মোদীর অঘোষিত জরুরি অবস্থার সময় ইন্দিরা গান্ধীর জারি করা জরুরি অবস্থাকে স্মরণ

১৯৭৫ সালের ২৬ জুন ইন্দিরা গান্ধী সরকার কুখ্যাত জরুরি অবস্থা জারি করে। বিরোধী পক্ষের নেতৃবৃন্দ এবং সমাজ আন্দোলনের কর্মীদের জেলে পোরা হয়, নাগরিক স্বাধীনতাকে মুলতুবি করে রাখা হয় (দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হল, ...

ddar

১৯৭৫ সালের ২৬ জুন ইন্দিরা গান্ধী সরকার কুখ্যাত জরুরি অবস্থা জারি করে। বিরোধী পক্ষের নেতৃবৃন্দ এবং সমাজ আন্দোলনের কর্মীদের জেলে পোরা হয়, নাগরিক স্বাধীনতাকে মুলতুবি করে রাখা হয় (দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হল, সুপ্রিম কোর্টও সংবিধানকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছিল), সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা এবং প্রতিবাদের ওপর দমন নামানো হয় এবং সরকারের বিরোধিতাকারী, সংখ্যালঘু এবং দরিদ্রদের ওপর হিংসা নামিয়ে আনা হয়।

সেদিনের জরুরি অবস্থাকে স্মরণ করার মধ্যে আজ কোন তাৎপর্য থাকতে পারে? বিজেপির কাছে এটা হল শুধুমাত্র কংগ্রেসকেই স্বৈরতান্ত্রিক ও অগণতান্ত্রিক বলে বর্ণনা করার দিন। কিন্তু আজ ভারতবাসীরা যখন চার দিকের অবস্থার বিচার করেন, তখন পরিস্থিতি তাদের কাছে কংগ্রেস এবং ইন্দিরা জমানার জরুরি অবস্থার চেয়েও শোচনীয় হয়ে দেখা দেয়।

আজকের দিনেও নাগরিক স্বাধীনতার কর্মী, সমাজ আন্দোলনের কর্মী এবং সরকার বিরোধীদের ইউএপিএ এবং দেশদ্রোহর মতো দানবীয় আইনে অভিযুক্ত করে বিনা বিচারে জেলে বন্দী করা হচ্ছে; যে সাংবাদিকরা নিজেদের কাজ করছেন, সরকার যে সমস্ত খবরাখবর চেপে রাখতে চায় সেগুলোকে প্রকাশ করছেন, তাদের ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত করা এবং হয়রানি ঘটানো হচ্ছে; পুলিশ আন্দোলনকারীদের, দরিদ্র ও সংখ্যালঘুদের ওপর পৈশাচিক নিপীড়ন চালাচ্ছে ও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করছে এবং তার জন্য তাদের কোনো শাস্তি হচ্ছে না। আরও নিকৃষ্ট ব্যাপার হল, পুলিশ একদিকে পিটিয়ে মারায় অভ্যস্ত এবং সাম্প্রদায়িক নির্মমতায় লিপ্ত উচ্ছৃঙ্খল গ্যাং ও রাজনীতিবিদদের মদত যোগাচ্ছে আর অন্য দিকে যারা সংবিধানকে রক্ষা করছে তাদের “অপরাধী” এবং “দেশদ্রোহী” বলে অভিযুক্ত করছে। আর সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ব্যাপার হল, সুপ্রিম কোর্ট সহ গোটা বিচার বিভাগই সব দেখেও চোখ বুজে থাকছে।

saf

 

