বিনোদ মিশ্র (২৪ মার্চ ১৯৪৭ – ১৮ ডিসেম্বর ১৯৯৮)
জন্ম ২৪ মার্চ ১৯৪৭, মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুরে এক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে। কানপুরে স্কুল-কলেজের পাঠ চুকিয়ে ১৯৬৬ সালে দুর্গাপুরে এলেন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে। হয়ে উঠলেন সিপিআই(এমএল)-এর সর্বক্ষণের কর্মী। ১৯৭০ দশকের ধাক্কার পর পার্টিকে তৃণমূল থেকে নতুন করে গড়ে তোলার কাজে হাত লাগান এবং ১৯৭৪ সালের ২৮ জুলাই কমরেড জহরের সাথে মিলে কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠন করেন। ১৯৭৫-এর নভেম্বরে জহর শহীদ হওয়ার পর সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৭৮ সালে শুদ্ধিকরণ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পার্টির রাজনৈতিক-সাংগঠনিক অগ্রগতির এক নতুন যুগের সূচনা ঘটান। ১৯৯২ সালের ৮ ডিসেম্বর কলকাতায় বিশাল ব্রিগেড সমাবেশে প্রকাশ্যে আসেন ব্যাপক বাম ও কমিউনিস্ট ঐক্যের আহ্বান নিয়ে। ১৯৯৮-এর ১৮ ডিসেম্বর লক্ষ্ণৌতে কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক চলাকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
বাংলা সংস্করণ : প্রকাশকের কথা
কমরেড বিনোদ মিশ্রের নির্বাচিত রচনা সংগ্রহের (ইংরাজি) বঙ্গানুবাদ প্রকাশ করা হল। কমরেড তাঁর সক্রিয় রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গ থেকে এবং শেষ পর্যন্ত তিনি এই রাজ্যে পার্টির কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, স্বাভাবিকভাবেই রাজ্য-রাজনীতির বিভিন্ন দিক সম্পর্কে তাঁর বহু গুরুত্বপূর্ণ লেখা ও ভাষণ রয়েছে। এ থেকে প্রতিনিধত্বমূলক কয়েকটিকে নিয়ে এক নতুন অধ্যায় আমরা বাংলা সংস্করণে যোগ করেছি। সেই সঙ্গে পার্টি গঠন অধ্যায়ে আরও দুটি লেখা – পার্টি সংগঠনকে শক্তিশালী করুন (জানুয়ারি ১৯৭৮) এবং বিলোপবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে চলুন, ঊর্ধ্বে তুলে ধরুন পার্টির স্বাধীন পতাকা (এপ্রিল ১৯৮৮) – যুক্ত হয়েছে। ইংরাজি সংস্করণ থেকে বাদ পড়েছে কেবল বিহার নির্বাচন সম্পর্কে দুটি লেখা।
সিপিআই(এমএল) প্রকাশনা
প্রথম প্রকাশ : বাংলা : জুন ১৯৯৯
পরিবেশক : দেশব্রতী প্রকাশনা
২১/১/১ ক্রীক রো, কলকাতা - ৭০০০১৪
এই বইটি কমরেড বিনোদ মিশ্রের প্রতিনিধি-স্থানীয় রচনাসমূহের এক নির্বাচিত সংকলন। রচনাগুলি মুখ্যত চারটি উৎস থেকে গ্রহণ করা হয়েছে : বিভিন্ন পার্টি সম্মেলনে ও কংগ্রেসে উপস্থাপিত ও গৃহীত দলিলসমূহ; পার্টির মুখপত্রগুলির জন্য লেখা প্রবন্ধসমূহ – যার অধিকাংশই ইংরাজিতে লেখা – যদিও কয়েকটি হিন্দি এবং বাংলাতেও রচিত; প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার সমূহ এবং পার্টি থেকে প্রকাশিত পুস্তক ও পুস্তিকাসমূহের মুখবন্ধ; বিভিন্ন সেমিনার, কনভেনশন, আন্তঃপার্টি সভা ও জনসভা এবং পার্টি স্কুল ও কংগ্রেসে প্রদত্ত অসংখ্য ভাষণ। জরুরি অবস্থার পরবর্তীকালে শুদ্ধিকরণ আন্দোলনের সময়ে যখন পুনর্গঠিত পার্টি বিভিন্ন গণ-রাজনৈতিক উদ্যোগ নিতে থাকে তখন থেকে শুরু করে আইপিএফ আমলে যখন গোপন পার্টি এক প্রকাশ্য ও বহুমাত্রিক সর্বভারতীয় রাজনৈতিক ফ্রন্টের মতাদর্শগত-রাজনৈতিক কেন্দ্র তথা সাংগঠনিক মেরুদণ্ডের ভূমিকা পালন করছিল সেই পর্যায় হয়ে ১৯৯২-এর ডিসেম্বরে কলকাতায় অনুষ্ঠিত পঞ্চম কংগ্রেসে পার্টির প্রকাশ্যে আসার পরবর্তী শেষ ছয় বছর পর্যন্ত এক দীর্ঘ সময়কাল এখানে বিধৃত রয়েছে।
মার্কসীয় তত্ত্ব ও অনুশীলনের যে সুবিস্তীর্ণ জগতে বিনোদ মিশ্রের পদচারণা, তার কিছুটা আভাস দেওয়াই এই নির্বাচিত সংকলনের উদ্দেশ্য। এক ডজনেরও বেশি শাখায় বিধৃত এই রচনাগুলি বিনোদ মিশ্রের স্বপ্নের ভারতের বাণীরূপ দিয়ে শুরু করা হয়েছে এবং শেষ করা হয়েছে তাঁর পরমপ্রিয় পার্টির প্রতি উদাত্ত আহ্বান দিয়ে। একটি মাত্র খণ্ডের মধ্যে বাছাই পর্বকে সীমিত রাখার বাধ্যবাধকতার জন্য অন্তর্ভুক্ত প্রতি বিষয়েই কমপক্ষে চার থেকে পাঁচটি লেখা বাদ পড়ে গেছে। হিন্দি পত্রিকা “শ্রমিক সলিডারিটি” ও “সমকালীন জনমত” এবং ইংরাজি সাময়িকী “ভয়েস অফ অলটারনেটিভ” ও “পিপলস ফ্রন্ট”-এ প্রকাশিত তাঁর সমস্ত রচনাগুলিই বাইরে থেকে গেছে, বাদ গেছে পার্টি সম্মেলন ও কংগ্রেসগুলিতে গৃহীত নানা দলিলসমূহের বিস্তৃত অংশগুলি, কেন্দ্রীয় কমিটি ও পলিটব্যুরোর সভার কার্য-বিবরণী ও আরও বেশ কিছু লিখিত নথি।
তৎসত্ত্বেও বর্তমান সংকলন থেকে বিশটি উত্তাল বছর জুড়ে পার্টি-তরণীর কাণ্ডারী হিসেবে বিনোদ মিশ্রের বৌদ্ধিক সৃষ্টির যে বিশাল পরিসর ও বৈচিত্র্য, পাঠকরা তার এক স্পষ্ট ধারণা পাবেন। তদুপরি, তাঁর প্রতিটি রচনায় – তা সে ‘আমার স্বপ্নের ভারত’-এর মতো ভিন্নধর্মী লেখায় হোক কিংবা লিবারেশন ও এম-এল আপডেটের সম্পাদকীয় নিবন্ধেই হোক – যা অনবদ্যভাবে বিম্বিত হয় তা হল প্রখর সৃজনশীল প্রেরণা।
১৯৭০ ও ১৯৮০-র দশকের গোড়ার দিকে গোপন ছাপাখানার জন্য যুদ্ধকালীন তৎপরপতায় এবং গোপন পার্টি জীবনের চরম অনিশ্চয়তা ও কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে হাতে লেখা দুষ্পাঠ্য পাণ্ডুলিপিগুলি এবং ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগে অপেক্ষাকৃত ধীরে সুস্থে এবং সময়বিশেষ সরাসরি কম্পিউটারে লেখা রচনাগুলিতে – তাঁর বৌদ্ধিক সৃষ্টিগুলির বস্তুগত পারিপার্শ্বিকতায় অনেক তারতম্যই ঘটেছে। কিন্তু সব সময়ই লেখা তাঁর কাছে ছিল শ্রেণীসংগ্রামের এক সচেতন ক্রিয়া আর লেখক বিনোদ মিশ্রের মধ্যকার সৃজনশীল প্রেরণা হিসেবে থেকেছে বিপ্লবী কমিউনিস্ট নেতা হিসেবে তাঁর অফুরন্ত উৎসাহ। মার্কসবাদের বিপ্লবী ঐতিহ্যের অনুক্রমে তিনি বিভিন্ন চিন্তা ও মতাদর্শের সংঘাতকে দেখতেন শ্রেণীসংগ্রামের এক প্রধান উপাদান হিসেবে, আর তাই তাঁর অধিকাংশ রাজনৈতিক রচনাতেই দেখা যায় এক বিতর্কমূলক চরিত্র।
