ইংরাজি সংস্করণ : জুলাই ২০১২
বাংলা সংস্করণ : জানুয়ারী ২০১৪
যখন নেহরুর “নিয়তির সাথে অভিসার” সর্বগ্রাসী এক নিদারুণ মোহভঙ্গে পর্যবসিত এবং লক্ষ লক্ষ ভারতবাসীর জন্য ডেকে এনেছে গভীর সংকট তখন একজন মানুষই যিনি জনগণের কল্পনাকে এক নতুন স্বপ্নে উদ্দীপিত করেন। তিনি সেই স্বপ্নকে তাঁর অগণিত সহযোদ্ধাদের সাথে ভাগ করে নিলেন এবং এভাবেই মূর্ত করে তুললেন কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের এক নতুন প্রজন্মকে দেশের নিপীড়িত গ্রামীণ দরিদ্রদের মধ্যে যে খুঁজে পেল তার নায়ককে। যাঁরা ছিলেন নিপীড়নের শিকার তারাই মুক্তিসংগ্রামের সাহসী যোদ্ধা হয়ে উঠলেন, কৃষিবিপ্লব হয়ে উঠল নয়াগণতান্ত্রিক ভারতের চালিকাশক্তি এবং ১৮৫৭-র অকীর্তিত নায়কেরা হয়ে উঠলেন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দেশপ্রেমের ইতিহাসে নতুন অগ্রদূত।
এই হলেন চারু মজুমদার, নকশালবাড়ি এবং সিপিআই(এম-এল)-এর রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত স্থপতি। ১৯৭০-এর দশককে মুক্তির দশকে পরিণত করার তাঁর আহ্বান সাফল্যমণ্ডিত হয়নি, কিন্তু ইতিমধ্যেই ১৯৬৭-র ২৫ মে (যেদিন দুনিয়া শুনলো নকশালবাড়ির কথা) থেকে ২৮ জুলাই ১৯৭২ (কলকাতার লালবাজারে পুলিশ লক-আপে যেদিন তাঁকে হত্যা করা হয়) – এই কালপর্বে তিনি শক্তিশালী এক সজ্জিত মহড়াকে পরিচালনা করেছেন। চার দশক পরেও চারু মজুমদার, নকশালবাড়ি এবং সিপিআই(এম-এল) পুরনো ভারতের রক্ষকদের কাছে যেমন সবথেকে ভয়ানক দুঃস্বপ্ন হিসেবে রয়ে গেছে তেমন বেশি বেশি মানুষকে সামিল করে এক নতুন ভারত গড়ার সংগ্রাম তীব্রতর করার ক্ষেত্রেও প্রেরণা সঞ্চার করে চলেছে।
-- দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
কমরেড চারু মজুমদারের শহীদ হওয়ার ৪০তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে ভারতীয় জনগণের এই মহান বিপ্লবী নেতার জীবন ও কর্মের বহুমুখী দিকগুলোকে আলোকিত করে এমন বিষয়সমূহের এক সংকলনকে আমরা উপস্থাপন করছি।
এর মধ্যে সন্নিবেশিত হয়েছে সি এম-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী ও তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা অনিতা মজুমদারের স্মৃতিচারণ। রয়েছে তাঁদের পারিবারিক অ্যালবাম থেকে সংগৃহীত বিরল কিছু আলোকচিত্র – যেগুলোর কয়েকটি বেশ অস্পষ্ট – যেখানে পরিদৃশ্য হয়েছে আত্মীয় ও বন্ধুবর্গের মাঝে জনগণের অতি সরল, অকপট মানুষটি।
পাঠকের সঙ্গে সি এম-এর রচনাবলী ও ভাষণসমূহ থেকে কিছু উদ্ধৃতির সংক্ষিপ্ত সংকলনও আমরা সংযুক্ত করেছি। তাঁর ঘটনাবহুল জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণের কতিপয় আলোকচিত্রও সংযোজিত হয়েছে, যেগুলোর অন্যতম হল তাঁর শহীদ হওয়ার পূর্বমুহূর্তে পুলিশী হেফাজতে থাকার ছবি।
তাঁর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত পার্টির কাছে চারু মজুমদার অপরিসীম অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছেন, থাকবেনও চিরকাল। প্রকৃতপক্ষে, তাঁর শহীদ হওয়ার দ্বিতীয় বার্ষিকীতে ১৯৭০ দশকের গোড়ায় প্রচণ্ড ধাক্কার মুখে পড়া পার্টি ও আন্দোলনকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্দেশ্যে আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠিত হয়।
তাঁর মৃত্যুর পর অসংখ্য অনুষ্ঠানে, পার্টি কংগ্রেসগুলোতে, পার্টি মুখপত্রে এবং পার্টি নেতৃত্ব কর্তৃক তাঁর উত্তরাধিকারকে গভীর শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হয়েছে, বর্তমান প্রেক্ষিতে তাঁর শিক্ষামালার মহান প্রাসঙ্গিকতা ও মুখ্য অবদানগুলোর ওপর পুনরায় গুরুত্ব আরোপিত হয়েছে। এই ধরনের পর্যবেক্ষণ ও নিবন্ধসমূহের এক নির্বাচিত সংকলনও এখানে পুনঃপ্রকাশ করা হয়েছে।
যে দিনটির দিকে সমগ্র পার্টি উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছিল দিল্লীতে “চারু ভবন” উদ্ঘাটনের, সেই দিনই এই সংকলন প্রকাশনার কাজটিকেও সমন্বিত করা হয়েছে। এই মহতিক্ষণে আমরা সমস্ত পার্টি সদস্য, পার্টির গণ্ডি ছাড়িয়ে বিপ্লবী কর্মী এবং ভারতের মহান বিপ্লবী জনগণের পক্ষ থেকে ভারতীয় বিপ্লবের বেদীমূলে কমরেড চারু মজুমদার ও অন্য যে সমস্ত মহৎ হৃদয় জীবন বিসর্জন দিয়েছেন তাঁদের প্রতি গভীরতম শ্রদ্ধা নিবেদন করছি এবং তাঁদের মহৎ লক্ষ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সম্মিলিত শপথ গ্রহণ করছি।
কেন্দ্রীয় কমিটি
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)
২৮ জুলাই ২০১২
১৯১৯ সালে বাংলা জ্যৈষ্ঠ মাসের (মে-জুন) কোনো সময় বারাণসীতে চারু মজুমদারের জন্ম হয়। ৭ কিংবা ৮ বছর বয়সে শিলিগুড়ির (দার্জিলিং জেলা) মহানন্দা পাড়ার পারিবারিক নিবাসে তাঁকে নিয়ে আসা হয়। শিলিগুড়ি বয়েজ হাইস্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণীতে তাঁকে ভর্তি করা হয়। তিনি প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন এবং ১৯৩৭ সালে পাবনার (অধুনা বাংলাদেশে) এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হন। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন কিন্তু ফাইনাল পরীক্ষায় না বসে তিনি কলেজ ছেড়ে দেন এবং শিলিগুড়িতে ফিরে আসেন। তিনি যেন আবার স্কুলজীবন ফিরে পান এবং নিজেকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করেন। এরপর ১৯৩৮ সালে তিনি কংগ্রেস সমাজবাদী পার্টিতে যোগ দেন। তাঁর পিতা বীরেশ্বর মজুমদার ছিলেন দার্জিলিং জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতি। তাঁর মা উমাশঙ্করী দেবী ছিলেন অত্যন্ত প্রগতিশীল নারী এবং নানা সমাজসেবামূলক কাজ ও গণআন্দোলনে তিনি সাহায্য ও উৎসাহ যোগাতেন। চারু মজুমদারের জীবনকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
১৯৩৯-এ সংলগ্ন জলপাইগুড়ি জেলায় যখন সিপিআই-এর একটি ইউনিট প্রতিষ্ঠিত হয়, যুবক চারু সত্বর সেখানে যোগদান করেন এবং দ্রুত সর্বক্ষণের কর্মী হয়ে ওঠেন। চরমভাবে শোষিত কৃষক জনগণের মধ্যে তিনি কাজ শুরু করেন। জেলার কৃষি-অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিল আধিয়ার প্রথা (যে ব্যবস্থায় ভাগচাষিরা ফসলের অর্ধেক ভাগ পেতেন)। আধিয়ারদের ফসলের সিংহভাগই জমিদাররা গ্রাস করে নিত। আর এভাবেই তাদের ঐ জমিদারদের কাছ থেকেই অত্যন্ত চড়া সুদে ঋণ গ্রহণ করতে বাধ্য করা হত। কিন্তু চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে ওঠা সুদ কখনোই শেষ করা যেত না এবং ঋণের বোঝা ক্রমাগত বাড়তে থাকত। এভাবে জলপাইগুড়ির কৃষকরা কার্যত নেমে আসেন ভূমিদাসের পর্যায়ে। কমিউনিস্ট পার্টিকে নিজেদের হাতের কাছে পাওয়া মাত্র তাঁরা সংগ্রামের পথে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পার্টির নেতৃত্বে কৃষক সমিতি ও প্রতিরোধের স্কোয়াডগুলো গড়ে ওঠে। কিন্তু আন্দোলন শক্তিশালী হওয়ার সাথে সাথে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নও তীব্রতর হয়।
একদিন পার্টির জলপাইগুড়ি জেলা কমিটির সম্পাদক তাঁর অফিসে মাথায় চিরুনি পড়েনি, এক জোড়া উজ্জ্বল চোখের অধিকারী এক সপ্রতিভ, সুদর্শন যুবককে প্রবেশ করতে দেখেন। যুবককটি বলে, “আমি চারু মজুমদার। আমি কৃষকদের মধ্যে পার্টির কাজ করতে চাই।” সম্পাদক প্রশ্ন করলেন, “তুমি কি কষ্ট সহ্য করতে পারবে?” ঝটিতে আত্মবিশ্বাসে ভরা জবাব এলো হ্যাঁ-বাচকভাবে।
