বিহারের বিজেপি-জেডিইউ সরকার কি দলিত পীড়ন এবং হেফাজতে মৃত্যুর সরকারে পরিণত হয়েছে? কিছুদিন আগে হেফাজতে নৃশংসভাবে খুন হলেন গোবিন্দ মাঁজি, আর এখন ২৬ বছরের দলিত যুবক বিনোদ কুমার দাস ভাগলপুরের কহলগাঁও-এ পুলিশের পাশবিকতায় খুন হলেন। এটাও সুস্পষ্টভাবে হেফাজতে খুন। একদিকে দানবীয় ‘পুলিশ আইন’এর জন্য পুলিশ হয়েছে লাগাম ছাড়া, অন্যদিকে সামন্তবাহিনী দলিত ও দরিদ্রদের ওপর তাদের আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে। ৪ সেপ্টেম্বর তিনজন দলিত যুবক ভোজপুর জেলার গজরাজগঞ্জের বড়কাগাঁও-এ একটি মন্দিরে প্রসাদ নিতে গিয়েছিলেন, তাদের রাইফেলের কুঁদো, রড ও লাঠি দিয়ে নৃশংসভাবে আঘাত করা হয়। ফলে চৌকিপুর গ্রামের রবি রঞ্জন পাসওয়ানের মাথার খুলি ফেটে যায়।
২০ জুলাই, ২৬ বছরের দলিত যুবক বিনোদ কুমার দাস কহলগাঁও থানার পুলিশের বিভৎস অত্যাচারে মায়াগঞ্জ হাসপাতালে মারা যায়। মৃতের গ্রাম বাঁকা জেলার চকসাফিয়া (রাজায়ুঁ)-তে সিপিআই(এমএল)-এর একটি টীম ৩১ আগস্ট পরিদর্শনে যায়। ঘটনার খুঁটিনাটি জানতে তাঁরা মৃতের পিতা মনোজ কুমার দাস সহ স্থানীয় বহু মহিলা ও পুরুষের সঙ্গে কথাবার্তা বলেন। জানা গেছে বিনোদ একজন সাধারণ স্পষ্টবাদী সৎ যুবক এবং হালকা যানের চালক ছিলেন এবং মাঝে মাঝে রং’এর কাজও করতেন।
৭ জুলাই রাত ৮ টায় কহলগাঁও থানার পুলিশবাহিনী চকমাফিয়ায় আসে, বিনোদের বাড়ির তল্লাশি চালায়। কিছুই না পেয়ে তারা বিনোদকে নিয়ে তার মামাশ্বশুরের বাড়ি তাড়াহি (অমরপুর) যায় এবং সেখানেও তল্লাশি চালায় (সেখানে বিনোদের স্ত্রী অরুণা দেবী বিয়ের নিমন্ত্রণে গিয়েছিলেন)। সেখানেও কিছুই না পেয়ে পুলিশ বিনোদকে কহলগাঁও থানায় নিয়ে যায়। এরমধ্যে শম্ভুগঞ্জ থানার পুলিশ বিনোদের শ্বশুরবাড়ি কুমারডি গ্রামে যায় তল্লাশি নিতে কিন্তু কিছুই পায়নি।
১১ জুলাই কহলগাঁও পুলিশ বিনোদের বাবা মনোজকে একটি কাগজে সই করিয়ে বিনোদকে বাড়িতে নিয়ে যেতে দেয়। আসলে ৭ থেকে ১১ জুলাই পুলিশ বিনোদকে পাশবিকভাবে পেটায়। বাবা মনোজকে ১০ জুলাইয়ের আগে ছেলে বিনোদের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। একজন গ্রামবাসী সন্তোষ দাস বলেন থানা থেকে বাড়ি ফেরার পর বিনোদ হাঁটতে পর্যন্ত পারছিলেন না। অমরপুরের একজন চিকিৎসক ডঃ বি কে তেওয়ারী তার চিকিৎসা করা সত্ত্বেও অবস্থার কোন উন্নতি না হওয়ায় তাকে ভাগলপুরের মায়াগঞ্জ হাসপাতালে রেফার করা হয়। সেখানে ২০ জুলাই বিনোদের মৃত্যু হয়।
