করোনা সংক্রমণ ও তার পরবর্তীতে নামানো লকডাউন দেশে ব্যাপক বিপর্যয় নিয়ে এসেছে। অনাহারের মুখোমুখি হয়ে হাজার-হাজার পরিযায়ী শ্রমিক শতশত মাইল পারি দিচ্ছেন বাড়ির উদ্দেশ্যে, এ দৃশ্য আমাদের দেশের সঙ্গে সারা দুনিয়াও দেখেছে। প্রায় দু-লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক বিহারে ফিরে এসেছেন, কিন্তু সরকার এবং প্রশাসন তাদের প্রতি কোনো আন্তরিকতা না দেখিয়ে নিষ্ঠুর মনোভঙ্গিই প্রদর্শন করেছে। নীতীশ কুমার এমনকি এই কথাও বলেছেন যে, তাদের বিহারের সীমানা পেরিয়ে রাজ্যের ভেতর ঢুকতে দেওয়া হবে না। কিছু জায়গায় সিপিআই(এম-এল) উদ্যোগ নেওয়ায় পরিযায়ী শ্রমিকরা বাড়ি ফিরতে পেরেছেন। অনাহার, জীবিকা হারানো এবং করোনা সংক্রমণের আতঙ্ক বিহারের এক বড় অংশের মানুষকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। বিহার সরকার কিন্তু গা-ছাড়া মনোভাব দেখাচ্ছে, সংকটের একটা কার্যকরী সমাধানে পৌঁছতে অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের সাহায্য ও সহযোগিতাকে প্রত্যাখ্যান করছে। এই পরিস্থিতিতে সামন্ততান্ত্রিক শক্তিগুলোর আক্রমণ এবং তাদের দ্বারা দরিদ্র ও দলিতদের সামাজিক বয়কটও অনেক গুণ বেড়ে গেছে। দিল্লীর তবলিগি জামাত জমায়েতের ঘটনাকে অছিলা করে সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ছড়ানোর পরিঘটনাও ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ভারত এমন একটা দেশ যেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কিছু জাত ও সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাটা এক নির্মম বাস্তবতা হয়েই বিরাজ করছে। এখানেই আবার সামাজিক দূরত্ব চালিয়ে যাওয়ার ব্রাহ্মণ্যবাদী ব্যবস্থাকে অব্যাহত রাখতে করোনাকে অস্ত্র হিসাবে কাজে লাগানো হচ্ছে। 'লকডাউন'কে সামনে রেখে সমস্ত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে চূর্ণ করা হচ্ছে এবং স্বৈরতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চলছে।
করোনাভাইরাস-লকডাউন-মদ নিষেধের নামে বিজেপি-জেডিইউ গুণ্ডা ও পুলিশের গাঁটছড়া বিহারের অনেক স্থানেই মারধর, লুট, হত্যা, ইত্যাদি যে নিপীড়নগুলো চালিয়েছে, সিপিআই(এম-এল)-এর কয়েকটি দল সেই সমস্ত ঘটনার তদন্ত করে দেখেছে। পাটনা, মাসাউরি, পুনপুন, ধনরুয়া ইত্যাদি স্থানে সংঘটিত কিছু ঘটনার বিবরণ নীচে দেওয়া হল।
১। ধনরুয়ার নন্দপুরা এবং সাদিশোপুর মুশাহার টোলার
ঘটনা : এখানে বেশ কয়েকদিন ধরেই পুলিশের হানাদারি ও তল্লাশি চলছিল এবং ২৭ মার্চ বিজেপি-জেডিইউ মদতপুষ্ট সামন্ততান্ত্রিক দুর্বৃত্তরা গ্রামে ঢুকে পুরুষ, মহিলা এবং এমনকি শিশুদেরও মারধর করে, কিছু জিনিসপত্র ধ্বংস এবং কিছু লুটও করে; এসবই তারা করে আঞ্চলিক ডিএসপি-র যোগসাজশে এবং ঐ সমস্ত হানাদারিতে নেতৃত্ব দেন জেডিইউ ব্লক সভাপতি বেদ প্রকাশ ও ভোলা সিং। অসুস্থ ৫০ বছর বয়স্ক বোথা মানঝিকে এমন ভয়ঙ্করভাবে মারা হয় যে তিনি ২ এপ্রিল মারা যান। সিপিআই(এম-এল) আঞ্চলিক অফিসারের কাছে এই বিষয়ে লিখিত অভিযোগ জানালেও কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
২। মাসাউরির তিনেরির ঘটনা : মদের উপর নিষেধাজ্ঞকে
