বেসরকারী হাসপাতালকে আনা হোকসরকারী নিয়ন্ত্রণে

সারা দেশেই করোনার সংক্রমণ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এ রাজ্যেও আক্রান্তের সংখ্যা ১৬ হাজারের দোরগোড়ায়। নিত্যদিন প্রায় ৫,০০০ আক্রান্তের সংখ্যা এখন হয়ে উঠেছে নতুন এক স্বাভাবিক। নতুন নতুন ‘সুপার স্পেশালিটি’ হাসপাতাল ...

ede

সারা দেশেই করোনার সংক্রমণ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এ রাজ্যেও আক্রান্তের সংখ্যা ১৬ হাজারের দোরগোড়ায়। নিত্যদিন প্রায় ৫,০০০ আক্রান্তের সংখ্যা এখন হয়ে উঠেছে নতুন এক স্বাভাবিক। নতুন নতুন ‘সুপার স্পেশালিটি’ হাসপাতাল গড়ে ওঠার কর্মকাণ্ডের কথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এক সময় নিজের সাফল্য হিসেবে ব্যাপক বিজ্ঞাপিত করেছিলেন। তার কী ফল এখন পাচ্ছে রাজ্যবাসী! আছে সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, কিন্তু নেই রোগাক্রান্ত মানুষের চিকিৎসা। গোটা রাজ্যে এখন চিকিৎসা পরিকাঠামোটাই করোনা-কেন্দ্রীক হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন হাসপাতালের বহির্বিভাগ এখনো বন্ধ। তালা ঝুলছে চিকিৎসকদের চেম্বারে। আর, প্রধানমন্ত্রীর উপদেশ শিরোধার্য করে, সংকটকে ‘সুযোগে’ পরিণত করতে বেসরকারী হাসপাতালগুলো অতিমারীতে অতিমুনাফা কামানোর নানা সুবর্ণ পন্থা উদ্ভাবন করতে মাঠে নেমে পড়েছে।

আমাদের রাজ্যে এখন সরকারী হাসপাতালের তুলনায় শয্যা সংখ্যার বিচারে বেসরকারী হাসপাতালগুলো ঢের এগিয়ে। যে অতিমারীর কবলে এখন আছি আমরা এবং আগামী দিনগুলোতে যার প্রকোপ কল্পনাতীতভাবে বিস্তার লাভ করবে বলে বেশ কিছু রিপোর্ট জানাচ্ছে, তা কেবলমাত্র সরকারী হাসপাতালের পরিকাঠামো দিয়ে মোকাবিলা করা অসম্ভব। অভূতপূর্ব এই স্বাস্থ্য সংকটকে যুঝতে স্পেন সর্বপ্রথম সমস্ত বেসরকারী হাসপাতাল ও পরিকাঠামোকে সরকারী নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। আমাদের দেশেও কেরল, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান প্রভৃতি রাজ্য জাতীয় বিপর্যয় আইন বলে বেসরকারী স্বাস্থ্য পরিষেবাকে নিয়ে আসে নিজের নিয়ন্ত্রণে। অথচ, এই রাজ্যে এখনও বেসরকারী হাসপাতালগুলোকে বিলি করা হচ্ছে কিছু পরামর্শ আর হাজারো ফাঁক ফোকর যুক্ত সরকারী বিজ্ঞপ্তি। রাজস্থান সরকার ভেন্টিলেটর সহ আইসিইউ-র খরচ ধার্য করেছে দৈনিক সর্বাধিক চার হাজার টাকা। এদিকে, সদ্য জন্ম নেওয়া তেলেঙ্গানা রাজ্য, বা পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের ক্ষমতা ভোগ করা থেকে অনেক দূরে থাকা দিল্লিও বেসরকারী হাসপাতালের জন্য প্রতিদিন করোনা রোগীর খরচের ঊর্দ্ধসীমা বেঁধে দেওয়ার মুরোদ দেখাতে পারে, যা পারলোনা আমাদের বহু বিজ্ঞাপিত ‘রাফ অ্যান্ড টাফ’ মুখ্যমন্ত্রী। সংবাদে প্রকাশ, দশ বছর ধরে একজন রোগী যে বেসরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা করাচ্ছেন, ক্রনিক ডায়ালিসিসের সেই রোগীকে করোনার অজুহাতে ঢুকতে দেওয়া হয় না, এবং ৪৫ মিনিট পর নিজের গাড়িতে অপেক্ষারত রোগীর মৃত্যু ঘটে। গুণমানের নিরিখে এক একটা পিপিই-র খরচ ৩০০ থেকে ৮০০ টাকার বেশি নয়। কিন্তু আদায় করা হচ্ছে ৩,৫০০ টাকা। একজন সাফাই কর্মী যে পিপিই পরে একাধিক রোগীকে পরিষেবা দেয়, তার ব্যবহৃত পিপিই-র বিল আদায় করা হচ্ছে প্রত্যেক রোগীর কাছ থেকে! কিছু বেসরকারী হাসপাতালে কোভিড১৯-এর চিকিৎসা খরচ ১০ লাখের কাছাকাছি গিয়ে ঠেকেছে!! দেখা যাচ্ছে, লকডাউন চলাকালীন বেশ কিছু অত্যাবশ্যক ওষুধের টান পড়ছে, এমনকি একটা সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ লকডাউনে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত বেশ কিছু পরিবার খরচ বাঁচাতে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবিটিসের ওষুধ কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। অতিমারীর এই আপৎকালীন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে মুনাফা নয় — আক্রান্তের  যথাযথ চিকিৎসা তথা জীবনের অধিকারই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে থাকবে, আর রাজ্য সরকারকে সেটাই সুনিশ্চিত করতে হবে। বেসরকারী হাসপাতালকে এখন আনতে হবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে। বিপর্যয় মোকাবিলা আইনে সরকারকে এই অধিকার দেওয়া আছে।