সিপিআই(এমএল) টীম রাজায়ুঁ থানায় তথ্য সংগ্রহে গেলে থানা ইনচার্জের দেখা পাওয়া যায়নি। গ্রামবাসীরা ২১ জুলাইয়ের ঘটনার প্রতিবাদে ঘন্টার পর ঘন্টা প্রধান সড়ক অবরোধ করেন। রাজায়ুঁ থানা এরফলে মনোজ দাসের আবেদনের ভিত্তিতে এফআইআর গ্রহণ করে।
পরবর্তীতে সিপিআই(এমএল) নেতা মুকেশ মুক্ত বিনোদের স্ত্রী অরুণা দেবী ও তার তিন বছরের পুত্রের সাথে ও অরুণা দেবীর ভাইয়ের সাথে দেখা করেন। অরুণা বলেন তাঁর চকসাফিয়ার শ্বশুরবাড়িতে ১২ জুলাই বিনোদকে দেখেন অত্যন্ত জখম অবস্থায়। বিনোদ বলেন তাকে পুলিশ বিনাদোষে পাশবিক ভাবে মেরেছে। তার শরীরে অনেক আঘাতের চিহ্নও দেখা যায় এবং সে ২০ জুলাই মায়াগঞ্জ হাসপাতালে মারা যায়।
তদন্তকারী টীমের নিরীক্ষা
চকসাফিয়াবাসী ২৬ বছরের যুবক বিনোদ কুমার দাসের মৃত্যু হয়েছে পুলিশের নির্মম মারে। ৭ জুলাই রাত (যখন পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে) থেকে ১১ জুলাই (যেদিন পুলিশ তাকে তার বাবার হাতে তুলে দেয়) পুলিশ বিনোদের হাত-পা বেঁধে নির্দয় ও অমানবিকভাবে মারে। যখন সে অর্ধমৃতপ্রায় এবং কোনও কিছুই তার বিরুদ্ধে প্রমাণ করতে না পেরে তার দেহ হাতে তুলে দেয়। রাজায়ুঁ থানার বড় অফিসার ও অন্যান্য পুলিশকর্মীরা তার মৃত্যুর জন্য দায়ী। তার বাবা মনোজ দাসকে পুলিশ ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করেছে। এটি একটি পরিষ্কার খুনের ঘটনা।
উত্তরবিহীন প্রশ্ন
কহলগাঁও থানায় (চুরির অভিযোগে) এফআইআর দায়ের করা হয়েছিল অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। তাহলে পুলিশ ৬০ কিমি দূরে চকসাফিয়া গ্রামের দলিত যুবক বিনোদ কুমার দাসের নাম কীভাবে পেল? পুলিশের কাছে কি কোনও গ্রেপ্তারী পরোয়ানা ছিল? কিভাবেই বা পুলিশ তিনটি আলাদা ব্লকের (ভাগলপুরের কহলগাঁও, বাঁকার রাজায়ুঁ ও শুভগঞ্জ) তিনটি জায়গায় একই দিনে ৭ জুলাই হানা দেয়, তল্লাশি চালায়! তিনটি জায়গা হল মৃতের বাড়ি চকসাফিয়া, তার মামাশ্বশুরের বাড়ি তাড়দি ও তার শ্বশুরবাড়ি কুমারডি। কার হুকুমে পুলিশ এই পরাক্রম দেখালো? কোন উচ্চপদাসীন পুলিশ আধিকারিক এই কর্মকান্ডের আয়োজক ছিলেন?
সিপিআই(এমএল) দাবি তুলেছে
- কহলগাঁও থানার ইনচার্জসহ অন্যান্য দোষী পুলিশ কর্মীদের বরখাস্ত, গ্রেপ্তার এবং বিচার চাই। রাজায়ুঁ থানার ইনচার্জসহ অন্যান্য দোষী পুলিশ কর্মীদের বরখাস্ত কর এবং তাদের দুষ্কর্ম্মের তদন্ত চাই।
- বিনোদ দাসের স্ত্রী অরুণা দেবীর সরকারি চাকরি ও তাঁর পরিবারের পঞ্চাশ লক্ষ টাকার ক্ষতিপূরণ চাই।
- ভাগলপুর ও বাঁকা জেলার জেলাশাসক ও এসপি’কে এই ঘটনার জন্য দায়ী করে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে।