২৬ জুনের কর্মসূচী প্রসঙ্গে পার্টির রাজ্য সম্পাদক পার্থ ঘোষ এক প্রেস বিবৃতিতে জানান, আজ থেকে ৪৫ বছর আগে এই দিনে ভারতের গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল। সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারগুলি সহ সমস্ত নাগরিক অধিকার এক লহমায় কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। কোনো কোনো সমাজতত্ত্ববিদ তাই সংবিধানের বিভিন্ন ধারা-উপধারায় বর্ণিত অধিকারগুলি (Rights)-কে ‘নেগেটিভ রাইটস’ বলে উল্লেখ করেন। অর্থাৎ রাষ্ট্র এবং প্রশাসন কোন না কোন অজুহাতে সেই অধিকারগুলি ছিনিয়ে নিতে পারে। ’৭৫-এর জরুরি অবস্থা (এমার্জেন্সি)-তে যা চূড়ান্ত রূপ নিয়েছিল। আজ বিজেপি আরএসএস জমানায় আমরা প্রতিদিন তা প্রত্যক্ষ করছি। জর্জ ডিমিট্রভ বলেছিলেন, পূর্ববর্তী সরকারগুলির যাবতীয় জনবিরোধী কার্যকলাপ ও পদক্ষেপ ফ্যাসিস্ট শাসনের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে কাজে লাগানো হয়। আজ আমরা প্রতিদিন যে রাষ্ট্রীয় এবং অ-রাষ্ট্রীয় (নন-স্টেট) সন্ত্রাস দেখতে পাচ্ছি, তা সে ইউএপিএ লাগু করাই হোক, বা মব লিঞ্চিং হোক, গোটা ৭০ দশক জুড়ে, বিশেষ করে জরুরি অবস্থার দিনগুলিতে তার অজস্র উদাহরণ ছড়িয়ে আছে।
রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে এই কর্মসূচী প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি শহর এবং চা-বাগান হোক, কিংবা দক্ষিণবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগর ও ধুবুলিয়া হোক, বা উত্তর ২৪ পরগণার বারাসাত, বসিরহাট বা কলকাতা মহানগরী হোক, কিংবা বর্ধমান জেলা শহর, কালনা, হুগলীর চুঁচুড়া, কোন্নগর বা হাওড়া জেলার বালি হোক, বা চিত্তরঞ্জন লোকোমোটিভ গেটে হোক, জনগণকে সমাবেশিত করে গণতন্ত্র রক্ষার শপথ গ্রহণের পাশাপাশি জনগণের মৌলিক অধিকার — খাদ্য, কাজ, মজুরি — যেভাবে আক্রান্ত হয়ে চলেছে, সে সম্পর্কে জনগণকে সজাগ ও সক্রিয় হওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।
লকডাউন পর্যায়ে বন্ধ চটকল ও চা বাগানের শ্রমিকদের মজুরির জন্য প্রতিবাদ সংগঠিত করার পাশাপাশি আমফান বিপর্যয়ের পর ত্রাণ নিয়ে রাজ্যের শাসকদলের লাগামছাড়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। নিদারুণ কষ্ট ও যন্ত্রণা সহ্য করে পরিযায়ী শ্রমিকরা ঘরে ফিরলো, তাদের না আছে কাজ, না হলো কোভিড-১৯ টেস্ট। ফ্যাসিস্ট সরকার গোটা দেশটাকে উচ্ছন্নে পাঠাতে বদ্ধপরিকর। হাতে আছে শুধু দেশদ্রোহ আইন বা ইউএপিএ কালাকানুন, কিংবা আর্বান নকশাল বা দেশদ্রোহী বানানোর সিলমোহর। রাজ্যের সরকারও এ পথেই হাঁটতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। আজকের গণতন্ত্র বাঁচাও, সংবিধান বাঁচাও দিবস উপলক্ষে জনগণের লড়াই আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয় ২৬ জুনের কর্মসূচীতে।