সম্প্রতি জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং সিএএ-বিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী সাফুরা জারগরকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়েছে; কিন্তু ওই মুক্তি এসেছে এক দীর্ঘ সমবেত প্রচার আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে যে আন্দোলনে এই বিষয়টার ওপরই জোর দেওয়া হয়েছিল যে, জারগর শুধু অন্যায়ভাবে জেলে আটক এক রাজনৈতিক বন্দীই নন, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মহামারীর মধ্যে জেলে আটক রেখে তাঁকে এবং গর্ভে ধারণ করা তাঁর সন্তানকে বিপদের মধ্যে ফেলা হচ্ছে। জারগরের মুক্তি একটা স্বাগত জানানোর মতো বিজয় হলেও আরও অনেক রাজনৈতিক বন্দীর জামিন থেকে বঞ্চনা অব্যাহতভাবে চলছে। এঁদের মধ্যে রয়েছেন ভীমা কোরেগাঁও ঘটনায় আটক ১১ জন কর্মী, যাদের মধ্যে ভারভারা রাও, আনন্দ তেলতুম্বডে এবং গৌতম নভলখা বয়স এবং অসুস্থার কারণে যথেষ্ট বিপদের মধ্যে রয়েছেন।

umar

 

দিল্লী পুলিশ দিল্লী দাঙ্গায় অংশ নেওয়ার মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানোয় বেশ কিছু ছাত্রছাত্রী এবং সিএএ-বিরোধী নারীবাদী কর্মীরা জেলে পচছেন (আসল অপরাধীরা যদিও অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে); এদের সাথেই আন্দোলনের আরও কিছু কর্মীকেও দাঙ্গায় জড়িত থাকার মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করা হচ্ছে, যাদের মধ্যে রয়েছেন উমর খলিদ, হর্ষ মান্দার, যোগেন্দ্র যাদব, আইসা কর্মী কাওয়াল প্রীত কউর এবং এমনকি ডিএস বিন্দ্রা যাঁর অপরাধ শুধু এই ছিল যে, প্রতিবাদে অংশ নেওয়া মানুষদের জন্য তিনি রান্নাবান্না ও খাবারের ব্যবস্থা করেছিলেন। তাঁদের শান্তিপূর্ণ বক্তৃতাগুলোকে “প্ররোচনা” বলে ছাপ মারা হচ্ছে, প্রতিবাদকে দাঙ্গা বলে দাগানো হচ্ছে, আর যে সমস্ত বিজেপি নেতা ও পুলিশ মুসলিমদের গণহত্যা করার আহ্বান জানিয়েছিল তাদের স্পর্শ পর্যন্ত করা হচ্ছে না।

অতি সম্প্রতি যে সাংবাদিককে নিশানা বানানো হল তিনি হলেন স্ক্রল ওয়েবসাইটের সুপ্রিয়া শর্মা। তাঁর বিরুদ্ধে উত্তরপ্রদেশে এফআইআর করা হয়েছে এবং অভিযোগ হল — লকডাউন পর্বে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সংসদীয় ক্ষেত্র বারাণসীর দরিদ্র মানুষদের ক্ষুধা ও দুরবস্থা নিয়ে তিনি প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন।

২০২০ সালে জরুরি অবস্থাকে স্মরণ করার প্রকৃত তাৎপর্য হল — নাগরিক স্বাধীনতা এবং সংবিধান রক্ষায় আজ আমাদের নতুন করে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। আন্দোলনের সেই সমস্ত কর্মীদের সমর্থনে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে যাঁরা শুধু জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধই গড়ে তোলেননি, জরুরি অবস্থা উঠে যাওয়ার পরও যাঁরা নাগরিক স্বাধীনতার রক্ষা থেকে কখনই বিরত হননি। যাঁরা সেদিন কংগ্ৰেস জমানাকে দায়বদ্ধ করেছিলেন, আজ মোদী জমানাকে দায়বদ্ধ করার জন্য তাঁদের জেলে পোরা হচ্ছে। সাংবাদিকরা নিজেদের পছন্দমতো রিপোর্ট তৈরি করবেন, সম্পাদকরা যেমন বুঝবেন সম্পাদনা করবেন, এবং নাগরিকরাও রাজনৈতিক চোখরাঙানির মুখোমুখি না হয়েই প্রতিবাদ জানাতে পারবেন — এঁদের সবারই স্বাধীনতার পক্ষে আমাদের দাঁড়াতে হবে। প্রতিটি রাজনৈতিক বন্দীর মুক্তির জন্য আমাদের কাজ করে যেতে হবে।

(লিবারেশন, জুলাই ২০২০ সংখ্যা থেকে)  

Published on 03 July, 2020