবা যাতে অটুট থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে।
১৫। প্রত্যেক রাজ্যে জরুরি ভিত্তিতে মেডিক্যাল ও কোয়ারান্টাইন পরিকাঠামো গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করে তা দ্রুত বিনিয়োগ করতে হবে। কোভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে যত্ন ও সচেতনতাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে, নিপীড়ন চালানো ও অপরাধী বানানো নয়।
১৬। কাশ্মীরে অবিলম্বে ইন্টারনেট পরিষেবা পূর্ণরূপে পুনর্বহাল করতে হবে; প্রয়োজনীয় সংযোগ ব্যবস্থার অভাবে মহামারীর সময়ে অতীব জরুরি খবরাখবর আদানপ্রদান মারাত্মক রকম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জরুরি পরিষেবার শ্রমিকেরা
১৭। সমস্ত জরুরি পরিষেবা কর্মীরা (স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন, ডেলিভারি, এ্যম্বুলেন্স ড্রাইভার, সেবাযত্নে নিয়োজিত কর্মী (বিশেষত অক্ষম, রুগ্ন ও বৃদ্ধদের যাঁরা দেখভাল করছেন), পুলিশ কর্মী, ইস্পাত শিল্পের কর্মী, কৃষি ও অন্যান্য জরুরি পরিষেবা ক্ষেত্র) যাতে বিশেষ মহামারি কালীন মজুরি পায় (কমপক্ষে তিন মাসের মজুরির সমান) এবং কাজের স্থায়িকরণ হয় ও পিপিই সহ সমস্ত রকম সুরক্ষা ও সম্মান পায় তা নিশ্চিত করতে হবে।
নারীসমাজ
১৮। গার্হস্থ্য নির্যাতন ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগ নেওয়ার জন্য প্রত্যেক জেলায় সপ্তাহে সাত দিন রাতদিন হটলাইন চালু করতে হবে, যেখানে অত্যাচারিতের অসুবিধে ও শঙ্কা শোনা উচিত ও ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অভিজ্ঞ দল থাকবে। ত্রাণ বণ্টনের সময় ঘরে ঘরে স্যানিটারি প্যাড পৌঁছে দিতে হবে। লকডাউনের সময়ে ভ্রুণের লিঙ্গ নির্ধারণের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হল তা অবিলম্বে পুনর্বহাল করতে হবে।
সাম্প্রদায়িকীকরণ ও তকমা দেওয়া রোধ কর
১৯। সংখ্যালঘুদের সাম্প্রদায়িক নিশানা বানানোকে ও কোভিড-১৯ রোগি ও সেবা প্রদানকারীদের অচ্ছুত বানাতে সামাজিক তকমা দেওয়াকে আটকাতে দ্রুত কার্যকরী ব্যবস্থা ও ব্যাপক সচেতনতা প্রচার দরকার। মুসলমানদের সামাজিক বয়কট, বহিস্কার ও হিংস্রতার শিকার হতে হচ্ছে, উত্তর পূর্বাঞ্চলের মানুষদের জাতিবিদ্বেষী আক্রমণের নিশানা হতে হচ্ছে, কোভিড-১৯ রোগি সন্দেহে বহিস্কার ও নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে – এরকম মারাত্মক প্রবণতার খবর আসছে। এসব ক্ষেত্রে তৎক্ষণাৎ দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নিলে তবেই এরকম অপরাধ আটকানো যাবে। এই ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংগঠনের নির্দেশিকা এবং অনেক দেরীতে হলেও শেষ পর্যন্ত যে সরকারী নির্দেশিকা জারি হয়েছে তা পূর্ণ মাত্রায় লাগু করতে হবে।
স্বাস্থ্য মহামারি ও লকডাউন রিলিফ খাতে স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ তহবিল গঠন
২০। স্থানীয় এলাকা উন্নয়ন তহবিল ও জনকল্যাণ প্রকল্পের রাজ্য তহবিল বন্ধ করে দেওয়ার বদলে এক্ষুনি বুলেট ট্রেন, সেন্ট্রাল ভিস্তা, সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়, সরকারী বিজ্ঞাপন ও প্রধানমন্ত্রী সহ সব সরকারি কর্তাব্যক্তিদের বিদেশ ভ্রমণের তহবিল বন্ধ করতে হবে। ধনকুবেরদের কাছ থেকে সমস্ত বকেয়া লোন ও ট্যাক্স আদায় করে তা কোভিড-১৯ ও লকডাউন তহবিলে জমা করতে হবে।
২১। ত্রাণ তহবিল থেকে দ্রুত বরাদ্দ সরবরাহ ও যথাযথ উপযোগ নিশ্চিত করতে হবে। ত্রাণ তহবিলগুলির, বিশেষত নতুন আনা পিএম-কেয়ার্স তহবিল যা কিনা কোভিড-১৯-এর জন্য বিশেষ তহবিল হিসেবে প্রচালিত হয়েছে, সেখানে জমার হিসেব ও তার ব্যবহারে পূর্ণ স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার গ্যারান্টি চাই।
কোভিড-১৯ মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ লড়াইকে শক্তিশালী করতে সদর্থক মনোভাব ও পদক্ষেপের প্রত্যাশা রাখছি।
আন্তরিকতার সাথে
দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
সাধারণ সম্পাদক
সিপিআই(এম এল) লিবারেশন
১১ এপ্রিল ২০২০