বিষয়বৈচিত্র্যে এই রচনাগুলির ব্যাপ্তি বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত। এতে প্রতিফলিত হয়েছে ১৯৭০ দশকে বস্তুত এক ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে কঠিন মতাদর্শগত চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করে বলিষ্ঠ পদক্ষেপে এগিয়ে চলার সময় পর্যন্ত পার্টির দীর্ঘ পথপরিক্রমা। একাধারে নৈরাজ্যবাদী ও অতিবাম বুলিসর্বস্বতার ঝোঁকের বিরুদ্ধে আর অন্যদিকে সমাজগণতন্ত্রীদের আত্মসমর্পণবাদ ও ক্ষুদে উদারনৈতিক সংস্কারবাদের বিরুদ্ধে যুগপৎ সংগ্রাম চালানোর মধ্য দিয়ে সিপিআই(এমএল)-এর বিপ্লবী লাইনের যে বলিষ্ঠ বিবর্তন ঘটেছে সে সম্পর্কেও পাঠকরা এক স্পষ্ট ধারণা পাবেন।
তাঁর সমস্ত লেখার কেন্দ্রবিন্দু হল পার্টি ও বিপ্লব – কিন্তু তা বিমূর্ত ও বিশুদ্ধ মতাদর্শগত সৃষ্টি নয়, বরং ইতিহাস ও সমাজের গভীর ও জটিল প্রক্রিয়ার ফসল। তাঁর কাছে পার্টি হল সর্বহারা শ্রেণীর সংগঠক ও সংগঠন দুই-ই, আর বিপ্লব হল লক্ষ্য তথা এক ক্রমবর্ধমান সম্ভাবনা যা বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের মাধ্যমে সর্বহারাকে আত্ম-আবদ্ধ শ্রেণী হিসেবে গঠনের সময় থেকে আত্ম-সচেতন শ্রেণী হিসেবে বিকাশের পর্যায় পর্যন্ত ধারাবাহিক রূপান্তরের প্রেরণা ও দিশা সঞ্চার করে। কিন্তু এই প্রক্রিয়াগুলি সরলরেখায় এগিয়ে চলে না। বরং এই গতি হল আঁকা-বাঁকা, ছোটো বৃত্ত থেকে বড় বৃত্তের পথে এগিয়ে চলার সর্পিল গতি, আর এই অগ্রগতি কোনো স্থির ছন্দে মসৃণভাবে একটানা এগিয়ে যাওয়ার বদলে বরং ওঠা-পড়া, ভাঙ্গন ও উল্লম্ফনের মধ্য দিয়েই সংঘটিত হয়।
কমরেড ভি এম বিশ্বাস করতেন, সর্বহারাকে বিপ্লবের নেতা হিসাবে উত্তরোত্তর গড়ে তোলা এবং সর্বহারার অগ্রণী বাহিনীর দ্বারা গণ-রাজনৈতিক কার্যকলাপের হাতিয়ার হয়ে ওঠা – এই দুটি কাজ যদি কমিউনিস্ট পার্টি একসাথে করতে না পারে তবে তার অস্তিত্ব অর্থহীন হয়ে পড়ে। তাই সর্বহারার স্বাধীন রাজনৈতিক আত্মঘোষণাই তাঁর কমিউনিজমের ভিত্তিপ্রস্তর হিসাবে থেকেছে এবং এই সারবস্তুটি যাতে হালকা হয়ে না পড়ে, বিকৃতি ও বিপথগামীতার শিকার না হয়, সে বিষয়ে তিনি সর্বদা সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন। যে দেশে জনগণের বিপুল গরিষ্ঠাংশ কৃষিজীবী, সেখানে গণতান্ত্রিক বিপ্লব পরিচালনা করতে গিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি যদি সর্বহারা শ্রেণীকে সংহত করার তথা সর্বহারা নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষক মৈত্রী গড়ে তোলার কাজে কোনোরকম অবহেলা দেখায় তবে শ্রমিকশ্রেণী ও কৃষকদের মধ্যে তার সম্ভাব্য সহযোগীরা পরিণত হবে বুর্জোয়া-জমিদার জোটের রাজনৈতিক আধিপত্যের এক নিষ্ক্রিয় লেজুড়ে। সর্বহারার স্বাধীন ভূমিকার প্রশ্নে এই অবহেলা সাধারণ সময়ে যদি শ্রেণী-সমঝোতা ও বুর্জোয়া রাজনীতির লেজুড়বৃত্তির মাধ্যমে অভিব্যক্ত হয়, তাহলে সংকটের সময়ে তা পুরোদস্তুর পক্ষাঘাতে পরিণতি লাভ করে। ১৯৭০ দশকের জরুরি অবস্থার সময়ে এই বিয়োগান্ত পরিণতিই দেখা গিয়েছিল।
বহু লেখায় বিনোদ মিশ্র বারবার পার্টির বিকাশমান ইতিহাস প্রসঙ্গে আলোচনায় ব্রতী হয়েছেন। মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মূল তত্ত্বে পার্টি লাইনের শিকড়কে নজরে রেখেই তিনি এর বিবর্তনকে অনুশীলনের কষ্টিপাথরে সমালোচনাত্মকভাবে যাচাই করেছেন। কখনো বিস্তার ঘটানোর আহ্বান জানিয়ে, কখনো সংহতকরণের কথা বলে, তিনি সর্বদাই পার্টির সামগ্রিক পরিমাণগত বৃদ্ধি ও গুণগত বিকাশের লক্ষ্যে সংগ্রাম চালিয়েছেন। সবকিছু খুঁটিয়ে দেখার আগ্রহ তাঁর অপরিসীম, কিন্তু তিনি কখনোই বৃক্ষ দেখতে গিয়ে অরণ্যকে ভোলেননি। ভারতের আধা-সামন্ততান্ত্রিক আধা-ঔপনিবেশিক অবস্থায় একটি বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার মহান কর্মকাণ্ডের প্রতিটি দিকেই – সঠিক কাজের ধারার বিকাশ ঘটানো থেকে শুরু করে পার্টির মধ্যে এক প্রাণবন্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে তোলা, তত্ত্ব ও প্রয়োগের সমন্বয়সাধন এবং পার্টির প্রতিটি স্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে তোলা – সমস্ত বিষয়েই তাঁর গভীর মনোযোগ ও যত্ন।
বুনিয়াদ ও উপরিসৌধের জটিল আন্তঃক্রিয়ার দিক থেকে ভারতীয় সমাজ সম্পর্কে অধ্যয়নকে আরও গভীরে নিয়ে যাওয়া এবং তদনুসারে ভারতীয় বিপ্লবের কর্মসূচিগত উপলব্ধিকে আরও নিখুঁত করে তোলার বিষয়ে তিনি সর্বদাই বিশেষ মনোযোগ দিয়েছেন। বিকাশমান পরিস্থিতিকে অধ্যয়ন করার সময়ে, যেসব দ্বন্দ্ব ও প্রবণতা পরিপক্ক হয়ে সামনে চলে আসছে সেগুলি বিশ্লেষণ করার সময়ে, তিনি সর্বদাই চেষ্টা করতেন এসবের পিছনে যে সামাজিক বাস্তবতা রয়েছে সেখানে পৌঁছে যাওয়ার, যাতে পার্টির রণনৈতিক বীক্ষা আরও সমৃদ্ধ হয়। বামপন্থার যে প্রতিপত্তিশালী প্রতিকল্প (ডিসকোর্স) কখনই এক ভাসাভাসা উদারনৈতিক ও সাংবিধানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে পেরিয়ে যেতে পারে না, বিনোদ মিশ্রের এই পদ্ধতি তার সম্পূর্ণ বিপরীত। জাত-পাত ও শ্রেণীর প্রশ্নে হোক বা ধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রসঙ্গে, অথবা জনজাতিদের স্বায়ত্তশাসন কিংবা নারীমুক্তির প্রশ্নে, তিনি সর্বদাই তাঁর গভীর বিপ্লবী মার্কসবাদী অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে ছিন্নভিন্ন করেছেন মামুলি ও পরিশীলিত সবরকমের উদারনৈতিক মোহজাল, ফালাফালা করেছেন উত্তর আধুনিকতার প্রবক্তাদের ছড়ানো বিভ্রান্তিগুলিকে।