বলবৎ করার নামে এক বিরাট পুলিশ বাহিনী বিজেপি-আরএসএস গুণ্ডা নরেন্দ্র সিংকে সঙ্গে নিয়ে এই গ্ৰাম এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে হানাদারি চালিয়ে সন্ত্রাসের আবহাওয়া সৃষ্টি করে। ওরা ২৮ মার্চ আবার আসে এবং গ্রামের লোকজনকে প্রচণ্ড প্রহার করতে থাকে। লকডাউন চলতে থাকায় নগেন্দ্র মানঝির ছেলে আহত রোহিত কুমারকে সময়মতো পাটনা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া যায়নি, ফলে সে মারা যায়। নরেন্দ্র সিং ও তার গুণ্ডাবাহিনী তার শেষ কৃত্যেও বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু জনগণ সেটা ব্যর্থ করে দেয়। ওই গুণ্ডারা ২৯ মার্চ আবার গ্রামে ঢোকে, জনগণকে মারধর করে এবং ১৫ বছরের কিশোরী মহাদলিত সম্প্রদায়ের সরস্বতী কুমারীকে টেনে নিয়ে যায় যার উদ্দেশ্য ছিল তাকে ধর্ষণ করা। গ্রামবাসীরা প্রতিবাদ জানালে রড দিয়ে তাদের মারা হয়। শিবরাম মানঝির বাড়িতে লুটপাট চালানো হয় এবং তার মেয়ের বিয়ের জন্য রাখা গয়নাও ছিনিয়ে নেওয়া হয়। অরুণ সাহু, নান্দু মানঝি ও আরো কিছু মানুষকে মারধর করে তাদের বাড়িতে লুটপাট চালানো হয়।
৩। বিক্রম ব্লকের চিকোডার ঘটনা : মদের ওপর নিষেধাজ্ঞাকে বলবৎ করার নামে পালিগঞ্জের ডিএসপি-র নেতৃত্বে বিজেপি সমর্থিত সামন্ততান্ত্রিক গুণ্ডারা গ্রামের ওপর আক্রমণ চালিয়ে গ্রামবাসীদের মারধর করে। তলোয়ার ও লাঠি নিয়ে যে গুণ্ডারা গ্রামে ঢোকে তাদের মধ্যে ছিল পুটু সিং, বীরেন্দ্র সিং, টুটু সিং, হরিরাম সিং, অমরনাথ সিং, রাজকমল সিং, সুধীর সিং ও অন্যান্যরা। যাবার সময় ওরা গ্রামবাসীদের এই হুমকি দিয়ে যায় যে, ওরা যদি এক সপ্তাহর মধ্যে গ্রাম না ছাড়ে তবে করোনা ভাইরাসের নামে ওদের জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হবে।
৪। ফুল ওয়ারির উড়ান টোলার ঘটনা : ৪ এপ্রিল গ্রামে ঢুকে পুলিশ গ্রামবাসীদের কাছ থেকে তোলা আদায় করতে শুরু করে। গ্রামবাসীরা যখন বলল যে ওদের টাকা নেই এবং ওরা অনাহারে রয়েছে, পুলিশ তখন মদের ওপর নিষেধাজ্ঞার নামে ওদের মারতে শুরু করে।
৫। পালিগঞ্জের জারখার ঘটনা : সিপিআই(এম-এল) ব্লক কমিটির সদস্য রাজেশ কুমারকে ফোনে হুমকি দেওয়া হয় এবং তারপর গুণ্ডারা তার বাড়িতে ঢুকে ইট-পাথর ছুড়তে এবং গুলি চালাতে শুরু করে। উল্লেখ্য যে, রাজেশ কুমার দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপি গুণ্ডাদের অপকীর্তিগুলোকে ফাঁস করে আসছেন। এই গুণ্ডারাই এর আগে গ্রামের দরিদ্রদের ওপর আক্রমণ চালায় এবং শিব মন্দিরে মুসলিম-বিরোধী পোস্টার সাঁটায়।
৬। রামপুর নিগওয়ার ঘটনা : রামানি (কাহার) জাতের যে তিনজন পরিযায়ী শ্রমিক গ্রামে ফিরেছিল বিজেপি-আরএসএস গুণ্ডারা ওদের হুমকি দিয়ে বলে যে তাদের গ্রামে থাকা হবে না এবং গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয় যে ওদের দেখে অসুস্থ মনে হচ্ছে না, আর তাই ওরা থাকতে পারে। কিন্তু ওই গুণ্ডাদের সেটা পছন্দ হয়নি এবং তিন দফায় ওদের মারধর করে গুরুতর রূপে আহত করা হয়।
৭। বিহটার ঘটনা : সামন্ততান্ত্রিক শক্তিগুলো এই ব্লকের গ্রামগুলোর ওপর আক্রমণ চালিয়ে সন্ত্রাসের আবহাওয়া সৃষ্টি করে। সিপিআই(এম-এল) জেলা কমিটি সদস্য গোপাল সিংকে গ্রামে ঢুকতে দেওয়া হয় না এবং আধিপত্য চালানো সামন্ততান্ত্রিক অংশ এই মিথ্যা প্রচার ছড়ায় যে, তাঁর করোনা সংক্রমণ হয়েছে এবং তাঁর থেকে সংক্রমণ ছড়াবে।
৮। দানিয়াওয়ার ঘটনা : গ্রামবাসীরা লকডাউনের সময় ফসল কাটার কাজ করতে অস্বীকার করলে সামন্ততান্ত্রিক শক্তিগুলো সাহজাপুর এলাকার কেওয়াই গ্রামে আক্রমণ চালিয়ে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে। মহাদলিত সম্প্রদায়ের শ্রমিক ৪০ বছর বয়স্ক হরদয়াল মানঝিকে প্রচণ্ড মারধর করে তার হাত ভেঙ্গে দেওয়া হয়।
৯। ভোজপুরের সারা মুসাহার টোলার ঘটনা : সামন্ততান্ত্রিক গুণ্ডারা ৫ এপ্রিল টোলায় আক্রমণ চালালে ছয় ব্যক্তি গুরুতর রূপে আহত হয়। যারা আহত হয়েছে তাদের বয়স ছয় মাস থেকে ৫০ বছর। প্রাপ্ত সংবাদ থেকে জানা যাচ্ছে, রবি যাদব এবং শিবলগন যাদবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, কিন্তু অন্য অভিযুক্তরা এখনও অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে।