বিশ্ব বাজারে অশোধিত তেলের মূল্যহ্রাস সত্বেও ডিজেল পেট্রলের ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি মোদী সরকারের ব্যর্থতা ও দ্বিচারিতার নিদর্শন

মোদী সরকার একটি বিষয়ে নিশ্চিত যে যতদিন পাকিস্তান ও চিনের সঙ্গে শত্রুতা বজায় রাখা যাবে, যতদিন রাম মন্দিরের মোহে দেশের সংখ্যাগুরু মানুষকে মজিয়ে রাখা যাবে, যতদিন দেশের সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বী বৃহত্তম জনগোষ্ঠির ....

bis

মোদী সরকার একটি বিষয়ে নিশ্চিত যে যতদিন পাকিস্তান ও চিনের সঙ্গে শত্রুতা বজায় রাখা যাবে, যতদিন রাম মন্দিরের মোহে দেশের সংখ্যাগুরু মানুষকে মজিয়ে রাখা যাবে, যতদিন দেশের সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বী বৃহত্তম জনগোষ্ঠির মানুষের বিরুদ্ধে সংখ্যাগুরুদের উসকানো যাবে, ততদিন দেশের বেকারি, ক্ষুধা, দারিদ্র, কৃষকদের আত্মহত্যা, চিকিৎসা-স্বাস্থ্য-শিক্ষার অব্যবস্থা, দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধির মতো জনজীবনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলিকে পাত্তা না দিলেও চলবে। দেশ যখন ভয়াল কোভিড-১৯ মহামারীর সঙ্গে যুঝছে ঠিক তার মধ্যবর্তী সময়ে ক্রমাগত পেট্রলের মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়ে এবং মূল্যবৃদ্ধিতে কোনো রকম হস্তক্ষেপ না করে তেমনটাই ইঙ্গিত করছে এই সরকার।

কোভিড-১৯ দ্বারা দেশ যখন আক্রান্ত হয়েছে তার প্রথম পর্বে মার্চ মাসে প্রথমে সরকার পেট্রল ও ডিজেলের উপর উৎপাদন শুল্ক প্রতি লিটারে ৩ টাকা করে বৃদ্ধি করে, তারপরে গত মে মাসের গোড়ায় পেট্রল ও ডিজেলের উপরে লিটার পিছু ৮ টাকা করে রাস্তা উন্নয়ন সেস বসানো হয়, সাথে পেট্রলের উপরে প্রতি লিটারে ২ টাকা ও ডিজেলের উপরে প্রতি লিটারে ৫ টাকা বিশেষ অতিরিক্ত উৎপাদন শুল্ক বসিয়ে পেট্রলে ও ডিজেলে যথাক্রমে লিটার পিছু ১০ টাকা ও ১৩ টাকার বোঝা চাপানো হয়। এর ফলে পেট্রলের উপর মোট উৎপাদন শুল্কের ভার চাপানো হয়েছে লিটার প্রতি ৩২ টাকা ৯৮ পয়সা ও ডিজেলের উপর ৩১ টাকা ৮৩ পয়সা। মোদী সরকার যখন পূর্বতন ইউপিএ সরকারের থেকে ক্ষমতা গ্রহণ করে তখন পেট্রল ও ডিজেলের উপর মোট উৎপাদন শুল্কের পরিমাণ ছিল লিটার পিছু যথাক্রমে ৯ টাকা ৪৮ পয়সা ও ৩ টাকা ৫৬ পয়সা। ফলে গত ৬ বছরে পেট্রল ও ডিজেলের উপরে লিটার পিছু উৎপাদন শুল্ক বেড়েছে ২৩ টাকা ৫০ পয়সা ও ২৮ টাকা ২৭ পয়সা, বা যথাক্রমে ২৪৭% ও ৭৯৪%।

