জম্মু ও কাশ্মীরে চালু হল রাষ্ট্রপতি শাসন। ভূস্বর্গ মুহূর্তে ভরে গেল ভারী বুট, বুলেটের আতঙ্কে। ৩৫(ক) বিলুপ্তির মাধ্যমে প্রশ্ন চিহ্নের মুখে ফেলা হল কাশ্মীরের ভূমিসন্তানদের বিশেষ অধিকারগুলিকে। ৩৭০ ধারা অবলুপ্তির মাধ্যমে সাংবিধানিকভাবে কেড়ে নেওয়া হল কাশ্মীরের স্বশাসনের অধিকার। ভেঙ্গে দেওয়া হল জম্মু ও কাশ্মীরকে। তৈরি হল দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত রাজ্য।
বৃহত্তম গণতন্ত্র বোধহয় একেই বলে। এই কি শেষ তবে? কাশ্মীরের স্বতন্ত্রতা ও স্বাধীনতার উপর শেষ পেরেকটা বোধহয় বাকি ছিল। ৩১ মার্চ, ২০২০ জারি হল কাশ্মীরে স্থায়ি বাসিন্দা হিসাবে স্বীকৃতির শংসাপত্র পাওয়ার অধিকারের নতুন আইন। কাশ্মীরে এই নতুন ডোমিসাইল নীতি কাশ্মীরীদের অধিকার হরণের বৃত্তকে সম্পূর্ণ করল। শুরু হল কাশ্মীরের জনমানচিত্র বদলে ফেলার পদক্ষেপ।
সালটা ২০১৯, ইলেকশনের প্রচারেও কাশ্মীরের গলায় ছুরি বসানোর কসুর করেননি মোদীজি। এবং সেই প্রচারের সময় দেওয়া কথা অনুযায়ীই আগস্টে তুলে দিয়েছিলেন ৩৭০ ধারা। কিন্তু তবু গলার কাঁটা থেকেই যাচ্ছিল, করণ কাশ্মীর মুসলিম প্রধান রাজ্যই থেকে যাচ্ছে। ৩৭০ এবং ৩৫(ক)-এর বিলুপ্তির পরও কাশ্মীরির সংখ্যাগুরু তো মুসলমানই থেকৃ যাচ্ছে! কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছিল সাম্প্রদায়িক মোদী সরকার এবং তার পৃষ্ঠপোষক আরএসএস-এর। এতটা সময় হয়ত লাগতও না এই অর্ডার আনতে। কিন্তু দেশজোড়া শয়ে শয়ে শাহিনবাগ; এনআরসি, এনপিআর, সিএএ-এর বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন রাজপথের জনপ্লাবন – বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেই পথে। আশীর্বাদস্বরূপ এল করোনা ভাইরাস। সবার গৃহবন্দি হওয়ার সুযোগ নিয়ে চুপিসাড়ে ৩১ মার্চ কাশ্মীরের কফিনে শেষ পেরেক পোঁতার কাজটা শেষ হল, যে অর্ডার কাশ্মীরের উপর চাপিয়ে দেবে কেন্দ্রীয় নিয়মনীতি। কারণ করোনার সুবাদে প্রতিবাদ তো দূর কেউ বাইরে বেরোলেও তাঁকে সামলানোর জন্যে সরকারি লেঠেল বাহিনী তো আছে।
কী আছে এই অর্ডারে? এই অর্ডার অনুযায়ী শুধুমাত্র জম্মু ও কাশ্মীরের স্থায়ী বাসিন্দারাই নয়, এখন থেকে যারা ১৫ বছর কাশ্মীরে থেকেছেন বা ৭বছর বা তার বেশি সময় ধরে কাশ্মীরে থেকে পড়াশোনা করেছেন বা দশম বা দ্বাদশ শ্রেণী পাশ করেছেন বা কেন্দ্রীয় সরকারের সমস্ত রকম কর্মচারি যারা ১০ বছরের বেশি সময় ধরে জম্মু ও কাশ্মীরে সার্ভিস দিচ্ছেন, এমনকি তাদের সমস্ত সন্তানসন্ততিরাও বা যে সমস্ত অভিবাসীদের নাম জম্মু ও কাশ্মীরের কমিশনারের কাছে রিলিফ ও পুনর্বাসনের জন্যে নথিভুক্ত আছেন – এরা সবাই কাশ্মীরের বাসিন্দা শংসাপত্র পেতে পারেন।
