সাঁওতাল বিদ্রোহের প্রবাদপ্রতীম নেতা ছিলেন সিধো মুর্মু ও তাঁর ভাই কানহু মুর্মু এবং আরো দুই ভাই চাঁদ ও ভৈরো। হুল সম্পর্কিত আলোচনায় এক নিঃশ্বাসে এই চারটি নাম উচ্চারিত হতে আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনেছি। কিন্তু দুই বোন ফুলো ও ঝান এযাবৎ কাল অনেকটাই বিস্মৃত ও অকথিত ছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে নারীবাদী চেতনার উদ্ভাস ঘটায় সাঁওতাল বিদ্রোহ সহ সমস্ত ঐতিহাসিক আন্দোলনেই মেয়েদের নেতৃত্ব ও অংশিদারিত্ব বা ভূমিকা সম্পর্কে খোঁজখবর গবেষণা ও আলোচনা বেড়েছে। কিন্তু দেড় শতাব্দী আগের এই মহান সাঁওতাল বিদ্রোহে মেয়েদের ভূমিকা সম্পর্কে তথ্য তালাশ এক দুরূহ বিষয়। একে তো মূল ধারার ইতিহাস চর্চায় আদিবাসী সাঁওতাল সমাজের নিজেদের কথা নকশালবাড়ি অভ্যুত্থানের আগে তেমন জায়গা করে নিতে পারেনি, তদুপরি সমাজে মেয়েরা তো আরেক ধাপ প্রান্তিক, বা বলা ভালো ইতিহাসের অপর পারের এক অভিব্যক্তিহীন সত্ত্বা হিসেবে ব্রাত্য। ফলত ফুলো ও ঝান সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায়নি, এবং সাঁওতাল বিদ্রোহ ‘হুল’ বা অর্ধশতাব্দী পরের মুণ্ডা বিদ্রোহ ‘উলগুলান’-এ যে আরও অসংখ্য মেয়েরা প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে প্রাণ দিয়েছিলেন তাঁদের নামও তেমন জানা যায়নি। ঝাড়খণ্ড থেকে প্রকাশিত ‘উলগুলান কি ঔরতেঁ’ পুস্তিকায় হুলের (১৮৫৫-৫৬) নেত্রী ফুলো ঝান ছাড়াও উলগুলানের (১৮৯০-১৯০০) ঔরতদের কিছু নাম — মাকি, টিগি, নাগি, লেম্বু, সালি, চাম্পি — সামনে এসেছে। ব্রিটিশ সেপাই ও জমিদারের লেঠেলদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সশস্ত্র সংঘাতে মেয়েরাও যে সরাসরি অংশ নিয়েছিল, ফ্রন্টলাইনে যোদ্ধাদের হাতে অস্ত্র সরবরাহ হোক বা তীর-কাঁড় চালানো — তা খুব স্বাভাবিক।
কিছু কিছু গবেষণা থেকে জানা যায় যে ফুলো ও ঝান ব্রিটিশ সেপাইদের ক্যাম্পে দুঃসাহসিক অভিযান চালিয়েছিলেন। যুদ্ধের এক সংকটপূর্ণ সময়ে রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে কুড়ুল হাতে তাঁরা শত্রুসেনার শিবিরে হানা দিয়ে ২১ জনকে খতম করে আসেন যা বিদ্রোহী সাথিদের মনোবল ফিরিয়ে এনে উজ্জীবিত করে। সাধারণভাবে আদিবাসী সমাজের আভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে যৌথতা ও সহমত্য তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়ে থাকে এবং ঐকমত্য তৈরীর প্রক্রিয়ায় মেয়েদের ভূমিকা স্বাভাবিক মর্যাদায় ক্রিয়াশীল থাকে। হুল বিদ্রোহে সিধু কানহুদের পাশাপাশি ফুলো ঝানরাও সমান মর্যাদায় নেতৃত্বের ভূমিকা ও দায়িত্ব পালন করেছেন এবং শহীদ হয়েছেন। ব্রিটিশ সেপাইরা নৃশংস ধর্ষণ-অত্যাচার চালিয়ে ফুলো মুর্মুকে হত্যা করেছিল এবং রেললাইনের ধারে মৃতদেহ ছুঁড়ে ফেলেছিল বলে জানা যায়। ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারতে সামাজিক অত্যাচার বহু যুগের পুরনো, তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধও ততটাই পুরনো। ফলত ইতিহাসের ‘প্রথম’ খুঁজতে যাওয়া অর্থহীন। কিন্তু ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার সংগ্রামের প্রথম শহীদ নেত্রী হিসেবে ফুলো ও ঝান নিশ্চয় স্বমহিমায় স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বর্তমান সময়ে ভারতের নারীবাদী সাম্যবাদী ইতিহাস গবেষকেরা নিশ্চয় হুল-উলগুলান-ইনকিলাবের ঔরতদের সম্পর্কে আরও গভীর অনুসন্ধান চালাবেন।