৫ মে, ২০২০ তে যখন পেট্রল ও ডিজেলের উপর নতুন বোঝা চাপানো হয়, তখন উভয়ের ভিত্তি মূল্য ছিল ১২ টাকা প্রতি লিটার। সরকারী নীতি অনুযায়ী দেশে পেট্রল ডিজেলের দাম বিশ্ব বাজারে অশোধিত তেলের দামে ওঠা নামার উপরে নির্ভরশীল। অতীতে ওই দুটি জ্বালানির মূল্য প্রশাসনিকভাবে নির্ধারিত হত, বাজার নির্ধারিত হত না। যেহেতু জ্বালানীর মূল্যের উপরে পণ্য পরিবহণ ও নাগরিক পরিবহণ পরিষেবা ব্যয় সরাসরি নির্ভরশীল তাই পেট্রল ডিজেলের মূল্যের উপর সরকারী-স্তরে নিয়ন্ত্রণ থাকা আবশ্যিক বলেই মনে করা হত। কিন্তু নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতি তাকে বাজার নির্ভর করে তোলে। মোদী সরকার তেলের মূল্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাজারের শক্তিকে আরোপ করলেও তেলের বিশ্ব বাজারে মূল্য নীচের দিকে নামলে তাকে নীচের দিকে যেতে দিতে নারাজ। তাই যখনই বিশ্ব বাজারে তেলের মূল্য কমে তখনই বিভিন্ন নামে পেট্রল ডিজেলের উপরে শুল্ক চাপিয়ে তেলের দামকে নীচের দিকে বেধে দেয়। এই মহামারীর সময়েও তাই করেছে। এপ্রিল মাসে তেলের চাহিদা অত্যন্ত কম হওয়ার কারণে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম ঋণাত্মক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভারতীয় বাজারে মূল্য কমেনি। কারণ সরকার পূর্বে উল্লেখিত ১০ টাকা ও ১৩ টাকা লিটার পিছু শুল্ক হাসিল করেছে। কিন্তু পরে যখন দাম বেড়েছে, ৭ জুন থেকে তেলের কোম্পানিগুলি সেই বর্ধিত মূল্য ক্রেতাদের কাছ থেলে উশুল করতে শুরু করেছে। ফলে ৭ তারিখ থেকে আজ (২৯ জুন) পর্যন্ত ২২ বার, মাঝে ১ দিন বাদ দিয়ে, তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। যেহেতু তেলের মূল্যের নিরিখে রাজ্য সরকার নির্ধারিত হারে ভ্যাট বসিয়ে রাজ্য সরকারগুলি কোষাগারে অর্থ সংগ্রহ করে তাই বিভিন্ন রাজ্যে সেই ভ্যাটের হার বিভিন্ন থাকায় তেলের দাম বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন হয়। তবে সর্বত্রই গত তিন সপ্তাহে পেট্রল ও ডিজেলের দাম লিটার পিছু প্রায় ১০ টাকা বেড়েছে।

এই ভন্ড মোদী সরকারে আসার আগে পেট্রল ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির জন্য তৎকালিন মনমোহন সিং সরকারকে দায়ী করেছিল। সেই সময়ে বিশ্ববাজারে লাগাতার তেলের দাম বাড়ছিল, ও তেলের কোম্পানিগুলি তেলের দাম বাড়িয়েছিল। যখন আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম ছিল প্রতি ব্যারেল ১০৭ ডলার, তখন ভারতে পেট্রলের দাম ছিল লিটার প্রতি ৭১ টাকা, ডিজেলের দাম ৫৫ টাকা। বিজেপির পরিবেশ ধ্বংসকারী পরিবেশ মন্ত্রী জাভরেকার বলেছিল দিল্লিতে পেট্রলের দাম লিটারে ৩৪ টাকার বেশি হওয়া উচিৎ নয়। কিন্তু এখন অশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৪২ ডলার, যা যখন মোদি সরকার ক্ষমতায় এসেছিল তার থেকে ৬০% কম। কিন্তু দিল্লিতে পেট্রলের দাম লিটার প্রতি ৮২ টাকা, তখনকার দামের থেকে ১৫% বেশি। কেবল তাই নয়, যেহেতু মোদি সরকার ডিজেলের উপরে উৎপাদন শুল্ক পেট্রলের তুলনায় অনেক বেশি বাড়িয়েছেন, তাই সর্বত্র পেট্রল ও ডিজেলের দামের তফাৎ কমে গিয়ে শূন্যে পৌঁছতে চলেছে, কিন্তু দিল্লিতে ভ্যাটের হারের কারণে ডিজেলের দাম পেট্রলের দামের থেকে বেশি হয়েছে। ডিজেলের দামকে পেট্রলের দামের থেকে বেশি করার ক্ষেত্রে মোদীজি কৃতিত্ব নিতে পারে, কেজরিওয়ালের সঙ্গে ভাগ করে।