জেলা সম্পাদক শচীন দাশগুপ্ত এরপর তাঁকে নিয়ে ডুয়ার্স অঞ্চলের গ্রামগুলিতে পরিভ্রমণ করতে থাকলেন – বিস্তীর্ণ এলাকায় পায়ে হেঁটে, একটানা কম করে তিন মাস ধরে। তাঁরা গরিব কৃষকদের ঘরে আশ্রয় নিতেন। কোনো সময় তাঁদের খাবার জুটতো, কোনো সময় জুটতো না। কখনও কখনও তাঁদের খোলা আকাশের নীচে রাত কাটাতে হত, কোনো কোনো দিন জলঢাকা নদীর ব্রিজের ওপর শুয়ে পড়তেন, কখনও বা কোনো গোয়ালঘরে ঘুমিয়ে পড়তেন।
এভাবেই যে কোনো পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়ার এবং কৃষকদের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার সামর্থ্যকে চারু মজুমদার প্রমাণ করেন। শচীন দাশগুপ্তও নিশ্চিত ও আশ্বস্ত বোধ কএমনি করেই চারু মজুমদারের কষ্ট সহ্য করার ও কৃষকদের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার প্রথম সচেতন অধ্যায়ের শুরু হয়।
অতি অল্পকালের মধ্যেই চারু মজুমদার কৃষকদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তাঁকে দেখলেই কৃষকদের মধ্যে আনন্দের ঢেউ খেলে যেত। তিনিও কৃষকদের মনকে বোঝার ক্ষেত্রে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। ১৯৪২-এ চারু মজুমদার পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হন। ১৯৪২-এর পর চা-বাগান ও রেল-শ্রমিকদের মধ্যে পার্টির কাজ যখন বিস্তারলাভ করে তিনি সেখানকার কাজেও সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে থাকেন।
১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের সময় তাঁর প্রস্তাব অনুসারেই আধিয়ারদের জঙ্গী আন্দোলন সংগঠিত হয়। জমিদাররা তাদের শস্যের গোলা পাহারা দিয়ে রাখায় আধিয়ারদের অনাহারে মরতে হচ্ছিল। পার্টি শ্লোগান তুলল – আমরা গুলি খেয়ে মরব তবু না খেয়ে মরব না।
গরিব জনগণের কাছে এই শ্লোগান দারুণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। জোতদারদের গোলা থেকে তারা ধান দখল করতে শুরু করেন। সেই ধান কমিটির মাধ্যমে ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করা হতে থাকে। বিক্রিত অর্থ জোতদারদের দিয়ে দেওয়া হয়। যে সব জোতদার এই ব্যবস্থা মানতে নারাজ হত ও উল্টে আদালতে মামলা ঠুকে দিত তাদের সঙ্গে আইনি লড়াই চালানোর জন্য ফসল বিক্রির টাকার একটা অংশ সঞ্চয় করে রাখা হত।
১৯৪৫-এর শেষের দিকে ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলন শুরু হয়। সি এম-কে অধুনা বাংলাদেশের অধীন এবং তেভাগা আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র পচাগড় থেকে আন্দোলন পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। আত্মগোপন করে তিনি কাজ চালাতে থাকেন এবং তাঁর পরিচালনায় বড় একটা এলাকা প্রায় মুক্তাঞ্চলে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়ায় তিনি যে সমস্ত অতীব মূল্যবান শিক্ষা লাভ করেন পরবর্তীকালে সেগুলিই তাঁকে নকশালবাড়ি আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদানে সহায়তা করে।
তীব্র পুলিশী নির্যাতনকে অগ্রাহ্য করে সমগ্র ডুয়ার্স অঞ্চলে সংগ্রাম ছড়িয়ে পড়ে। চা-বাগান শ্রমিক ও কৃষকরা অনেকগুলি যুক্ত মিছিল সংগঠিত করেন এবং তাঁরা জোতদারদের ফসল দখল করে নেন। এই রকমই এক সংগ্রামের সময় জলপাইগুড়ি জেলার মঙ্গলাবাড়ি-নিউ রামাঝারি অঞ্চলে কৃষকরা পুলিশের কাছ থেকে রাইফেল ছিনিয়ে নেন এবং তাঁদের মধ্যে ১১ জন পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এই সংগ্রাম রেল-শ্রমিকদেরও ভালো মাত্রায় প্রভাবিত করে। বাংলা-ডুয়ার্স রেলওয়েতে এক শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন ইউনিট গড়ে ওঠে।
আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধির সাথে সাথে পুলিশী নিপীড়নও তীব্রতর হতে থাকে। যখন পার্টি কর্মীরা শ্রমিক-কৃষকের সম্মিলিত আন্দোলনকে সমস্ত বাধা-বিপত্তি ডিঙিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ঠিক তখনই সরকার কর্তৃক আন্দোলনকে ন্যায়সঙ্গত বলে স্বীকার করে নেওয়ার কারণ দেখিয়ে পার্টির রাজ্য কমিটি আন্দোলন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু চারু মজুমদার এবং স্থানীয় অন্যান্য নেতৃবর্গ দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দেন পিছু হঠার কোনো প্রশ্ন তো ওঠেই না, পরন্তু কেন ভূমিহীন ও গরিব কৃষকদের সংগ্রামে সামিল করা গেল না এবং কর্মীদের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কেন দিশা প্রদর্শন করা গেল না সে বিষয়ে রাজ্য কমিটির পর্যালোচনা করা উচিত।
রাজ্য কমিটি ম্যানডেট জারি করে এবং দার্জিলিং-এর কমরেডদের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়। তাঁরা বুঝলেন, ভবিষ্যতের এক উজ্জ্বল সম্ভাবনাকে অঙ্কুরেই বিনাশ করা হল। চারু মজুমদারের কাছে এটা ছিল বিশাল এক মানসিক ধাক্কা। তিনি জানতেন, এবার পুলিশ ভয়াবহ অত্যাচার নামাবে। আর বাস্তবে সেটাই ঘটলো।
১৯৪৮-এ পার্টি অফিসে কমরেডরা যখন দ্বিতীয় কংগ্রেসের রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা করছেন তখন পুলিশ এসে চারু মজুমদার সহ সকলকে গ্রেপ্তার করল। তাঁকে প্রথমে জলপাইগুড়ি জেলে আটক রাখা হল, তারপর দমদম জেলে স্থানান্তরিত করা হল। পরবর্তীকালে তাঁকে দমদম থেকে সরাসরি উড়িয়ে নিয়ে এসে বক্সার জেলে বন্দি করে রাখা হল। ১৯৫১ সালে তিনি মুক্তি পেলেন।
১৯৫২-র ৯ জানুয়ারী তিনি লীলা সেনগুপ্তকে বিবাহ করেন। লীলা সেনগুপ্তও ছিলেন পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী। বিবাহের পর তাঁরা দুজনই সিপিআই-এর দার্জিলিং জেলা কমিটির সদস্য হন। সেই সময় সি এম গ্রামাঞ্চলে কাজ করার সাথে সাথে চা-বাগান শ্রমিকদের মধ্যেও কাজ করতেন। তিনি শিলিগুড়ি রিক্সাচালক ইউনিয়নেরও ছিলেন সভাপতি।
১৯৫৬-তে পালঘাটে অনুষ্ঠিত সিপিআই-এর তৃতীয় কংগ্রেসে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রতিনিধি। সেই সময় থেকেই সিপিআই লাইনের সাথে তাঁর বিরোধিতা তীব্র হতে শুরু করে। ১৯৫৭-তে পার্টি নেতৃত্ব তাঁকে কলকাতায় আসার আহ্বান জানায় এবং রাজ্য স্তরে কৃষক সংগ্রাম পরিচালনা করার জন্য তাঁকে দায়িত্ব দিতে চায়। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব গ্রহণে অসম্মতি জানান।
ইতিমধ্যে তাঁর পরিবারের আর্থিক অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে থাকে। আরও বড় বিষয় হল, পার্টি লাইনের সঙ্গে দিন দিন তাঁর সংঘাতও বেড়ে চলে। এসবের কারণে কিছু সময়ের জন্য নৈরাশ্য তাঁকে বিপর্যস্ত করে। এরপর ১৯৬০-এর দশকের প্রথমার্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যকার মহা বিতর্কের আবহে উজ্জীবিত দার্জিলিং-এর কমরেডরা স্থির করলেন যে পার্টি সংগঠনকে অবশ্যই মজবুত করে তুলতে হবে এবং জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং-এর দুটি বাছাই করা এলাকায় মুক্তাঞ্চল গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালানো হবে।
