হায়দ্রাবাদ ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত চারজনকেই আজ ভোরে পুলিশি এনকাউন্টারে মেরে ফেলা হয়েছে। এই ‘এনকাউন্টার’ বা ‘সংঘর্ষে’র মধ্যে হেফাজতে হত্যার সমস্ত রকম চিহ্ন রয়েছে, যাকে ‘সংঘর্ষে’-র চেহারা দেওয়া হয়েছে। সন্দিগ্ধরা পুলিশ হেফাজতে ছিল অর্থাৎ নিরস্ত্র ছিল, এর থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় পুলিশ মিথ্যে কথা বলছে যে অভিযুক্তদের ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে সেই রাতের ঘটনার ‘পুনর্নির্মাণের’ সময় তারা ‘পুলিশ-কে আক্রমণ করে’ এবং এর ফলে তাদের মেরে ফেলা হয়।
আমাদের, এক দেশ হিসেবে, এখন বলা হবে যে ‘ন্যায়’ সম্পন্ন হয়ে গেছে, নির্যাতিতার বদলা নেওয়া হয়ে গেছে। আর এখন আমরা সবাই আশ্বস্ত হয়ে স্বাভাবিকভাবে রোজকার কাজে ফিরে যেতে পারি এই ভেবে যে আমাদের পুলিশ, সরকার, সমাজ সঠিক কাজ করেছে আর শয়তান ধর্ষকেরা আর জীবিত নেই।
কিন্তু এই ন্যায়-এর কোনো যথার্থতা নেই। যে ব্যবস্থায় হত্যা কে ‘ন্যায়’ এর মোড়কে পেশ করা হয় সেই ব্যবস্থা মহিলাদের জন্য নিরাপদ রাস্তাঘাট সুনিশ্চিত করতে অক্ষম, মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধের তদন্ত করে অপরাধ প্রমাণ করার জন্য উপযুক্ত প্রমাণ জোগাড় করতে অপারগ, নির্যাতিতাদের সুরক্ষা দিতে অক্ষম (গতকালই উত্তর প্রদেশ-এর একজন নির্যাতিতাকে জীবন্ত অবস্থায় গায়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে), কোর্টে নির্যাতিতাদের সম্মান ও গরিমা বজায় রাখার ব্যবস্থা করতে অক্ষম। এরা শুধু পারে এক অনিয়ন্ত্রিত ভিড়-এর মতো ব্যবহার করতে আর লিঞ্চিংকেই একমাত্র সম্ভাব্য ন্যায় হিসেবে আমাদের সামনে তুলে ধরতে।
আমাদের আরো মনে রাখতে হবে এই চারজনই ছিল সন্দিগ্ধ। আমাদের জানা নেই অপরাধ প্রমাণে তাদের স্বীকারোক্তি কিভাবে আদায় করা হয়েছে, ভারতবর্ষের পুলিশ হেফাজতে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য অত্যাচার যেখানে এক নিয়মিত ঘটনা। অত্যাচার সত্য উন্মোচন করে না। হেফাজতে অত্যাচারিত ব্যক্তি সেটাই বলে যা অত্যাচারী শুনতে চায়। সুতরাং আমাদের এটাও জানা নেই যে আদৌ মৃত চারজন ব্যক্তি হায়দ্রাবাদের ডাক্তারের ধর্ষক ও হত্যাকারী ছিল কিনা।
এই হায়দ্রাবাদ পুলিশই নির্যাতিতাকে তার মা বাবার খোঁজার মরিয়া প্রচেষ্টাকে উপহাস করে, ফতোয়া জারি করে ‘মহিলাদের কি করা উচিত আর কি করা উচিত নয়’, মহিলাদের রাত ৮টার পরে বাড়িতে থাকতে উপদেশ দেয় কারণ পুলিশ পথঘাট সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব নেবে না/ নিতে পারবে না। এই পুলিশই এখন আমাদের বিশ্বাস করতে বলছে যে তারা ধর্ষকদের ধরেছে এবং ‘শাস্তি’ দিয়েছে, এবং বিচারক, জুরি তথা জল্লাদ হিসেবে কাজ করেছে। এ এক নির্মম পরিহাস।
সর্বপ্রথম নারী আন্দোলনের সংগঠনগুলিই বলবে যে এটা ন্যায় নয়। এটা পুলিশ, বিচারব্যবস্থা ও সরকারকে মহিলাদের ন্যায় ও সম্মান-এর জন্য দায়বদ্ধ করার আমাদের যে দাবি তা দমিয়ে দেওয়ার এক চক্রান্ত। নিজেদের কাজের প্রতি দায়বদ্ধ থাকার বদলে ও মহিলা অধিকারকে সুরক্ষিত করতে সরকারের ব্যর্থতা সংক্রান্ত আমাদের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার বদলে, তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী আর তাঁর পুলিশ ভিড় হত্যার নায়ক হিসেবে কাজ করেছে।
