সীমান্ত অঞ্চলের মানুষেরা এক নেই রাজ্যের বাসিন্দা

not-residents-of-the-same-state

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবাসীরা দেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকার, আইনের শাসনের কাঁটাতারের সীমানার বাইরে মরে বেঁচে আছেন। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত অঞ্চল আজ কেন্দ্রীয় সরকারের বিএসএফ, রাজ্য সরকারের পুলিশ-প্রশাসন এবং শাসক দলের লুম্পেনদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। ভোট আসে ভোট যায়, কেন্দ্র-রাজ্যের সরকার পাল্টায় কিন্তু সীমান্তবাসীদের উপর প্রতিদিন ঘটে চলা বেআইনি, অমানবিক, অসাংবিধানিক কর্মকাণ্ডের অবসান হয় না।

সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা বলতেই বেশীরভাগ মানুষের ধারণা ওরা চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত। ঘটনাটা সত্যি না হলেও এটা ঠিক যে, বিএসএফ-পুলিশ প্রশাসন এবং শাসক দলের গুন্ডার পক্ষ থেকে ঐ এলাকার মানুষদের অনেককে চোরা কারবারে নামতে বাধ্য করা হয়। এর পেছনে চলে এক নিরন্তর প্রক্রিয়া। আর্থিক অস্বচ্ছলতা, অসম্মানকে উপেক্ষা করে সততার সাথে বাঁচতে চাইলেও তাঁদেরকে বহু বাধার সম্মুখীন হতে হয়। প্রতিবাদ করতে গেলে হয় মেরে লাশ গুম করে দেওয়া হয়, না হয় মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে জেলে পুরে দেওয়া হয়।

মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’এর সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে ঐ সকল সীমান্তবাসীদের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা নিয়ে কাজ করে আসছেন। অনতি অতীতে তাঁরা কলকাতা প্রেসক্লাবে ও ত্রিপুরা হিতসাধনি হলে সীমান্তবাসীদের নিয়ে এসেছিলেন তাঁদের জীবন যন্ত্রণার কথা শোনাতে। অল ইন্ডিয়া ল’ ইয়ার্স এ্যাসোশিয়েশন ফর সোশ্যাল জাস্টিস ‘আইলাজ’কে সেখানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সীমান্তবাসীদের নিদারুণ অভিজ্ঞতার কথা শুনে আঁতকে উঠতে হয়, ৭৬ বছরের স্বাধীন ভারতবর্ষে এমনটাও হয়?

সীমান্ত

ভারত-বাংলাদেশের সীমান্ত ৪০৯৬ কিলোমিটার বিস্তৃত। এরমধ্যে বেশিরভাগটাই আছে পশ্চিমবাংলায়, যার পরিমাণ ২২১৭ কিলোমিটার। আসাম বাংলাদেশ সীমান্ত ২৬২ কিলোমিটার। মিজোরাম বাংলাদেশ সীমান্ত ৩১৮ কিলোমিটার। ত্রিপুরা বাংলাদেশ সীমান্ত ৮৫৬ কিলোমিটার। মেঘালয় বাংলাদেশ সীমান্ত ৪৪৩ কিলোমিটার। পশ্চিমবাংলার সীমান্ত এলাকার ভারতীয় নাগরিকরা বেশিরভাগই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর। মুসলিম, তপশিলি জাতি ও উপজাতিভুক্ত। মুর্শিদাবাদের রাণীনগর, লালগোলা; নদীয়ার বানপুর, করিমপুর, ধানতলা; উত্তর চব্বিশ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জ, হাসনাবাদ, গাইঘাটা; মালদার পঞ্চানন্দপুর, কালিয়াচক; কোচবিহারের দিনহাটা, সিতাই, শীতলকুচি হলদিবাড়ি; দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট বা হিলি; উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জ বা গোয়ালপোখর; জলপাইগুড়ির বেড়ুবাড়ি অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষেরা মনে করেন তারা ভারতবর্ষে থেকেও বিদেশি। সংবিধানের মৌলিক অধিকার, প্রশাসনের পরিকাঠামো, সরকারি কার্যকলাপ, জীবন-জীবিকা, পরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য — কোনও কিছুই এদের জন্য না। এরা যেন এক নেই সাম্রাজ্যের বাসিন্দা। অথচ নেপাল, ভুটানও তো ভারতের প্রতিবেশী দেশ, সেখানকার সীমান্তে এই হিংস্রতা চোখে পড়ে না। সেখানকার সীমান্তে বিএসএফ নেই, সেখানে সীমান্ত প্রহরার দায়িত্বে আছে সশস্ত্র সীমা বল (এসএসবি)। এই প্রতিবেশী দেশগুলিতে যাতায়াতের জন্য পাসপোর্ট, ভিসারও কোন প্রয়োজন হয় না। এই দেশগুলির মানুষ অবাধে আসা যাওয়া করছেন, ব্যবসা বাণিজ্য করছেন। সেই সব সীমান্তে বিএসএফ, পুলিশ প্রশাসন বা শাসক দলের গুন্ডাদের দাপাদাপি লক্ষ্য করা যায় না। ১৯৭১ সাল থেকে বাংলাদেশ ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্র বলেই ঘোষিত। তা সত্ত্বেও প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এমনটা কেন হচ্ছে তার কোন সদুত্তর নেই।