তাঁর সমস্ত তাত্ত্বিক রচনায় বিনোদ মিশ্র মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও মাও চিন্তাধারার সার্বজনীন বিপ্লবী মর্মবস্তুর সাথে ভারতের নির্দিষ্ট বাস্তবতাকে সৃজনশীলভাবে একাত্ম করেছেন। বলাবাহুল্য, এই একাত্মকরণ এক কষ্টকর ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া এবং এটা বিশেষত রাশিয়া ও চীনের মতো বিজয়ী বিপ্লবের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার আলোকেই কেবল সম্পন্ন হতে পারে। ভারতে কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা ১৯৬০-এর দশকে যে চীনা মডেল দিয়ে শুরু করেছিলেন তা ছিল খুবই স্বাভাবিক, বিশেষত যেহেতু ভারতের স্বীকৃত কমিউনিস্ট নেতৃত্ব কোনোদিনই চীনের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার বিষয়ে মনোযোগ দেননি। চীনা মডেলকে হুবহু অনুকরণ করার প্রচেষ্টা চালাতে গিয়ে ভারতীয় পরিস্থিতির বৈশিষ্ট্যগুলো খুব প্রকটভাবে সামনে চলে আসে এবং কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পরবর্তী প্রজন্মের কাজ হয়ে দাঁড়ায় এইসব বৈশিষ্ট্যের সাথে সঙ্গতি রেখে পার্টি কর্মসূচি ও কৌশলগত লাইনের যথাযথ বিন্যাস ও বিকাশ ঘটানো। ভি এম বিশ্বাস করতেন যে এভাবেই ভারতীয় বিপ্লব তার নিজস্ব পথ ও মডেল খুঁজে নিতে সক্ষম হবে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙ্গন এবং সমাজতন্ত্রের প্রচলিত মডেলগুলির পতন ও সংকট তাঁকে প্রবলভাবে নাড়া না দিয়ে পারেনি। ভারতের কমিউনিস্ট সংগঠনগুলির মধ্যে সিপিআই(এমএল)-ই সোভিয়েত বিপর্যককে বুঝতে পারা ও তার ধাক্কা সামলে নেওয়ার প্রশ্নে সবচাইতে সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। সিপিআই ও সিপিআই(এম) সর্বদাই সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের গুণকীর্তনে ব্যস্ত থেকেছে, এমনকি যখন সোভিয়েত ব্যবস্থার অচলাবস্থা ও অধঃপতনের দরুণ শেষ পর্যন্ত সেখানে ধ্বস নামতে শুরু করে তখনও এর ব্যতিক্রম হয়নি। অপরদিকে, সিপিআই(এমএল) বরাবর সোভিয়েত পরিস্থিতির মূল্যায়নে খোলাখুলিভাবেই সমালোচনাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে এসেছে। এ সত্ত্বেও ভি এম কখনোই “আমরা আগেই বলেছিলাম” গোছের কথা বলে সমস্যাটাকে এড়িয়ে যাওয়ার সহজ পথে হাঁটেননি। সোভিয়েত-পতন পরবর্তী বুর্জোয়াদের বিজয়োল্লাসের মুখে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক ও কমিউনিস্ট আন্দোলন যে সংকটের মুখে পড়েছিল তাকে তিনি নিছক ফলিত মার্কসবাদের ব্যর্থতা বলে খাটো করে দেখেননি। আসল সমস্যাকে স্বীকার করে নেওয়ার মার্কসবাদী-লেনিনবাদী মানসিকতা থেকে তিনি সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন-ধরনের গতিসূত্রগুলি অধ্যয়নের চ্যালেঞ্জটি আমাদের সামনে তুলে ধরেছিলেন। এই কাজটিকে তিনি পুঁজিবাদী উৎপাদন-ধরন সম্পর্কে পুঁজি গ্রন্থে মার্কস যে ঐতিহাসিক অধ্যয়ন করেছেন তারই মতো বিরাট ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে মনে করতেন।
এক কথায় বলতে গেলে, বিনোদ মিশ্রের নির্বাচিত রচনা সংকলন হল পরিভাষা-বর্জিত, খোলামেলা, আত্মসমালোচনাত্মক ধারায় লিপিবদ্ধ বিংশ শতাব্দীর শেষ চতুর্থভাগে ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের সুমহান আত্মকথন। স্বাধীনতা-উত্তরকালের একজন মার্কসবাদী হিসাবে তিনি মার্কস, লেনিন ও মাও-এর পাঠ নিয়েছিলেন নকশালবাড়ির বুকে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষে এবং বিহারের বহ্নিমান খেত-খামারে তার বলিষ্ঠ প্রতিধ্বনির মধ্যে। আর তাই তিনি কখনোই সমাজগণতন্ত্রের লন্ডন স্কুল-মার্কা ধ্যান-ধারণা ও গান্ধী-নেহরু ধাঁচের কংগ্রেস সমাজবাদ ও ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রতিকল্প দ্বারা ভারাক্রান্ত হননি। একজন ব্যবহারিক বিপ্লবী বর্তমান সমাজব্যবস্থার অভ্যন্তরে কাজ করতে যতটুকু বাধ্য হন, বুর্জোয়া গণতন্ত্রের ভারতীয় সংস্করণের সঙ্গে তিনি ততটুকুই যুক্ত হয়েছেন, কিন্তু কখনোই তিনি তাঁর বিশ্লেষণ ও দৃষ্টিকে বুর্জোয়া উদারতাবাদ ও নিয়মতান্ত্রিকতার ক্রমশ সঙ্কুচিত হতে থাকা সীমানার মধ্যে আবদ্ধ রাখেননি। এ কারণেই তাঁর সমস্ত রচনা অসামান্য স্পষ্টতা ও বিপ্লবী উদ্দেশ্যের প্রতি বিশ্বস্ততায় ভাস্বর হয়ে আছে।
তাঁর রচনাগুচ্ছ মার্কসীয় দ্বন্দ্বতত্ত্বের এক চমৎকার জীবনমুখী পাঠ। তাঁর দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে একদেশদর্শীতা ও গোঁড়ামি থেকে মুক্ত রেখেছিল। অধ্যয়নের বিষয়বস্তুগুলিকে তিনি প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপটে নির্দিষ্ট করেন, প্রতিটি দিককে অধ্যয়ন করেন অনন্য বস্তুনিষ্ঠার সঙ্গে। কিন্তু তাঁর এই বস্তুনিষ্ঠা নিরপেক্ষ ও স্থানু নয়, বিপ্লবী ও গতিশীল। প্রতিটি প্রক্রিয়ার ক্ষুদ্র অথচ বিকাশমান ইতিবাচক দিকটিকে আয়ত্ত করা ও তারপর তাকে প্রধান ও নির্ণায়ক দিকে রূপান্তরিত করাই ছিল তাঁর দ্বন্দ্বতত্ত্বের মূল বিষয়।
মার্কসের অন্ত্যেষ্টির সময়ে এঙ্গেলস তাঁর সংক্ষিপ্ত ভাষণে প্রয়াত সহযোদ্ধার বহুমাত্রিক ও বর্ণময় সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের সবথেকে অমোঘ বর্ণনা দিয়ে বলেছিলেন যে, মার্কস ছিলেন সর্বোপরি একজন বিপ্লবী। পরবর্তীতে লেনিনও মার্কসবাদের বিকৃতির বিরুদ্ধে আমাদের সতর্ক করে দিয়েছিলেন। মার্কসবাদকে তার বিপ্লবী অন্তরাত্মা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললে তা হয়ে দাঁড়ায় নিষ্প্রাণ ও সংশোধনবাদী – এই ছিল তাঁর সাবধানবাণী। বিনোদ মিশ্রও ছিলেন সর্বোপরি একজন বিপ্লবী। মার্কসবাদের বিপ্লবী মর্মবস্তুকে পুনরুদ্ধার ও সমৃদ্ধ করাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় আবেগ, এ লক্ষ্যেই তিনি সর্বদা এগিয়ে চলেছেন।
