৩০ এপ্রিল পর্যন্ত আবার বাড়ানো হলো দেশব্যাপী লকডাউন। প্রায় সমস্ত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সাথে প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও কনফারেন্সে এই সিদ্ধান্ত আবার বিরাট অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দিল কোটি কোটি শ্রমজীবী জনতাকে। উচ্চ পর্যায়ের এই বৈঠকে ও ঘোষিত হলো না কর্মচ্যুত এই সুবিপুল জনসংখ্যার জন্য ন্যুনতম কোনো আর্থিক প্যাকেজ। লকডাউন পর্যায়ে তাঁদের ছাঁটাই করা চলবে না, তাঁদের সমস্ত মজুরি দেওয়ার সরকারী বিজ্ঞপ্তি নিয়োগকর্তারা ছেঁড়া কাগজে পরিণত করেছে। কিভাবেই বা তাঁরা ফিরবেন নিজ নিজ রাজ্যে তা নিয়ে ও কোনো উচ্চবাচ্চ নেই প্রশাসনের তরফ থেকে।
এর বিরুদ্ধে এবার বিক্ষোভ-প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। সুরাট হচ্ছে গুজরাটের বয়নশিল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিপুল সংখ্যক পরিযায়ী শ্রমিক সেখানে কর্মরত। লকডাউনকে ভেঙে বিশাল সংখ্যায় বয়ন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত পরিযায়ী শ্রমিক ৩০ মার্চ দাবি তোলে তাঁদের অবিলম্বে ওড়িশায় ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিতে হবে। এরপর, এপ্রিল ১১ বেশ কিছু শ্রমিক ফের লকডাউন উপেক্ষা করে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন তাঁদের বকেয়া মজুরি, নিজভূমে ফেরার অনুমতি, এবং নিম্নমানের খাদ্য সরবরাহের বিরুদ্ধে। তাঁদের আন্দোলন হিংসাত্মক চেহারা নেয়। পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তার ও করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কিছুদিন আগে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট বেশ কিছুটা বিস্ময় প্রকাশ করে বলে, পরিযায়ী শ্রমিকরা তো খেতে পারছে, তাঁদের টাকার কী প্রয়োজন। সেখানে খাদ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও বিচারপতিরা তা পাত্তাই দেয় না।
এদিকে, এ রাজ্যেও চটকল শ্রমিকেরা লকডাউন পর্যায়ে তাঁদের মজুরির দাবিতে সোচ্চার হচ্ছেন। বালি জুটের মালিক শ্রমিকদের মজুরি না দিয়ে উৎপাদিত মাল বার করতে গেলে শ্রমিকরা বাধা দিয়ে তা আটকে দেয়। থানায় থানায় বিক্ষোভ শুরু হয়েছে মজুরি প্রদানে সরকার, প্রশাসনকে অবিলম্বে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার দাবিতে।
লকডাউন যত দীর্ঘতর হচ্ছে, অনাহার-দারিদ্রের করাল ছায়া ততই গ্রাস করতে শুরু করেছে। এরপর, স্বতস্ফূর্ত শ্রমিকদের বিক্ষোভ এখন শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা।