আমরা বেশিরভাগ মানুষই মনে করি সীমান্তে কাঁটাতারের ওপারেই বাংলাদেশ। আসলে তা নয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কাঁটাতার হওয়া উচিত প্রকৃত সীমান্তের International Border pillar (IBP) থেকে ১৫০ গজের মধ্যে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশ সীমান্তে খুব কম জায়গা আছে যেখানে সীমান্ত থেকে কাঁটাতারের দূরত্ব ১৫০ গজ। অনেক জায়গাতেই দেখা যায় ৫০০ মিটার থেকে ১ কিলোমিটার, এমনকি ৫ কিলোমিটার থেকে ১০ কিলোমিটারও অতিক্রম করেছে। ফলে কাঁটাতারের ওপাশে হাজার হাজার ভারতীয় সীমান্তবাসীর জায়গা জমি রয়েছে। এমনকি হাজার হাজার মানুষের ঘর বাড়িও রয়েছে। আনুমানিক ৫০ হাজারেরও বেশী পরিবার এরকম এলাকায় থাকেন। কাঁটাতার বসানোর আগে তাঁদের কথা ভাবা হয়নি, নেওয়া হয়নি তাঁদের মতামত। কাঁটাতার বসানোর সময় বলা হয়েছিল সীমান্তবাসীদের যাতায়াতের জন্য ১২ ঘণ্টা গেট খুলে রাখা হবে। জমিতে চাষের বা যাতায়াতের কোন অসুবিধা হবে না। গরীব চাষিরা সেসময় সেসব কথায় বিশ্বাস করেছিলেন।

সীমান্তবাসীদের কাছ থেকে জমি নেওয়া হয়েছিল কাঁটাতার বসানোর জন্য। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জমি দাতারা land losser হিসাবে নথিভুক্ত হন। এই জমি দাতাদের প্রদত্ত জমির সমমূল্যের ক্ষতিপূরণ দান করা এবং সরকারি চাকরি পাওয়ার বিশেষ সুবিধা প্রদান করা হবে বলে ঘোষণা করা হয় (পশ্চিমবঙ্গ সরকার শ্রমদপ্তর বিজ্ঞপ্তি নাম্বার 301-EMP/IM-10/2000, Para- 3, point number 3[2])। কিন্তু তা আজও সার্বিক ভাবে বাস্তবায়িত হয়নি, বহু মানুষ আজও সরকারি দপ্তরে মাথা খুঁটে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