চীনা পত্রপত্রিকা অধ্যয়নের মাধ্যমে অর্জিত উপলব্ধিসমূহের ভিত্তিতে দলিল প্রস্তুত করার দায়িত্ব বর্তায় চারু মজুমদারের ওপর এবং তিনি নকশালবাড়ি এলাকার কাজকে পরিচালনা করতে শুরু করেন। ১৯৬২-তে ঐ দলিল প্রস্তুত হয় এবং তা রাজ্য কমিটির কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। প্রমোদ দাশগুপ্ত তখন জেলে। তিনি অভিমত প্রকাশ করলেন, যিনি এই দলিল লিখেছেন তাকে অবিলম্বে পার্টি থেকে বহিষ্কার করা উচিত। কিন্তু অন্যান্য নেতারা ভিন্নমত হওয়ায় এই নির্দেশ কার্যকর হল না।
১৯৬৩-র জানুয়ারীতে শিলিগুড়ি বিধানসভা আসনের জন্য উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় কমরেডদের চাপে পার্টি নেতৃত্ব সি এম-কে পার্টির প্রার্থী মনোনীত করতে বাধ্য হয়। জেল থেকে তিনি মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। প্রচারের সময় তিনি সশস্ত্র সংগ্রামের রাজনীতিকে তুলে ধরেন এবং চীন আক্রমণকারী বলে ভারত সরকারকে নিন্দা জানান। এভাবে তিনি সরাসরি পার্টি লাইনের বিরোধিতা করেন। তিনি ৩০০০-এর কম ভোট পান এবং তাঁর জামানত জব্দ হয়। তিনি বললেন, “আসুন, আমরা বিজয় মিছিল বার করি। কারণ এত যে মানুষ সশস্ত্র সংগ্রামের পক্ষে এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী উন্মাদনার বিরুদ্ধে ভোট দিলেন – তা এক বিরাট সাফল্য।” সেই মতো মিছিলও সংগঠিত হয়।
১৯৬৪-তে তীব্র আন্তঃপার্টি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সিপিআই(এম)-এর জন্ম হলে সি এম সিপিআই(এম)-এ যোগ দেন। কিন্তু ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রথম ভাঙ্গনটি কেবলমাত্র ভবিষ্যতের আরও মৌলিক সংগ্রামেরই পূর্বাভাস বলে প্রমাণিত হয়।
সিপিআই(এম) নেতৃত্ব বিপ্লবী সংগ্রাম গড়ে তুলতে অস্বীকার করায় এবং নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পথ গ্রহণ করায় সি এম এই নয়া সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে তত্ত্বে ও অনুশীলনে সত্যিকার বিপ্লবীদের সংগ্রামে নেতৃত্ব প্রদান করেন। নকশালবাড়ি সমগ্র জাতি ও দুনিয়াকে কাঁপিয়ে দেয়। সিপিআই(এম)-এর মধ্যকার এবং বাইরের কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা ১৯৬৮-র শেষ দিকে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সারা ভারত কো-অর্ডিনেশন কমিটিতে (এআইসিসিসিআর) মিলিত হন এবং ১৯৬৯-এর ২২ এপ্রিল সিপিআই(এমএল) গঠিত হয়। বাকিটা তো ইতিহাস।
চারু মজুমদারের পারিবারিক জীবন ও জেল-জীবন তাঁর এই অত্যন্ত ব্যতিক্রমী গতিময় রাজনৈতিক জীবনেরই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তাঁর দুই কন্যা ও এক পুত্রের কাছে তিনি ছিলেন স্নেহশীল পিতা। শিক্ষক হয়ে তাদের পড়াশোনাও তিনি দেখিয়ে দিতেন। তিনি চাইতেন কোনো ইংরাজি ব্যাকরণ ও অভিধান ছাড়াই তারা ইংরাজি উপন্যাস পাঠ করুক। তিনি বলতেন, “এভাবেই তো ইংরাজি শিখতে হয়।” তিনি তাদের রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র ও বঙ্কিমচন্দ্রের রচনাবলী পাঠ করতেও উৎসাহ দিতেন। ধ্রুপদী সঙ্গীতের তিনি ছিলেন গভীর অনুরাগী। রেডিওতে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের অনুষ্ঠানের তিনি ছিলেন নিয়মিত শ্রোতা।
এই বিপ্লবী নেতাকে বহুবার কারাবন্দি থাকতে হয়েছে আর বন্দি জীবনকে তিনি গভীর অধ্যয়নের কাজে লাগাতেন। ১৯৬৪ থেকে জীবনের শেষ দিন অবধি তিনি হাঁপানির মতো দুরারোগ্য হৃদরোগ ও আরও নানান জটিল অসুখে ভুগতেন। তথাপি ১৬ জুলাই ১৯৭২ জীবনে শেষবারের মতো গ্রেপ্তার হওয়ার আগে পর্যন্ত আত্মগোপন অবস্থায় বিপ্লবী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব তিনি কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। কলকাতার কুখ্যাত লালবাজার লক-আপে 'জিজ্ঞাসাবাদের' সময় তাঁকে অমানুষিক কষ্ট ভোগ করতে হয়েছে। কিন্তু কোনো স্বীকারোক্তি অথবা বিন্দুমাত্র গোপন তথ্য তাঁর কাছ থেকে আদায় করা যায়নি।
বিপ্লবের চূড়ান্ত জয় সম্পর্কে প্রগাঢ় প্রত্যয় নিয়ে এই মহান বিপ্লবী ২৮ জুলাই ১৯৭২ ভোর প্রায় ৪টের সময় মাথা উঁচু করে শহীদের মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মরদেহ এমনকি তাঁর পরিবারের হাতেও তুলে দেওয়া হয়নি। তাঁর পরিবারের নিকটতম সদস্যদের সঙ্গে রেখে পুলিশ তাঁর মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে যায়। সমস্ত এলাকাটা পুলিশী-বেষ্টনীতে ঘিরে রাখা হয় এবং তাঁর দেহ যখন আগুনের শিখা হয়ে জ্বলতে থাকে তখন তা দেখার জন্য একজনেরও অনুমতি মেলেনি।
“১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধের পর বাবা যখন জেল থেকে ফিরলেন তারপর থেকেই তাঁর মধ্যে একটা অস্থিরতা দেখলাম। তিনি যেন একটা নতুন কিছু খুঁজছেন। ১৯৬৪ সালে তাঁর প্রথম হার্ট অ্যাটাক হল। তারপর তিনি সারাদিন বাড়িতে ইজিচেয়ারে বসে পড়তেন, লিখতেন। মাঝে মাঝেই গ্রামে যেতেন। বাড়িতে নতুন লোকেদের নিয়ে বৈঠকও করতেন যাঁদের অধিকাংশই ছাত্র ও যুবক। তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা বলে বুঝলাম, তিনি ভারতবর্ষকে আমূল পাল্টে ফেলার এক দুঃসাহসিক স্বপ্ন দেখছেন। তিনি বলতেন যে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ এবং মাও সেতুঙের চিন্তাধারার সঠিক প্রয়োগেই সেটা সম্ভব। তার জন্য তিনি নতুন মানুষের সন্ধানে ছিলেন – যারা শুধু মৃত্যুভয় ত্যাগ করবে না, নিজেকে একেবারে পাল্টে কৃষক ও শ্রমিকের সাথে একাত্ম হয়ে যেতে পারবে। তারপর আমার চেনা দশজন যুবক কাকুরা একদিন তাদের সমস্ত পরিচিত পরিবেশ, বাড়ি এবং নিজেদের পড়াশোনা ও কেরিয়ার ছেড়ে গ্রামে চলে গেল বিপ্লবের প্রস্তুতি নিতে। আমি এই নতুন মানুষদের বুঝতে ও শ্রদ্ধা করতে শিখলাম।
১৯৬৭ সালে নকশালবাড়ির অভ্যুত্থান ঘটলো। এরপর কমরেড বাবুলালের শহীদ হওয়ার খবরে বাবার মধ্যে প্রচণ্ড একটা প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করলাম – একই সঙ্গে এক প্রিয় কমরেডের জ্ন্য গৌরব ও শোক। তিনি সেদিন দুপুরে পায়চারি করতে করতে কমরেড বাবুলালের ওপর তাঁর লেখাটি আমাকে ডিকটেশন দিলেন। তারপর একদিন কমরেড পঞ্চাদ্রি কৃষ্ণমূর্তি আমাদের বাড়িতে এলেন, দুদিন থাকলেন। লড়াই আস্তে আস্তে ভারতবর্ষের অনেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়ল। এল ১৯৬৯ সাল। বাবা অস্থির হয়ে পড়ছেন। আমি, মা বুঝতে পারছি উনি আন্ডার গ্রাউন্ডে চলে যেতে চাইছেন। কিন্তু যে লোকটার দিনের মধ্যে কয়েকবার ভয়ঙ্কর বুকের ব্যথা হয়, অনেক সময় তার জন্য পেথিডিন ইনজেকশনও নিতে হয় এবং বাড়িতে অক্সিজেন সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হয়, তার সেল্টার যোগাড় করা মুশকিল। এ সত্ত্বেও বাবা কলকাতায় যেতেন মাঝে মাঝে। ১৮ জুন সেই যে গেলেন, অনেকদিন আর কোনো খবর পেলাম না। বুঝলাম উনি ওনার প্রিয় কমরেডদের সাথে একসাথে লড়াই করার জন্য বাড়ি ছেড়েছেন। তখন আমি দশম শ্রেণীতে পড়ি, আমার বোন অষ্টম এবং ভাই তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে।
তারপর একদিন পুলিশ বাড়ি সার্চ করতে এলো। আমার মা আমাদের বললেন, “আমাকে অ্যারেস্ট করতে পারে, তোমরা ভেঙ্গে পোড়ো না।” ওরা আমাদের স্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করে নিয়ে গেল। যখনই পুলিশ সার্চ করতে আসতো মা তখনই তাদের কাছে ওয়ারেন্ট চাইতেন এবং তাদের পকেটের রিভালবার বাইরে রেখে তবে ঢুকতে দিতেন।
১৯৭০ থেকে ১৯৭১-এর মধ্যে আমরা কয়েকবার পার্টির নির্দেশে অত্যন্ত গোপনে বাবার সাথে দেখা করি। ১৯৭১-এর ফেব্রুয়ারীতে এইভাবে তাঁর সাথে আমার শেষ দেখা হয়।
