মুর্শিদাবাদের সাম্প্রতিক ঘটনাবলীতে সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের অনুসন্ধান রিপোর্ট

violence-stricken-areas-of-murshidabad

মুর্শিদাবাদ জেলায় সামসেরগঞ্জ থানার সদর ধুলিয়ান পুরসভা। তার লাগোয়া তিনপাকুড়িয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত জাফরাবাদ গ্রামে গত ১২ এপ্রিল ২০২৫ সাম্প্রদায়িক হিংসার এক চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে। দুই জন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে খুন করা হয়। অন‍্যদিকে ওই দিনই ধুলিয়ান বাজারে সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত বিএসএফের প্রত‍্যক্ষ মদতে আরএসএস কর্মীরা মুসলমান সম্প্রদায়ের ওপর সন্ত্রাস চালায়। এর আগে বেশ কয়েকদিন ধরে সামসেরগঞ্জ ও পার্শ্ববর্তী সূতি থানা এলাকায় সংখ্যালঘু জনগণের ওয়াকাফ সংশোধনী বিরোধী সতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে ব্যাপক রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নেমে আসে। ঘটনার আগের দিন অর্থাৎ ১১ এপ্রিল পার্শ্ববর্তী সূতি থানায় পুলিশের গুলিতে একজন সংখ্যালঘু যুবক খুন হন। ১২ এপ্রিল তারবাগানে নাবালক সহ বহুসংখ্যক মানুষ বিএসএফের গুলিতে আহত হন।

এই পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৮ ও ১৯ এপ্রিল ২০২৫ সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের এক প্রতিনিধি দল গোটা এলাকায় তদন্ত অনুসন্ধান চালায়। আমাদের পর্যবেক্ষণ নিম্নরূপ:

১) সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের  ভূমিতে পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক হিংসা সৃষ্টির গভীর ষড়যন্ত্র

গত ১২ এপ্রিল তারিখে প্রকাশ্য দিবালোকে এক উন্মত্ত দুষ্কৃতি বাহিনী জাফরাবাদে একই পরিবারের বাবা ও ছেলে হরগোবিন্দ দাস ও চন্দন দাসকে  ঘর থেকে টেনে বার করে কুপিয়ে খুন করে। তাঁদের ঘর বাড়ি ভাঙচুর করে, পাকা দালান বাড়ির সামনের ঘরটিতে ভাঙ্গচুরের চিহ্ন দেখা যায়। দুষ্কৃতিরা সংখ্যায় শতাধিক বলে গ্রামবাসীরা জানায়। জাফরাবাদে হিন্দু পরিবারের সংখ্যা ১০০/১২৫ ঘর। তার বেশ কিছু সংখ্যক বাড়িতে দুষ্কৃতিরা তান্ডব চালায়। আগুন লাগিয়ে দেয়। কয়েকটি বাড়িতে লুঠতরাজ চালায়। একই সময়কালে পার্শ্ববর্তী গ্রাম বেতবোনা, রাণীপুর, দিগরীর হিন্দু পাড়ায় দুষ্কৃতিরা  ঘরবাড়িতে হামলা করে আগুন লাগায়, লুঠতরাজ করে। মহিলাদের প্রতি অশালীন ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করে। মহিলারা জানায় হামলাকারীরা গালিগালাজ করতে করতে বোমাবাজি ও ভাঙচুর করে। ধর্মীয় জিগির তোলার লক্ষ্যে দেবত্বস্থানেও হামলা করা হয়। লাগোয়া গ্রাম বেতবোনায় দেখা যায় একই চিত্র। সেখানে পাশাপাশি থাকা হিন্দু মুসলিম দোকানের মধ্যে বেছে বেছে হিন্দুদের দোকানগুলো আক্রান্ত। প্রায় তিন চার ঘন্টা ধরে চলা এই তাণ্ডব চলাকালে গ্রামের মানুষেরা সামসেরগঞ্জ থানায় বহু বার একটানা ফোন করে কোনওরকম সাহায‍্য সুরক্ষা পাননি। সকলেই পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব‍্যাপক ক্ষোভ ও হতাশা ব‍্যক্ত করেন। অথচ ঘটনাস্থলের মাত্র ১ কিলোমিটার দুরে এসডিপিও অফিস, থানার দূরত্ব ৩ কিমি। বেশ কয়েকদিন ধরে চলমান ওয়াকাফ আইন বিরোধী আন্দোলন দমনে মোতায়েন করা বিএসএফ বাহিনী পাশেই ধুলিয়ান বাজারে ছিলো। তারাও কোনো তৎপরতা দেখায়নি।