বিনোদ মিশ্রের এই নির্বাচিত রচনা সংকলন ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের এক মহত্তম বিপ্লবীর অসমাপ্ত ব্রতেরই এক সংক্ষিপ্ত বিবরণী। ঘনায়মান যে বিপ্লব আগামী সহস্রাব্দে উছলে পড়তে চলেছে তারই প্রাণাবেগে স্পন্দিত এই রচনাগুচ্ছ বিশ্ব জুড়ে বিপ্লবী মার্কসবাদের অপ্রতিহত অগ্রগতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত।
দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
সাধারণ সম্পাদক
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)
(লিবারেশন, জানুয়ারি ১৯৯৯ থেকে। দি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল)
রাজনীতি ছাড়া আরেকটা বিষয়ে আমার বেশ ভালোরকম আগ্রহ আছে – সেটি হল মহাবিশ্বের তত্ত্ব। আমার কাছে রাজনীতি হল এমন এক মাধ্যম যাতে সমাজের সূক্ষ্ম জটিলতাগুলি প্রকাশিত হয়। আর মহাবিশ্বে অনন্ত স্থান ও কালের মধ্যে এই বিশ্বজগৎ নিজেকে প্রকাশ করে – যেখানে প্রতিটি নীহারিকা বিশ্বের ক্রমবিলীয়মান সীমানার মধ্যে দ্রুতই পরস্পরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে; যেখানে এক একটি নক্ষত্র রূপ নিচ্ছে, আলো দিচ্ছে, আবার বিরাট বিস্ফোরণে চরম পরিণতি পাচ্ছে; যেখানে, অত্যন্ত স্পষ্টতই, গতিই হল বস্তুর অস্তিত্বের রূপ।
মানবসমাজের অস্তিত্ব গতি, অর্থাৎ পরিবর্তন ও রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে অভিব্যক্ত হয়। আর এই গতি সবসময়েই আরও বেশি সুসংবদ্ধ হয়ে ওঠার দিকে। কোনও ধারণাই চরম নয়, কোনও সমাজই ত্রুটিহীন নয়। যখনই কোনও সমাজব্যবস্থাকে পরম ধারণার মূর্ত রূপ হিসাবে গণ্য করা হয়েছে, তখন তারই গভীরতম অন্তঃস্থল থেকে এক উত্তাল আলোড়ন এসে তাকে ভিতসুদ্ধ কাঁপিয়ে দিয়ে গেছে। আর তারপর, সর্বব্যাপী হতাশার মধ্যে আবার জন্ম নিয়েছে নতুন নতুন স্বপ্ন। কিছু স্বপ্ন কখনই বাস্তব হয়ে ওঠে না কারণ সেগুলি আত্ম-আবদ্ধ মানব মনের আকাশ-কুসুম কল্পনা। কেবল সেসব স্বপ্নই বাস্তবায়িত হয় যেগুলি আত্মসচেতন মানব মনের বিমূর্ত রচনা।
আমার স্বপ্নের ভারত এমন এক ঐক্যবদ্ধ ভারত যেখানে কোনও পাকিস্তানি মুসলিমকে তাঁর শিকড়ের সন্ধানে আসতে আগে ভিসার সন্ধানে ছুটতে হয় না। একইভাবে যেখানে একজন ভারতবাসীর কাছে মহান সিন্ধু সভ্যতার ধাত্রীভূমি বিদেশ নয়। যেখানে বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুর মন থেকে শেষ পর্যন্ত মুছে যাবে ঢাকার তিক্ত দিনগুলির স্মৃতি। একজন বাংলাদেশী মুসলিমকে ভারত থেকে বিদেশী নাগরিক বলে কুকুরের মতো তাড়িয়ে দেওয়া হবে না।
কথাগুলি বিজেপির মতো শোনাচ্ছে কি? অথচ বিজেপি কিন্তু মুসলিম পাকিস্তান আর হিন্দু ভারতের (অবশ্য ততটা বিশুদ্ধ নয়) মধ্যে দেশের এই মহাবিভাজনকে মূলধন করেই টিকে আছে। তারা এই বিভাজনকে তার চরম সীমায় নিয়ে যেতে উদ্যত, তার ফলাফল যত মারাত্মকই হোক না কেন। আর এই কারণেই আমি নিশ্চিত যে তিনটি দেশেই দেখা দেবেন মহান চিন্তানায়করা, যাঁরা এক সৌভ্রাতৃত্বময় পুনর্মিলনের পক্ষে জনমতকে ঘুরিয়ে দিতে পারবেন। আর বিজেপির মতো শক্তিগুলির কাছে নিঃসন্দেহে সেই হবে “শেষের সেদিন ভয়ঙ্কর”।
আমার স্বপ্নের ভারতে গঙ্গা ও কাবেরী, সিন্ধু ও ব্রহ্মপুত্র মুক্তধারায় পরস্পর মিলেমিশে বয়ে চলবে। ভারতের সমস্ত মহান সুরসৃষ্টির যুগলবন্দীতে জেগে উঠবে ভোর। কোনও এক রাষ্ট্রনায়ক তখন তাঁর টুকরো লেখাগুলিকে গেঁথে লিখতে বসবেন “ভারতের পুনরাবিষ্কার”।
বিশ্ব সম্প্রদায়ের মধ্যে আমার স্বপ্নের ভারত মাথা তুলে দাঁড়াবে এমন এক দেশ হিসাবে যাকে তার দুর্বলতম প্রতিবেশীও ভয় পাবে না, আবার দুনিয়ার প্রবলতম দেশটিও তাকে ভয় দেখাতে বা ব্ল্যাকমেল করতে পারবে না। এই ভারত থাকবে দুনিয়ার প্রথম পাঁচটি দেশের মধ্যে – অর্থনৈতিক অবস্থার দিক থেকে তো বটেই, অলিম্পিক পদক সংখ্যার দিক থেকেও।
আমার স্বপ্নের ভারত হবে এক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, যার নীতি হবে ‘সর্ব ধর্ম সমভাব’ নয়,‘সর্ব ধর্ম বর্জিত’। ব্যক্তির বিশ্বাসে হস্তক্ষেপ না করেও রাষ্ট্র সক্রিয়ভাবে বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিবাদী বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির প্রসারে সচেষ্ট হবে।
ধর্মকে সঠিকভাবেই পরিবেশের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের অসহায়তার বহিঃপ্রকাশ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই ধর্মের অবসান ঘটাতে গেলে প্রয়োজন মানবজীবনের বস্তুগত ও আত্মিক পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন, যাতে মানুষ তার পরিবেশের নিয়ন্তা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। ভারতে যখনই রক্ষণশীল কোনও দার্শনিক ধারা জগদ্দল পাথরের মতো মানুষের ওপর চেপে বসেছে, তখনই জন্ম নিয়েছে মহান মহান সংস্কার আন্দোলন। আর তাই আমি স্বপ্ন দেখি যুক্তিবাদী চিন্তাধারার এক মহান পুনরুত্থানের, যখন মানুষের যে অন্তরাত্মা ঈশ্বররূপে মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল তা মানুষের মধ্যেই নিজেকে আবার ফিরে পাবে। আর মানবমনের এই সংস্কার আসবে এক সমাজবিপ্লবের হাত ধরে, যখন সম্পদের স্রষ্টারাই হয়ে উঠবেন সম্পদের প্রকৃত অধিকারীও।
আমার স্বপ্নের ভারতে অস্পৃশ্যদের হরিজন নাম দিয়ে মহিমান্বিত করার পরিহাস বন্ধ হবে, দলিত বলে কোনও বিশেষ বর্গ থাকবে না। সেখানে জাতগুলি মিশে যাবে শ্রেণীতে এবং তারও প্রত্যেক সদস্যের থাকবে নিজের স্বকীয়তাকে অভিব্যক্ত করার পূর্ণ সুযোগ।