এপ্রিলের ৬ তারিখের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ২৪ মার্চ রাত থেকে দেশব্যাপী লকডাউন শুরু হওয়ার পর পরিযায়ী শ্রমিক, বিশেষ করে নির্মাণ শ্রমিকদের চরম দুর্দশা ও বিপন্নতা নিয়ে জন সাহাস নামক এক এনজিও এক সমীক্ষা চালায় ৩,১৯৬ জন পরিযায়ী নির্মাণ শ্রমিকদের মধ্যে, টেলিযোগাযোগের মাধ্যমে। ২৭-২৯ মার্চ এই সমীক্ষা চালানো হয়। লকডাউন শুরু হওয়ার পর উল্লিখিত সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ শ্রমিক নিজ নিজ রাজ্যে ফিরে যেতে পারেননি। কর্পদকশূণ্য ওই সমস্ত শ্রমিকেরা পানীয় জল খাদ্য না পেয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন। ৪২ শতাংশ শ্রমিকরা জানায়, তাঁদের এক দিনের জন্য ও রেশন নেই। ২১ দিনের লকডাউন পর্যায়ে তাঁদের যে কী অবস্থা হবে তা ভেবে তাঁরা কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছেন না। ৬৬ শতাংশ শ্রমিক জানিয়েছেন, ২১ দিনের পর লকডাউন বজায় থাকলে, এক সপ্তাহের বেশি তারা তাদের প্রাত্যহিক জীবনের খরচ চালাতে পারবেন না।
যারা যারা নিজের নিজের এলাকায় ফিরে যেতে পেরেছেন, সেখানে রেশন বা আয় না থাকায় চরম অভাব অনটনে দিন গুজরান করতে হচ্ছে।
সমীক্ষা আরও জানাচ্ছে, ৯৪ শতাংশ নির্মাণ শ্রমিকরা কল্যাণ বোর্ডের সদস্য নন, নেই তাঁদের পরিচয় পত্র। তাই ওই তহবিল থেকে নির্মাণ শ্রমিকদের জন্য এককালীন যে আর্থিক অনুদান ঘোষণা করা হয়েছে সেখান থেকেও তাঁরা বঞ্চিত হবেন। ৩১ শতাংশ শ্রমিকরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঋণ নিয়েছেন সুদখোরের কাছ থেকে, ব্যাঙ্ক থেকে যে সুদের হার তিন গুণ বেশি। এছাড়া, ৭৯ শতাংশ শ্রমিক, যারা ঋণ নিয়েছেন, তাঁরা অদূর ভবিষ্যতে তা পরিশোধ করতে পারবেন কিনা সে ব্যাপারে রীতিমতো সন্দিহান।
সমীক্ষায় সাক্ষাৎকার নেওয়া প্রায় সমস্ত নির্মাণ শ্রমিকরাই সংকট সামাল দিতে আশু রেশন সরবরাহ, মাসিক আর্থিক অনুদান চেয়েছেন। ৮৩ শতাংশ শ্রমিক জানেন না যে ২১ দিন লকডাউনের পর (এখন তো তা বেড়ে গোটা এপ্রিল মাস পর্যন্ত চলবে) তাঁরা আদৌ কাজ পাবেন কিনা। ৮০ শতাংশ শ্রমিক মনে করেন যে ২১ দিন লকডাউনের পর তাঁদের পরিবারকে অনাহারে দিন কাটাতে হবে।
দেখা যাচ্ছে, ৫৫ শতাংশ শ্রমিকেরা দৈনিক ২০০- ৪০০ টাকা আয় করে চারজনের পরিবারকে চালায়। আর, ৩৯ শতাংশ দৈনিক আয় করেন ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা। বিরাট সংখ্যক শ্রমিকেরা ন্যুনতম মজুরি আইন কর্তৃক নির্দ্ধারিত মজুরি থেকে বঞ্চিত। এদিকে সরকারী এক তথ্য জানাচ্ছে, নির্মাণ ক্ষেত্র জাতীয় আয়ে অবদান রাখে ৯ শতাংশ। কৃষিকাজের পর এখানেই দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ শ্রমশক্তি নিয়োজিত। ৫ কোটি ৫০ লক্ষ দৈনিক মজুরি প্রাপ্ত মজুর এখানে জীবন নির্বাহ করেন। ফি বছর ৯০ লক্ষ মানুষ গ্রামীণ ক্ষেত্র থেকে শহরাঞ্চলে কৃষি কাজের খোঁজে ছুটে যায়।
এই বিপুল জনসংখ্যা আমাদের দেশে নিরন্তর গড়ে তুলছেন একের পর এক পরিকাঠামো – ফ্লাইওভার, সেতু, মেট্রোর সুবিশাল কর্মকান্ড, গগনভেদী অট্টালিকা, প্রশস্থ হাইওয়ে, আরো কত কিছু। নিদারুণ বঞ্চনার মধ্যে, দিনের পর দিন, বছরের পর বছর এরা হাড় ভাঙা পরিশ্রম করে যে চোখ ধাঁধানো সভ্যতা নির্মাণ করে, তাঁদেরই সবচেয়ে নীচে, পশচাতে ঠেলে রেখেছে আমাদের সরকার, আইন আদালত, রাষ্ট্র।
লকডাউন আজ এদের বিরাট অনাহারের অন্ধকার জগতে নিক্ষিপ্ত করেছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মুখর হওয়া আজ সময়ে দাবি।