koro

 

মহামারী বিপর্যয় আইনের রক্তচক্ষু দেখিয়ে রাজ্যে গণতান্ত্রিক প্রশ্ন ও অধিকারকে দমন করার কৌশল নেওয়া হচ্ছে, সংকুচিত করা হচ্ছে ন্যায় ও অধিকার আন্দোলনের চিরজাগ্রত পরিসরকে। অথচ যে উদ্দেশ্যে এই আইনে সরকারকে আপৎকালীন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে — যথাযথ চিকিৎসা ও মানুষের জীবন রক্ষা — সেই উদ্দেশ্যে এই আইনি ক্ষমতা কেন ব্যবহৃত হচ্ছে না? বেসরকারী সংস্থার হাসপাতাল, বেসরকারী নিয়োগ কর্তা, বেসরকারী স্কুল বা সিইএসসি-র মতো সংস্থাগুলোর চৌকাঠে এসে কেন ঠুঁটো হয়ে পড়ছে মহামারী বিপর্যয় আইনের শক্ত হাত? এইসব মুনাফালোলুপ মালিকদের একের পর এক জনবিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে রাজ্য সরকার আজ পর্যন্ত একটাও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিল না। সিইএসসি অন্যায়ভাবে বাড়িয়ে চলেছে বিদ্যুত মাশুল, অথচ রাজ্য সরকার নিরুচ্চার। নানা ছুতোনাতায় বেসরকারী স্কুলগুলো অন্যায্য ফি বৃদ্ধি করছে, তা নিয়ে আজ পর্যন্ত নেওয়া হলো না একটাও পদক্ষেপ। লকডাউন পর্যায়ে ছাঁটাই না করা, সেই সময়কার মজুরি দেওয়ার যে পরামর্শ বিচারবিভাগের পক্ষ থেকে ‘বিপর্যয় মোকাবিলা আইন’ অনুযায়ী করা হয়েছিল, মালিকপক্ষ  তাকে বিদ্রুপ করে বুড়ো আঙুল দেখালো। ত্রাণের ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতির বিরুদ্ধেই হোক, বা, লকডাউন পর্যায়ে মজুরির দাবিতে, অথবা বিদ্যুৎ মাশুল কমানোর দাবিতে সোচ্চার বিক্ষোভ — মানুষের ন্যায্য প্রশ্নগুলিকে দমন করতে মুখিয়ে রয়েছে রাজ্য সরকার। আর পরিহাসের বিষয় এটাই যে, গণতান্ত্রিক প্রশ্ন ও আকাঙ্খাকে দমন করার এই সমস্ত চরম পদক্ষেপের মাধ্যমে টিএমসি এরাজ্যে ফ্যাসিবাদী বিজেপির জমি তৈরি করে দিচ্ছে।

গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে প্রসারিত করেই এই বিপদকে রোখা সম্ভব।

Published on 03 July, 2020