আমার স্বপ্নের ভারতের প্রতিটি শহরে থাকবে কফি হাউস, যেখানে বরফঠাণ্ডা কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে বুদ্ধিজীবীরা চালাবেন গরম গরম আলোচনা। সেখানে কোনও বিরহী হৃদয় ভেসে বেড়ানো সিগারেটের ধোঁয়ায় খুঁজে বেড়াবে তার প্রিয়ার মুখ। শিল্প ও সাহিত্যের বহু বিচিত্র সৃষ্টির নতুনতর ব্যাখ্যা গোগ্রাসে গিলবে কত বুভুক্ষু মন। শিল্প বা সাহিত্যের ওপর রাষ্ট্রের কোনও বিধিনিষেধ থাকবে না , কিন্তু সমস্ত জনবহুল স্থানে ধূমপান হবে নিষিদ্ধ। ব্যতিক্রম – একমাত্র ঐ কফি হাউসগুলি।
যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেই প্রসঙ্গে ফিরে যাই। আমি এমন এক ভারতের স্বপ্ন দেখি, যেখানকার মহাকাশযান ছুটে যাবে গভীর মহাশূন্যে। ভারতের বিজ্ঞানী ও গণিতবিদেরা কষবেন সমীকরণ – প্রকৃতির মৌলিক শক্তিগুলিকে একটি একক সূত্রে গাঁথার চেষ্টায়।
পরিশেষে, আমার সব স্বপ্নের সেরা স্বপ্ন এমন এক মাতৃভূমি যেখানে প্রতিটি নাগরিকের রাজনৈতিক স্বাধীনতা সব থেকে মূল্যবান বলে গণ্য হবে। যেখানে ভিন্নমত পোষণ করা হবে স্বাভাবিক ব্যাপার। যেখানকার তিয়েনআনমেনের মতো ঘটনার মোকাবিলা করবেন নৈতিক শক্তিতে বলীয়ান রাষ্ট্রনায়করা আর নিরস্ত্র গণমিলিশিয়া।
আমার স্বপ্নের ভারত দাঁড়িয়ে আছে আজকের ভারতীয় সমাজের বুনিয়াদী প্রক্রিয়াগুলির ওপর ভিত্তি করে। আর একে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য আমার মতো বহু মানুষ তাঁদের শেষ রক্তবিন্দুও উৎসর্গ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ।
(পঞ্চম পার্টি কংগ্রেসের রাজনৈতিক-সাংগঠনিক রিপোর্ট থেকে)
বিগত কয়েক বছর ধরে সাম্প্রদায়িক উত্তাপ বেড়েই চলেছে। বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে দেওয়ার পর দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক হিংসার তাণ্ডবে হাজারে হাজারে মানুষ মারা যাওয়ায় ও জখম হওয়ায় সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নেহরুর অর্থনৈতিক মডেলের পতন এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের ক্রমবর্ধমান বিরক্তি ও জাতীয় ঐক্যের প্রতি প্রকৃত ও কাল্পনিক বিপদ এবং দক্ষিণপন্থা ও মৌলবাদের উত্থানের এক আন্তর্জাতিক মতাদর্শগত পরিমণ্ডল, এই বহুমুখী কারণগুলিই সাম্প্রদায়িক মতাদর্শ ও রাজনীতির উত্থানের এক অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে অবদান জুগিয়েছে। এর ওপর কংগ্রেস(ই), জনতা দল, সিপিআই এবং সিপিআই(এম)-এর মতো সমস্ত মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলি বিজেপির প্রতি বিভিন্ন সন্ধিক্ষণে যে ধরনের সুবিধাবাদী রাজনৈতিক আচরণ করেছে তাতে বিজেপির ফুলে ফেঁপে ওঠার পথ আরও প্রশস্ত হয়েছে।
এটি পরিষ্কারভাবে বুঝে নেওয়া দরকার যে, রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ বিতর্ক হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কোনো সাধারণ মন্দির-মসজিদ বিতর্ক নয়। আরএসএস এবং বিজেপির চতুর নেতৃবৃন্দ এযাবৎকাল বাবরি মসজিদকে এভাবেই তুলে ধরেছেন যে, বাবরি মসজিদ হল বহিরাগত মুসলমানদের হিন্দু ভারত আক্রমণের স্মৃতিসৌধ এবং হিন্দু গৌরব পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য এর ধ্বংসের প্রয়োজন। এইভাবে রাম জন্মভূমি আরএসএস-এর দীর্ঘমেয়াদী হিন্দুরাষ্ট্র মতাদর্শের একটি নির্দিষ্ট প্রতীকে পরিণত হয় এবং সরলমনা হিন্দু জনগণের একটি বৃহৎ অংশকে আকৃষ্ট করে। এভাবে সংঘ পরিবারের সুকৌশলী নেতৃত্বে এবং সংগঠিত প্রচেষ্টায় রাম জন্মভূমিকে ধরে প্রকৃতই এক গণআন্দোলন গড়ে ওঠে। ধর্মীয় মুখোশের আড়ালে এর মূল বিষয়বস্তু হল রাজনীতি ও মতাদর্শ। রামের নাম নিয়ে বিজেপি দ্রুতই দেশের কোণে কোণে পৌঁছে যায় এবং খুব কম সময়ের মধ্যে প্রধান বিরোধীদলে পরিণত হয়ে ওঠে। চারটি রাজ্যে ক্ষমতায় আসার সাথে সাথে স্কুলগুলিকে হিন্দুরাষ্ট্রের মতাদর্শের প্রচার কেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্যে আরএসএস দ্রুতই স্কুলের পাঠক্রম পাল্টাতে শুরু করে দেয়।
মার্কসবাদী ও অন্যান্য বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শের পশ্চাদপসরণ তথা কংগ্রেস(ই)-র বিশ্বাসযোগ্যতায় বড় আকারের ধ্বস নামার ফলে দেশে যে মতাদর্শগত-রাজনৈতিক শূন্যতা গড়ে উঠেছে তারই সুযোগ নিয়ে বিজেপি সাহসের সাথে সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিস্ট বিকল্প হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে চাইছে।
বুর্জোয়া ও জমিদারদের সর্বাপেক্ষা রক্ষণশীল অংশের প্রতিনিধিত্বমূলক চিন্তাধারা ফ্যাসিবাদ স্বভাবতই আক্রমণাত্মক। একটি-দুটি রাজ্যে শাসন ক্ষমতা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার দল বিজেপি নয়। কেন্দ্রে ক্ষমতা দখলের জন্য পরবর্তী লাফ দিতে সে মরীয়া। তাই সে অযোধ্যা ইস্যুতে চাপ বজায় রেখেছে এবং বাবরি মসজিদকে ভেঙ্গে দেওয়ার পর তার পরবর্তী নিশানা এখন কাশী ও মথুরাতে মুসলিম ধর্মস্থানগুলিকে ধুলিসাৎ করে দেওয়া।
এই সাম্প্রদায়িক আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে শাসক দল ও সরকারপন্থীরা উদারনৈতিক হিন্দু অবস্থান থেকে আবেদন নিবেদন ও আইনি পথের আশ্রয় নেওয়ার মধ্যেই আটকে রয়েছে। মূলধারার বামপন্থীদের প্রতিক্রিয়াও এই চৌহদ্দির বাইরে যেতে পারেনি এবং শেষ পর্যন্ত তারা যে স্লোগান নিয়ে আসে তা হল – মন্দিরও হোক, মসজিদও থাকুক – সবাই আইন মেনে চলুক। মার্কস বেঁচে থাকলে মন্তব্য করতেন যে ভারতবর্ষ এমন এক দেশ যেখানে সমস্ত লড়াই, তা সে শ্রেণীগুলির মধ্যকারই হোক কিংবা বিভিন্ন ধ্যানধারণার মধ্যকারই হোক, শেষ পর্যন্ত সমঝোতায় গিয়ে শেষ হয়। ধর্মনিরপেক্ষতার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে।
