আমরা এক বিরাট উত্তরণের মধ্য দিয়ে চলেছি। একদিকে অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ছে এবং সামাজিক ভিত্তিগুলি ধ্বসে পড়ছে, অন্যদিকে জনগণ আজ বিদ্রোহী হয়ে উঠছেন। অর্থনৈতিক সুবিচার, রাজনৈতিক গণতন্ত্র এবং সামাজিক সমতার জন্য জাগ্রত গণসংগ্রাম এক নতুন আশার সঞ্চার করছে, এক নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে। স্বৈরতন্ত্র দ্রুত তার জাল বিস্তার করে চলেছে।
এই সন্ধিক্ষণে বিপ্লবী তত্ত্বের ভূমিকা চরম গুরুত্ব বহন করছে। এবং ইতিহাসের এই চূড়ান্ত মুহূর্তে যদি আমরা আমাদের মাতৃভূমিকে শান্তি, প্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই, তবে মার্কসবাদই একমাত্র ভরসা। দুর্ভাগ্যবশত বাজারে অনেক ধরনের ভেজাল মার্কসবাদ ছড়িয়ে আছে। আর তাই অনেক বিভ্রান্তিও আছে।
সেইজন্য আমরা সহজবোধ্য ভাষায় বই প্রকাশ করব বলে মনস্থ করেছি, যার বিষয়বস্তু হল মার্কসবাদের তিনটি অঙ্গ – দর্শন, রাজনৈতিক অর্থনীতি ও সমাজতন্ত্র। আমরা আশা করি বর্তমান সন্ধিক্ষণে বইগুলি পাঠকদের সাহায্য করবে।
মার্কসবাদী অধ্যয়ন কেন্দ্র,
দিল্লী, আগস্ট ১৯৮১
আমরা এখন এক তরঙ্গসঙ্কুল পৃথিবীতে বাস করছি। এক অদ্ভূতপূর্ব অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক বিশৃঙ্খলা আমাদের ঘিরে ধরেছে। ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারী, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুনিয়া কাঁপানো বিপ্লব এবং জনগণের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামগুলির সাথে সাথে পারস্পরিক বিরোধিতায় লিপ্ত বিভিন্ন মার্কা 'সমাজতন্ত্র', রাষ্ট্রকর্তৃক ক্রমবর্ধমান নৃশংসতা, ব্যাপক রক্তক্ষয়, ভয়াবহ লোডশেডিং যার কোনো সুরাহা নেই, নৈতিক মূল্যের অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধনগুলি ভেঙ্গে পড়া, পুনঃপুন প্রাকৃতিক ও মানুষের সৃষ্ট বিপর্যয়, শক্তি সংকট, ব্যাপক দুর্নীতি, বিজ্ঞানের অবিশ্বাস্য আবিষ্কার এবং পারমাণবিক ও রাসায়নিক যুদ্ধের বিপদ, আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি ইত্যাদি ইত্যাদি সমস্ত বিষয়গুলিই আমাদের হতবুদ্ধি করে দিচ্ছে। কেন এই দুনিয়া জোড়া টালমাটাল অবস্থা? মহাসমুদ্রের আবর্তে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করি, পরক্ষণেই আবার অদৃষ্টবাদ ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখার দৃষ্টিভঙ্গীর আশ্রয় নিই। মনে হয় যেন কিছু রহস্যময় শক্তি আমাদের প্রতিষ্ঠিত অবস্থাকে ভেঙ্গে চূরমার করে দিচ্ছে, আবার কোনো কোনো সময়ে সেই শক্তিগুলিই আমাদের মনে উন্নত জীবনের জন্য নতুন আশার সঞ্চার করছে।
