ঘাতকের ছিন্ন কর ছদ্মবেশ!

রাজ্য বিজেপি নরেন্দ্র মোদীর জন্মদিন উদযাপনকে উপলক্ষ হিসেবে কেন্দ্রে রেখে চলতি সপ্তাহে কর্মসূচী নিয়েছে ‘সেবা সপ্তাহ’ পালনের। এই কর্মসূচী বুথভিত্তিক এবং দশ দফা কাজের। বৃক্ষরোপণ, স্বাস্থ্য সচেতনতা ....

dde

রাজ্য বিজেপি নরেন্দ্র মোদীর জন্মদিন উদযাপনকে উপলক্ষ হিসেবে কেন্দ্রে রেখে চলতি সপ্তাহে কর্মসূচী নিয়েছে ‘সেবা সপ্তাহ’ পালনের। এই কর্মসূচী বুথভিত্তিক এবং দশ দফা কাজের। বৃক্ষরোপণ, স্বাস্থ্য সচেতনতা, কৃত্রিম অঙ্গদান, রক্তদান শিবির, প্লাষ্টিক বর্জন, মোদীর ভার্চুয়াল মহিমাকীর্তন, ‘আয়ুস্মান ভারত’ নামরূপী স্বাস্থ্য বিমা, ফসল বিমা, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা ও সড়ক যোজনা-র ভার্চুয়াল মাহাত্ম প্রচার-প্রদর্শনী – এসবই রয়েছে কর্মসূচীতে। ঘাতক বিজেপি আবার ভেক ধরছে ‘করসেবা’র! বাংলার ‘গণদেবতা’র মনের তল পাওয়ার! শ্যেনদৃষ্টি এখন পরের বিধানসভা নির্বাচনের দিকে। পূর্বাঞ্চলে দখল নিয়েছে ত্রিপুরা ও আসামের; বিহারেও নির্বাচন আসন্ন, শাসকদল জেডিইউ পাল্টি খেয়েছে যথেষ্ট, মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার বিজেপির সাথে আঁতাতের মুখ হয়ে উঠতে উন্মুখ। এই হাওয়ায় বাংলায় এবার বড় মাত্রায় ফায়দা তুলতে বিজেপি মরীয়া। সেই লক্ষ্যেই নিচ্ছে যত কর্মসূচী, কষছে যত মেরুকরণের অঙ্ক, আর ভোট শতাংশ পঞ্চাশে তোলার মারপ্যাঁচ।

এরাজ্যে ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রাপ্ত ভোটের ভাগ ছিল ৪০ শতাংশ। একে ৫০ শতাংশে ওঠাতে হলে প্রয়োজন আরও ১০ শতাংশ ভোট। সেই সংস্থান করতে সাজাতে শুরু করেছে প্রচার সামগ্রী। ফন্দি আঁটছে বিশেষত যুব ও সংখ্যালঘু ভোটে দাঁও মারার। ময়দানে নামাচ্ছে দলের সংগঠন ‘যুব মোর্চা’-কে, সংঘর্ষ ও সদস্য সংগ্রহের জন্য। আর ব্যবহার করা শুরু করেছে দলের 'সংখ্যালঘু সেল'-কে। সংখ্যালঘুদের ভয়ে ‘ভক্তি’-তে টেনে আনার জন্য। এরাজ্যে মুসলিম ভোট ২৯-৩০ শতাংশের মতো। হিন্দুত্বের ও তার আনুসঙ্গিক সবকিছুর সর্বব্যাপী প্রচার চালিয়ে গত লোকসভায় দলের ভোট অনেক ফুলে-ফেঁপেছিল। উঠেছিল নজিরবিহীন শতাংশে। তবু খোয়াব দেখার তুলনায় থাকতে হচ্ছে অনেকটাই পেছনে। তাই সংখ্যালঘুদের সন্ত্রস্ত করে চলার লাইন চালিয়ে যাওয়ার সাথে বাজি ধরতে হচ্ছে সংখ্যালঘু ভোট হাতানোরও। ছলে-বলে-কৌশলে। মুসলিম অধ্যূষিত বিধানসভা কেন্দ্রের সংখ্যা ১২৫টি। তার মধ্যে গত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি লিড পেয়েছিল ২৩টি ক্ষেত্রে মাত্র। এবার এর বড় মাপের সংখ্যা বাড়াতে নামছে দুই বিশেষ বর্গে ক্ষেত্র বাছাই করে। প্রথম বর্গের নিশানায় রয়েছে দক্ষিণবঙ্গের তিনটি অঞ্চল উলুবেড়িয়া, বারাসাত ও খড়গপুর শহর। পরের তালিকায় রেখেছে উত্তরবঙ্গের কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, মালদা সহ মুর্শিদাবাদকে। সংখ্যালঘু অধ্যূষিত অঞ্চলের জন্য প্রচারের বিষয়বস্তু ছকা হচ্ছে বিশেষভাবে। তা হল, ‘সেল’ প্রচারমাধ্যম থেকে প্রচার করা হবে ‘সিএএ বিরোধী প্রতিবাদ ও আন্দোলন করে ভুল হয়েছে। বাংলার মুসলিমদের ভয় নেই। এখানে এনআরসি হবে না।’ ছকবাজি চলবে এইসমস্ত ছদ্মবেশী প্রচারে মুসলিম মন আত্মসাৎ করার।