the-people-of-the-border-region

বিএসএফের দৌরাত্ম

সীমানার গেট ১২ ঘণ্টা খুলে রাখা হবে, কাঁটাতার বসানোর সময়কার এই প্রতিশ্রুতিকে উপেক্ষা করে কিছুদিন পর থেকে শুরু হল নয়া রুটিন। সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৪টের মধ্যে দিনে তিনবার এক ঘণ্টা করে গেট খুলে রাখা হল। সকাল ৭টা থেকে ৮টা, দুপুর ১২টা থেকে ১টা, বিকেল ৩টে থেকে ৪টে — অর্থাৎ ১২ঘণ্টার জায়গায় খেপে খেপে মোট ৩ঘণ্টা। কাঁটাতারের ওপারের মানুষদের বাজারহাট, ডাক্তার দেখানো, আত্মীয় স্বজনের বাড়ি যাতায়াত — সবই ঐ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে করতে হয়। আপৎকালীন অসুস্থতার জরুরি প্রয়োজনেও কোনও ছাড় নেই, সে সময়েও গেট খোলা হয় না। ঐ সব এলাকায় অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের যাওয়া আসার ক্ষেত্রেও বিএসএফের পক্ষ থেকে নানা বাধার সম্মুখীন হতে হয়। ফলে তাঁরাও যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। আর এরফলে ঐ সকল অঞ্চলের প্রসূতি মায়েদের এবং শিশুদের সুচিকিৎসা বা দেখভালের বিষয়টা অত্যন্ত অবহেলিত থেকেই যাচ্ছে। এমনই অবস্থা যে, ঐ সকল অঞ্চলের বাসিন্দাদের সঙ্গে কাঁটাতারের এপারের বাসিন্দাদের মধ্যে বিয়ের সম্পর্ক পর্যন্ত হয় না। কারণ ঐ যাতায়াতের বিধিনিষেধ। ঐ অঞ্চলে বিয়ে বা কোনো অনুষ্ঠানের নেমন্তন্নে গেলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফিরে আসতে হয়, কারা যাচ্ছে তার নামের তালিকা বিএসএফ’কে জানাতে হয়।

কাঁটাতারের এপারের বহু মানুষের চাষের জমি ঐ অঞ্চলে আছে। তাঁদেরও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চাষ আবাদ করে ফিরে আসতে হয়। তাঁরা কী ধরনের ফসল ফলাবেন সেটাও ঠিক করে দেয় বিএসএফ’রা। ভোটার কার্ড, আধার কার্ড থাকলেও বিএসএফ আলাদাভাবে পরিচয়পত্র দিচ্ছে যা নিয়ে চলা ফেরা করতে হয়। ভারতীয় সংবিধানের ১৯ ও ২১নং অনুচ্ছেদ ভারতীয় নাগরিকদের দেশের যেখানে ইচ্ছা যাওয়ার স্বাধীনতা বা অধিকার দিলেও সীমান্তবাসীদের ক্ষেত্রে তাকে মান্যতা দেওয়া হয় না। ওখানে বিএসএফ’ই শেষ কথা। সেইসব জমি তাঁরা অভাবের তাড়নায় বেচতেও পারেন না। কারণ কেউ সেই জমি কেনে না। কেউই সীমান্তের জমি কিনে নিজের লোকসান বাড়াতে চান না। তাহলে তাঁরা করবেন কী? খাবেন কী? বাঁচবেন কীভাবে? তাই অনেকে সীমান্ত এলাকা থেকে অন্য রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে চলে যাচ্ছেন। গ্রামে মহিলা, শিশু আর বৃদ্ধ বৃদ্ধারাই পড়ে থাকেন আর তাদের উপর চলে বিএসএফের নির্যাতন। মানুষদের অকারণে মারধোর করা, চলাচলে বাধা দেওয়া, গালাগাল দেওয়া, মহিলাদের শ্লীলতাহানি করা, ঘরদোর ভাঙ্গা — এসব ঐ অঞ্চলের প্রতিদিনকার ঘটনা।