দর্শনশাস্ত্রকে সাধারণভাবে এক রহস্যময় কিছু হিসাবে, আমাদের বাস্তব জীবনের বাইরের কিন্তু একই সাথে সর্বজনীনভাবে প্রযোজ্য কিছু বিষয় হিসাবে ভাবা হয়। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে মানুষ দর্শনের বিষয়বস্তুর মধ্যে জড়িয়ে পড়ে। যদি কেউ আকস্মিকভাবে মারা যান, তাঁর আত্মীয়-স্বজনকে শোকাভিভূত হয়ে বলতে শোনা যায় ... “কে পারে ভাগ্যের চাকাকে রোধ করতে? জীবন-মৃত্যু, লাভ-লোকসান, যশ-অপযশ এইগুলি সবই সর্বশক্তিমান ভাগ্যের হাতে।” কিন্তু এমন একটা সময় আসে যখন অদৃষ্টবাদ আর কাজ করে না, জীবনের জটিল বিষয়গুলির মানুষকে দর্শনের আশ্চর্য জগতে উঁকিঝুঁকি দিতে বাধ্য করে। শুধু উঁকিঝুঁকি নয়, মানুষ এই সমস্ত জটিল বিষয়গুলির সাথে জড়িয়ে পড়ে ও সেগুলি সমাধান করে এবং সিদ্ধান্তও গ্রহণ করে। এইভাবে জীবনের বাস্তব সমস্যাবলী সমাধানের প্রক্রিয়ায় জ্ঞানের সমস্ত শাখাগুলির মতো দর্শনশাস্ত্রও গড়ে ওঠে। তাহলে দর্শনশাস্ত্র জিনিসটা কী? এটির প্রয়োজনীয়তা কী? সমাজ ও প্রকৃতিকে পরিবর্তিত করতে এটি কিভাবে ব্যবহার করা যায়? এ সবগুলিই হচ্ছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জানার বিষয়।
তাই অতীতের দিকে ফিরে তাকানো যাক যখন মানুষ তার বন্যতার শেষ যুগে বা বর্বরতার সূচনার যুগে ছিল। তখন শিকারই ছিল আমাদের পূর্বপুরুষদের বেঁচে থাকার মুখ্য উপায়। কৃষিকার্য বা পশুপালন তখনও চালু হয়নি। তখন প্রকৃতির প্রতি তাদের মনোভাব কী ছিল? প্রকৃতি ঠিক যে রকম ছিল সেইভাবে তারা দেখত। প্রকৃতির রহস্যগুলির গভীরে যাওয়া তখন তাদের সাধ্যের বাইরে ছিল। প্রকৃতি ঠিক যে রকম ঠিক সেইভাবেই তাকে দেখাটা হল আদিম বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গী। প্রাচীন গ্রীক দর্শনে এবং বৈদিক মন্ত্রে আমরা এই দৃষ্টিভঙ্গীর ছোঁয়াচ পাই। এখনও পর্যন্ত আমরা পৃথিবীর কোনো কোনো অংশে কিছু গোষ্ঠীর পরিচয় পাই যাদের জীবনযাত্রা আমাদের পূর্বপুরুষদের জীবনযাত্রার সাথে মিলে যায়। তখন তাদের কোনো “বিমূর্ত ধারণার” প্রয়োজন হয়নি এবং এটা সম্ভবও ছিল না। তারা অবশ্যই প্রকৃতির কিছু রহস্যকে অনুভব করত কিন্তু এই অনুভব ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, তখনও পর্যন্ত তাদের প্রকৃতি ও মনের আন্তঃসম্পর্কের প্রশ্নটির মুখোমুখি হতে হয়নি। আগেই হোক আর পরেই হোক এই প্রশ্নটির উদ্ভব ছিল অনিবার্য এবং তা কিছুটা অদ্ভুতভাবেই হাজির হয়েছিল। আদিম বস্তুবাদের পক্ষে এই ধাঁধার সমাধান ছিল অসম্ভব।