আমি ১৯৭২ সালের জানুয়ারী মাসে প্রি-মেডিক্যাল পড়তে কলকাতা গেলাম। ১৭ জুলাই সকালে হঠাৎ-ই দুজন পুলিশ আমার সাথে দেখা করতে হস্টেলে এলো এবং বাবার গ্রেপ্তারের খবর দিয়ে আমাকে লালবাজারে যেতে বলল। হস্টেলে আমার পরিচয় আর গোপন থাকল না। কংগ্রেসী সিনিয়র মেয়েরা আমাকে ডেকে নানাভাবে ব্যঙ্গ করতে লাগল। আমি ১১টা নাগাদ লালবাজারে গেলাম। সেন্ট্রাল লক-আপে বাবার সাথে দেখা হল। আমি সেখানে কোনো অক্সিজেন সিলিন্ডার দেখতে পেলাম না। বাবা হেসেই কথা বললেন। তাঁকে খুব অসুস্থ মনে হল না – এর থেকে অনেক বেশি অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে আমরা দেখেছি। আমরা দুজনেই বুঝলাম যে এই সরকার তাঁকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে না, সুতরাং শেষ মুহূর্তের প্রতীক্ষা। পুলিশের কাছ থেকে খবর পেয়ে আমার মা-ভাইবোন এলো। আমরা দু-তিনবার লক-আপে বাবার সাথে দেখা করলাম। মাকে বাবা বললেন, তোমরা আর কদিন থাকবে, এবার শিলিগুড়ি চলে যাও। ২৫ জুলাই শেষবার আমাদের সাথে তাঁর দেখা হল। ২৮ জুলাই সকাল ৮টা নাগাদ আবার পুলিশ এলো। আমাকে বলল যে আপনার বাবা খুব অসুস্থ হয়ে পিজিতে আছেন, উনি আপনাকে দেখতে চাইছেন। আমার প্রথমেই মনে হল এটা হতে পারে না, আমার বাবা কখনই পুলিশের কাছে এই অনুরোধ করতে পারেন না।
পিজিতে পৌঁছে দেখি অসংখ্য পুলিশ, আর এখানে ওখানে গুচ্ছ গুচ্ছ মানুষ। আমি কেবিনের দরজা থেকে দেখলাম উনি শুয়ে আছেন, ওঁর শরীর সাদা চাদরে ঢাকা, মাথায় বালিশ নেই। বুঝলাম, সব শেষ। কিন্তু আমার একটুও কান্না এলো না। আমার বাবা বিপ্লবের জন্য শহীদ হয়েছেন, সেই গৌরববোধ আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। আমি শুধু ওনার বুকের ওপর ছোট্ট সাদা কাগজে লেখা 'কজ অফ ডেথ'টা মুখস্ত করলাম : 'ইস্কিমিক হার্ট ডিজিস উইথ কনজেস্টিভ কার্ডিয়াক ফেলিওর'। কত বয়স্ক নার্স এসে ওনাকে প্রণাম করে গেলেন। আমার মনে হল উনি শুধু আমার বাবাই নন, আরও অসংখ্য মানুষের পিতৃতুল্য। আমার মনে এলো ওঁর একটা কথা – 'মানুষ নিজের জন্যই বিপ্লবে সামিল হয়'। মা-রা সেদিনই কলকাতায় পৌঁছালো এবং রাতে কড়া পুলিশ প্রহরায় তাঁর শরীরটা কেওড়াতলা শ্মশানে পুড়ে গেল। আমি জানতাম এ শুধু আমাদের পারিবারিক শোক নয়, এতে সামিল আছেন আরও অসংখ্য মানুষ। আমি জানতাম, এতে বিপ্লবের গতি স্তব্ধ হবে না, কারণ কোনো একজন মানুষ বিপ্লবের জন্য অপরিহার্য নয়। কিন্তু আমি তখনও বিশ্বাস করতাম, এখনও করি, বিপ্লব অনিবার্য।
আমি এখন বুঝতে পারি, বাবার মৃত্যুর সময়ে সরকার ও পুলিশ আমাদের দাবার ঘুঁটি করেছিল। যেখানে অসংখ্য অন্য মা, স্ত্রী, বোন ও কন্যারা বছরের পর বছর জানতেই পারেনি তাদের প্রিয়জন জেলে আছেন না শহীদ হয়েছেন, সেখানে সরকার দেখালো চারু মজুমদারের ক্ষেত্রে তারা কত বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছিল এবং কত মহানুভবতার সাথে আমাদের তাঁর সাথে দেখা করার সুযোগ করে দিয়েছিল। এইভাবে ওরা বাবার মৃত্যুকে স্বাভাবিক মৃত্যু বলে দেখাতে চেয়েছিল।
এরপর অনেকদিন কেটে গিয়েছে। ১৯৯৮ সালে আমার বাবা সহ '৭০ দশকের সমস্ত বীর শহীদদের হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও দোষীদের শাস্তি দাবি করে হাইকোর্টে মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু সেখানে এবং তারপর সুপ্রীম কোর্টেও মামলা খারিজ হয়ে যায়। এই সরকারের কাছে এর থেকে বেশি কিছু আশা করা যায় না। আমাদের অন্তরের গভীর শোক ও ঘৃণাকে বৃহত্তর গণআন্দোলনে পরিণত করেই একমাত্র এদের বাধ্য করা যায়। এখনও অসংখ্য মানুষ আমার সাথে বিভিন্ন কারণে দেখা হলে বাবার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। মৃত্যুর পর আমার কাছে যে অসংখ্য চিঠি এসেছিল, তার মধ্যে বাংলাদেশের এক তরুণ কমরেডের লেখা শেষ কথাটাই মনে পড়ছে : 'কোনো মৃত্যুর উদ্দেশ্যই বৃথা যায় না – আপনার বাবার এই কথাটাই শেষ সম্বল'।”–
যে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান মাওবাদ/নকশালবাদ/বামপন্থী উগ্রপন্থাকে ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রশ্নে একক বৃহত্তম শত্রু হিসাবে বর্ণনা করে সে তো চারু মজুমদারকে অমঙ্গলের প্রতিমূর্তি বলে চিহ্নিত করবেই। বিপ্লবের বিরুদ্ধাচারী শ্রেণীশক্তিগুলির বুদ্ধিজীবী প্রতিনিধিরা একটা উদ্দেশ্য নিয়েই সি এম-কে হত্যার রাজনীতির উদ্গাতা ও তত্ত্বকার হিসাবে চিত্রিত করে। তারা যে কেবল বিদ্যমান বিভিন্ন সংগঠনগুলিকেই আক্রমণ করে তা নয় বরং তারা সেই মানুষটিকে কলঙ্কিত করার ও শেষ করে দেওয়ার সমস্ত সুযোগকেই কাজে লাগায় – যে মানুষটিকে প্রায় চল্লিশ বছর আগে শারীরিকভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে অথচ যার ভূত আজও এখানে সেখানে, সর্বত্র তাড়া করে বেড়ায়।
প্রায়শই সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলিতে ওপর ওপর ধারণা থাকার কারণে কিম্বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁদের নিজেদেরই বিপ্লব সম্পর্কে দ্বিধাগ্রস্ত, পরস্পর বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গী থাকায় বামেদের মধ্যেও অনেকে তাঁকে সন্ত্রাসবাদী/নৈরাজ্যবাদী/বাম হঠকারী বলে বর্ণনা করে থাকেন। জনগণের চলমান বিভিন্ন আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল অনেক লেখককেও অত্যন্ত কর্কশ মন্তব্য করে তাঁকে খারিজ করতে সচেষ্ট হতে দেখা যায়। উদারহণস্বরূপ, বামপন্থী ঐতিহাসিক দিলীপ সাইমন তাঁকে “একজন ব্যক্তি যাঁর সমাজতন্ত্রের প্রতি একমাত্র অবদান হল মানুষ খুনের মনোবিকারকে রাজনৈতিক নীতির পর্যায়ে উন্নীত করা” বলে বর্ণনা করেছেন এবং তাঁকে ভি ডি সাভারকারের মতো সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের পংক্তিতে স্থান দিয়েছেন (“পার্মানেন্ট স্প্রিং”, সেমিনার, মার্চ ২০১০)। মাওবাদীদের অনুসৃত পদ্ধ তির মস্ত গুণগ্রাহী লেখিকা অরুন্ধতী রায়ের মতে সি এম-এর “জ্বালা ধরানো বাক্যালংকারগুলি হিংসা, রক্তপাত ও শহীদ হওয়ার স্তবগান করে এবং কখনও কখনও সেই ভাষা প্রায় গণহত্যাকে উৎসাহিত করার মতো কদর্ষ।” যদিও রায় আমাদের বলেছেন, “তাকে এতখানি কর্কশ হিসাবে আমরা বিচার করতে পারি না” – শুধুমাত্র এই কারণেই, যে পার্টিটির তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন সেটি “ভারতের বিপ্লবের স্বপ্নকে সত্যিকার এবং জাগরুক করে রেখেছে [“কমরেডদের সঙ্গে চলতে চলতে” (ওয়াকিং উইথ দি কমরেডস), আউটলুক, মার্চ ২৯, ২০১০]।
চারু মজুমদারের (সি এম) রাজনৈতিক-সাংগঠনিক দৃষ্টিভঙ্গীসমূহ কীভাবে গড়ে উঠেছিল সে বিষয়ে আলোকপাত করে এমন ছোট ছোট ঘটনার প্রামাণ্য ছবি প্রদীপ বসু আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। সি এম ছিলেন তেভাগা আন্দোলনের এক সংগঠক আর ১৯৪৮-এ জঙ্গী কৃষক আন্দোলন পরিচালনার কারণে জলপাইগুড়ি জেলা কমিটি কর্তৃক তিনি সমালোচিত হন এবং তাঁকে ট্রেড ইউনিয়ন ফ্রন্টে বদলি করে দেওয়া হয়। পরের বছর জঙ্গী ট্রেড ইউনিয়ন কার্যকলাপ চালানোর জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাঁর তিন বছর কারাদণ্ড হয়। মুক্তির পর যে জেলা কমিটি তাঁর সমালোচনা করেছিল সেই কমিটিরই তিনি সম্পাদক নির্বাচিত হন।