যারা যুক্তি দিচ্ছেন হেফাজতে হত্যা এই ধরনের অপরাধের ‘নিবারক’ হিসেবে কাজ করবে তারা আরো একবার ভাবুন। হায়দ্রাবাদ এবং তেলেঙ্গানা পুলিশ এই ধরণের হেফাজতে হত্যার জন্য কুখ্যাত। ২০০৮ সালে, হায়দ্রাবাদ পুলিশ অ্যাসিড আক্রমণের ঘটনায় অভিযুক্ত ৩ জনকে হেফাজতে হত্যা করে। এই হত্যা হায়দ্রাবাদ, তেলেঙ্গানা বা ভারতে মহিলাদের উপর ঘটা অপরাধকে কমায়নি। মহিলাদের উপর অ্যাসিড আক্রমণ, ধর্ষণ, হত্যা লাগাতার ঘটে চলেছে কোনো বিচার ছাড়া।
আমরা এই তথাকথিত এনকাউন্টার-এর বিশদে তদন্তের দাবি জানাচ্ছি। দায়ী পুলিশ অফিসারদের গ্রেপ্তার করে মামলা চালাতে হবে, তাদের আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে মৃত চারজনকে আত্মরক্ষার খাতিরে মারা হয়েছে। কেন এটা শুধু মানবাধিকার-এর জন্য নয় মহিলাদের অধিকারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ? কারণ যে পুলিশ বাহিনী হত্যা করেও ছাড় পেয়ে যায়, কোনো প্রশ্ন করা হয় না, তারা মহিলাদেরও ধর্ষণ করে হত্যা করতে পারে নিশ্চিত হয়ে যে তাদের কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে না। মনে করুন ছত্তিসগড়ের কিশোরী মিনা খালখো-র কথা, যাকে ছত্তিসগড় পুলিশ গণধর্ষণ করে হত্যা করে ও মিনাকে মাওবাদী প্রতিপন্ন করে এক এনকাউন্টারের চেহারা দেয়। বিচার বিভাগীয় তদন্ত থেকে জানা যায় গণধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাকে চাপা দিতেই এনকাউন্টারের গল্প ফাঁদা হয়। সেই ধর্ষক ও খুনিদের দল আজ পর্যন্ত কোনো তদন্ত, মামলার মুখে পড়েনি, বিচার এখনও অধরা।
বহু টিভি চ্যানেল ও সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় দক্ষিণপন্থী বাহিনী আপনাদের বলবে, যে নারী আন্দোলনের কর্মীরা হল শত্রু, কারণ আমরা হেফাজতে হত্যা ও লিঞ্চিংকে ন্যায় হিসেবে স্বীকার করি না। এই চ্যানেলগুলি আর এই বাহিনী হল তারাই যারা কাঠুয়াতে ধর্ষণ অভিযুক্তের সপক্ষে মিছিলকে সমর্থন করেছিল, আদালতের বিচারে তারা অপরাধী প্রমাণ হওয়ার পরেও তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। এরাই প্রধান বিচারপতি গগৈ-এর বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগকারিণীকে মিথ্যেবাদী হিসেবে দাগিয়েছিল, যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে অভিযোগকারী জেএনইউ বা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটিয়েছিল, গণধর্ষণে অভিযুক্ত বিধায়ক কুলদীপ সেঙ্গার-এর পক্ষে দাঁড়িয়েছিল।
আমরা, নারী আন্দোলনের কর্মীরা, মহিলাদের জন্য বাস্তবিক ন্যায়ের দাবি জানাই। আমরা চাই, পুলিশ নিজের কাজ করুক, মহিলাদের অধিকারকে সুরক্ষিত করুক, বিচারক বা জল্লাদ হিসেবে নয়। পুলিশ দ্বারা চিহ্নিত করা ধর্ষকদের হত্যা করার মাধ্যমে তুষ্ট করা কোনো কাল্পনিক ‘সমষ্টিগত বিবেক’কে আমরা চাই না। বরং আমরা চাই সমাজের বিবেক পরিবর্তিত হোক, ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগকারিণীদের প্রতি সমাজ আরো সংবেদনশীল, সহায়ক ও সম্মানপূর্ণ ব্যবহার করুক, নিপীড়িতাদের দোষারোপ করা (ভিক্টিম ব্লেমিং) ও ধর্ষণ সংস্কৃতি (রেপ কালচার)-কে প্রত্যাখ্যান করার প্রশ্নে আর সতর্ক ও সক্রিয় হোক।
- রতি রাও, সভানেত্রী, সারা ভারত প্রগতিশীল মহিলা সমিতি
- মীনা তেওয়ারি, সাধারণ সম্পাদিকা, সারা ভারত প্রগতিশীল মহিলা সমিতি
- কবিতা কৃষ্ণাণ, সম্পাদিকা, সারা ভারত প্রগতিশীল মহিলা সমিতি