জন্মশতবর্ষ স্পর্শ করার ৮৩ দিন আগে ২৯ জুন ২০২০-তে জীবনাবসান ঘটল এককালের প্রসিদ্ধ শ্রমিক নেতা জলি মোহন কলের। প্রাক-স্বাধীনতা আমলে নেতৃত্বদায়ী শেষ ট্রেড ইউনিয়ন নেতা ছিলেন জলি কল। চব্বিশ বছর বয়সে ১৯৪৭ সালে কলকাতার বন্দর শ্রমিকদের ঐতিহাসিক ৮৭ দিনের ধর্মঘট পরিচালনায় তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ক্যালকাটা পোর্ট ট্রাস্ট এমপ্লইয়িজ অ্যাসোসিয়েশ্যনের সম্পাদক । ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক হুকমতে ক্যালকাটা পোর্ট ট্রাস্টের বন্দর শ্রমিকদের মাসিক বেতন ছিল মাত্র ১৫ টাকা। বেতন বৃদ্ধির দাবিতে ফেব্রুয়ারী মাসে শুরু হয় সেই ধর্মঘট। পোর্ট ট্রাস্টের ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ শেষ অব্দি মজুরি বাড়াতে সম্মত হয়। সেই সময় ঐ ইউনিয়ন ছিল কলকাতা অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ইউনিয়নের মধ্যে অন্যতম।শ্রমিকদের ৬০ শতাংশের বেশি ছিলেন মুসলিম। সেই ধর্মঘটের ছ’মাস আগে সারা ভারত মুসলিম লিগের সভাপতি মহম্মদ আলি জিন্নার ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে-র (১৬ অগাস্ট ১৯৪৬) দেশ জুড়ে নারকীয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সূত্রপাত হয়, যার জেরে ঘটে ইতিহাসে মহাকলঙ্ক ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’। কিন্তু বন্দর শ্রমিকদের ঐতিহাসিক ৮৭ দিনের ধর্মঘটে সেই কলুষের লেশমাত্র ছিল না। জলি কল (আমাদের সবার প্রিয় জলিদা) ১৯৯৭ সালের এপিল মাসে বন্দর শ্রমিকদের সেই পথদর্শী ও ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা নথিবদ্ধ করে গেছেন এক সাক্ষাৎকারে। সেই সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন ব্রিটেন-নিবাসী অ্যান্ড্রু হোয়াইটহেড। লন্ডনের সোয়াস (স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড অ্যাফ্রিকান স্টাডিজ) বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাফেজখানায় সেই সাক্ষাৎকার সুরক্ষিত আছে।
জলিদার ট্রেড ইউনিয়ন জীবনের ইতি ১৯৬৩ সালের জানুয়ারী মাসে,যখন তিনি ও তাঁর স্ত্রী কিংবদন্তীপ্রতিম কমিউনিস্ট নেত্রী মনিকুন্তলা সেন অবিভক্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) সদস্যপদ ত্যাগ করেন। চীন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষের পরে পার্টির আন্তঃপার্টি সংগ্রাম সাংগঠনিক ক্ষেত্রে এক নিম্ন মানের কোন্দল ও কুৎসায় পর্যবসিত। জলিদা ও মনিদির বিরুদ্ধে লাগামহীন কুৎসা চাউর হয়। তাঁরা সেই পরিস্থিতিতে পার্টি ও সংশ্লিষ্ট গণ সংগঠনগুলির দায়িত্ব ত্যাগ করেন।
পার্টি ছাড়লেও তাঁর শ্রমিক শ্রেণীর প্রতি জলিদার ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা যে কমেনি, অ্যান্ড্রু হোয়াইটহেডকে দেওয়া ১৯৯৭ সালে সাক্ষাৎকার তার নিদর্শন। তিনি ১৯৪১ সালে সিপিআই সদস্য হ’ন, তখন পার্টি নিষিদ্ধ। নেমে পড়েন শ্রমিক আন্দোলনে। কলকাতা জেলা কমিটির সদস্য নির্বাচিত হ’ন ১৯৪৩ সালে। পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে (কলকাতা ১৯৪৮) রণদিভে আমলের হঠকারী লাইন ও তার জেরে পার্টি আবার নিষিদ্ধ (১৯৪৯) হলে তিনি পার্টির খিদিরপুর কমিউন থেকে গ্রেপ্তার হ’ন। সেখান থেকে আলিপুর জেলে, যেখানে ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ কারারুদ্ধ ছিলেন, যেখানে ছিলেন মুজফফর আহমেদ, চারু মজুমদার, সুশীতল রায়চৌধুরী প্রভৃতিও।
পার্টির উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হলে জলিদা ও সবাই ছাড়া পান। তিনি ১৯৫২ সালে সিপিআই-র কলকাতা জেলা কমিটি সম্পাদক নির্বাচিত হ’ন, ১৯৫৮ সালে পার্টির পঞ্চম কংগ্রেসে (অমৃতসর, ১৯৫৮) জাতীয় পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হ’ন, ১৯৬৩-র জানুয়ারী মাস অব্দি সেই পদে ছিলেন।
পার্ক সার্কাসে কড়েয়া সরকারী আবাসনে জলিদার দু-কামরার আবাসনে অনেক বার গেছি। আমাদের একটা আলাপ চক্র তাঁকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল। সেখানে আসতেন সুনন্দ কিশোর দত্ত রায়, অদিতি রায় ঘটক, তপন বন্দ্যোপাধ্যায়, নিত্যানন্দ ঘোষ প্রভৃতি। জলিদা ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের এক জীবন্ত বিশ্বকোষ।
- শঙ্কর রায়