তখনও পর্যন্ত মানুষ তার দৈহিক গঠন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিল। মস্তিষ্কের কাজ সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা ছিল না। স্বপ্ন প্রায়শই তাদের চিন্তুত করে তুলত। উপনিষদে একটি গল্প আছে যাতে বোধা যায় যে আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছে স্বপ্ন ছিল একটা বিরাট উদ্বেগের বিষয়। এক রাজা সেই সময়কার এক বড় সাধুকে তিনটি প্রশ্ন করেছিলেন, তার মধ্যে প্রথম প্রশ্নটি হল “আমাদের মধ্যে কে আছেন যিনি কথা বলেন এবং আমরা ঘুমিয়ে থাকলে যিনি সক্রিয় থাকেন?” যাজ্ঞবল্ক্যের সূত্রে এই স্বপ্ন সম্পর্কে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা আছে। তাই স্বপ্ন দেখতে দেখতে ক্রমেই মানুষের মনে বিশ্বাস জন্মালো যে চিন্তা ও অনুভূতি তাদের কোনো শারীরিক ক্রিয়া নয় বরং এটা হল এক পৃথক আত্মার কাজ, যে আত্মা দেহের মধ্যেই থাকে এবং মৃত্যুর সাথে সাথে দেহ পরিত্যাগ করে। তখন থেকেই মানুষ এই আত্মা ও বহির্জগতের সম্পর্ককে তাদের চিন্তা-ভাবনায় প্রতিফলিত করতে থাকে। যদি মৃত্যুর সাথে সাথে আত্মা দেহত্যাগ করে ও অবিনশ্বর থাকে তাহলে এই আত্মার শেষ পরিণতি আবিষ্কারের কোনো প্রয়োজনই থাকে না। এইভাবেই অমরতার ধারণার উদ্ভব ঘটল।
একবার যখন স্বীকার করা হল যে দেহের বিনাশের পর আত্মার বিনাশ হয় না তখন এই আত্মাকে নিয়ে কী যে করা যায় সে সম্পর্কে সার্বিক ও সাধারণ অজ্ঞতা থেকেই জন্ম নিল ব্যক্তিগত অমরত্বের ধারণা। ঠিক একইভাবে প্রথমে, দেবতাদেরও আবির্ভাব ঘটেছে প্রাকৃতিক শক্তিগুলিকে ব্যক্তি রূপ দেওয়ার মধ্যে দিয়ে।’ তাদেরকে সন্তুষ্ট করার জন্য প্রার্থনা, ভোজবাজি, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান, জাদুবিদ্যা, বলিদান, ইত্যাদি দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রমশ বিভিন্ন ধর্মের উদ্ভব ঘটে এবং ধর্ম এই আচার অনুষ্ঠানকে, স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। মানুষের বুদ্ধিমত্তার বিকাশের সাথে সাথে অবশেষে বহু দেবতার পরিবর্তে আসে এক এবং একমাত্র দেবতা, এইভাবে ভাববাদ। প্রাচীন বস্তুবাদকে নাকচ (negate) করে দেয়।