অল্পদিন পরই তিনি তাঁর নিজের জেলা দার্জিলিং ফিরে যান ও কৃষক ফ্রন্টের কাজে মনোনিবেশ করেন। এখানেও আবার তাঁকে সাসপেনশনের মুখে পড়তে হয়। এবার জেলা সম্পাদকের আমলাতান্ত্রিক কাজের সমালোচনা করার জন্য তাঁর এই শাস্তি। কিন্তু তাঁর কাজের পরিচয়কে উপেক্ষা করতে না পেরে এবং পার্টি কর্মী ও উত্তরবঙ্গের শ্রমজীবী জনগণের মধ্যে তাঁর প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা দেখে রাজ্য কমিটিকে হস্তক্ষেপ করতে হয় এবং তাঁর সাসপেনশনের আদেশ বাতিল হয়ে যায়।
'৫০-এর দশকের মধ্যভাগে পার্টির মধ্যে তীব্র আন্তঃপার্টি বিতর্ক দেখা দিলে সি এম শিলিগুড়ি মহকুমায় দুমাসব্যাপী এক শিক্ষাশিবির সংগঠিত করার কাজে নেতৃত্ব দেন; এরই পরবর্তী ক্রিয়া হিসেবে তিনি সমস্ত পার্টি মিটিং-এ সংক্ষিপ্ত তত্ত্বগত আলোচনা চালানোর রেওয়াজ গড়ে তোলেন।
সর্বক্ষণের কর্মীদের (হোলটাইমার) ভাতা দেওয়ার তিনি বিরোধী ছিলেন। তিনি চাইতেন, হোলটাইমার কর্মীরা জনগণের মধ্যে থাকবেন এবং নিজেদের যাবতীয় প্রয়োজন মেটানোর জন্য জনগণের ওপরই নির্ভর করবেন। তাঁকে অনুসরণ করে শিলিগুড়িতে পুরনো প্রথাকে বিদায় দেওয়া হয়। ১৯৬৩-র উপনির্বাচনে শিলিগুড়ি কেন্দ্রের প্রার্থী হিসেবে তিনি ভারতের চীন আক্রমণের নিন্দা করেন এবং প্রকাশ্য জনসভাগুলিতে সশস্ত্র সংগ্রামের রাজনীতি প্রচার করেন। ১৯৬৪-তে সিপিআই(এম)-এর গড়ে ওঠার পর্বে পার্টি কংগ্রেসের খসড়া কর্মসূচীকে তিনি শর্তসাপেক্ষে সমর্থন করেন। পরিমল দাশগুপ্ত একটা বিকল্প দলিল হাজির করেছিলেন – কেউই যার সপক্ষে এসে দাঁড়ায়নি।
প্রদীপ বসু আমাদের সামনে আরও কিছু প্রায় অজানা তথ্য হাজির করেছেন – যেমন কানু সান্যালের সঙ্গে একেবারে ১৯৬৬-র গোড়ার দিকেই সি এম-এর আংশিক রাজনৈতিক মতপার্থক্য দেখা দেওয়ার কথা। পার্টির মধ্যে স্বীকৃতিলাভ করেনি এমন বিভিন্ন মঞ্চ চালিত তত্ত্বগত সংগ্রামের বর্ণনাও কম তথ্যবহুল নয়। যেমন ছিল চিন্তাগ্রুপ (অমূল্য সেন, সুপ্রকাশ রায় ও অন্যান্যদের দ্বারা প্রকাশিত তাত্ত্বিক পত্রিকাকে ঘিরে যা গঠিত হয়েছিল), ইনস্টিটিউট অফ মার্কসিজম-লেনিনিজম (১৯৬৪-র ২২ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত – যা এস আর সি, অসিত সেন ও সরোজ দত্ত কর্তৃক চালিত হত এবং যেটা একটা ছোট পাঠাগার, অধ্যয়ন কেন্দ্র, মতাদর্শগত চর্চা ও প্রকাশনা সংস্থা হিসেবে কাজ করত) ইত্যাদি ইত্যাদি।
এই ধরনের বিচিত্র কর্মকাণ্ডের বিস্তৃত পরিসরের ওপর সমীক্ষা চালিয়ে সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে লেখক দুটি পৃথক ও সুস্পষ্ট ধারা হিসেবে বিভাজিত করেছেন। যথা : “বিতর্কপন্থী” ধারা ও “অ্যাকশনপন্থী” ধারা। শেষোক্তটির “প্রকাশ ঘটে চারু মজুমদারের দলিল, আলোচনা, চিঠিপত্র ও কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে” এবং তাঁর সতীর্থদের মাধ্যমে যাঁরা “তত্ত্বগত বিতর্ক সম্পর্কে আস্থা হারিয়েছিলেন” ও সেই কারণে “জঙ্গী রাজনৈতিক অ্যাকশন বিশেষত কৃষকদের সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ার কাজেই সমস্ত প্রচেষ্টাকে ঢেলে দিয়েছেন ...।” অন্য সমস্ত ৠ।ডিক্যাল/বিপ্লবী ব্যক্তিবর্গ ও গোষ্ঠীগুলি কোনো বিপ্লবী আন্দোলনের মডেল গড়ে তোলার প্রয়াস না চালিয়ে তাদের প্রচেষ্টাকে “কেন্দ্রীভূত করেছিল পার্টির অভ্যন্তরে দীর্ঘমেয়াদী তত্ত্বগত বিতর্ক চালানোর কাজে।”
বইটির দ্বিতীয় অংশে এই দুই ধারার “কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যকে” সবিস্তারে বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়ায় লেখক তাঁর সমালোচনামূলক মন্তব্যগুলিকে তুলে ধরেছেন। আর নিশ্চিতভাবেই এই উপসংহারে এসে পৌঁছেছেন যে অ্যাকশনপন্থীদের মধ্যে ছিল তত্ত্বের ঘাটতি এবং বিতর্কপন্থীদের ছিল অনুশীলনে না যাওয়ার দুর্বলতা। সিপিআই(এমএল) প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথমোক্ত ধারার ওপর ভিত্তি করে (কারণ দীর্ঘকালীন আন্তঃপার্টি সংগ্রাম চালাতে চালাতে “মাওবাদীরা” অধৈর্য্য হয়ে পড়েছিল) আর এর মধ্যেই পরবর্তীকালের বিপর্যয়ের মূল নিহিত ছিল। বসু বইটির একেবারে শেষের দিকে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, “মজুমদারের নেতৃত্ব তাঁর তত্ত্বগত শ্রেষ্ঠত্ব, মতাদর্শগত পরিপক্কতা অথবা অন্যদের চেয়ে তাঁর আগে চিন্তা করার সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি। বিপরীতে, তাঁর নেতৃত্ব ছিল অ্যাকশন নির্ভর। নকশালবাড়ির অভ্যুত্থানের পর “মতাদর্শবিহীন, তাত্ত্বিকতাহীন, অভিজ্ঞতাবাদের” ভিত্তিতে তাঁদের মধ্যে ঐক্য গড়ে উঠলেও “গোড়া থেকেই নকশালপন্থীদের মধ্যে তত্ত্বের প্রশ্নে মতপার্থক্য ছিল” আর সেটাই “তাঁদের বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে যাওয়ার কারণ।”
পণ্ডিতি কেতায় কূটতর্কের মাধ্যমে সহজ যে উপসংহারটি টানা হয়েছে তা হল : নকশালবাড়ি আন্দোলনের ব্যর্থতা ছিল অবধারিত কেননা তা মতাদর্শগতভাবে যথেষ্ট প্রস্তুতি ছাড়াই গড়ে উঠেছিল এমন একজনের নেতৃত্বে যিনি অ্যাকশনপন্থী হিসেবে মহৎ হলেও তাত্ত্বিক দিক থেকে ছিলেন (বিতর্কপন্থীদের থেকে) নিকৃষ্টতর।”
প্রথমত, সি এম-এর নেতৃত্ব নিছক নকশালবাড়ির অভ্যুত্থানের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল – বসুর ধাঁচে এমন সিদ্ধান্ত টানাটা একেবারেই হাস্যকর। এভাবে দেখলে তো সে নেতৃত্ব ১৯৬৭-র আগস্টের পর আর স্থায়ীত্বই পেত না – কারণ নকশালবাড়ির অভ্যুত্থান তার আগেই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। সকলেই জানে যে পশ্চিমবঙ্গ সমেত অন্যান্য রাজ্যের নেতৃস্থানীয় কর্মীরা শেষপর্যন্ত সি এম-কেই নেতা হিসেবে বেছেছেন ১৯৬৯-র এপ্রিল মাসে যা চূড়ান্ত হয়, ১৯৭০-এর মে-তে (যখন প্রথম পার্টি কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়) অর্থাৎ তাঁর ধারণাগুলিকে পর্যবেক্ষণ ও আলোচনা চালানোর মাধ্যমে এবং দু-তিন বছর ধরে সেগুলির প্রকৃত ফলাফলের দিকে নজর রেখেই।
বসু বহু কসরৎ করে বিজ্ঞাপিত করেছেন, রাজনৈতিক, রণনীতিগত ও সাংগঠনিক প্রশ্নে মজুমদারের বিশ্লেষণগুলি ছিল “সরলতার দোষে দুষ্ট ও ভাসাভাসা।” আমাদের আবার বলতে হচ্ছে, আরও অনেকেই অনুরূপ ধারণা পোষণ করেন। এই সব বিদগ্ধ বিশ্লেষকদের মধ্যে যেখানটায় মিল দেখা যায় তা হল এরা সকলেই মার্কসবাদী তত্ত্বকে এক ধরনের অভিজাতসুলভ উচ্চমার্গীয় দৃষ্টিতে বিচার করেন। তত্ত্বগত কাজের রূপ ও বৈশিষ্ট্যগুলিকে অধ্যয়ন করার প্রশ্নে এদের সকলের মধ্যেই ঐতিহাসিক ও দ্বন্দ্বমূলক দৃষ্টিভঙ্গীর অভাব আছে। তত্ত্ব সম্পর্কিত কাজ পৃথক পৃথক পরিস্থিতির দাবির সাথে সঙ্গতি রেখেই এক এক রূপ পরিগ্রহ করে থাকে। সুতরাং ধারণাসৃষ্টি ও তার প্রয়োগ ঘটানোর মধ্যে যে জীবন্ত দ্বিমুখী, গতিময় সম্পর্ক আছে তা আয়ত্ত করতেও তাঁরা ব্যর্থ হন। এ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার দিকে আমরা যদি একঝলক দৃষ্টি ফেরাই তাহলে বিষয়টি আপনা থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
একটি আনকোরা নতুন তত্ত্বের ভিত্তি রচনার কাজটির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মার্কস ও এঙ্গেলসকে কমিউনিস্ট ইস্তাহারের মতো 'অ্যাকশনপন্থী' দলিল প্রণয়নের সাথে সাথে জার্মান মতাদর্শ, ক্যাপিটাল, অ্যান্টি ডুরিং ইত্যাদির মতো 'ভারী' বিষয়কেও রচনা করতে হয়েছিল। তারপর সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব ঘটলে ও সম্পূর্ণ বিচিত্র পরিস্থিতিতে (পশ্চাদপদ পুঁজিবাদ সহ) মার্কসবাদকে প্রয়োগের প্রয়োজন ও অভিজ্ঞতা তার সার্বিক সম্প্রসারণ ও সামগ্রিক বিকাশের দাবি জানায়। আর এ কারণেই লেনিন ও তাঁর সহযোগীদের বিশাল বিশাল গ্রন্থ রচনা করতে হয়।