অনেক মানুষই বিজেপির আর এক ধরনের প্রচারধারায় প্রভাবিত হন যে হিন্দুপ্রধান দেশ বলেই ভারতবর্ষ ধর্মনিরপেক্ষ হতে পেরেছে। এর মধ্যে প্রচ্ছন্ন যে ইঙ্গিত আছে তা হল ইসলাম ধর্মের অন্তর্নিহিত মৌলবাদের তুলনায় হিন্দু ধর্ম কত সহিষ্ণু ও উদার।
প্রথমত, অযোধ্যার ঘটনাপরম্পরা বেশ ভালোভাবেই এই কল্পকথার অসারতাকে প্রমাণ করে দিয়েছে। অযোধ্যাকে তথাকথিত হিন্দু ভ্যাটিকান বানিয়ে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের আদলে হিন্দু ধর্মকে এক সংগঠিত রূপ দেওয়ার সাথে সাথে হিন্দু ধর্মের মহন্তরাও অন্য যে কোনো ধর্মের মৌলবাদীদের মতোই ধর্মান্ধ ও ধর্মোন্মত্ত হিসেবে বেরিয়ে এসেছেন।
দ্বিতীয়ত, ধর্মনিরপেক্ষতার ভারতীয়করণের নামে ভারতের আধুনিক সমাজচিন্তাবিদরা সমস্ত ধর্মের ইতিবাচক আত্তীকরণ বা ‘সর্ব ধর্ম সমভাবের’ যে ধারণা নিয়ে এসেছেন তার সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষতার কোনো সম্পর্কই নেই। ধর্মনিরপেক্ষতার প্রকৃত অর্থ হল, রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপ পরিচালনার সঙ্গে ধর্মের কোনো সংশ্রব না রাখা।
তৃতীয়ত, সর্বত্র ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র এক সফল গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ফসল হিসাবেই জন্ম নিয়েছে এবং ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাকে লঘু করে দেওয়ার পিছনে যে বাধ্যবাধকতা কাজ করছে তা ভারতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের অসমাপ্ত চরিত্র সম্পর্কে আরও এক স্বীকারোক্তি ছাড়া আর কিছু নয়। কোনো ধর্মের গোঁড়া অথবা উদারনৈতিক রূপের প্রাধান্যমূলক অবস্থান গ্রহণ যে কোনো নাগরিক সমাজের বিবর্তনের স্তরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। গোঁড়ামিপূর্ণ থেকে উদারনৈতিক স্তরে খ্রীষ্টধর্মের বিবর্তন কিংবা খালিস্তানের উত্থানের সাথে সাথে আপাত উদার শিখধর্মের গোঁড়ামিপূর্ণ হয়ে ওঠা – এ সবই এই সামাজিক নিয়মের দৃষ্টান্ত।
উদারনৈতিক হিন্দু বুদ্ধিজীবীরা বাবরি মসজিদ ধ্বংস হওয়াতে মর্মাহত কারণ তা হিন্দু মতবাদের বিরুদ্ধ-কাজ বলে মনে করা হচ্ছে। একইসঙ্গে তাঁরা এই ভেবে অবাক হন যে মুসলিম নেতৃবৃন্দ কেন এই জরাজীর্ণ কাঠামোর উপর তাঁদের দাবি ছেড়ে দিচ্ছে না, বিশেষত সেই কাঠামোটি যখন আর মসজিদ হিসাবে ব্যবহৃত হয় না। তাদের সুবিধামতো তাঁরা এটা ভুলে যান যে মুসলমান জনগণের কাছেও বাবরি মসজিদ ভারতবর্ষের জটিল সামাজিক-ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে তাঁদের ঐতিহ্য ও অস্তিত্বের প্রতীকস্বরূপ এক স্মারক হয়ে উঠেছে।
ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীদের সাধারণ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্নতার দরুণ সাম্প্রদায়িক আক্রমণের মুখে তাঁরা সহজেই আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন এবং প্রায়ই মন্দিরের বিরুদ্ধে মণ্ডলকে দাঁড় করানোর নেতিবাদী কৌশলের পথেও চলে যান। গত নির্বাচনে এই কৌশল চরম ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছে।
এব্যাপারে কোনো দ্বিমত থাকতে পারে না যে আজকের সাম্প্রদায়িক আক্রমণের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমতকে সমাবেশিত করতে হলে হিন্দু ও ইসলাম উভয় ধর্মের উদারনৈতিক মূল্যবোধ তথা প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার ও আইনি রায় এই সবকিছুকেই ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে হবে। কিন্তু এক স্বাধীন বাম মঞ্চ থেকে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ মতাদর্শের ব্যাপক প্রচার ছাড়া সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কোনো পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে উঠতে পারে না। তাছাড়া ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নটিকে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্তব্যকর্মের বিপরীতে দাঁড় করানো অথবা ধর্মনিরপেক্ষ মোর্চার নামে সমস্ত ধরনের সুবিধাবাদী জোটবন্ধনের সপক্ষে যুক্তি খাড়া করলে চলবে না। বরং এই প্রশ্নটিকে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত এক বিষয় হিসাবেই দেখতে হবে। গণতান্ত্রিক প্রশ্নও তুলে ধরতে পারে এমন এক ধর্মনিরপেক্ষ মোর্চার পরিবর্তে আমাদের অবশ্যই চাই এক গণতান্ত্রিক মোর্চা যার কর্মসূচির মধ্যে এক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নটি যথাযথ অগ্রাধিকারের সঙ্গে বিবেচিত হবে। শুধুমাত্র এক নৈতিক প্রশ্ন হিসাবে অথবা ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের ঘোষণা হিসাবে নয়, বরং বাস্তব রাজনীতির প্রশ্ন হিসাবেও, এক আধুনিক ভারত গড়ার চূড়ান্ত পূর্বশর্ত হিসাবেই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের বিষয়টি আমাদের দেখতে হবে।
(ডিসেম্বর ১৯৯২-এর পঞ্চম পার্টি কংগ্রেসে গৃহীত রাজনৈতিক-সাংগঠনিক রিপোর্ট থেকে)
১। বিগত পাঁচ বছরে দুনিয়াজুড়ে যে ঘটনাপ্রবাহ বয়ে গিয়েছে তার তাৎপর্য প্রকৃতই বিশ্ব-ঐতিহাসিক। বিংশ শতাব্দীর মধ্যে বিশ্বব্যাপী সমাজতন্ত্রের বিজয়ের যে আশা লেনিন দেখেছিলেন তার বিপরীতে ৭৫ বছরের তিক্ত সংগ্রামের পর আজ পুঁজিবাদী আপাতদৃষ্টিতে সমাজতন্ত্রের উপর বিজয় অর্জন করেছে।
