গালোয়ান উপত্যকায় সংঘাত : প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় চীনের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘাত নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে হবে

শান্তিপূর্ণ ও কূটনৈতিক পথে সীমান্ত বিবাদের মীমাংসা করতে হবেকোভিড ১৯ মহামারী ভারতে জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্রে এক বিপুল সংকটের সৃষ্টি করেছে, আর ২৫ মার্চ থেকে বলবৎ হওয়া লকডাউনও আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে জন্ম দিয়েছে এক সুবিশাল ...

gal

শান্তিপূর্ণ ও কূটনৈতিক পথে সীমান্ত বিবাদের মীমাংসা করতে হবেকোভিড ১৯ মহামারী ভারতে জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্রে এক বিপুল সংকটের সৃষ্টি করেছে, আর ২৫ মার্চ থেকে বলবৎ হওয়া লকডাউনও আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে জন্ম দিয়েছে এক সুবিশাল বিপর্যয়ের যা ক্রমান্বয়ে তীব্রতর হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে লাদাখ সেক্টরে ১৫/১৬ জুন চীন-ভারত প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় চীন ও ভারতীয় সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হয়, যাদের মধ্যে একজন কর্নেল পদমর্যাদার সেনা অফিসারও আছেন। অপর দিকে চীন পক্ষেও অনির্দিষ্ট সংখ্যার কিছু সেনার হতাহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে, এর অবশ্য সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ মেলেনি।

মে মাসের প্রথম দিক থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে মুখোমুখি সংঘাত তথা অচলাবস্থার খবর সংবাদ মাধ্যমে চাউর হতে থাকে। ২০২০-র ৫-৬ মে প্যাংগং সো লেকের কাছে ভারতীয় ও চীনা সেনাদের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় যাতে উভয় পক্ষের কিছু সেনার আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। ২৮ মে ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ভারত ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থার উল্লেখ করে কূটনৈতিক পথে বিবাদ নিষ্পত্তির কথা বলেন। ইতিমধ্যে বিভিন্ন স্তরে সামরিক কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে কয়েক দফা আলোচনা চলে, যার পরিণতিতে ৬ জুন লেফটেন্যান্ট পর্যায়ের অফিসাররা আলোচনায় বসেন। এরপর বিদেশ মন্ত্রক জানায় “বর্তমান পরিস্থিতির প্রশমনে এবং সীমান্ত অঞ্চলে শান্তি ও সুস্থিতি সুনিশ্চিত করতে উভয় পক্ষ সামরিক ও কূটনৈতিক স্তরে আলোচনা চালিয়ে যাবে।”

সংঘাত তথা অচলাবস্থার নিরসনে সামরিক ও কূটনৈতিক মাধ্যমে আলোচনা অব্যাহতভাবে চলার এই প্রেক্ষাপটে বিচার করলে গালোয়ান উপত্যকার এই সংঘর্ষ চলমান প্রক্রিয়ায় লাগা এক ধাক্কাকেই দেখিয়ে দেয়। উত্তেজনা প্রশমনের জন্য চলা আলোচনার মাঝে হঠাৎই আমরা উত্তেজনাকে তীব্রতর হয়ে উঠতে দেখলাম যার পরিণামে কিছু সেনাকে নিহত হতে হল। ইতিহাসের নিরিখে বিচার করলে ১৯৬৭-র পর এটাই সবচেয়ে বড় রক্তক্ষয়ী সংঘাত, এবং ১৯৭৫-এর পর সেনা নিহত হওয়ার প্রথম ঘটনা। এই ঘটনার দু’দিন পর বিদেশ মন্ত্রক তাদের প্রথম প্রতিক্রিয়া জানায়। পরিহাসের ব্যাপার হল, বিদেশ মন্ত্রকের ১৮ জুনের বিবৃতিতে সংঘর্ষের জন্য চীনকে দায়ী করা হলেও ওই বিবৃতিতে চীনাদের হাতে কোনো ভারতীয় সেনার বন্দী হওয়ার কথা স্বীকার করা হয়নি, এবং চীন সেদিনই চার অফিসার সহ দশ ভারতীয় সেনাকে মুক্তি দেওয়ার পরই কেবল ভারতীয় জনগণ ভারতীয় সেনাদের বন্দী হওয়ার কথা জানতে পারলেন।