এই ঘটনার উৎস এলাকায় ঘটে যাওয়া কোনো সম্প্রদায়গত পারস্পরিক বিবাদজনিত নয়। এটা উপর থেকে পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে। বিগত দিনে ঐ এলাকায় হিন্দু মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনোরকম অশান্তি ছিলো না। জাফরাবাদের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা, বিশেষত মহিলারা, যে কথা বারবার বলেন, এতদঞ্চলে বহু বছর ধরে সামাজিক জীবনে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ সৌহার্দ‍্যপূর্ণভাবে পরস্পরের উৎসবে ও আনন্দানুষ্ঠানে মিলেমিশে বসবাস করছিলেন। একই রকম সূতি ১ নং ব্লকের কাশিমনগরের মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষেরাও জানান যে, “কেউই অন‍্যের বিরুদ্ধে খারাপ ভাষাও বলেনি কখনও” ।

জাফরাবাদে নির্দিষ্টভাবে এই হামলার প্রাক্কালে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনো প্ররেচনামূলক বা উত্তেজনাকর ঘটনা ঘটেনি। এই হত্যা ও সন্ত্রাসের ধরনটিকে দেখে মনে হয়েছে এটা নিছক তাৎক্ষণিক কোন ভিড়হিংসার ঘটনা নয়, বরং সাম্প্রদায়িক জিঘাংসা সৃষ্টির লক্ষ‍্যে সুচারু হিসেবনিকেশ ও পূর্বপরিকল্পনায় সংগঠিত এক সন্ত্রাস অভিযান। জাফরাবাদ সংখ্যালঘু প্রধান গ্রাম। সেই গ্রামের মধ্য দিয়ে গাড়ী করে আক্রান্ত হিন্দু পাড়ায় যাওয়ার পথের দুধারে জটলা করে থাকা সংখ্যালঘু মানুষেরা বারবারই আমাদের গাড়ির দিকনির্দেশ করে দিচ্ছিলেন, সহযোগিতা করছিলেন। তাদের শরীরী ভাষায় কোনো ঘৃণা বা বিদ্বেষ চোখে পড়েনি। বরং হামলা ও হত্যার ঘটনার প্রতি তাঁদের বিরোধিতা এবং আক্রান্তদের প্রতি সহানুভূতি ফুটে উঠছিলো। একই এলাকায় বসবাসকারী মানুষেরা ধর্মীয় বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে তাঁদের প্রতিবেশীর উপর এমন হামলা করবে এমন কোনো তথ্য প্রমান আমরা পাইনি। আক্রমণকারীদের পরিচয় জানতে চাইলে গ্রামবাসীরা বলেন সকলেই মুখে কাপড় ঢাকা থাকায় চিনতে পারা যায়নি। অনুমান করা যায়  চিনে থাকলেও সেটা জানালে পরবর্তীতে নানা ঝামেলা ঝামেলা ঝঞ্ঝাট আসতে পারে এই আশংকা গ্রামবাসীদের মধ্যে কাজ করেছে। তবে কয়েকজন একটি সম্প্রদায়ের প্রতি ইঙ্গিত করেন। এ প্রসঙ্গে পার্শবর্তী শূলিতলা গ্রামের নাম কয়েকজন বলেন। ঐ এলাকাটি “সমাজবিরোধীদের পাড়া” বলে কথিত। মানুষের কাছে হামলাকারী কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতার নাম শোনা যায়নি। সকলের মধ্যে পুলিশ প্রশাসনের প্রতি তীব্র অনাস্থা ও নিরাপত্তাহীনতার মনোভাব দেখা যায়। প্রাণ বাঁচানোর জন্য এদিক ওদিক পালিয়েছিলেন বলে সকলেই জানান। প্রশ্ন হলো এই হামলার পেছনে কোনো চতুর রাজনৈতিক পরিকল্পনা কাজ করেছে কি? সেই জন্যই কি হামলাকারী বাহিনীকে কাজে লাগানো হয়েছে? হামলার নেপথ্যে রয়েছে কারা? "হিন্দু আক্রান্ত", “জেহাদী হামলা” এই ন্যারেটিভকে প্রতিষ্ঠা করাই কি হত্যার উদ্যেশ্য? এই সমস্ত প্রশ্নের কোনো সহজ সরল উত্তর বা তথ্য পাওয়া যায়নি। যা তদন্ত সাপেক্ষ। বেশ কয়েকটি পরিবার মালদা ক্যাম্পে গেছেন বলে জানা গেলো। বিজেপির নেতারা আক্রান্ত অসহায় মানুষদের সেই ক্যাম্পে নিয়ে গেছেন। আবার কয়েকজন বলেন তারা আত্মীয়ের বাড়ি ঝাড়খন্ডে গিয়েছিলেন। ঘটনার ৬ দিন পর প্রতিবেশীদের আশ্বাসে গ্রামে ফিরে এসেছেন।