এদিনের কর্মসূচীতে গণতন্ত্রের প্রশ্নের সাথে জুড়ে গেছিল পেট্রল-ডিজেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রতিবাদও। দার্জিলিং জেলায় শিলিগুড়িতে জেলা সম্পাদক অভিজিৎ মজুমদারের নেতৃত্বে বিভিন্ন লোকাল কমিটির নেতৃস্থানীয় কমরেডরা প্রতিবাদে সামিল হন। খড়িবাড়ি শচীন্দ্র চন্দ্র চা বাগানে এআইসিসিটিইউ-র পক্ষ থেকে চা শ্রমিকেরা কর্মসূচী সংগঠিত করেন বন্ধু বেক, যোসেফ ওরাঁও, রাজকুমার এক্কা, সুকনাথ ওরাঁও, সুমন্তী, তাশিলাল, দেওয়ান মার্ডি, রামসূরজ মার্ডি, লাল সিংহ, রামু সিংহ প্রমুখদের নেতৃত্বে।
কলকাতায় জেলা কমিটির ডাকে ঢাকুরিয়ায় অয়েল ইন্ডিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় দপ্তরের সামনে একটি বিক্ষোভ সংগঠিত হয় জেলা সম্পাদক অতনু চক্রবর্তীর নেতৃত্বে। মাইক ব্যবহার করেই এই বিক্ষোভ চলছিল। বিক্ষোভ চলাকালীন পুলিশ এসে বাধা দেয়, পুলিশকে কেন আগে জানানো হয়নি এই অভিযোগে। বিক্ষোভের সময়কাল সংক্ষিপ্ত করার সিদ্ধান্তে রফা হয়। এরপর ঢাকুরিয়া বাসস্ট্যাণ্ডে সভা হয় যেখানে বাসুদেব বোস, ইন্দ্রানী দত্ত, অতনু চক্রবর্তী, নীতিশ রায় ও মলয় তেওয়ারী সমগ্র প্রসঙ্গটি তুলে ধরেন। এই সভা থেকে হুল দিবসের বর্তমান তাৎপর্য তুলে ধরে ৩০ জুন সর্বত্র প্রতিবাদ দিবস পালনের ডাকও দেওয়া হয়। সন্ধ্যায় বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের পক্ষ থেকে গড়িয়া মোড়ে মাইক সহ পথসভা হয় যেখানে এআইপিএফ, গণসংস্কৃতি পরিষদ ও আইপোয়ার রাজ্য নেতৃত্ব উপস্থিত ছিলেন। পুলিশ এখানে বহুক্ষণ বাকবিতণ্ডা চালায় কর্মসূচী বন্ধ করার জন্য, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পিছু হটে। সন্ধ্যায় বেহালার পঞ্চাননতলাতেও পার্টির ডাকে বিক্ষোভসভা সংগঠিত হয়।
হুগলি জেলায় চুঁচুড়া পার্টি অফিসের সামনের রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে স্লোগান ও প্ল্যাকার্ডে প্রতিবাদ তোলেন উপস্থিত কমরেডগণ। এরপর জরুরি অবস্থার ইতিহাস এবং বর্তমানে অঘোষিত জরুরি অবস্থা এবং আমাদের কাজ নিয়ে আলোচনা সভা চলে অফিসের ভিতরে। আরএসএস সেদিন ইন্দিরা গান্ধির চাটুকারিতা করেছিল আর আজ সারা দেশেই সংঘ পরিবার অঘোষিত জরুরি অবস্থা জারী করেছে, সেদিনকার ঘৃণিত সিদ্ধার্থ শংকর রায়কে ছাপিয়ে যাচ্ছে অমিত-মোদি জুটি। ভারতবর্ষের মানুষ জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করে এক নতুন গণতান্ত্রিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ ভারতে প্রবেশ করেছিল, আজ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই নতুন ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে — হয় অন্ধকারময় ভারতবর্ষ নয় ফ্যাসিবাদকে পরাস্ত কড়ে নতুন চেতনায় সঞ্জাত দেশ। এই লড়ায়ের চ্যালেঞ্জ নিয়ে চুঁচুড়ার আলোচনাসভা শেষ হয়।