এটা যদিও বা যথেষ্ট অসমীচীন না হয়ে থাকে তবে এর পর যা ঘটল তার কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া সত্যিই দুষ্কর। বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতিতে বলা হল যে সংঘর্ষটা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার ভারতের দিকেই ঘটেছে যেখানে চীন একটা কাঠামো গড়ার চেষ্টা করছিল। আর পরদিন মোদী “সর্বদলীয় বৈঠকে” সরাসরি বললেন যে, অনুপ্রবেশ বা হানাদারির কোনো ঘটনা ঘটেনি এবং কোনো জমি বা পোস্ট হারানোর ঘটনা ঘটেনি। তাঁর বিবৃতি এতটাই সুস্পষ্ট ও সোজাসাপ্টা ছিল যে তার মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির কোনো অবকাশ ছিল না। পরের দিন প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় থেকে এক দীর্ঘ ব্যাখ্যা বেরোলো যাতে তাঁর ভিডিও বিবৃতিতে থাকা অনুপ্রবেশ বা হানাদারির অস্বীকৃতি সম্পূর্ণরূপে বাদ গেল। ইতিমধ্যে চীন তাদের নিজেদের অবস্থানের সমর্থনে মোদীর ভিডিও বিবৃতিকে বড় আকারে কাজে লাগাচ্ছে এবং পুরো গালোয়ান উপত্যকার ওপর নিজেদের দাবিকে তূলে ধরছে, সামরিক বিশ্লেষকরা যদিও বলছেন যে ১৯৬২-র পর থেকে এই উপত্যকা প্রধানত ভারতের নিয়ন্ত্রণেই থেকেছে। চীনের দাবিকে খণ্ডন করে ভারত সরকারের তরফে কোনো বিবৃতি এখনও দেওয়া হয়নি।

lad

 

নরেন্দ্র মোদী সহ সরকারের কাছ থেকে আসা এবারের সরকারী বিবৃতিগুলো যথেষ্ট সংযত বলেই দেখা যাচ্ছে, যেটা তাদের স্বভাবের সঙ্গে একেবারেই বেমানান। যদি ২০১৩-১৪ বর্ষে, ২০১৪ সালে বিজয়ের আগের প্রচার পর্বে মোদী যে আগ্ৰাসী বুলির ফোয়ারা ছুটিয়েছিলেন, অথবা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’-এর যে উগ্ৰ হাবভাব দেখিয়েছিলেন সেগুলোর সাথে তুলনা করলে এবারের বিবৃতিগুলো বিশেষভাবে ওই ধরনের বলেই প্রতিপন্ন হয় যা কার্যত চীনের দাবির প্রতি মৌন সম্মতিরই ইঙ্গিত করে। আর এ সবকে চাপা দিতে সংঘ-বিজেপি উগ্ৰ-জাতীয়তাবাদী বুলি এবং বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারের ঝড় বওয়াচ্ছে, যা চালিত হচ্ছে ভারতে সরকারের বিরোধী পক্ষ এবং বামপন্থীদের বিরুদ্ধে। যে তিনটে চরম বিদ্বেষপূর্ণ এবং মিথ্যা বিষয়কে কেন্দ্র করে সংঘ-বিজেপির প্রচার চলছে তা হল : (১) চীনা পণ্য বিক্রয় ও ক্রয়ের জন্য ছলনাপূর্ণ ভাবে ছোট ব্যবসায়ী এবং সাধারণ ক্রেতাদের লক্ষ্যবস্তু বানানো (তা করা হচ্ছে যখন মোদী জমানার গোটা পর্ব জুড়ে চীনের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা বেড়ে চলেছে যার পরিণতিতে চীন ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য শরিক হয়ে উঠেছে এবং ভারতের বড়-বড় কর্পোরেট সংস্থাগুলো একগুচ্ছ চীনা কোম্পানি এবং চীনা পুঁজির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে আবদ্ধ হয়েছে), (২) সরকার জবাব দিতে পারছে না এমন প্রতিটি অস্বস্তিকর প্রশ্নকে থামিয়ে দিতে বিরোধী পক্ষকে চীনপন্থী বলে অভিযুক্ত করা, (৩) বাস্তব জীবনে আমাদের যখন অনেক বড় মূল্য দিতে হচ্ছে তখন সামরিক-কূটনৈতিক ক্ষমতা সম্পর্কে মিথ্যা বড়াই করা।

সরকার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার ফ্রন্টে ঠিক কি ঘটছে সে সম্পর্কে নিশ্চুপ থাকলেও তারা কিন্তু ভারতীয় সেনা বাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কে একটা নতুন আখ্যান ফেরি করতেও শুরু করেছে। পরিস্থিতির মোকাবিলায় সেনাবাহিনীকে অবাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বলে মোদী দাবি করেছেন আর টিভির অন্যতম এক বড় চ্যানেলের জনৈক সঞ্চালক বললেন, যে সেনাবাহিনী প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় প্রহরার কাজে নিয়োজিত তাদের তরফে কোনো ত্রুটির জন্য সরকারকে জবাবদিহি করতে বলা চলবে না। পুলওয়ামা বালাকোট পর্ব থেকে এটা কত ভীষণভাবেই না আলাদা, যখন মোদী গোটা পর্যায় জুড়ে নিজেকেই সমস্ত কৃতিত্বের দাবিদার করে তুলতে এবং খ্যাতির সমস্ত আলো আত্মসাৎ করতেই উঠেপড়ে লেগেছিলেন! এর উদ্দেশ্য কি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বাঁচানো এবং কোনো বিপর্যয় বা অস্বস্তিকর ঘটনা ঘটলে তার দায় সেনাবাহিনীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া?