২) পুলিশ প্রশাসন ও শাসক তৃণমূলের অপরাধসম নিষ্ক্রিয়তা ও ঘৃণ্যকৌশল

পুলিশ ও পাশেই থাকা টহলকারী বিএসএফ বাহিনী ঘন্টা ৪ ধরে চলা উন্মত্ত তান্ডবের স্থানে আসলো না কেন? এটা কি নিছক সরকার প্রশাসনের অপদার্থতা? নাকি সচেতনভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা? বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষ। হামলাকারীরা বহিরাগত কিনা এ বিষয়ে কোনো বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে আন্তঃরাজ্য ও দেশীয় সীমান্তবর্তী  ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী তার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সামসেরগঞ্জ বিধানসভাটি মালদা (দক্ষিণ) লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত। যেখানে কংগ্রেস জিতেছে। কিন্তু পঞ্চায়েতগুলি ও পুরসভা তৃণমূলের দখলে। সেখানে পরিস্থিতি মোকাবিলায় শাসক দলের সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ভূমিকা দেখা গেছে। নিহত হিন্দু পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় যে এফআইআর করা হয়েছে তাতে পাশ্ববর্তী শূলিতলার ৪ জন ও দিগরীর ২ জন সংখ্যালঘু মানুষের নামে অভিযোগ জানানো হয়েছে। পুলিশ ১০৩ নং ধারা দিয়েছে, যা সম্পত্তি লুঠতরাজ জনিত হত্যা। হত‍্যার সাথে জড়িত অভিযোগে পুলিশ যাদের গ্রেপ্তার করেছে তারা অধিকাংশই শূলিতলার ও সংখ্যালঘু। মুর্শিদাবাদ জেলায় এর আগেও বেলডাঙাতে সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটেছে। তার কোনো তদন্ত বা দোষীদের গ্রেপ্তার কিছুই ঘটেনি। এক্ষেত্রেও রাজ্য প্রশাসনের তেমনই এক বিস্ময়কর নীরব ভূমিকা দেখা যাচ্ছে। একটা পর্যায়ে হিংসার ঘটনা ঘটতে দেওয়া তারপর নিজেদের রক্ষাকর্তা হিসাবে তুলে ধরা এটাই কি তৃণমূল সরকারের কৌশল হয়ে উঠেছে ? এই প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

৩) কেবল “হিন্দু আক্রান্ত” নয়! মুসলমানরাও বড় আকারে আক্রান্ত। ওয়াকাফ আন্দোলনে নজিরবিহীন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস

