লক ডাউন প্রথম দফা ২১ দিন চলার পর বাড়িয়ে দেওয়া হল আরও ১৯ দিন। সরকারি সূত্র বলছে, চলতি পর্ব চলবে ক্ষেত্রবিশেষে কিছু অতিরিক্ত কড়া ব্যবস্থা গ্রহণ ও কিছু ছাড় দেওয়ার ভিত্তিতে। সরকার যাই বলে চলুক, মানুষের মধ্যে পুঞ্জীভূত হচ্ছে ধন্দ-শংকা-অনিশ্চয়তা-অসহায়তা-অসন্তোষ-ক্ষোভ। তার কিছু কিছু বহিঃপ্রকাশও ঘটতে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষের এই প্রতিক্রিয়ার প্রকাশগুলো ঘটছে করোনার সংক্রমণ জড়িত সবদিক নিয়েই। কোনও ক্ষেত্রেই যেন নিঃসংশয় হওয়া যাচ্ছে না। স্বাস্থ্য পরীক্ষার কথায় আসা যাক। বিগত তিন সপ্তাহে পরীক্ষা-পদ্ধতি-প্রকরণ প্রক্রিয়ায় কোনো গুণগত পরিবর্তন এসেছে কি? বলা হচ্ছে, কোনো এলাকা বিশেষে সর্বশেষ সংক্রমণের পর থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে যদি কোনো নতুন সংক্রমণের খবর না আসে তবে ধরে নেওয়া হবে এলাকাটি সংক্রমণ-মুক্ত। এই যদি মাপকাঠি হয় তাহলে বুঝে নিতে হচ্ছে বিপদাশংকা এতটুকু কমেনি। পাশাপাশি এমনও কিছু সংক্রমণের কেস মিলছে যার সাথে সাম্প্রতিক অতীতে বিদেশ ফেরত, বিশেষ অনুষ্ঠান বা জমায়েতে থাকার কোনো তথ্য নেই। এহেন নমুনার মধ্যে কি চাপা সামাজিক সংক্রমণের উৎস থেকে যাচ্ছে না? উদ্বেগ ও জিজ্ঞাসা থাকছেই। তাই পরীক্ষা অভিযানকে তীব্র ও ব্যাপক করে তোলার গুরুত্ব কোনোভাবেই হ্রাস করতে দেওয়া যেতে পারে না। অথচ কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের রিপোর্ট-কার্ডে তেমন আত্মানুসন্ধানী মনোভাব নেই, কোনও বিশ্বাসযোগ্য বিশ্লেষণ থাকছে না, বরং প্রকাশ পাচ্ছে যেন একরকম আত্মতুষ্টি। প্রধানমন্ত্রী যেদিন জাতির উদ্দেশ্যে তাঁর চতুর্থ ভাষণটি দিলেন তখনও পর্যন্ত দিনপ্রতি পরীক্ষাকরণের তৃতীয় পর্বের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়নি। আইসিএমআর সূত্রের রিপোর্ট অনুসারে দৈনিক পরীক্ষার সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছিল ২১ হাজারে। পরীক্ষা কেন্দ্রের সংখ্যা ২৪৪টি, সরকারি ল্যাব ১৭১টি, বেসরকারি ৭৩টি। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রক ইতিমধ্যে বিবৃতি দিয়েছে এপ্রিলের শেষ নাগাদ পরীক্ষা-সংখ্যার লক্ষ্যমাত্রাকে দিনপ্রতি ৪০ হাজারে নিয়ে যাওয়া হবে। এছাড়া দাবি করা হচ্ছে যে, প্রচুর পরিমাণে কিট মজুত আছে, তাছাড়া আরও ৩৩ লক্ষ ‘আরটিপিসিআর’ কিট, ৩৭ লক্ষ ‘ৠাপিড অ্যান্টিবডি ডায়গনোস্টিক’ কিট আমদানির বরাত দেওয়া