পুঁজিবাদের এই আপাত বিজয়ে উৎফুল্ল বুর্জোয়া মতাদর্শের বিশিষ্ট প্রবক্তা ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা একটি “একক, সুসংবদ্ধ, বিবর্তনশীল প্রক্রিয়া” অর্থে ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘোষণা করে দিয়েছেন। ফুকুয়ামার মতে “উদারনীতিবাদী পুঁজিবাদের থেকে উন্নত কোনো সামাজিক রূপের কথা আর ভাবা যায় না” এবং “এর পরেও সমাজে যে বৈষম্য থেকে যাবে তার মূলে থাকবে মানুষে মানুষে প্রতিভার স্বাভাবিক তারতম্য, অর্থনৈতিকভাবে প্রয়োজনীয় শ্রম বিভাজন এবং সংস্কৃতি”।
পুঁজিবাদ ও উদারনৈতিক গণতন্ত্রের ব্যবস্থাতেও উত্তেজনা থাকবে, ফুকুয়ামা আমাদের বলছেন, তা উদ্ভূত হবে শ্রেণীগত বিরোধের কারণে নয় ‘বরং অসমান মানুষকে সমান চোখে দেখার ও সমান স্বীকৃতি দেওয়ার যে প্রবণতা উদারনৈতিক গণতন্ত্রের রয়েছে সেই প্রবণতা থেকেই’। এই অশান্তি কি আবার উদারনৈতিক গণতন্ত্রকে কোণঠাসা করে ফ্যাসিবাদকে ডেকে আনবে না যে ফ্যাসিবাদ অসমান জনগণের প্রতি অসম আচরণ করে থাকে? ফুকুয়ামা এ প্রশ্নে নীরব থাকলেও ইউরোপে সমাজতন্ত্রের পতনের সাথ সাথে জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালীতে নাৎসীবাদ আবার স্পষ্টতই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে যদিও এবার নিশানা বহিরাগত জনসমুদয়।
২। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ছিল একই সঙ্গে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ঠাণ্ডা যুদ্ধের সূচনা, পরবর্তীকালে যা দুই বৃহৎশক্তির মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসাবে সামনে এসেছে। দুই সামরিক জোট ন্যাটো ও ওয়ারশ প্যাক্ট ইউরোপের বুকে এমন এক মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হয়েছিল যে তা লাগামহীন অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং বিশাল পরিমাণে পারমাণবিক বোমা মজুত করে তুলেছিল যা দিয়ে সমগ্র মানব জাতিকে কয়েকবার ধ্বংস করে ফেলা যায়।
৩। সাম্রাজ্যবাদ ও সমাজতান্ত্রিক ব্লকের মধ্যেকার এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সোভিয়েত নেতৃত্ব সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও কেন্দ্রাভিমুখ আরোপ করেছিল যা সমস্ত সমাজবাদী দেশ, কমিউনিস্ট পার্টি ও তৃতীয় বিশ্বের আন্দোলনকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পিছনে দাঁড়ানোরই দাবি করে। কিন্তু বাস্তব জীবনে, এটি সমাজতান্ত্রিক শিবিরে ভাঙ্গন সৃষ্টি করেছিল। ১৯৬৮ সালে চেকোশ্লোভাকিয়ার উপর আক্রমণ এবং পরবর্তীকালে সীমাবদ্ধ সার্বভৌমত্বের ধারণার উদ্ভব কার্যত পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিকে সোভিয়েতের তাঁবেদারে পরিণত করেছিল।
৪। বৃহৎশক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করার পর সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্রুতই নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে। চীনের সঙ্গে স্থায়ী উত্তেজনায় জড়িয়ে পড়া, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিতে জাতীয় ভাবাবেগের বিরাগভাজন হয় পড়া, এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সাথে সামরিক জোটে আবদ্ধ হওয়া ইত্যাদির পর শেষপর্যন্ত সে আফগানিস্তানে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে।
অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে, সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা বহু পূর্বেই তার স্পন্দন হারিয়ে ফেলেছিল এবং স্থবির হয়ে পড়েছিল। পচনের প্রক্রিয়া অনেক আগেই শুরু হলেও তা বৃহৎশক্তিসুলভ দম্ভের আড়ালে লুকানো ছিল। ঐ বুদবুদের বিস্ফোরণ অনিবার্যই ছিল। ১৯৮০ দশকের মধ্যভাগে সোভিয়েতের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হওয়ার সাথে সাথে, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলির একের পর এক সোভিয়েত কক্ষপথ থেকে বেরিয়ে যেতে থাকে এবং ফলত সোভিয়েত ধাঁচের সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে থাকে। বৃহৎ শক্তিসুলভ অবস্থা টলমল হয়ে পড়ার পর কোনো বন্ধনই আর অবশিষ্ট থাকল না যা সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারে।
৫। রোমানিয়া, যুগোশ্লাভিয়া ও আলবেনিয়াও, আগে অথবা পরে, নিজ নিজ পথে সোভিয়েত পতনকে অনুসরণ করল। ইউরো কমিউনিজমের তথাকথিত বাহ্যিক চেহারাটি পরিবর্তনের হাওয়ার প্রথম ধাক্কাতেই মুখ থুবড়ে পড়ল এবং তাদের সমাজতান্ত্রিক অন্তর্বস্তু উন্মোচিত হয়ে গেল। ইউরোপের প্রায় সমস্ত সোভিয়েতপন্থী কমিউনিস্ট পার্টিগুলি রাতারাতি ভোল পার্টে বিভিন্ন ধারার ও বিভিন্ন মাত্রার সমাজতন্ত্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করে। সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি প্রবাদের ডাইনোসোরের মতোই তার গতি হারিয়ে ফেলেছিল। পেরেস্ত্রৈকা ও গ্লাসনস্তের মধ্যে সে নিজের ফ্রাঙ্কেনস্টাইন সৃষ্টি করে ফেলে।
৬। ঠাণ্ডা লড়াই পরবর্তী যুগে সবচেয়ে লাভবান হয়েছে জার্মানি। পূর্ব জার্মানিকে পশ্চিম জার্মানির মধ্যে অঙ্গীভূত করে ফেলা হয়েছে এবং পূর্ব জার্মানির রাষ্ট্রপ্রধান হোনেকার এখন বিচারের অপেক্ষায় জার্মানির কারাগারে দিন কাটাচ্ছেন। নতুন ‘ঐক্যবদ্ধ’ জার্মানি যুগোশ্লাভিয়ার ভাঙ্গনে প্ররোচনা সৃষ্টি করতে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। সংক্ষেপে বলা যায় যে যুদ্ধ পরবর্তী যুগে জার্মানির বিরুদ্ধে যেসব নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা হয়েছিল তা ভেঙ্গে পড়েছে এবং ইউরোপীয় অর্থনৈতিক সম্প্রদায়ের কাঠামোর ভেতর ও বাইরে জার্মানির আর্থিক ও রাজনৈতিক প্রতিপত্তি বেড়েই চলেছে।