৮ এপ্রিল থেকে ধুলিয়ানে ওয়াকাফ বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। পরপর কয়েকদিন প্রতিবাদী মিছিল হয়। ধুলিয়ান বাজারে বিএসএফের প্রোটেকশনে আরএসএস কর্মীরা অস্ত্র সহ প্রকাশ‍্য সন্ত্রাস চালায় এবং তারবাগানে বিএসএফ গুলি চালিয়ে কয়েকজনকে আহত করে। সূতি ব্লকের সাজুর মোড়ে জাফরাবাদ ঘটনার আগের দিন, ১১ এপ্রিল শুক্রবার বিকেলে ওয়াকফ সংশোধনীর বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ মিছিল সংগঠিত হয়েছিল। পুলিশ সেই মিছিলে লাঠি চালালে পুলিশের সাথে প্রতিবাদীদের সংঘর্ষ হয়। পুলিশের ব‍্যাপক লাঠির জেরে জনতা ছত্রভঙ্গ হয়। এই সময় পুলিশের গুলিতে ইজাজ আহমেদ নামক একজন যুবকের মৃত্যু হয়। তিনি একজন পরিযায়ী শ্রমিক ছিলেন ও মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁর বাড়িতে এবং সমগ্র এলাকায় বাড়ি বাড়ি প্রতিনিধিরা গিয়ে পর্যবেক্ষণ করে। গুলি কান্ডের দিন ১১ ও ১২ এপ্রিলের মধ্যবর্তী রাত থেকে ভোর, সূতির কাশেমনগর ও কুমড়াপুর গ্রামে ব‍্যাপক পুলিশী অভিযান চলে। অসংখ‍্য গ্রামবাসী, বিশেষত মহিলারা, এই পুলিশী অভিযানের যে বর্ণনা তুলে ধরেন তা ভয়াবহ। বাহিনী এসেছিল হাতে ভারী বন্দুক ছাড়াও সাবল ও মোটা লাঠি হাতে। কেউ কেউ ছিলো হাফ প্যান্ট পড়া। কয়েকজনের পায়ে দেখা গেছে হাওয়াই চটি। সাবল দিয়ে দরজা ভেঙে বাড়ি বাড়ি ঢুকে ব‍্যাপক সন্ত্রাস চালায় এই বাহিনী। সমস্ত কমবয়সী ছেলেদের একধার থেকে পেটাতে শুরু করে, বাড়ির মহিলাদের অকথ‍্য অশ্লীল গালিগালাজ করে। বাচ্চা ছেলেদেরও ব‍্যাপক পেটানো হয়। কয়েকটি মোটর সাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া হয়। অনেক নাবালক সহ মোট ৭১ জনকে পুলিশ তুলে নিয়ে যায়। কোনো ক্ষেত্রেই কোনও গ্রেপ্তারির রসিদ বা কাগজ পরিবারকে দেওয়া হয়নি। থানায় কাগজ আনতে গেলে মহিলাদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়। দেখা যায় মহিলাদের চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। পরবর্তীতে খোঁজখবর নিয়ে গ্রামবাসীরা জানতে পারেন যে তুলে নিয়ে যাওয়া  ছেলেদের মারাত্মক সব ধারায় জেলে ঢোকানো হয়েছে, ৯ জনের ৯ দিনের পুলিশ কাস্টডি হয়েছে। কাশেমপুরের গ্রামবাসীরা জানান তুলে নিয়ে যাওয়া ছেলেদের অন্তত ৩০ জন নাবালক। এই আন্দোলনে কিছু ধ্বংসাত্মক মারমুখী শক্তি থাকলেও তারা প্রাধান্য ছিল না। কাশেমনগরের মানুষেরা বলেন, গুলিকান্ডের আগের দিন সূতি থানার ওসি এসে বলেন মিছিল বন্ধ রাখতে হবে। গ্রামবাসীরা জানায় শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার গণতান্ত্রিক অধিকার কি থাকবে না? অধিকারের বোধ থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন স্থানের মতো সেখানেও ব্যাপক মানুষ বিশেষত যুব শক্তি সেদিন মিছিলে সমাবেশিত হয়। সন্ত্রাসের পরবর্তী ৫ দিন কেটে গেলেও তখনও মানুষ প্রবল আতঙ্কিত। যুবকরা রাতে ঘরে থাকতে পারছে না৷ দেখা গেলো সংখ্যালঘু মানুষের মধ্যে তৃণমূলের বিরুদ্ধে প্রবল ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকটি মুসলিম সংগঠন এখানে জমি পাচ্ছে।