চোরা কারবার প্রসঙ্গে

সীমান্তে যদি চোরা কারবার বা পাচার বন্ধ হয়ে যায় তাহলে সব চাইতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিএসএফ, পুলিশ-প্রশাসন ও শাসক দলের লুম্পেনরা। একটা বড় নেক্সাস বা পারস্পরিক অসুভ আঁতাতের মাধ্যমে এই চক্র প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টাকার তোলা তুলছে। তার ভাগ নীচ থেকে ওপর — নানা সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নিচ্ছে। এই পাচারের জন্য বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট জায়গা আছে, যেখান দিয়ে টাকার বিনিময়ে দিনের আলোয় গরু, মানুষ পাচার চলছে। ১০/১২ বছরের মেয়েদের দালাল মারফত ভারতে নিয়ে এসে দিল্লী, মুম্বাই, পুনের নিষিদ্ধ পল্লীগুলিতে পাচার করা হচ্ছে। এপারের বিএসএফ আর ওপারের বিজিবি দুটো বাহিনীই দুর্নীতিগ্রস্ত। ৫ ফুট উচ্চতার গরু পার হয়ে যায় — কেউই নাকি দেখতে পায় না। এই সকল গরুগুলি এ’রাজ্যেরও না। এদেরকে আনা হচ্ছে রাজস্থান, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, বিহার থেকে। এই হাজার হাজার গরু বড় বড় লরি বা ট্রাকের মাধ্যমে এতগুলো রাজ্যের চেক পোস্ট পার করে এ’রাজ্যের সীমান্তে পৌঁছে যাচ্ছে — এগুলো পুলিশ প্রশাসনের চোখে পড়ে না! আসলে এই পাচারের সাথে যুক্ত প্রতিটি রাজ্যের পুলিশের ডিজি, জেলাগুলির এসপি, থানাগুলির ওসি এবং রাজনৈতিক দলের নেতা মন্ত্রীরা। শুধুমাত্র গরু পাচারের ফলে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা কাটমানি হিসেবে আয় হচ্ছে — যার বখরা কলকাতা থেকে দিল্লী পর্যন্ত যাচ্ছে।

মাঝে মধ্যে সীমান্ত রক্ষীবাহিনীকে ‘কঠোর’ প্রহরার কাজ দেখাতেই হয়। সীমান্তের গরিব মানুষদের দিয়ে দৈনিক ৩০০ বা ৪০০ টাকার বিনিময়ে পাচার করানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। কে নিজের ইচ্ছায় এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে চায়? কিন্তু তাও কেউ কেউ পেটের তাড়নায় বাধ্য হয়ে সেই কাজকে পেশা বলে গ্রহণ করছে। এর কারণ, সীমান্ত এলাকাগুলির ভয়াবহ দারিদ্র। সরকারি প্রকল্পের কোনও সুযোগ এদের জন্য নেই। সীমান্ত এলাকায় বেশিরভাগ মানুষের বাড়িতে শৌচালয় পর্যন্ত নেই। রাজ্য সরকারের কৃষক বন্ধু প্রকল্প, খাদ্যসাথী প্রকল্প, নিজ ভূমে নিজ গৃহ প্রকল্প, কর্মসাথী প্রকল্প, নিজশ্রী হাউজিং প্রকল্প, স্নেহালয় প্রকল্প, সুফল বাংলা প্রকল্প, উৎকর্ষ বাংলা প্রকল্প, যুবশ্রী প্রকল্প পশ্চিমবাংলার সীমান্তে কাজ করে না। এছাড়াও কেন্দ্রীয় সরকারের আরো গুচ্ছ গুচ্ছ প্রকল্প আছে। তাতে কোটি কোটি টাকাও আছে। শুধু সীমান্তে এইসব প্রকল্প কার্যকরী হয় না। হলেও বিশেষ কিছু মানুষের জন্য হয়। রাস্তা নেই, বিদ্যুৎ নেই, স্বাস্থ্য পরিষেবা নেই, চাকরী নেই, উন্নয়ন নেই। আছে বলতে বিএসএফের নির্যাতন, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা, প্রশাসনের অন্ধত্ব, পরনির্ভরতা। আর বাঁচার রাস্তা একমাত্র যেন চোরাকারবার। তাদের কয়েকজনকে মাঝে মধ্যে বিএসএফ গুলি করে হত্যা করে। পরদিন সংবাদ মাধ্যমে ছোট খবর হয় ‘সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর গুলিতে পাচারকারী হত’। ব্যাস, এর কোনো তদন্তও হয় না। পুলিশ, গ্রামের মানুষের অভিযোগ বা এফআইআর নিতে চায় না। আর যদিও বা মৃত পরিবারের চাপে বা মানবাধিকার সংগঠনের চাপে তদন্ত হয় তাহলে দেখা যাবে যারা হত্যা করেছে তাদেরকেই তদন্তের ভার দেওয়া হয়েছে। ফলে তদন্তের পরিণতি যা হওয়ার তাই হয়। গ্রামবাসীর তথ্য অনুযায়ী এইসব অঞ্চলে বছরে প্রায় ২০০ মানুষকে হত্যা বা গুম করা হয়। আরো ভয়ঙ্কর বিষয় সীমান্তবাসীরা এইসব অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে উচ্চ পর্যায়ে অভিযোগ জানালে বিএসএফ বাহিনী পরের দিন থেকেই অভিযোগকারীদের বাড়ি বাড়ি হামলা চালায়। হুমকি দেওয়া হয় NDPS (Narcotics Drugs Psycotropic Substance) কেসে ফাঁসিয়ে জেলে ভরে দেওয়ার।