বুনিয়াদী বিষয়সমূহ স্থাপিত হয়ে যাওয়ার ফলে, মাও তাঁর সমগ্র মনোযোগকে নিবদ্ধ রেখেছিলেন চীনা পরিস্থিতির বৈশিষ্ট্যের সাথে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সর্বজনীন সত্যকে সংযুক্ত করার কাজে। চীনের পরিস্থিতি, দীর্ঘস্থায়ী বিপ্লবী যুদ্ধের শর্তসমূহ এবং যে গ্রামীণ পরিবেশে চীনা কমিউনিস্টদের কাজ করতে হয়েছিল – প্রধানত সেগুলিই তাঁর রচনাবলীর চরিত্র ও ক্ষেত্রকে নির্ধারণ করে দিয়েছিল। ইউরোপীয় ঐতিহ্যের থেকে বিষয়গুলি এতটাই আলাদা ছিল যে বিভিন্ন মহল থেকে তাঁকে এক মহান বিপ্লবী বলে গণ্য করা হলেও তাঁকে প্রথম-সৃষ্টিকারী কোনো তাত্ত্বিক বলে ভাবা হয় না। এটাও লক্ষ্যণীয় যে মাও-এর গোড়ার দিকের রচনাগুলি, বলতে গেলে সবই ছিল অ্যাকশনপন্থী। তাঁর অপেক্ষাকৃত পরিণত 'তাত্ত্বিক' বিশ্লেষণগুলির অধিকাংশই ১৯৩৯ সাল নাগাদ প্রণীত হয়েছে – যখন অভিজ্ঞতার এক সামগ্রিক সারসংকলনের সময় ও সুযোগ দুই-ই ছিল নাগালের মধ্যে।
আমাদের দেশে সি এম-এর আটটি দলিল আকারে ভারতীয় বিপ্লবের পথপ্রদর্শক কর্মসূচীটি ইতিহাসের এমন এক বিরলতম মুহূর্তে রচিত হয় যখন মার্কসের ভাষা অনুযায়ী, বিপ্লবী কাজে একটা পদক্ষেপ গ্রহণ এক ডজন কর্মসূচীর খসড়া তৈরির থেকেও ঢের বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া, ১৯৬৫ সালের আগেই পার্টির সংকীর্ণ গণ্ডির ভেতর রাজনৈতিক বিতর্ক চূড়ান্ত মাত্রায় পৌঁছে যাওয়ায় ব্যাপক জনগণকে সামিল না করে তাকে আর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। যতক্ষণ না বিপ্লবী অনুশীলনের মধ্য দিয়ে কৃষক জনগণ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন ততক্ষণ সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে প্রকৃত লড়াই শুরুই করা যাবে না – এই মন্তব্য করার মধ্য দিয়ে সি এম বিষয়টিকে অত্যন্ত সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
এক কথায় বলতে গেলে, তখন ছিল ব্যতিক্রমী সময় আর সে কারণেই তিনি “কমিউনিস্ট পার্টির চিরাচরিত আলাপ-আলোচনার পদ্ধতিকে অনুসরণ করেননি” – বসু যে দিকটিকে চিহ্নিত করেছেন (সি এম-এর তাত্ত্বিক শূন্যগর্ভতা হিসেবে)। উদারহণস্বরূপ, বিতর্কপন্থী 'পিডিজি'র বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে তিনি “বিপ্লবী পরিস্থিতির মূল্যায়ন করতে গিয়ে এ বিষয়ে লেনিনের বিখ্যাত রচনা সম্পর্কে কোনো উল্লেখ পর্যন্ত করেননি।”তিনি তাহলে কী করেছিলেন ? সমকালীন ভারতে লেনিনীয় মানদণ্ড অনুযায়ী বিপ্লবী সঙ্কটের নির্দিষ্ট প্রকাশগুলিকে তিনি চিহ্নিত করেছিলেন : পাশবিক রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মুখে দাঁড়িয়েও দেশজুড়ে স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলনের ক্রমবর্ধমান জঙ্গী মেজাজ – যা দেখিয়ে দেয় যে জনগণ পুরনো অবস্থায় বেঁচে থাকতে আর একেবারেই রাজি নয়; এবং খাদ্যসংকট সমাধানে ও কংগ্রেস দলের মাধ্যমে স্থিতিশীল সরকার টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে শোচনীয় ব্যর্থতা।
বৃহৎ বেসরকারী পুঁজির স্বার্থরক্ষাকারী সোভিয়েত সাহায্যপ্রাপ্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র সম্পর্কে (উদারহণস্বরূপ, ইস্পাত ও পেট্রোলিয়াম শিল্প), ভারতীয় বুর্জোয়াশ্রেণীর সম্পূর্ণ মুৎসুদ্দি চরিত্র সম্বন্ধে এবং এক সুবিস্তৃত মতাদর্শগত, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রশ্নকে তিনি একই রকম প্রাঞ্জল ভাষায় (বসুর কথায় “স্বতঃসিদ্ধের” মতো), স্পষ্ট ও তীক্ষ্ণভাবে সূত্রবদ্ধ করেছেন। যার ফলে, ১৯৬৫ সাল থেকেই সি এম-এর রচনাগুলি বিপ্লবী কর্মীবাহিনী ও বেশ কিছু নেতৃস্থানীয় ক্যাডারকে – যাঁরা সি এম লেখনী ধরার আগে থেকেই কঠিন তাত্ত্বিক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন – আকৃষ্ট করতে শুরু করে।
সি এম এবং অন্যদের অ্যাকশনপন্থী-বিতর্কপন্থী এমন বিভাজন অভিসন্ধিমূলক ও কৃত্রিম। এটা এই সরল সত্যটিকেই অস্পষ্ট করে দেয় যে তাঁদের সকলেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, পার্টি সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে তাঁদের সাধ্যমতো ও নিজ নিজ ধারণা অনুযায়ী একই অভিন্ন লক্ষ্যে সংগ্রাম চালাচ্ছিলেন। আর এ কারণেই তাঁরা সাগ্রহে এমন একজন সতীর্থ কমরেডের নেতৃত্ব স্বীকার করে নেন যিনি তত্ত্বে ও অনুশীলনে নিজেকে সবথেকে অগ্রণী হিসেবে প্রমাণ করেছিলেন। আর অবশ্যই তাঁদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও প্রজ্ঞার ফলেই নকশালবাড়ি ও পশ্চিমবঙ্গ ছাড়িয়ে আন্দোলনের বিস্তার ঘটে এবং সিপিআই(এমএল)-এর জন্ম হয়।
এ সবকিছু থেকে কি এই অর্থ দাঁড়ায় যে সি এম-এর নেতৃত্ব ছিল ত্রুটিহীন ? কোনো মতেই না। এআইসিসিসিআর এবং সিপিআই(এমএল)-এর মধ্যে কি তত্ত্বগত ঘাটতি ও বিতর্ক ছিল না? হ্যাঁ, ছিল, কয়েকটি তো ছিল রীতিমতো সাংঘাতিক। নতুন পার্টির জন্ম দেওয়ার আগে যদি সর্বসম্মতিতে বা প্রায় সর্বসম্মতিতে পৌঁছানো যেত তাহলে কি আরও ভালো হত না? সত্যিই ভালো হত। কিন্তু একমাত্র সমস্যাটা হল যে বিপ্লবকে সম্পন্ন করা (অথবা প্রচেষ্টা চালানো) ও বিপ্লবী পার্টির প্রতিষ্ঠা তো গ্রন্থশালায় হয় না কিম্বা আদর্শ গবেষণাগারের পরিবেশেও হয় না, হয় তো কেবল শ্রেণীসংগ্রামের বিস্তীর্ণ দুনিয়ায়, বিকাশের আঁকা-বাঁকা ধারায় – প্রায়শই কাজ চালাতে গিয়ে বিপ্লবীদের যার মুখোমুখি হতে হয়; যেগুলি চরিতার্থ করার জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়ীগত প্রস্তুতি ও বস্তুগত অবস্থারও হয়তো কোনো কোনো দিকে ঘাটতিও থেকে যায়। এই সমস্ত সন্ধিক্ষণে, যেমন নভেম্বর বিপ্লবে, সর্বদাই পেটিবুর্জোয়া তর্কবাগীশ ও মার্কসবাদের মধ্যকার সর্বহারা বিপ্লবী প্রবণতাগুলির মধ্যে তীব্র বিতর্কের উদ্ভব ঘটে।
দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের নেতারাও সবকটি অথবা নিদেনপক্ষে কয়েকটি উন্নত পুঁজিবাদী দেশে একসাথে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটনের আদি মার্কসবাদী ভাবনার বিপরীতে একটি মাত্র দেশে – তাও আবার পিছিয়ে পড়া রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র গড়ে তোলার জন্য বলশেভিকদের প্রচেষ্টাকে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেন। তাঁদের জবাবে লেনিন “আমাদের বিপ্লব”(১৯২১) রচনায় লেখেন, “তাঁরা সকলেই নিজেদের মার্কসবাদী বলে অভিহিত করেন, কিন্তু মার্কসবাদ সম্পর্কে তাঁদের ধারণা পণ্ডিতিসূলভ। মার্কসের যেটা নির্ধারক অর্থাৎ তার বিপ্লবী দ্বান্দ্বিকতাকেই তাঁরা বুঝতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন” এবং বলেন যে “'স্বাভাবিক' সম্পর্কে তাঁদের ধারণা একেবারেই ছকে বাঁধা ও সংকীর্ণ।” সুতরাং বিশেষ পরিস্থিতিতে “কী রূপের দিক থেকে, কী বিকাশের পর্যায়ের দিক থেকে” তারতম্য ও অভিনবত্ব দেখা দেওয়াটা যে “অনিবার্য” সে বিষয়ে তাঁরা পুরোপুরি অজ্ঞ থেকে গেছেন।”