৪) ওয়াকফ আন্দোলন হিংসাত্মক হয়ে উঠে হঠাৎ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রূপ নিয়েছে! এটা চরম মিথ্যাচার

ওয়াকাফ আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র সূতিতে যেখানে পুলিশ গুলি করে একজন যুবককে হত্যা করেছে, বহু সংখ্যক গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়েছে সেখানে একটিও কোনো সাম্প্রদায়িক হিংসার খবর নেই। সেখানে পুলিশ-বিএসএফ যৌথভাবে সন্ত্রাস চালিয়েছে। ওয়াকাফ আন্দোলন সম্পূর্ণতঃ রাষ্ট্র বিরোধী। সেটা আদৌ হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়। বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে সংখ্যালঘু মানুষের সাথে কথা বলে তাঁদের এই প্রশ্নে হিন্দুদের উপর আক্রোশের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ধুলিয়ান বাজারে বিএসএফের প্রোটেকশনে আরএসএস কর্মীদের প্রকাশ‍্য সন্ত্রাস এবং ধুলিয়ান পুরসভার অন্তর্গত তারবাগানের ঘটনাবলী উল্লেখযোগ্য। ১২ তারিখ সকালে ধুলিয়ান শহরের তারবাগানে বিএসএফ বাহিনী অথবা, স্থানীয়দের ভাষায় “বিএসএফের পোশাক পরা একটি দল”, বিক্ষোভরত মানুষের উপর গুলি চালায়। ১২ জন গুলিবিদ্ধ হন। গুলিবিদ্ধ চার জন বহরমপুর মেডিক‍্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছে যাদের মধ‍্যে একজন, ১২ বছর বয়সী হাসান শেখ, মরণাপন্ন অবস্থায় আছে।
সেখানে ১২ এপ্রিল সংখ্যালঘুদের ওপর যখন বিএসএফ গুলি চালায় তখন লোকজন ধুলিয়ান বাজারের দিকে আসতে চায়, কারন তখন সেখানে মুসলিমদের দোকানে লুঠ চলছিলো। সেখানে কোনো হিন্দু বাড়িতে হামলা হয়নি। প্রতিনিধি দল সংখ্যালঘুদের সেই দোকানগুলি প্রত্যক্ষ করে এবং মানুষের কথা শোনে৷ সমগ্র সামশেরগঞ্জের মধ‍্যে জাফরাবাদ বেতবোনা ও সংলগ্ন আরও দুটি গ্রামে হিন্দুদের ওপর হামলা হয়েছে। মুসলমানরা ‘সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা’-য় লিপ্ত হলে আরো বহু গ্রামে হিন্দুরা আক্রান্ত হতো। ওই বিধানসভার ৮২ শতাংশ ভোটার মুসলিম। ঐ একটা এলাকা ছাড়া আর কোথাও কোনোরকম হামলা হয়নি। কোনো বড় ব্যাবসায়ীদের দোকান নয়, মূলত ছোট ছোট দোকানগুলিতেই তান্ডব ও লুঠ হয়েছে।

৫) হিন্দুত্ববাদী শক্তির দাপট

এই এলাকায় হিন্দুত্ববাদী শক্তি তাদের তৎপরতা বৃদ্ধি করে চলেছে। ওয়াকাফ আন্দোলন চলাকালে এটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে বিএসএফ পুলিশ প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা দেখা গেছে। বরং তাদের সাথে মিলে মিশে শাসক দল এবং প্রশাসন কাজ করেছে। ঘটনার দিন সামশেরগঞ্জ থানার শহরকেন্দ্র ধুলিয়ানে একই দাবিতে চলা একটি মিছিলে ইঁট মারার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বচসা হয়।