দঃ ২৪ পরগণায় পূজালী, বাখরাহাট বুড়িরপোল নতুন রাস্তার মোড় ও সাঁজুয়া নতুনরাস্তার মোড় — এই তিনটি স্থানে কর্মসূচী অনুষ্ঠিত হয় জেগুলির প্রতিটিতেই শ্রমিক কমরেডদের জমায়েত ছিল উল্লেখযোগ্য। পূজালী পোলে জেলা সম্পাদক কিশোর সরকার বক্তব্যু রাখার মাঝখানে পুলিশ এসে বাধা দেয়। অজুহাত কর্মসূচীর আগাম অনুমতি নেওয়া হয়নি। আজ যখন অঘোষিত জরুরি অবস্থার মাধ্যরমে কেন্দ্রীয় সরকার সমস্ত বিরোধী কন্ঠস্বরকে স্তব্ধ করতে চাইছে, তখন এরাজ্যে্ও তার প্রতিধ্বনি শুরু হচ্ছে। বিষ্ণুপুর-সাতগাছিয়া লোকাল কমিটির সম্পাদক নিখিলেশ পালের নেতৃত্বে অন্য দুটি স্থানের কর্মসূচীতে খালি গলায় বক্তব্য রাখা হয়। কিসান মহাসভার বর্ষিয়ান নেতা দিলীপ পাল সত্তরের দশকের জরুরি অবস্থার সাথে আজকের পরিস্থিতির তুলনা করেন। যুব নেতা শুভদীপ পাল বলেন লকডাউনে যখন দেশজুড়ে কোটি কোটি নতুন বেকার তৈরি হচ্ছে তখন কেন্দ্রের মোদী সরকার বড়লোকদের ৬৮,০০০ কোটি টাকা ঋণছাড় দেয়, প্রধানমন্ত্রী গালভরা ভাষণ দিয়ে চলেছেন কিন্তু ঘোষণা সত্বেও নির্মাণ শ্রমিকরা তাদের হকের টাকা পেলনা।
বর্ধমান শহরের কার্জন গেটের সামনে কুনাল বক্সী ও শ্রীকান্ত রাণার নেতৃত্বে প্রতিবাদ কর্মসূচী সংগঠিত হয় শ্লোগান ও প্ল্যাকার্ডে দাবিসমূহ তুলে ধরে। বহরমপুর শহরের টেক্সটাইল মোড়ে জেলা সম্পাদক রাজীব রায়ের নেতৃত্বে প্রতিবাদ সংগঠিত হয়। হাওড়া জেলার বালিবাজার হরিসভার সামনে সমস্ত রাজনৈতিক কর্মীদের মুক্তির দাবীর সঙ্গেই দাবী ওঠে পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ করতে হবে। চীন-ভারত বিবাদ নিয়েও মোদি সরকারের স্ববিরোধী এবং ধোঁয়াশাপূর্ণ অবস্থানের বিরোধীতা করা হয়, বক্তব্য রাখেন নীলাশিস বসু।
উত্তর ২৪ পরগণার বারাসাত শহরে আনন্দময়ীর সামনে এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তব্য রাখেন, শিব শংকর গুহ, অজয় বসাক, জেলা সম্পাদক সুব্রত সেনগুপ্ত, নির্মল ঘোষ, সভায় গণসঙ্গীত পরিবেশন করেন বাবুনী মজুমদার। উপস্থিত ছিলেন দেশব্রতীর সম্পাদক অনিমেষ চক্রবর্তী ও রাজ্য কমিটির সদস্যা জয়শ্রী দাস। ঐ দিন বসিরহাট টাউন হলের সামনেও বসিরহাট আঞ্চলিক কমিটির উদ্যোগে জেলা কমিটির সদস্য দেবব্রত বিশ্বাসের নেতৃত্বে জরুরি অবস্থা বিরোধী প্রতিবাদ দিবস পালিত হয়।