দেশব্যাপী তিন সপ্তাহের লকডাউনের তৃতীয় সপ্তাহে আমরা এখন প্রবেশ করছি। কোভিড-১৯ অতিমারীর মোকাবিলায় মোদী সরকার লকডাউনকেই একমাত্র নির্ণায়ক ও নির্দিষ্ট উপায় করে তুলেছে এবং তাকে বলবৎ করতে সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করছে। ভারতে অতিমারীর বৃদ্ধি ও বিস্তারের দিকে তাকালে আমরা বুঝতে পারছি না যে, লকডাউনের কৌশল এখনও পর্যন্ত কতটা সফল হয়েছে। লকডাউনের এই দু-সপ্তাহে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৬০৬ থেকে বেড়ে ৪৪২১-এ পৌঁছেছে, আর মৃতের সংখ্যাও ১০ থেকে বেড়ে পৌঁছেছে ১১৪-তে (বিং ডট কম-এ দেওয়া ৭ এপ্রিল-এর তথ্য)। সংখ্যাগুলো অতি দ্রুত বেড়ে চলেছে, প্রায় প্রতি তিন দিনের ব্যবধানে দ্বিগুণ হচ্ছে এবং ভারতের সমস্ত জেলার ৪০ শতাংশই এখন সংক্রমণের কবলে।
দেশব্যাপী লকডাউন চালু না হলে ওই সংখ্যাগুলো খুব সম্ভবত আরও বিশ্রী দেখাত, তবে যে পরিসংখ্যান আমাদের দেওয়া হচ্ছে তা এখনও যে অনেক কম দেখাচ্ছে তা প্রধানত এই কারণে যে, ভারতে নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে প্রতি দশ লক্ষ লোকের মধ্যে মাত্র ৫০ জনের, পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশের তুলনায় যা অনেক কম। ব্যাপক সংখ্যক মানুষের নমুনা পরীক্ষা এমনই একটা কৌশল যা দক্ষিণ কোরিয়া ও জার্মানির মত দেশে যথেষ্ট ফলদায়ী রূপে দেখা দিয়েছে। এখানে আমরা শুধু সেই দেশগুলোর মধ্যে মাত্র দুটো দেশের কথাই উল্লেখ করলাম যেগুলোতে ব্যাপক সংখ্যক মানুষের মধ্যে করোনা সংক্রমণ ঘটলেও মৃতের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। কার্যকরী চিকিৎসা পরিকল্পনার সঙ্গে একযোগেই লকডাউন ফলদায়ী হতে পারে। যথেষ্ট সংখ্যক মানুষের নমুনা পরীক্ষা না করে এবং যে সমস্ত চিকিৎসাকর্মী এই মারণ ভাইরাসের মোকাবিলায় সামনের সারিতে রয়েছেন তাদের সুরক্ষা ব্যবস্থায় গাফিলতি করে ভারতীয় রাষ্ট্র আশু চিকিৎসা ব্যবস্থার দিক থেকেও শোচনীয় অবহেলা দেখিয়েছে।
কোনো ধরনের পরিকল্পনা না করে এবং এবং ভুল পথে চালিত করে লকডাউনকে আরও দুর্বল করে তোলা হয়েছে। পরিযায়ী শ্রমিক এবং দিন আনা দিন খাওয়া গ্ৰাম ও শহরাঞ্চলের দরিদ্ররা কিভাবে বাঁচবে সরকার সেটা কিন্তু অনায়াসেই অনুমান করতে পারত। সরকার যদি গোড়ার ব্যাপারগুলো ঠিকভাবে করতে পারত, লকডাউনের ফলে যাদের সবচেয়ে অসহায় ও ক্ষতিগ্ৰস্ত হওয়ার সম্ভাবনা তাদের দুর্দশা লাঘবের পরিকল্পনা তৈরি করে সম্প্রচারিত করত, যদি খাদ্য এবং প্রতিদিনের অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যসমূহের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহকে সুনিশ্চিত করতে পারত, সে ক্ষেত্রে আজ যে দলে-দলে শ্রমজীবী জনগণের নিষ্ক্রমণ ঘটছে এবং যে তীব্র অনাহার মারণ করোনা ভাইরাসের চেয়ে আরও দ্রুত গতিতে ভারতকে তাড়া করছে, তা আমাদের দেখতে হত না। জনগণ যদি লকডাউনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার কিছুটা সময় পেত, তবে যে ধরনের আতঙ্ক তাড়িত কেনাকাটার হুড়োহুড়ি আমরা দেখলাম, যা জনগণের অসুবিধা সৃষ্টি করা ছাড়াও ‘সামাজিক দূরত্ব’ বজায় রাখার সমস্ত বিধিকে প্রহসনে পরিণত করল, তা আমাদের দেখতে হত না।