হয়েছে, যেকোনো দিন এসে যাবে। প্রশ্ন হল, রাজ্যে রাজ্যে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য প্রবণতার নিরীখে কিট মজুদের উপরোক্ত সংখ্যাচিত্রটা কত শতাংশ! আদৌ উল্লেখযোগ্য নয়। আরও প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে। পরীক্ষা পদ্ধতিতে বড় মাত্রায় পরিবর্তন না এনে ও পরীক্ষাকেন্দ্রের সংখ্যাগত উল্লম্ফন না ঘটিয়ে পরীক্ষার ঘোষিত বর্দ্ধিত লক্ষ্যমাত্রায় কি পৌঁছানো সম্ভব? সাদা মনে সহজ অংকে সেই হিসাব মেলার নয়। মোদী সরকার নিছক প্রতিশ্রুতির রাজনীতি ফেরী করে পার পেতে চাইছে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের আচরণ আরও গোলমেলে। সংক্রমণ ছড়ানোর গোড়ার পর্যায়ে ‘মাস্ক’ পরা নিয়ে কার্য়ত দেখানো হয় এক ধরনের ঢিলেঢালা ভাব। তারপরে সংক্রমণ বাড়তে দেখে যখন আকস্মিকভাবে লক ডাউন চাপিয়ে দেওয়া হয় তখন বাজারে মাস্কের যোগান ছিল খুবই কম, চাপ এড়াতে তখন বলা হতে থাকে সাধারণ সুস্থ মানুষের অতো মাস্ক পরার দরকার নেই, মাস্ক পরা দরকার স্বাস্থ্য কর্মী ও অসুস্থদের। মানুষ অভ্যস্ত হচ্ছিল সেভাবেই। তারপর অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে থাকলে তখন সরকারপক্ষ একদিকে মাস্ক সংগ্রহের দায়িত্ব চালান করে দিল জনতার ওপর, অন্যদিকে মাস্ক না পরে বের হলে শুরু করে দেওয়া হয় মানসিক-শারীরিক নির্যাতন। কেন্দ্রের স্বাস্থ্য মন্ত্রকের দ্বিতীয় বড় অপরাধ হল, করোনার প্রকোপ থেকে মুক্তি পাইয়ে দেওয়ার নামে সমাজের গভীরে গেড়ে থাকা অশিক্ষা ও কুসংস্কারকে পুঁজি করে অপবিজ্ঞানের হাওয়া তোলা হল, সে সম্পর্কে নিরুচ্চার থেকে যাওয়া। যেহেতু প্রকারান্তরে ঐ হাওয়া তোলার পেছনে ছিল মনুবাদী বিজেপি-আরএসএস-এর সুপরিকল্পিত যোগসাজশ। ঘর নিষ্প্রদীপ রেখে, দুয়ারে প্রদীপ আর রাস্তায় মশাল জ্বালিয়ে, বাজি পুড়িয়ে ‘গো ব্যাক করোনা’ কসরত প্রদর্শনের কর্মসূচী আচমকা ছিল না। মুখ বন্ধ করিয়ে রাখা হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের।
কেন্দ্রের মোদী সরকার শুধু করোনা পরীক্ষায় মারছে না, মারছে অনাহারে-অর্দ্ধাহারে, মারছে লাঠিতে, ফাটকে পুরে দিয়ে। করোনার প্রতিক্রিয়ায় আরও একবার কল্পনাতীতভাবে প্রকাশ হয়ে গেল ভুখা ভারতের চেহারাটা। সরকারের গুদামে রয়েছে কোটি কোটি টন মজুদ খাদ্যশস্য, সরকার কবুল করছে এই বছরভর সবাইকে খাওয়ানোর মতো খাদ্য রসদ মজুদ রয়েছে, প্রধানমন্ত্রী গণবণ্টন ব্যবস্থায় মাথাপিছু বাড়তি