বাস্তবে সীমান্ত এলাকার গ্রামগুলিতে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা কিছু নেই বললেই চলে। এই এলাকাগুলিতে মানুষের জীবন-জীবিকা, শান্তি, আইনশৃঙ্খলা, খেলাধুলা সব কিছুই নিয়ন্ত্রণ করছে বিএসএফ। ১৯৭৩ সালের পঞ্চায়েত আইনের ১৬খ ধারা অনুযায়ী নিয়মিত গ্রামসভার মিটিং হওয়ার কথা। কিন্তু সীমান্ত এলাকায় তা হয় না। পঞ্চায়েত আইনের ১৯/২ঘ ধারায় নির্দিষ্ট গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীনে সকল রাস্তাঘাট, তার রক্ষণাবেক্ষণ এবং চলাচলের বাঁধা অপসারণ করা পঞ্চায়েতের দায়িত্ব। কিন্তু সীমান্তবর্তী পঞ্চায়েত এলাকায় একমাত্র পাকা রাস্তাটি বিএসএফের দখলে। এই সকল বিষয়ে সাধারণ মানুষের প্রচুর অভিযোগ আছে। কিন্তু কোনও সুরাহা হয়না। এমনও দেখা গেছে সীমান্ত এলাকায় পঞ্চায়েত কোন কাজ করতে গেলে সেখানেও তাদের সীমান্তরক্ষী দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হতে হয়। কেউ যদি এইসব বাধার ব্যাপারে প্রশ্ন তোলে বলা হয় ১৪৪ ধারা জারি আছে। এই ১৪৪ ধারা জারি করছে জেলা শাসক বা কোথাও কোথাও মহকুমা শাসকও। ফৌজদারী আইনের ১৪৪ ধারায় পরিষ্কার ভাবে উল্লেখ করে বলা আছে এই আইন টানা ৬০ দিনের বেশী প্রয়োগ করা যাবে না, কিন্তু সীমান্ত এলাকায় প্রতি ৫৯ দিনের মাথায় পরবর্তী আরো ৬০ দিনের জন্য এই আইন প্রণয়নের নির্দেশ জেলাশাসক বা মহকুমা শাসকের দপ্তর থেকে এসে যাচ্ছে। এই বিষয়ে আবার সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট নির্দেশিকা জারী করেছে। কোনভাবেই কোন এলাকায় লাগাতার এই ধারা প্রয়োগ করা যাবে না। মানুষের চলাফেরা, মত প্রকাশের অধিকার — এগুলি সাংবিধানিক অধিকার; কেবলমাত্র জরুরি পরিস্থিতিতে এই ধারা স্বল্পকালের জন্য প্রয়োগ করা যেতে পারে। সংবিধানের ১৪১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের আদেশ আমাদের দেশের আইন। সরকার এবং জনসাধারণ সকলেরই তা মান্য করা উচিত। অথচ যারা এই নির্দেশ দিচ্ছেন তারা একবারও সেই সীমান্ত এলাকার মানুষদের সাথে আলোচনা করছেন না। তাদের সমস্যার কথা জানার চেষ্টা করছেন না। দিল্লীর নর্থ ব্লক বা পশ্চিমবঙ্গের নবান্ন থেকে রাজ্যের উন্নয়নের জন্য প্রতিবছর যে লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ হয় তা দেশের সীমান্তে পৌঁছানোর আগেই ফুরিয়ে যায়।