লেনিন দেখিয়েছেন, ১৯১৭ ও তার পরবর্তীকালে রাশিয়া ঠিক এমনই এক অসাধারণ সময়ের মধ্য দিয়ে চলেছিল যখন বিপ্লবী মার্কসবাদীরা নেহাৎ পাঠ্য বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে থাকতে পারেননি। তিনি বলেছিলেন, তাদের অবশ্যই সৃজনশীলভাবে মার্কসবাদকে প্রয়োগ করার হিম্মত দেখাতে হবে এবং নেপোলিয়নের মতো সক্রিয়তা দেখাতে হবে, যিনি বলেছিলেন : “প্রথমে নিদারুণ এক সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড় আর তার পর দেখ কী ঘটছে।”
ভারতে সি এম-ই হলেন প্রথম সর্বাগ্রগণ্য ব্যক্তি যিনি মার্কসবাদের এই “বিপ্লবী দ্বান্দ্বিকতাকে” আয়ত্ত করেছিলেন এবং বলশেভিক স্পিরিটকে আত্মস্থ করেছিলেন। বিষয়ীগত প্রস্তুতির আদর্শ স্তরটিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে যে ঘাটতি রয়েছে সে সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন থেকেও তিনি বিপ্লবী কর্মীবাহিনী ও সংশোধনবাদ বিরোধী অগ্রণী যোদ্ধাদের দ্রুত পেকে ওঠা বিপ্লবী পরিস্থিতির ডাকে তত্ত্বে ও প্রয়োগে সাড়া দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এআইসিসিসিআর-এ যোগদানকারী বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলির কেউ কেউ যখন তত্ত্বগত বিতর্কের পুরোপুরি নিষ্পত্তি না হওয়া অবধি নতুন পার্টি গঠনের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেছিলেন তখন সি এম তার জবাবে বলেছিলেন যে এটা ভাববাদী ও বিশুদ্ধতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গী। তিনি বলেছিলেন, বিপ্লব যখন দরজায় কড়া নাড়ছে তখন আমাদের অবশ্যই বর্তমান যা বোঝাপড়া তার ওপর ভিত্তি করেই বিপ্লবী পার্টি গঠনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। যে সব প্রশ্নের সমাধান হয়নি সেগুলিকে নতুন অভিজ্ঞতার আলোকে ও আন্তঃপার্টি বিতর্কের মধ্য দিয়েই মীমাংসা করতে হবে।
নির্দিষ্ট অবস্থায় এটিই একমাত্র সঠিক বিপ্লবী অবস্থান হতে পারত – যা ভারতের ১৯০৫-কে বিপ্লবী মার্কসবাদী-লেনিনবাদী ঐতিহ্যের জননীকে সার্থক করে তুলেছিল। আমাদের মধ্যে যাঁরা এটিকে ১৯৬৯ সালে গ্রহণ করতে ব্যর্থ হলেন (যেমন এমসিসি) – সঙ্গে সঙ্গে তাঁরাও যারা পরবর্তী বছরগুলিতে এই ঐতিহাসিক সাফল্যকে নাকচ বা অস্বীকার করলেন এবং প্রাক-পার্টি স্তরের দিকে পিছু হঠলেন, ভারতে একটি বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো কিছুই অর্জন করতে সক্ষম হননি। আমাদের আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ের বিচ্যুতিগুলি প্রসঙ্গে এটা বলা চলে, সেগুলিকে ইতিবাচকভাবে কাটিয়ে ওঠা গেছে এবং চিন্তা ও অনুশীলনে সত্যিকার ও স্থায়ী অগ্রগতিও ঘটানো সম্ভব হয়েছে। কিন্তু যারা যাবতীয় দোষ সি এম-এর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছিলেন প্রথমদিকের সেই সব 'শুদ্ধিকরণপন্থীরা' এই সাফল্য অর্জন করেননি, এটা অর্জিত হয়েছে একটি ছোট 'অ্যাকশনপন্থীদের' গ্রুপের দ্বারা যারা আমাদের চমৎকার বিপ্লবী ঐতিহ্যগুলিকে বজায় রাখার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছিল।
আমাদের মূল বিষয়টিতে ফিরে আসা যাক। বসুর বিবরণী থেকে এটা স্পষ্ট যে সি এম সবসময়ই জনগণেরই একজন হয়ে থাকতে – একজন সচেতন, স্বাধীনমন কিন্তু তৃণমূলস্তরে সংগ্রামরত সুশৃঙ্খল সৈনিক হয়েই থাকাটা পছন্দ করতেন। কিন্তু পরিস্থিতি দাবি করলে, অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে এবং তাঁর অত্যন্ত দুরূহ শারীরিক সমস্যা থাকা সত্ত্বেও কখনোই পার্টির সর্বোচ্চ অবস্থানের দায়িত্ব গ্রহণে পিছপা হতেন না। তাঁর ভুলগুলিকে নিয়ে আলোচনা ও সেগুলিকে শুধরে নেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু ভারতে বিপ্লবী পার্টি গঠনের জন্য যে মজবুত মতাদর্শগত, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি সি এম এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধারা রচনা করেছেন তাকে খাটো করে দেখাটা অতি অবশ্যই ভুল হবে।
মার্কসবাদ যদি আপ্তবাক্য না হয়ে কাজের দিশা হয়ে থাকে, যদি ধ্রুপদী রচনাগুলিকে তোতাপাখির মতো কপচে যাওয়ার দক্ষতাটাই একজন মার্কসবাদী তাত্ত্বিকের মানদণ্ড না হয় বরং কোথা থেকে কীভাবে শুরু করতে হবে সেই বিষয়ে প্রকৃত অন্তর্দৃষ্টি ও নির্দিষ্ট উত্তর দেওয়ার সামর্থটাই বিচার্য হয়, যদি একজন মহান মার্কসবাদী তিনিই হন যাঁর দৃষ্টি ও কর্মে তত্ত্ব জনগণের আয়ত্তাধীন বস্তুগত শক্তি হয়ে ওঠে তাহলে সি এম-কে অবশ্যই এক সর্বোত্তম মার্কসবাদী হিসেবে সম্মান জানাতে হবে। এঙ্গেলস মার্কস সম্পর্কে যে অর্থে বলেছিলেন যে, সর্বোপরি, তিনি ছিলেন একজন বিপ্লবী সেই অর্থে সি এম যে একজন 'অ্যাকশনপন্থী' ছিলেন সে বিষয়ে সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই।
নকশালবাড়ির প্রকৃত তাৎপর্য বলতে কী বোঝায়? নকশালবাড়ির অর্থ বুনিয়াদী কৃষক জনগণের জাগরণ। সশস্ত্র কিছু স্কোয়াড দিয়ে এদিক ওদিক বিক্ষিপ্ত কিছু কার্যকলাপ বা কিডন্যাপের মতো চমকপ্রদ অ্যাকশন করে বেড়ানো নয়। তার অর্থ কলকাতা, দিল্লী, বোম্বেতে কফি হাউসে বসে বড় বড় বিপ্লবী বুলি আওড়ানোও নয়। নিজেদের ব্যর্থতাকে চাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন গোষ্ঠী আমাদের যতই গালাগালি দিয়ে বেড়াক না কেন, সত্য এটাই যে নকশালবাড়ির ধারায় এই কৃষক জাগরণ একমাত্র ঘটছে বিহারেই এবং আমাদের পার্টিই রয়েছে তার সামনের সারিতে।
নকশালবাড়ির অর্থ এই কৃষক জনগণের ভিত্তিতে জাতীয় রাজনীতিতে এক বৈপ্লবিক রাজনৈতিক ধারা প্রবর্তন। স্থানীয় ভিত্তিতে কৃষকের কিছু অর্থনৈতিক দাবি-দাওয়া পূরণের মানেই কিন্তু নকশালবাড়ি নয়। পাহাড়ে-জঙ্গলে গিয়ে 'লাল সেনা ও ঘাঁটি এলাকা' গড়ে যারা বিকল্প রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, তাদের সকলেই ব্যর্থ হয়েছেন। এখন সেখানে রাজনীতি বন্দুক চালাচ্ছে না, উল্টে বন্দুকই রাজনীতি চালাচ্ছে।
নকশালবাড়ি মার্কসবাদ বনাম সংশোধনবাদ, সশস্ত্র সংগ্রাম বনাম সংসদীয় পথের মধ্যকার কোনো বিমূর্ত সংগ্রামের সাফল্য নয়। পেটিবুর্জোয়া বিপ্লববাদ কিন্তু তাই ভাবে। কাজেই সে মনে করে বিপ্লবী ভাবাবেগ দিয়ে ও কিছু মৌলিক মার্কসবাদী সূত্র দিয়ে যখন খুশি, যেখানে খুশি নকশালবাড়ি গড়ে তোলা সম্ভব। যাবতীয় নৈরাজ্যবাদী কার্যকলাপ, তদজনিত হতাশা এবং অবশেষে উল্টো পথে যাত্রা – যার ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে রয়েছে – এ সবের পিছনে বিপ্লব সম্পর্কে মধ্যবিত্তের সেই কল্পনাবিলাসই কাজ করে।
নকশালবাড়ির শিকড় রয়েছে ভারতের গ্রামীণ সমাজব্যবস্থার অন্তর্দ্বন্দ্বের মধ্যে, তার পেছনে আছে দীর্ঘ কৃষক সংগ্রামের ইতিহাস, তেভাগা-তেলেঙ্গানার ধারাবাহিকতা। আছে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনে দুই বিপরীতমুখী কৌশলগত লাইনের মধ্যকার দীর্ঘ সংগ্রামের প্রক্রিয়া। একটি বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যার পরিণতি ঘটেছিল নকশালবাড়ির বিদ্রোহে। নকশালবাড়িকে বুঝতে হলে এসবই বুঝতে হবে।