আর একটা দুরভিসন্ধিমূলক দিক প্রকাশ পেল যখন মোদী বিহার রেজিমেন্টের দেখানো শৌর্যর জন্য বিহারের প্রতিটি মানুষকে গর্ব অনুভব করার আহ্বান জানালেন। যে সেনারা চীনাদের সঙ্গে হাতাহাতি লড়াই করেছিলেন তাঁরা ছিলেন বিহার রেজিমেন্টের ১৬তম ব্যাটেলিয়নের সদস্য, কিন্তু তার মধ্যে সারা ভারতের সেনারাই রয়েছেন। এই রেজিমেন্টের যে ২০ জন সেনা নিহত হয়েছেন তার মধ্যে ১৫ জনই হলেন অন্য রাজ্যের। যে মোদী সরকার যুক্তরাষ্ট্রীয়তার ভিত্তিকে ক্ষয় করতে চেষ্টার কোন কসুর করছে না, সেই মোদীই যে কেন আঞ্চলিকতার চশমা দিয়ে সেনাদের পরিচিতিকে তুলে ধরছেন তা বুঝে উঠতে একটুও অসুবিধে হচ্ছে না। এ বছরের শেষের দিকে যে বিহারে নির্বাচন হতে যাচ্ছে!

indo

 

গালোয়ান উপত্যকার সংঘাত নিয়ে অনেক প্রশ্নেরই সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য কোন উত্তর এখনও পাওয়া যায় নি। তবে দু-পক্ষই আলোচনার মাধ্যমে অচলাবস্থার নিরসনের চেষ্টায় আলোচনার টেবিলে ফিরে গেছে। মহামারী এবং গুরুতর অর্থনৈতিক সংকটের মাঝে পরমানু শক্তিধর দু-দেশের মধ্যে যুদ্ধ বিপর্যয় ঘনিয়েই তুলতে পারে। সংঘাত যাতে যুদ্ধে পরিণতি না পায় এবং সমস্ত বিষয়েরই মীমাংসা যেন আলোচনার মাধ্যমে হয় তা সুনিশ্চিত করতে হবে। সীমান্ত বিবাদের নিষ্পত্তি সামরিক উপায়ে হতে পারে না, একমাত্র কূটনৈতিক উপায়েই তার সমাধান সম্ভব। দু-দেশ যখন কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যে দিয়ে বিষয়গুলোর নিষ্পত্তির চেষ্টা চালাতে থাকবে, মোদী সরকারকে তখন প্যাংগং সো ও গালোয়ান উপত্যকার মুখোমুখি সংঘাত নিয়ে একটা শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে হবে যাতে বর্তমানের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে ভারতীয় জনগণের আস্থা অর্জন করা যায়।

চীন ও ভারতের মধ্যে যে কোনো দ্বন্দ্বেরই বিশ্ব স্তরে একটা প্রতিক্রিয়া থাকবে। চীন ও ভারতের মধ্যে আগেকার ও এই সময়ের দ্বন্দ্বের মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ ফারাক আসছে ভারতের বিদেশ নীতির পরিবর্তন থেকে, যে পরিবর্তন আগেকার জোট-নিরপেক্ষতার যুগ থেকে পরিবর্তিত হয়ে পরিণতি পেয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান রণনৈতিক একাত্মতা ও দহরম মহরমের বর্তমান পর্যায়ে। চীনের সঙ্গে ভারতের নিজের দ্বন্দ্ব বা সংঘাত এইভাবে চীনকে নিশানা বানানোর ক্ষেত্রে আমেরিকার বিশ্বব্যাপী নকশার অংশ হয়ে উঠছে এবং এটা ভারত ও চীনের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনাকে বাড়িয়েই তুলবে। ভারত ও চীনের মধ্যে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দেওয়ার কোনো সুযোগই ট্রাম্প হাতছাড়া করেন না। মোদী সরকার যখন ভারতকে মার্কিন-ইজরায়েল জোটের সঙ্গে আরও গভীর সম্পর্কের মধ্যে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, ভারতের সঙ্গে প্রায় সমস্ত প্রতিবেশি দেশেরই তখন বিচ্ছিন্নতা ঘটছে। আমাদের সীমান্তগুলোকে সুরক্ষিত ও শান্তিপূর্ণ করার একটা পূর্বশর্ত হল প্রতিবেশিদের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন করা। ভারতের বিদেশ নীতি যে ধারায় চলছে তার বড় ধরনের সংশোধন আবশ্যকীয় হয়ে উঠেছে। ভারত যাতে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আরও কার্যকরী ভূমিকা নিতে পারে তার জন্য সমস্ত প্রতিবেশি দেশের সঙ্গে শান্তি ও সহযোগিতাকে আমাদের বিদেশ নীতির বুনিয়াদি লক্ষ্য ও ভিত্তি করে তুলতে হবে।

(লিবারেশন পত্রিকার সম্পাদকীয়, জুলাই ২০২০)  

Published on 03 July, 2020