যদিও এই ধারণাগুলি বস্তুগত বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, তথাপি মানুষ এই রকম এক সিদ্ধান্তে এসেছিল কেবলমাত্র জীবনের সমস্যাগুলি ব্যাখ্যা করা ও সমাধান করার জন্য। সুতরাং এইসব অবৈজ্ঞানিক ক্রিয়াকলাপ সত্ত্বেও প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার ও নতুন রূপে দেখার চেষ্টা তারা চালিয়ে যেতে লাগল। একদিকে তারা রোগের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ভূত-প্রেতের পূজা আরম্ভ করল, আবার অপরদিকে ঔষধপত্র আবিষ্কারের কাজও করতে লাগল। একদিকে তারা যেমন বৃষ্টির জন্য যজ্ঞ ও পূজা করত তেমনি অপরদিকে খরার মোকাবিলায় খাল এবং পুকুর তৈরির কাজও চালিয়ে গেল।
এইভাবে, চেতনার সাথে অস্তিত্বের সম্পর্কের, আত্মার সাথে প্রকৃতির সম্পর্কের প্রশ্নটি হল সমগ্র দর্শন শাস্ত্রের প্রধান বিষয়বস্তু। এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে দার্শনিকেরা দুটি বড় শিবিরে ভাগ হয়ে গেছেন। যাঁরা প্রকৃতির চেয়ে আত্মাকে প্রাধান্য দেন এবং তাই মনে করেন পৃথিবী হল কোনো না কোনো ভাবে ঈশ্বর বা কোনো “পরম ভাবে” সৃষ্টি, তাঁদের নিয়েই ভাববাদী শিবির গড়ে ওঠে। অন্য দার্শনিকেরা যাঁরা মনে করেন প্রকৃতিই হল আদি, তাঁরা বস্তুবাদের বিভিন্ন ধারার জন্ম দেন। ভাববাদের সাথে বস্তুবাদের দ্বন্দ্বই হল দর্শন শাস্ত্রের মূল দ্বন্দ্ব এবং এই দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়েই শাস্ত্রের বিকাশ ঘটেছে।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দার্শনিক ধারাগুলি মানুষের জ্ঞানের বিকাশ ঘটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কোনো দর্শনকেই (বস্তুবাদী বা ভাববাদী, দ্বান্দ্বিক বা অধিবিদ্যক যাই হোক না কেন) বিমূর্তভাবে “প্রগতিশীল” হিসাবে প্রশংসা করা বা “প্রতিক্রিয়াশীল” হিসাবে চিহ্নিত করা যায় না। অবশ্যই এটা ঠিক যে, যেহেতু দর্শন হল মতাদর্শগত উপরিসৌধের প্রকাশ, তাই যে কোনো শ্রেণীবিভক্ত সমাজে পরস্পর বিরোধী দুই দার্শনিক চিন্তাধারার মধ্যে সংগ্রাম প্রকৃতপক্ষে সমাজের শ্রেণী সংগ্রামেরই প্রতিফলন। এই বিষয়গুলিকে মাথায় রেখে দর্শনশাস্ত্রের প্রণালীবদ্ধ ও বিস্তৃত অধ্যয়নে আসা যাক।
দর্শন শাস্ত্রের মৌলিক প্রশ্নগুলির কীভাবে উদ্ভব হয়েছিল তা আমরা ইতিমধ্যেই আলোচনা করেছি। কিন্তু দর্শন শাস্ত্রের বিকাশে এমন একটা অবস্থার কথা ধরে নেওয়া হয় যেখানে জনগণের একটা অংশ প্রয়োজনীয় শ্রম করত না এবং শিল্প, বিজ্ঞান, দর্শন ইত্যাদি বিষয়ে মনোনিবেশ করার যথেষ্ট অতিরিক্ত সময় তাদের হাতে ছিল। আদিম সাম্যবাদের শেষের দিকে নতুন উৎপাদিকা শক্তি আবিষ্কার (তামা প্রভৃতি) এবং সাথে সাথে শ্রম বিভাজন, বাণিজ্যের বিস্তার ইত্যাদি বিষয়গুলি প্রভূত পরিমাণে উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়, ফলে মানুষের শ্রমশক্তি নিজের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যা