আপাতভাবে দেখতে গেলে একটু দেশপ্রেম দেশপ্রেম ভাব জাগতে পারে কিন্তু এই অর্ডারের ফল হবে বিধ্বংসী। কারণ এই অর্ডারের ফলে বাইরের বহু ব্যক্তি এখন জম্মু কাশ্মীরের জমির মালিক হতে পারেন এবং স্থায়ী বাসিন্দার মতো থাকতে ও সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকবে কাশ্মীরের জনসংখ্যা। এবং ধীরে ধীরে সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে কাশ্মীরিরা তথা কাশ্মীরের ভূমিসন্তানেরা। ফলত কাশ্মীরীদের মতামতও হয়ে পড়বে সংখ্যালঘুর মতো যা বাধ্য করবে গণভোটের ফলকে কাশ্মীরের বাইরের ভারতেরই পক্ষে যেতে। কাশ্মীর আর কাশ্মীরীদের থাকবে না। সমস্ত কর্পোরেট তথা ইন্ডিয়ান কোম্পানিগুলি লোলুপের মতো ঝাঁপিয়ে পড়বে ভূস্বর্গের জল জঙ্গল জমিনকে কব্জা করতে। নাহ এখানেই শেষ নয়। কাশ্মীরের ক্ষেত্রে ন্যুনতম গ্রেড ফোর অব্দি সরকারি চাকরি সংরক্ষিত ছিল কাশ্মীরীদের জন্যে। সেটুকুও ছিনিয়ে নেবে এই অর্ডার। এবং মজার বিষয় হল এতকিছু সত্ত্বেও টুঁ-শব্দটি করতে পারবেন না কাশ্মীরীরা। কারণ সরকারিভাবেই দেওয়া হয়েছে হুমকি যে এই অর্ডারের বিরোধিতা করার ফল ভালো হবে না।
আশ্চর্যজনকভাবে হিমাচল প্রদেশ বা নাগাল্যান্ডেও কিন্তু জমি কেনার অধিকারে আরোপ রয়েছে ঠিক যেমনটা কাশ্মীরে ছিল। ওই রাজ্যগুলিতে কিন্তু রক্তচক্ষুর প্রশ্ন আসে না কখনই। হিমাচলপ্রদেশে রয়েছে বিজেপি সরকার আর নাগাল্যান্ডের সরকার বিজেপি সমর্থিত। সুতরাং কাশ্মীরের ক্ষেত্রে মুসলিম-বিদ্বেষজনিত বর্বরতাই চক্ষুশূলের কারণ নয় কি?
এই অর্ডার কাশ্মীরের পক্ষে এতটাই অবমাননাকর যে খোদ বিজেপিধন্য ‘জম্মু ও কাশ্মীর আপনি পার্টির’ সভাপতি আলতাফ বুখারিও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে ৩১ অক্টোবর ২০১৯-এর পর কাশ্মীরীরা স্বাধিকার ও চাকরি সংক্রান্ত প্রশ্নে যেটুকু আশ্বাস মোদি সরকারের উপর রেখেছিল তাও গলা টিপে হত্যা করা হল এই ডোমিসাইল অর্ডারের মাধ্যমে। গত ১৫ই মার্চ কাশ্মীরের সমস্ত রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহের সঙ্গে দেখা করতে যান। কিন্তু তাঁদের জানানো হয় যে, জম্মু ও কাশ্মীরের বাসিন্দাদের অধিকার রক্ষার্থেই নাকি এই সব করা হয়েছে। সুতরাং, জোর করে কাশ্মীরের জনমানচিত্র বদলে দিয়ে সেটেলার কলোনি বানানো এবং আত্মনির্ধারণের অধিকার কেড়ে নিয়ে একপ্রকার ডিটেনশনে পাঠানো – সবটাই করা হচ্ছে ভীষণ পরিকল্পিতভাবে যা সরাসরি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের বিরোধী। সমস্ত আন্তর্জাতিক স্তরে এ নিয়ে এখনই আওয়াজ ওঠা জরুরি। আওয়াজ উঠুক মানবতার পক্ষে, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পক্ষে।