পশ্চিমবাংলায় বিশেষত বিগত একদশক সময়কালে, বিভিন্ন কারণে, তা সে বামপন্থীদের প্রতি আস্থা ক্ষুণ্ণ হওয়া ও বিচ্ছিন্নতা বেড়ে যাওয়ার কারণে হোক, তৃণমূল কংগ্রসের প্রতি প্রবল বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠার কারণে হোক, ব্যাপক গণতান্ত্রিক শক্তির এক উল্লেখযোগ্য অংশ, তার মধ্যে আছে যুবশক্তি, আছেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষেরাও, তাঁরা রাজ্য বিজেপির ‘বিরোধীদল’রূপী হাতছানিতে বচনে বিমোহিত হয়ে গেছেন। মোদী জমানার দেশব্যাপী ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন-দমন-পীড়ন দেখেও এসব ঘটেছে। আর, এই বাড়বৃদ্ধি দেখেই বাংলায় বিজেপির একদিকে যত হুঙ্কার অন্যদিকে তত ছলচাতুরি। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় জনতাকে বিজেপির পাতা ফাঁদ সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে সম্যক। ওদের তৈরি ‘সংখ্যালঘু সেল’ আদৌ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সুরক্ষার তো নয়ই, কোনও ভালো কিছু করার হতে পারে না; ওসব হল সংখ্যাগুরুবাদী হিন্দুত্বের জোয়াল মেনে নেওয়া মানিয়ে নেওয়ার মতো আদায়ের হাতিয়ার। বুঝতে হবে সিএএ-বিরোধী আন্দোলন তীব্র হয়েছে বলেই ক্ষমতায় আসার জন্য মুখিয়ে থাকা এত মাখো মাখো স্তোকবাক্য।

বিজেপির এই ছদ্মবেশী ধেয়ে আসার মুখোমুখি মোকাবিলার খুব প্রয়োজন। যেখানে যেমন সেখানে তেমন। দূরন্ত উদ্যোগ ও সক্রিয়তা চাই জোরের সাথে পাল্টা প্রচার-প্রভাবিত ও সংগঠিত-সমাবেশিত করার। যে বিজেপি দেশকে সর্বনাশের দিকে নিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত, এমনকি অতিমারী অবস্থাতেও, একে বাংলায় কিছুতেই ‘পরিত্রাতা’ হয়ে ওঠার সর্বনাশা ছদ্মবেশ ধারণ করতে দেওয়া যায় না। দেশের গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, বহুত্ব, বিশেষত দলিত-আদিবাসী-সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্বাধিকার, নারীসমাজের অধিকার আজ সবদিক থেকেই সর্বব্যাপী আক্রান্ত, বিপন্ন। তাই বিজেপির স্বরূপ উন্মোচন করতে, বিজেপিকে বিচ্ছিন্ন ও পর্যূদস্ত করতে প্রয়োজন সমস্ত শক্তি উজার করে দেওয়া। পাল্টা চেপে ধরার জ্বলন্ত সুযোগ রয়েছেই।

Published on 20 September, 2020