প্রয়োজন তার বেশি উৎপাদন করতে পারত। অতিরিক্ত শ্রমশক্তিকে কাজে নিয়োগ করা এবং রক্ষণাবেক্ষণ করার উপায় পাওয়া গেল। পূর্বে যে সব যুদ্ধবন্দীদের শুধু হত্যা করা হত, এবার থেকে তাদের বাঁচিয়ে রাখা হল ও তাদের শ্রমকে কাজে লাগানো হল। এইভাবে দাস-ব্যবস্থার সৃষ্টি হল এবং শীঘ্রই তা এরকম সকল সমাজেই উৎপাদনের প্রধান ধরন হয়ে দাড়ালো। সুতরাং এমন একটি বিশেষ শ্রেণীর উদ্ভব হল যারা প্রকৃত শ্রম থেকে মুক্তি পেয়েছে। “দাস ব্যবস্থা ছাড়া কোনো গ্রীক রাষ্ট্র, কোনো গ্রীক শিল্প ও বিজ্ঞান সম্ভব ছিল না। আমাদের কখনোই ভোলা উচিত নয় যে আমাদের সামগ্রিক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিমত্তার বিকাশের অপরিহার্য শর্ত ছিল এমন একটা অবস্থা যেখানে দাসব্যবস্থা তার সর্বজনীন স্বীকৃতির মতোই প্রয়োজনীয় ছিল।” (এঙ্গেলস : এ্যান্টি ড্যুরিং)
এইভাবে গ্রীস, ইরান, ভারত, চীন ইত্যাদি দেশে দাসব্যবস্থার সময়েই বিভিন্ন রূপে দর্শন শাস্ত্র গড়ে উঠতে থাকে। এখানে আমরা কেবল গ্রীক দর্শন আলোচনা করব। কারণ এঙ্গেলস বলেছেন, “... ... পৃথিবীতে পরবর্তীকালের দৃষ্টিভঙ্গীর প্রায় সমস্ত ধরনগুলিই গ্রীক দর্শনের বহুবিধ রূপের মধ্যে ভ্রূণ আকারে এবং সদ্যোজাত অবস্থায় পাওয়া যায়।”
গ্রীক দর্শন হচ্ছে দ্বান্দ্বিক দর্শনের প্রথম ঐতিহাসিক রূপ যার মধ্যে দ্বন্দ্ব-তত্ত্ব তার আদিম রূপে দেখা যায়। যেহেতু ঐ সময়ে (খ্রিঃ পূর্ব ৭০০ – ৩০০ খ্রিষ্টাব্দ) গ্রীকরা প্রকৃতিকে কাটাছেঁড়া করা ও বিশ্লেষণ করার মতো যথেষ্ট অগ্রসর হতে পারেনি তাই সাধারণভাবে প্রকৃতিকে সমগ্র হিসাবে দেখা হত। উদাহরণ হিসাবে যদি আমরা প্রকৃতি বা মানুষের ইতিহাস বা আমাদের মানসিক ক্রিয়াকলাপের দিকে তাকাই তবে প্রথমেই আমরা অন্তহীন পারস্পরিক সংযোগ আর ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার এক অন্তহীন গোলকধাঁধা দেখতে পাই। এই গোলকধাঁধায় যেখানে যা ছিল বা যেভাবে ছিল তার কোনো কিছুই আর সেখানে বা সেভাবে থাকে না, বরং সবকিছু কেবলই এগিয়ে চলে, পাল্টে যায়। জন্ম নেয় আর বিনাশ লাভ করে। বিশ্ব সম্পর্কে এই আদি, সরল কিন্তু সঠিক ধারণা স্পষ্টভাবে সুসংবদ্ধ করেন হিরাক্লিটাস : “সবকিছু আছে আবার নেইও, কারণ সবকিছু প্রবহমান, সর্বদাই পরিবর্তনশীল, সর্বদাই উদ্ভূত হচ্ছে ও বিনষ্ট হচ্ছে।” গ্রীসের অপর এক বড় দার্শনিক এ্যারিস্টটল আগেই দ্বান্দ্বিক চিন্তাধারার সবচেয়ে প্রয়োজনীয় রূপগুলি পরীক্ষা করেন। তাঁকে তর্কবিদ্যার জনক বলা হয়। এবং তিনি জ্ঞানের সমস্ত শাখায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