পরিমাণ খাদ্যশস্য সরবরাহের ঘোষণাও শুনিয়েছেন, তবু নির্মম বাস্তব পরিণতি হল, মানুষ বিস্ফোরক হয়ে উঠছে না খেতে পেয়ে বা আধপেটা পরিত্যক্ত হয়ে থাকার কারণে। তথ্যের কারচুপি চলছে যেমন করোনার প্রকোপের মোকাবিলা করে উঠতে পারা না-পারা প্রসঙ্গে, একইভাবে পরিসংখ্যানগত জালিয়াতি চলছে প্রধানত কোটি কোটি গরিবের ঘরে অনাহার-অর্দ্ধাহার তথা সমস্ত দিক থেকে ঘোর অচলাবস্থা চলা নিয়ে। এবিষয়ে সরকারের দিক থেকে দৈনন্দিন তত্ত্বাবধান, পক্ষকালব্যাপী পর্যালোচনা এবং প্রতিনিয়ত জনদরদী পদক্ষেপ পুনর্বিন্যস্ত করে চলার রীতিনীতি প্রায় একেবারেই থাকছে না। উল্টে নেওয়া হচ্ছে অত্যন্ত বেদরদী অমানবিক অবস্থান। কপর্দকশূন্য হয়ে পড়া, খিদের জ্বালা সহ্য করতে না পারা, পরিবারের সমূহ বিপদ অনুভবে উতল হওয়া জনতার ওপর নামানো হচ্ছে পুলিশী উৎপীড়ন। মেগা-মিডিয়া চ্যানেলগুলোর দিনরাতের বিশেষজ্ঞ আলোচনায় যত স্থান পায় করোনার আক্রমণের ভয়াবহতা ও মুখোমুখি জনস্বাস্থ্যের বিষয়, সেই তুলনায় কণামাত্র স্থান পায় না খাদ্য ও পুষ্টির সুলভ সরবরাহ প্রসঙ্গ। এমনকি ঘিঞ্জি বসতি এলাকায় ‘শারীরিক দূরত্ব’ বজায় রাখা যে দুরূহ ভুলেও সেই সমস্যা ও তার সমাধানের আলোচনা সামনে আনা হয় না। পাছে দায়িত্ব নিতে হয় ভেবে পাশ কাটাচ্ছে শাসকপক্ষ। শুধু কি তাই! শ্রমিকদের ওপর একদিকে চলছে বকেয়া মজুরির অংশ কেটে নেওয়া, কোথাও আবার বকেয়া রেখে দেওয়া হচ্ছে পুরো মজুরি; অন্যদিকে ছুতোনাতায় চাপানো হচ্ছে ১২ ঘণ্টা কাজের নিয়ম। সবই চলছে করোনার নামে। এই সমস্ত কিছু চাপিয়ে দেওয়ার তথাকথিত বৈধতা আদায় করতে প্রধানমন্ত্রী একে জনগণের ‘ত্যাগের পরিচয়’ বলে প্রচারের হাতিয়ার করছেন। তাঁর বিগত ভাষণে প্রধানমন্ত্রী গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজোর মতো জনগণের জন্য জনগণকে সাত দফা কর্তব্য পালনে ‘সপ্তপদী’ হতে বললেন। কিন্তু রাষ্ট্রের করণীয় কর্তব্যগুলির বিষয়ে, কেন সেসব ক্ষেত্রে ব্যর্থতা থাকছে তার কোনও কৈফিয়ৎ দেওয়ার ধারকাছ মাড়ালেন না। উপরন্তু ত্রাতার নাম কেনার উদ্দেশ্য হাসিল করতে মোদী সরকার আত্মপ্রচারের স্বার্থে যা যা ধূর্তামি করে চলার সবই করে চলেছে। এই দেশ এই বিশ্ব দেখছে ভারতে করোনা আগ্রাসনের পরিস্থিতিতে এমনকি পাশবিক পুলিশীরাজ চালাচ্ছে মোদী জমানা।
তাই করোনার মোকাবিলায় অতন্দ্র সজাগতা-সতর্কতা রাখার পাশাপাশি মোদী সরকারের ওপর রেখে চলতে হবে অবিরাম চাপ। জারী থাকুক এই সংকল্প।