ধুলিয়ান শহরের মেন রোডের ওপর সামশেরগঞ্জ থানা। ১২ এপ্রিল সকাল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত এই থানার নাকের ডগায়, ধুলিয়ান বাজার এলাকায়, মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর প্রকাশ‍্যে সন্ত্রাস চলে। বাছাই করা বাড়িগুলির সামনে খোলা তরোয়াল বাহিনীর হুঙ্কার, দোকানে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট চলে। হিন্দুত্ববাদী  সন্ত্রাসকারীরা নিজেদের চেহারা বা পরিচয় গোপন করেনি। এই সমস্ত ঘটনাবলী সুনির্দিষ্ট পূর্ব পরিকল্পনায় সংগঠিত করা হয়েছে। ঘোষপাড়ার আরএসএস কর্মীরা প্রকাশ‍্যেই সন্ত্রাস চালিয়েছে। তাঁরাও তাঁদের পরিচয় গোপন রাখেনি। রাজ‍্যের বিজেপি নেতৃত্ব তথা প্রচারযন্ত্র প্রকাশ‍্যেই সাম্প্রদায়িক জিঘাংসা প্রচার করেছে। অনুসন্ধানের দ্বিতীয় দিন দেখা গেছে এইসব নেতাদের সাথে নিয়ে খোদ রাজ‍্যপাল আক্রান্ত ও ক্ষুব্ধ মানুষগুলিকে নিয়ে বিদ্বেষের রাজনীতি উসকিয়ে দিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। তিনি জাফরাবাদে হিন্দু এলাকায় গেলেন কিন্তু সূতিতে নিহত মুসলিম পরিবারে গেলেন না। ইঙ্গিতটা স্পষ্ট। পুলিশের মধ‍্যে আরএসএস ও চক্রান্তকারীদের গভীর ও প্রত‍্যক্ষ প্রভাবের প্রসার রুখতে রাজ‍্য সরকার সম্পূর্ণ ব‍্যর্থ!

৬) বিএসএফের ভূমিকা

সীমান্তের ৫০ কিমি এলাকায় তারা প্রয়োজনে ঢুকতে পারে। (আগে ১৫ ছিলো) সামসেরগঞ্জ ও সূতির বড় এলাকা তেমনই। বিধি অনুসারে রাজ্য পুলিশের সাথে কথা বলে তারা আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করবে। কিন্তু কোনো কার্যকরী ভূমিকায় তারা ছিলো না কেন?  আক্রান্ত হিন্দু এলাকায় বিএসএফ খুব কাছাকাছি থেকেও সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় থেকেছে। হামলাকারীদের অবাধে খুন আগুন লাগানো প্রভৃতি করতে দিয়েছে। মানুষের প্রবল ক্ষোভ এখানেই। আবার মুসলিম এলাকায় প্রতিক্রিয়া ভিন্ন। এখানে বিএসএফ সরাসরি ভয়াবহ আক্রমণ করেছে। গুলি করে হত্যা করেছে, বহু মানুষকে আহত করেছে। ঘরে ঘরে ঢুকে ভাঙচুর, নির্বিচারে গ্রেপ্তার করেছে। এক কথায় ওখানে বিএসএফ মানে আতঙ্ক, মানুষের ঘৃণা। হিন্দু এলাকায় আবার বিএসএফকে অনেকটা রক্ষাকর্তা হিসাবে মানুষ দেখছে।সামশেরগঞ্জ থানা বিএসএফের হাতে নিয়ন্ত্রণ তুলে দিয়েছিল এবং তারা একদিকে মুসলমানদের ওপর অপরদিকে হিন্দুদের ওপর সন্ত্রাস চলতে দিয়েছে তা স্পষ্ট।

৭) কোনো সন্ত্রাসবাদী বা জঙ্গি সংগঠন সক্রিয়তার তথ্য পাওয়া যায়নি

দীর্ঘদিন ধরে এখানে মুসলিম সংগঠনগুলি সক্রিয়। কিন্তু তারা কোন জঙ্গি কার্যকলাপে লিপ্ত এমন কোন তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

