লকডাউনে সৃজন মননের চর্চা – ঘরবন্দির গ্রন্থপাঠ

পাঠ্য বইয়ের বাইরে তেমন পড়িনি কিছুই দেখতে দেখতে এসে গেল ৬৬’র খাদ্য আন্দোলন। বামপন্থী আন্দোলনে বিশ্বাস তৈরি হল। সুকান্তের কবিতা পড়ি। পথের দাবি পড়া হয়েছে। ওই পর্যন্ত। ....

h18

পাঠ্য বইয়ের বাইরে তেমন পড়িনি কিছুই দেখতে দেখতে এসে গেল ৬৬’র খাদ্য আন্দোলন। বামপন্থী আন্দোলনে বিশ্বাস তৈরি হল। সুকান্তের কবিতা পড়ি। পথের দাবি পড়া হয়েছে। ওই পর্যন্ত। তাতেই ‘যাহা আসে কই মুখে’। বাবা বললেন, “খুব তো বড় বড় কথা বল আর বিদ্যে ফলাও। হাসুবানু পড়েছ?” কথাটা মনের মধ্যে গেঁথে গিয়েছিল। কিন্ত এসে গেল নকশালবাড়ি। সামান্য যা পড়াশুনো তার পাট চুকিয়ে উত্তাল মহাজীবনের স্রোতে ভেসে গেলাম।    

অনেক কাল কেটে গেছে। ইট পূজো-বাবরি মসজিদ পেরিয়ে ফ্যাসিবাদ এখন পূর্ণ রাজ্য পাটে। দেশ বিভাগের ক্ষতচিহ্ন উসকে সঙ্ঘ পরিবার প্রতিটি প্রশ্নের সঙ্গে জুড়ে দিচ্ছে মুসলিম বিদ্বেষ। এমনকি করোনা ভাইরাসের জন্যও কিনা মুসলমানরাই দায়ী! লকডাউনের সময় মনে পড়ে গেল হাসুবানুর কথা। প্রবোধ কুমার সান্যালের এই উপন্যাস তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার সে দেশে নিষিদ্ধ করে দেয়। পড়তেই হবে বইটি। কিন্ত পাব কোথায়? আমার ‘মুশকিল আসান’ নীলাশিস বইটির পিডিএফ ভার্সন পাঠিয়ে দিল। ৩৫০ পৃষ্ঠার বই, ২৫ বৈশাখ, ১৩৫৯ প্রথম প্রকাশ।    

বইয়ের গল্পে কী এমন আছে যে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের শাসকদের তা মোটেই মনপসন্দ হয়নি? পড়ে দেখলাম, আগাগোড়া উপন্যাসটিতে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির জন্য লেখকের আর্তি। হাসুবানু (বলা বাহুল্য উপন্যাসের মূল চরিত্র) শৈশবেই মা-বাবাকে হারায় ও এক হিন্দু জমিদারের আশ্রয়ে বেড়ে ওঠে। হাসনুর বাবা জমিদারের বিশ্বস্ত কর্মচারি ছিলেন আর সে বিশ্বাসের দাম চোকাতে জমিদার কোনো কার্পণ্য করেননি। নিজের বাড়িতে হাসনুকে রেখেছেন, নিজের মেয়ের সঙ্গেই সমান আদর ও যত্নে তার লেখা-পড়ার ব্যবস্থা করেছেন। ইংরেজি, উর্দু, সংস্কৃত-এ সবকটি ভাষাই হাসনুর আয়ত্তে। মনে প্রাণে সে ধর্মনিরপেক্ষ। ইসলাম ধর্মের রীতি মেনে তার দু-দু’বার বিয়ে হয়।কিন্ত কোনো বারই তার ‘ঘর বাঁধা’ হয়ে ওঠেনি। মুসলিম সমাজে পুরুষদের আধিপত্য ও নারীদের অবমাননা হাসুবানু মানতে চায়নি। কিন্ত সে শুধু মুসলিমদের পুরুষতান্ত্রিকতার বিরোধী এমন নয়, সে সামগ্রিকভাবেই পুরুষতন্ত্রের বিরোধী। দাঙ্গা, গৃহদাহের মধ্যদিয়ে দেশ ভাগ হয়ে গেল। বহু পথ পেরিয়ে হাসুবানু ভারতেও এসেছে। ছোটবেলার এক হিন্দু বন্ধুর সঙ্গে তার আবার দেখা হয়েছে। দুজনে একত্রে বেরিয়েছে – একে অপরের কমরেড হয়ে। কিন্ত ভারত (অর্থাৎ বৃহত্তর হিন্দু সমাজ) তাকে সন্দেহের চোখে দেখেছে। সে তার কমরেডকে নিয়ে ফিরে গেছে পূর্ব পাকিস্তানে। কিন্তু পাকিস্তান তাকে ভারতের গুপ্তচর সন্দেহে বন্দি (অন্তরীণ) করেছে এবং অত্যাচারে উন্মাদ হয়ে তার মৃত্যু ঘটেছে। এই কাহিনী থেকে তদানীন্তন পাকিস্তানের শাসকদের উষ্মার কারণ বোঝা যায়। কিন্ত এখন বিজেপি যদি পশ্চিমবাংলায় ক্ষমতায় আসে তাহলে এবার হয়ত হাসুবানু এপাড় বাংলাতেই নিষিদ্ধ হবে। কেন না প্রবোধবাবু বইটি উৎসর্গ করেছেন জনাব লিয়াকৎ হোসেন ও জনাব সোফিয়ার রহমানকে – প্রথমজন এক ধর্মনিরপেক্ষ, দেশবৎসল ব্যক্তি, দ্বিতীয়জন এক তরুণ আইনজীবী।
     
বইটি দেশভাগের কোনো ঐতিহাসিক দলিল নয়। অমিতাভ ঘোষের ‘হাঙ্গরি টাইডের’ মতো গল্পের ভাঁজে ভাঁজে তথ্য ও ইতিহাসের বিশেষ বিশেষ দলিলও যুক্ত হয়নি। কিন্ত হাসুবানুর জবানিতে দেশভাগের বিয়োগব্যথা বড় আবেগের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে – যেখানে দুই বাংলার সাধারণ জনগণের দুর্দশার ছবি চুঁইয়ে চুঁইয়ে ঝরে পড়েছে। হাসনু অবিভক্ত বৃহত্তর ভারতের মানচিত্র আঁকেনি। সে চেয়েছে দুই বাংলার পুনর্মিলন – যেখানে ‘আমিনা, ফকিরুদ্দিন, ওই হাবু মোড়ল আর দাশু সেখদের’ মানুষের মতো মানুষ করে তোলা হবে। সে স্বপ্ন দেখেছে : বিরাট পুরুষকে চাই, পার সঙ্গে চাই বিরাটতর আইডিয়া। জীবনমৃত্যুর বিভীষিকার ভিতর দিয়ে আসবে সংহতি, যাকে বলে সিন্থেসিস। হাসুবানু ভাবালুতাকে পেরিয়ে শক্ত জমিতে পা রাখতে পারেনি। কী জানি, আজকের হাসনু ও হিরণরা (হাসনুর কমরেড) তা পারবে কিনা!

banu

 

Published on 18 April, 2020