৭। ১৯৮০-র দশকে জাপান এক অর্থনৈতিক অতিবৃহৎ শক্তি হিসাবে নিজেকে সংহত করেছে এবং এই দিক থেকে তার স্থান কেবলমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরেই। এই অর্থনৈতিক বলে বলীয়ান হয়ে জাপান আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকা গ্রহণ করতে সচেষ্ট হচ্ছে। নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যের আসন পাওয়ার লক্ষ্যে নিরাপত্তা পরিষদের পুনর্বিন্যাসের জন্য ওকালতি করা এবং রাষ্ট্রসংঘের এক শান্তি উদ্যোগে সামিল হয়ে দেশের সীমানার বাইরে কাম্পুচিয়ায় সৈন্যবাহিনী পাঠানোর উদ্দেশ্যে সংবিধান সংশোধন করা – অন্যান্য বিষয় ছাড়াও এগুলি স্পষ্টভাবেই ঐ উদ্দেশ্যকে প্রতীয়মান করছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তি এবং তার সঙ্গে মার্কিন ছত্রছায়া দুর্বল হয়ে পড়ায় জাপান সামরিকীকরণের এক উচ্চাকাঙ্খী কর্মসূচিতে নেমে পড়েছে। তার সামরিক বাজেট এখন পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম।
৮। জাপানের পাশাপাশি ‘এশীয় শার্দুলেরাও’ অর্থাৎ দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং, সিঙ্গাপুর ও তাইওয়ান দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। মালয়েশিয়া, থাইল্যাণ্ড ও ইন্দোনেশিয়াও তাদের থেকে এখন খুব একটা পিছিয়ে নেই। একসাথে বিশ্ব বাণিজ্যের দশ শতাংই হয় তাদের মাধ্যমে। আমেরিকা ও ব্রিটেনের পড়ন্ত অর্থনীতির তুলনায় এশিয়াকে ৯০-এর দশকের অতিবৃহৎ বাজার হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে।
৯। বিশ্ব অর্থনীতির নতুন শক্তিকেন্দ্র হিসাবে চীন আত্মপ্রকাশ করেছে যার বার্ষিক বৃদ্ধির হার ৯০-এর দশকে জাপান ও কোরিয়াকে অতিক্রম করে যাবে বলে আশা করা যায়। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তির ভিত্তিতে চীনও উন্নয়নশীল বিশ্বের অংশ হিসাবে বিশ্ব রাজনীতিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ১০০০ মেগাটনের পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা, পর্যবেক্ষক হিসাবে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে যোগ দেওয়া, জাপানী অগ্রগতিকে মাথায় রেখে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এবং খুব সম্প্রতি মার্কিন আপত্তি অগ্রাহ্য করে পারমাণবিক রি-এ্যাক্টর বিক্রি করার জন্য ইরানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়া – এগুলি সাম্প্রতিক সময়ে চীনের কতকগুলি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
১০। ঠাণ্ডা লড়াইয়ের মতাদর্শগত বিজয়ী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার বিশ্ব আধিপত্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাইছে গদগদভাবে ‘নয়া বিশ্ব ব্যবস্থার’ ওকালতির মধ্য দিয়ে। ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধ নির্দিষ্টভাবে এই ইঙ্গিতই বহন করে। ইরাকের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক মার্কিন কার্যকলাপ নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করছে যে রাষ্ট্রপুঞ্জের নির্দেশে কুয়েতকে মুক্ত করার অজুহাত ছিল আসলে তার প্রকৃত মতলবকে আড়াল করার কৌশলমাত্র। অবশ্য, আমেরিকার আধিপত্য বিভিন্ন শিবির থেকে বিরোধিতার মুখোমুখি হচ্ছে এবং তার দুরাকাঙ্খা যাইই হোক না কেন বাস্তব জীবনে সে এক পতনোম্মুখ বৃহৎশক্তি মাত্র।
১১। সাম্রাজ্যবাদ ও সর্বহারা বিপ্লবের যুগ হিসাবেই বর্তমান যুগকে আজ সবচেয়ে ভালোভাবে চরিত্রায়িত করা যায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙ্গন এবং সোভিয়েত শিবিরের অবলুপ্তির পর সমাজতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী দেশগুলির দ্বন্দ্ব আজ আর আলাদা করে বিশ্বের একটি বড় দ্বন্দ্ব হিসাবে থাকছে না। অন্যদিকে, সাম্রাজ্যবাদ ও তৃতীয় বিশ্বের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব কিন্তু ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে। সমাজতান্ত্রিক শিবিরের ওপর সোভিয়েত আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা যেমন সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির মধ্যে বিভাজনই ডেকে এনেছিল তেমনি সাম্রাজ্যবাদ বনাম তৃতীয় বিশ্বের দ্বন্দ্বকে সমাজতন্ত্র বনাম সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্বের অধীনস্থ করে রাখার চেষ্টাও কেবলমাত্র তৃতীয় বিশ্বকে বিভক্তই করেছিল, যার ফলস্বরূপ তৃতীয় বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ভূমিকা দুর্বল ও বিকৃতই হয়ে পড়ে। আজ যখন সোভিয়েত প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে তৃতীয় বিশ্বকে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েই সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়তে হচ্ছে, তখন তৃতীয় বিশ্বের মধ্যে এক ঐক্য ও সংকল্পও দেখা যাচ্ছে। তৃতীয় বিশ্বের মধ্যকার সোভিয়েত ঘেঁষা দেশগুলির দরকষাকষির ক্ষমতা নিশ্চয়ই মার খেয়েছে, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির ক্রমবর্ধমান দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে তারাও দ্রুতই নিজেদের সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস ও হৃত শক্তির পুনরুদ্ধারের পথে এগিয়ে চলেছে। তাছাড়া আজকের অবশিষ্ট সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি তৃতীয় বিশ্বেরই প্রতিনিধিত্ব করে এবং প্রধানত সেই সামর্থের ওপর দাঁড়িয়েই তারা সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে। বর্তমান ঐতিহাসিক যুগে, সাম্রাজ্যবাদ ও তৃতীয় বিশ্বের মধ্যকার দ্বন্দ্বই তাই প্রধান দ্বন্দ্ব হিসাবে থাকছে।