border-region

বিএসএফের এক্তিয়ার সীমান্ত থেকে ৫০ কিলোমিটার বাড়ানো হল

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে গত ১১ অক্টোবর ২০২১ তারিখে একটি নির্দেশনামায় ঘোষণা করা হয় যে, পশ্চিমবঙ্গ অসম ও পাঞ্জাবের সীমান্তে বিএসএফের কর্মক্ষেত্র সীমান্ত থেকে ৫০ কিলোমিটার বাড়ানো হল। এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কোনো রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা হল না। এমনিতেই সীমান্ত (IBP) থেকে প্রায় ১০-১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বিএসএফের দখলে দৌরাত্ম্য চলে বা এই এলাকাগুলি কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে। এই ঘোষণার ফলে একদিকে যেমন বিএসএফের দৌরাত্ম্যের — যাকে খুশি মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করা, তল্লাশির নামে বাড়ীঘর ভাঙ্গচুর করা, মালপত্র আটক করা, মহিলাদের শ্লীলতাহানি করা ইত্যাদি — এলাকা প্রসারিত হবে, অন্যদিকে রাজ্যের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়বে। মনে রাখা দরকার পশ্চিমবঙ্গের ভুখন্ডের প্রায় এক তৃতীয়াংশ এর মধ্যে পড়ছে। এই ৫০ কিলোমিটার বাড়ানোর পিছনে কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও আছে। এটা এই পুরো এলাকাটাকে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন করার পরিকল্পনা ছাড়া আর কিছুই না। ৫০ কিলোমিটার বাড়ানোর ফলে পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, উত্তর এবং দক্ষিণ দিনাজপুর, নদীয়া, উত্তর ২৪ পরগণা জেলার অধিকাংশ, মালদা, মুর্শিদাবাদ জেলার বেশীরভাগ অংশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আওতায় পড়ছে। ফলে এরপর থেকে শুধুমাত্র সীমান্তবাসী নয়, শহরাঞ্চলের মানুষকেও বিএসএফের বিপদের মুখোমুখি হতে হবে। যদিও ইতিবাচক যে, ইতিমধ্যে পাঞ্জাব এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকার ঐ ঘোষণাকে মান্যতা দেবে না বলে তাদের সরকারি সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে।

সীমান্তবাসীদের আক্ষেপ যে এই লক্ষ কোটি মানুষের প্রতিদিনকার এই ভয়ঙ্কর সমস্যা নিয়ে কোনো রাজনৈতিক দলই এজেন্ডা করে না। নতুন নতুন সরকার আসে যায় কিন্তু তাঁদের জীবনে কাটে না আঁধার, আসে না নতুন ভোর।

আশার আলো, এই সমস্ত রকমের নির্যাতনের বিরুদ্ধে সীমান্তবাসীরা বিভিন্ন জেলায় নিজেদেরকে সংগঠিত করছেন ‘আমরা সীমান্তবাসী’ সংগঠন গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে। আমাদেরও উচিত সাধ্যমত তাঁদের পাশে দাঁড়ানো।

(তথ্য সূত্রঃ ‘মাসুম’ কর্তৃক প্রকাশিত পুস্তিকা ও ‘আমরা সীমান্তবাসী’র সংগঠকদের সাথে কথোপকথন)

- দিবাকর ভট্টাচার্য্য

Published on 17 May, 2024