৮) উপসংহার এবং উঠে আসা দাবি

জাফরাবাদের সন্ত্রাস অভিযানকে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে “হিন্দু আক্রান্ত!” বলে মূলধারার সংবাদমাধ‍্যমে ব‍্যাপক সম্প্রচার লক্ষ‍্য করা যাচ্ছে। কিন্তু কাশেমনগর ও কুমড়াপুরে পুলিশ বাহিনীর (অথবা পুলিশ ও ঠ‍্যাঙাড়ে বাহিনীর) সন্ত্রাস ও অল্পবয়সী ছেলেদের পিটিয়ে তুলে নিয়ে গিয়ে মারাত্মক সব ধারায় জেলে ঢুকিয়ে দেওয়া,এবং ধুলিয়ান বাজারে মুসলমানদের ওপর সন্ত্রাসের ঘটনা সম্পূর্ণ চেপে দেওয়া হয়েছে। আমরা সমস্ত গণতান্ত্রিক সংগঠন ও দায়িত্ববান স্বাধীন সাংবাদিকদের কাছে আবেদন জানাচ্ছি সামসেরগঞ্জ ও সূতির আক্রান্ত মানুষ‍দের পাশে দাঁড়াতে, বিশেষত, একদিকে পুলিশের অপরাধসম নিস্ক্রিয়তা ও অন‍্যদিকে পুলিশের মোটা দাগের অপরাধমূলক অভিযানের সত‍্যতা ও তার পেছনে থাকা সাম্প্রদায়িক অভিসন্ধিকে উন্মোচিত করে মানুষের সামনে তুলে ধরতে।

সামসেরগঞ্জ সূতির ঘটনাবলীকে ধরে রাজ্যের বুকে বিজেপি আরএসএস যে মিথ্যা প্রচার করে ঘৃণা ও বিভাজনের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিতে চাইছে। এই গৈরিক ষড়যন্ত্রের  বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে হবে।

আমাদের দাবি -

১) ধুলিয়ান জাফরাবাদ এলাকায় পুলিশের নাকের ডগায় অপরাধীরা অবাধে খুন সন্ত্রাস চালালো কেন?  তৃণমূল সরকারকে এর দায় নিতে হবে। বিচারবিভাগীয় তদন্ত করতে হবে। নির্দিষ্ট সময় সীমার মধ্যে রিপোর্ট প্রকাশ করতে হবে। হামলাকারীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি দিতে হবে।

২) লোক দেখানো বদলী নয়, সামসেরগঞ্জ ও সূতি থানার ওসি এবং এসডিপিও কে ক্লোজ করে তদন্তের আওতায় আনতে হবে।

৩) সন্ত্রাস হিংসার দায় একটি সম্প্রদায়ের উপর চাপিয়ে দিয়ে বিজেপির ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন।

৪) ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়িয়ে দাঙ্গা লাগানোর চক্রান্তকারী বিজেপির বিরুদ্ধে এক হোন।

৫) সংবিধান বিরোধী ওয়াকাফ সংশোধনীর বিরুদ্ধে ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকারীদের উপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস - নিরাপরাধ যুবকদের মারধোর, মিথ্যা অভিযোগে গ্রেপ্তার, ঘরবাড়িতে পুলিশী হামলা হলো কেন তৃণমূল সরকার জবাব দাও। অন্যায়ভাবে ধৃত যুবক ও নাবালকদের অবিলম্বে নিঃশর্তে মুক্তি চাই।

(প্রতিনিধি দলে ছিলেন মলয় তেওয়ারি, রণজয় সেনগুপ্ত, চন্দ্রাস্মিতা চৌধুরী, বর্ষা বড়াল, মধুরিমা বক্সী, ঋতম মাজি, মনভোলা চৌধুরী, রাজীব রায়, প্রিয়া রাম, জয়তু দেশমুখ।)

 

 

01 May, 2025