সরকার তার সিদ্ধান্তগুলোর ক্ষেত্রে কোনো রাজ্য সরকার, রাজনৈতিক দল, স্বাধীন বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক স্বাধীনতার সংগঠনগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের পরামর্শ করাকে একেবারেই আমল না দিলেও নরেন্দ্র মোদী এবং সংঘ-বিজেপি বাহিনী মোদী ভজনা এবং বিজেপির স্বার্থকে এগিয়ে নিয়ে যেতে কোভিড-১৯ সংকটকে কাজে লাগাতে চেষ্টার কোনো কসুর করছে না। চীন এবং মুসলমানদের যথাক্রমে এই রোগটার “উৎপাদক” ও “পরিবেশক” বলে দাগানোর একটা বিদ্বেষমূলক প্রচারাভিযান চলছে। নিজামুদ্দিনে তবলিগি জামাতের জমায়েতকে বিশেষভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণার বিদ্বেষ ছড়াতে, আর এই প্রচারের ফলস্বরূপ সন্তান জন্ম দেওয়ার কালে এক মুসলিম মহিলাকে চিকিৎসা পরিষেবা থেকে বঞ্চিত করা হয় যার পরিণামে তাঁর সন্তান মারা যায়, এবং মুসলিমদের সামাজিকভাবে বয়কট করা এবং বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়াও হচ্ছে। এরই মধ্যে, ডাক্তার এবং অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা কর্মীদের প্রতি সংহতি জানাতে হাততালি দেওয়া ও থালাবাটি বাজাতে এবং প্রদীপ ও মোমবাতি জ্বালাতে বলা হয়। এই দুই উপলক্ষেই ‘সামাজিক দূরত্ব’ বিধির ব্যাপক লঙ্ঘন হয় এবং তার সাথেই এই রোগ মোকাবিলার নামে কুসংস্কারাচ্ছন্ন গুজবকে বিপজ্জনক মাত্রায় ছড়ানো হয়।
শ্রমিকদের ছাঁটাই না করা বা মজুরি হ্রাস না করা সম্পর্কে নিয়োগকর্তাদের কাছে সরকারের নির্দেশাবলী এবং আবেদনের বলতে গেলে কোনো ফলই দেখা যাচ্ছে না এবং এই নির্দেশনামাকে বলবৎ করতে রাষ্ট্রের তরফেও কোন আন্তরিক প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে না। এখন আবার কোভিড-১৯-এর মোকাবিলার লক্ষ্যে অর্থ জোগাড়ের নামে সরকার দু-বছরের জন্য সাংসদদের মাধ্যমে বিতড়ন করা স্থানীয় এলাকা উন্নয়ন তহবিলকে স্থগিত করে দিয়েছে। স্থানীয় এলাকা উন্নয়নকে স্থগিত করে দিয়ে সরকার যেখানে ৭৯০০ কোটি টাকা পাবে, সরকার সেখানে কেন্দ্রীয় ভিস্তা প্রকল্পের অধীনে রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে ইণ্ডিয়া গেট পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা লাটিয়েন দিল্লীর কেন্দ্রস্থলের সৌন্দার্যায়নের জন্য ২০০০০ কোটি টাকা ব্যয় করতে প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। এরই মধ্যে আবার ঘৃণা ও কুসংস্কারের লাগাতার প্রচারের ওপর সওয়ার হয়ে বিজেপি জনগণের মধ্যে ‘মোদী মিল’ বিতরণ করে জনগণের ক্ষুধাকে তাদের স্বার্থ সিদ্ধিতে কাজে লাগাচ্ছে।
কোভিড-১৯ সংকট এবং লকডাউন, এই দুই ধাক্কা আমাদের প্রতিদিনের অস্তিত্বের সামনে এক অভূতপূর্ব ধাক্কা হয়ে দেখা দিচ্ছে। সবকিছুই অচল হয়ে গেছে। তবে, এটাও ঠিক যে দুর্দশাগ্রস্ত জনগণ একে অপরকে সহায়তা দিয়ে এই সংকটকে প্রতিহত করার পথের সন্ধান পাচ্ছেন। জনগণের লড়াইয়ের এই অঙ্গীকার এবং দৃঢ়তাই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মোকাবিলার চাবিকাঠি হয়ে দেখা দেয়। বিজেপি যেখানে চরম অবক্ষয়ী এবং পশ্চাৎমুখী ধ্যানধারণাগুলোয় সুড়সুড়ি দিয়ে আমাদের সমাজে বিদ্যমান অবিশ্বাস ও ঘৃণার উৎসগুলোকে গভীরতর করে তুলতে চাইছে, তার বিপরীতে আমরা সবসময়েই জনগণের নিজস্ব অভিজ্ঞতাগুলোর চমৎকার ঐতিহ্য এবং শক্তিশালী বৈশিষ্ট্যগুলোর ওপর আস্থা রাখি, তাদের উদ্যমগুলোর মধ্যে সমন্বয়সাধন করি এবং উদ্যোগের দ্বারকে উন্মুক্ত করে দিই। কোভিড-১৯ মহামারীর বিরুদ্ধে আমাদের প্রহরা ও লড়াইকে চালিয়ে যাওয়ার সাথে-সাথে আমাদের জনগণের জন্য আশু ত্রাণের ব্যবস্থার লক্ষ্যে সার্বিক চেষ্টা চালাতে হবে এবং সমস্ত কমরেডের সমবেত উদ্দীপনা ও উদ্যোগকে শক্তিশালী করে তুলতে হবে। আজকের এই ধরনের সন্ধিক্ষণে আমাদের এই নীতির প্রতি সুবিচার করতে হবে : “জনগণের স্বার্থই পার্টির স্বার্থ”, এবং আমাদের সমস্ত চিন্তাধারা, দৃষ্টিভঙ্গি ও কাজের মধ্যে দিয়ে কমিউনিস্ট হিসাবে নিজেদের প্রতিপন্ন করতে হবে।
(এম-এল আপডেট সম্পাদকীয়, ৭ এপ্রিল ২০২০)