যেহেতু বিশ্ব বাজারে পেট্রলের ঊর্ধমুখী গতি আগামীতেও চলতে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, তাই ডিজেল পেট্রলের মূল্যবৃদ্ধিও ধারাবাহিক ভাবে চলতে থাকবে বলেই মনে হয়। কেন্দ্রীয় সরকার রাজস্ব ঘাটতি মেটানোর জন্য জ্বালানি তেলের উপর শুল্ক বসানোর সহজ রাস্তা গ্রহণ করছে। মে মাসের গোড়ায় যখন পূর্বোল্লিখিত ১০ টাকা ও ১৩ টাকার শুল্ক আদায় বাড়ানো হয় তখন বলা হয়েছিল এর ফলে তেলের দাম বাড়বে না, তেল কোম্পানিগুলি দাম বাড়াবে না। আদতে ওই সময়ে অশোধিত তেলের দাম কমার ফলে সরকারের বাজার নির্ধারিত মূল্য নীতি অনুযায়ী তেলের দাম কমার কথা ছিল। কিন্তু সে তো আন্তর্জাতিক বাজরে দাম বাড়ার সময়কার নীতি। ফলে দাম কমেনি, শুল্ক বেড়েছে। এখন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ছে, শুল্ক কমছে না, দাম বাড়ছে। এর নামই মোদী সরকার।

সরকার জিএসটি আদায়ে ব্যর্থ, সেই ব্যর্থতার দায় মেটাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হল। সরকার শিল্পপতিদের কাছ থেকে আয়কর, কর্পোরেট-কর আদায়ে অপারগ, সেই ব্যর্থতার দায় মেটাতে পেট্রল ডিজেলের দাম বাড়ল। ধনী শিল্পপতিদের পদলেহনকারী মোদী সরকার সম্পদ-কর বা উত্তরাধিকার-কর আরোপ করে বিত্তশালীদের বিরাগভাজন হতে চায় না তাই অত্যাবশ্যক তেলের দাম বাড়িয়ে দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধির দ্বার উন্মুক্ত করে সরকারী তথ্য অনুসারে মে মাসে খাদ্য সামগ্রীর দাম বেড়েছে বার্ষিক ৯.৩% হারে; শহরে  সেই বৃদ্ধির হার ৮.৪%, যা গ্রামাঞ্চলের হার ৯.৭% অপেক্ষা বেশ খানিকটা কম। কোভিড-১৯ মহামারীর সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও খাদ্যসামগ্রীর দাম বাড়তে শুরু করেছে। সেই বাড়াতে আরো ইন্ধন যোগাচ্ছে প্রতিদিন পেট্রল ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি। মনে রাখা দরকার মে মাসে তেলের দাম বাড়েনি। জুন মাসের গোড়া থেকে তা বাড়তে শুরু করেছে। ফলে জুনে ওই মুদ্রাস্থীতি আরো বেড়েছে বলেই মনে হয়। খাদ্য দ্রব্যের এই মূল্যবৃদ্ধি গ্রামের দরিদ্রদের আরো বিপদে ফেলেছে। একদিকে গ্রামে কাজ নেই, চিকিৎসার বন্দোবস্ত নেই, কোভিড টেস্টের তেমন কোনো পরিকাঠামোও নেই। ফলে গ্রামাঞ্চলের অধিবাসীরা আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। সম্ভবত বিনা চিকিৎসায় কোভিডে মারাও যাচ্ছেন বহু মানুষ। সেই সময়ে কেন্দ্রীয় সরকার অবলীলায় জ্বালানি তেলের দামকে আকাশছোঁয়া করে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির আগুনে ঘি ঢালছে।

Published on 04 July, 2020