মেহনতি কৃষক জনগণের জাগরণের মধ্যে দিয়ে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সমাধা হবে নাকি বুর্জোয়াদের কোনো না কোনো অংশের সাথে যুক্তফ্রন্টের স্বার্থে কৃষক জনগণের উদ্যোগকে স্তিমিত করা হবে – এই দুই বিপরীতমুখী কৌশলের লড়াই দীর্ঘ সময় ধরে পার্টিতে চলেছিল। ১৯৬৭ সালের বিশেষ এক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেই এই লড়াই তার চরমবিন্দুতে পৌঁছায় – যখন ক্ষমতাসীন যুক্তফ্রন্ট সরকার কৃষক আন্দোলনের ঢেউকে দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে এবং কমরেড চারু মজুমদারের নেতৃত্বে বিপ্লবীরা এগিয়ে যান এই আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিতে।
(নকশালবাড়ি সম্পর্কে বিনোদ মিশ্র, দেশব্রতী, সেপ্টেম্বর ১৯৯০)
“বিপ্লব কখনো সফল হতে পারে না বিপ্লবী পার্টি ছাড়া। যে পার্টি দৃঢ়ভাবে চেয়ারম্যান মাও সেতুঙ-এর চিন্তাধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত, আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ লক্ষ লক্ষ শ্রমিক, কৃষক ও মধ্যবিত্ত যুবকের দ্বারা গঠিত, যে পার্টির অভ্যন্তরে পুরো গণতান্ত্রিক অধিকার আছে সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার এবং যে পার্টির সভ্যরা স্বেচ্ছায় ও স্বাধীনভাবে শৃঙ্খলা মেনে নিয়েছে, যে পার্টি শুধু ওপরের হুকুম মেনেই চলে না, স্বাধীনভাবে প্রত্যেকটি নির্দেশকে যাচাই করে এবং ভুল নির্দেশকে অমান্য করতেও দ্বিধা করে না বিপ্লবের স্বার্থে, যে পার্টির প্রত্যেকটি সভ্য নিজের ইচ্ছায় কাজ বেছে নেন এবং ছোট কাজ থেকে বড় কাজ সব কিছুকেই সমান গুরুত্ব দেন; যে পার্টির সভ্যরা নিজেদের জীবনে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী আদর্শকে প্রয়োগ করেন, নিজেরা আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে জনতাকে উদ্বুদ্ধ করেন, আরও আত্মত্যাগে আরও কর্মোদ্যম বাড়াতে যে পার্টির সভ্যরা কোনো অবস্থাতেই হতাশ হন না, কোনো কঠিন পরিস্থিতি দেখেই ভয় পান না, দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যান তার সমাধানে – এরকম একটা পার্টিই পারে দেশের বিভিন্ন শ্রেণী ও মতের মানুষের ঐক্যবদ্ধ মোর্চা গড়ে তুলতে। এই রকম একটি বিপ্লবী পার্টিই পারে ভারতবর্ষের বিপ্লবকে সফল করে তুলতে।”
(“এটাই বিপ্লবী পার্টি গড়ার সময়” – লিবারেশন, নভেম্বর ১৯৬৭ থেকে)।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ভারতবর্ষের বিপ্লবী জনতা কমিউনিস্ট আন্দোলনে বার বার সংগ্রাম করেছেন, অসীম আত্মত্যাগ স্বীকার করেছেন, জীবন দিয়েছেন। পুন্নাপ্রা-ভায়ালার বীর শহীদরা, তেলেঙ্গানার বীর সংগ্রামীরা, ভারতের প্রতিটি প্রদেশের শ্রমিক ও কৃষক সংগ্রামীরা বহু জীবন দান করে যে ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা করেছেন সেই ঐতিহ্য বহন করে নিয়ে যেতে হবে আমাদের, আমরা তারই উত্তরসাধক। যে কমিউনিস্ট পার্টির নাম করে কায়ুরের বীরেরা ফাঁসির মঞ্চে উঠেছিলেন, সেই কমিউনিস্ট পার্টিরই প্রতিনিধি আমরা, সেই কমিউনিস্ট পার্টিই আজকের ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)। সেই মহান ঐতিহ্যকে বহন করার জন্যই আজ আমাদের প্রয়োজন সেই মহান অভিজ্ঞতার সারসঙ্কলন করা এবং ভুল চিন্তাগুলির বিরুদ্ধে তীব্রতম শ্রেণীঘৃণার সৃষ্টি করা।
কমরেডগণ, মনে রাখবেন ভারতবর্ষে কৃষক জনতা বারবার সংগ্রাম করেছে, বহু ত্যাগ স্বীকার করেছে, বহু শহীদের দেশ এই ভারতবর্ষ। ... ভারতবর্ষের বিপ্লবী কৃষককে, দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষককে শ্রদ্ধা করতে শিখুন; তাদের ওপর ভরসা রাখলে কোনোদিন পথের ভুল হবে না।
(“ভারতের বিপ্লবী কৃষক সংগ্রামের অভিজ্ঞতার সারসঙ্কলন করে এগিয়ে চলুন” – লিবারেশন, ডিসেম্বর ১৯৬৯ থেকে)।
দুশো বছরের পরাধীন ও শোষিত ভারতবর্ষে ছাত্র ও যুবকরাই হচ্ছেন শিক্ষিত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি। সাম্রাজ্যবাদী শোষণ ব্যাপক জনগণকে অশিক্ষিত ও অন্ধ করে রেখেছে। তাই বিপ্লবী আন্দোলনে এই শিক্ষিত সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। শতসহস্র শহীদ আজ আহ্বান জানাচ্ছেন তাঁদের কাছে, আজ দিন এসেছে এই রক্তের ঋণ শোধ করবার, দিন এসেছে সাম্রাজ্যবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল শোষকশ্রেণীকে ধ্বংস করার।
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) আহ্বান জানাচ্ছে যুব-ছাত্রদের কাছে দৃঢ় আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে যাও ঐ শ্রমিক এবং দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকের কাছে, কারণ তারাই পারে এই লাঞ্ছনা, এই অবমাননার অবসান ঘটাতে।
ছাত্র যুবকদের কাছে পার্টির আজ একটিই আবেদন – শ্রমিক এবং দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকের সাথে একাত্ম হও, একাত্ম হও, একাত্ম হও।
(“ছাত্র ও যুবকদের কাছে পার্টির আহ্বান”, লিবারেশন, সেপ্টেম্বর ১৯৬৯)।
সম্পদ সৃষ্টিকারী শ্রমিক ও কৃষক ঐক্যবদ্ধ হলে যে বিরাট শক্তির জন্ম হবে তাতে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সমাধা করে শোষণকারী ও শোষণ ব্যবস্থা ধ্বংস করা যায় এবং এই ভারতবর্ষে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে পরিণত করার দায়িত্ব ও নেতৃত্ব নিতে হবে শ্রমিকশ্রেণীকে।
শ্রমিকের লড়াই – মর্যাদার লড়াই, সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার লড়াই। সংশোধনবাদীদের জঘন্যতম অপরাধ হল এই যে, তারা বিপ্লবের নেতা শ্রমিকশ্রেণীকে আটকে রাখতে চায় অর্থনীতিবাদী সংগ্রামের গণ্ডির ভেতর।
ভারতবর্ষের শ্রমিকশ্রেণী মুক্তির জন্য বহু জীবন আহুতি দিয়েছেন। বহু সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস তাদের। শহীদদের রক্তরঞ্জিত বিপ্লবী পথে চলতে শ্রমিকশ্রেণী অভ্যস্ত। সংশোধনবাদীরা তাঁদের পথে লক্ষ্যভ্রষ্ট করেছে, তাই ভারতবর্ষের কোটি কোটি মানুষ আজও এই অসহ্য শোষণ ও নিপীড়ন সহ্য করছেন।
(“শ্রমিকশ্রেণীর প্রতি”, লিবারেশন, মার্চ ১৯৭০)।
আজ আমাদের কর্তব্য হচ্ছে ব্যাপক মূল জনগণের মধ্যে পার্টি গঠন করার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং লড়াইয়ের ভিত্তিতে জনগণের ব্যাপকতম অংশের সাথে যুক্তমোর্চা প্রতিষ্ঠা করা। কংগ্রেস রাজত্বের বিরুদ্ধে ব্যাপকতম যুক্তমোর্চা প্রতিষ্ঠা করা যায়। আজ বামপন্থী দলগুলি সাধারণ মানুষের প্রতি যে অত্যাচার কংগ্রেস চালাচ্ছে তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে নেতৃত্ব দিচ্ছে না। সেই সব দলগুলির মধ্যকার শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি জনগণের তাদের দলের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ রয়েছে। ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের ভিত্তিতে আমাদের তাদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এমনকি যারা এক সময় আমাদের প্রতি শত্রুতা করেছে বিশেষ পরিস্থিতিতে তারাও আমাদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হতে এগিয়ে আসবে। এই সব শক্তির সাথে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মতো মনের প্রসারতা রাখতে হবে। মনের প্রসারতা কমিউনিস্টদের গুণ। জনগণের স্বার্থই আজ ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের দাবি জানাচ্ছে। জনগণের স্বার্থই পার্টির স্বার্থ। (“জনগণের স্বার্থই পার্টির স্বার্থ” – এই লেখাটি চারু মজুমদার ১৯৭২ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার কয়েকদিন আগে লিখেছিলেন)।