গ্রীক দার্শনিকদের মধ্যে বস্তুবাদী ও ভাববাদী উভয় দার্শনিকই আছেন, কিন্তু এখানে আমরা গ্রীক দর্শনের সমস্ত ধারাগুলি সম্পর্কে আলোচনায় যাচ্ছি না। আমরা গ্রীক দর্শনের মধ্যে দ্বান্দ্বিক চিন্তাধারার ইতিবাচক দিকগুলি নিয়ে এবং যে দুর্বলতাগুলি অধিবিদ্যাকে নিজের স্থান দখল করতে দিয়েছিল সেগুলি নিয়ে আলোচনা করব।
গ্রীক দর্শন অখণ্ডরূপে প্রকৃতির সাধারণ বর্ণনা সঠিকভাবেই করেছিল কিন্তু প্রকৃতির এক একটি অংশ বিশ্লেষণ করতে সক্ষম ছিল না। ঐ অংশগুলিকে জানার জন্য তাদের প্রাকৃতিক বা ঐতিহাসিক সম্পর্কগুলি থেকে বিচ্ছিন্ন করা প্রয়োজন এবং প্রত্যেকটি বৈশিষ্ট্য, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াকে পৃথকভাবে অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। এটাই হল প্রকৃতি-বিজ্ঞান এবং ইতিহাসের কাজ। কিন্তু গ্রীকদের এই কাজ করার মতো প্রয়োজনীয় উপকরণাদি ছিল না। এটাই হচ্ছে গ্রীক দর্শনের দুর্বলতা এবং এর থেকেই পরবর্তীকালে পৃথিবীতে দৃষ্টিভঙ্গীর অন্যান্য ধরনগুলি গড়ে ওঠে আলেকজাণ্ডারের সময়কাল থেকে (খ্রিঃ পূঃ ৩য় শতাব্দী থেকে ৭ম খ্রিষ্টাব্দ) গ্রীকদের হাতে প্রকৃতি বিজ্ঞানের কাজ শুরু হয়। ঐ সময় গণিত (ইউক্লিভ), বলবিদ্যা (আর্কিমিডিস), জ্যোতির্বিজ্ঞান, শবব্যবচ্ছেদবিদ্যা, শরীরবিদ্যা, ভূগোল এবং বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার দ্রুত উন্নতি পরিলক্ষিত হয়। পরবর্তীকালে মধ্যযুগে আরবদের হাতে প্রকৃতি-বিজ্ঞানের আরও উন্নতি ঘটে। খাঁটি প্রকৃতি-বিজ্ঞানের সূত্রপাত ঘটে পঞ্চদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ভাগ হতে এবং এর পর থেকে গত পাঁচ-শ বছরে প্রকৃতি বিজ্ঞান ক্রমবর্ধমান গতিতে এগিয়ে চলেছে।
কিন্তু এই অগ্রগতির ভিত্তি কী ছিল? প্রকৃতিকে খণ্ডবিশেষে বিশ্লেষণ করা, ভিন্ন ভিন্ন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াসমূহ ও বস্তুসমূহের নির্দিষ্ট শ্রেণীবিভাগ করা, বিভিন্ন রূপের জৈবিক বস্তুর আঙ্গিক গঠন অধ্যয়ন করা -- এইগুলি ছিল আমাদের প্রকৃতি সম্পর্কে জ্ঞানের জন্য বিপুল অধ্যয়নের প্রাথমিক শর্ত। কিন্তু এর ফলে পুরুষানুক্রমে যে অভ্যাস গড়ে ওঠে তা হল – প্রাকৃতিক বস্তুসমূহ ও প্রক্রিয়াগুলি পৃথকভাবে সাধারণ পটভূমি থেকে বিচ্ছিন্নভাবে পর্যবেক্ষণ করা, বস্তুসমূহকে গতিশীল অবস্থায় নয়, স্থিতিশীল অবস্থায় দেখা; তাদের জীবন্তভাবে না দেখে মৃতভাবে দেখা। এবং এটা অধিবিদ্যক চিন্তা পদ্ধতির জন্ম দেয়।
ষোড়শ শতাব্দীতে ব্রিটিশ দার্শনিক বেকন এবং সপ্তদশ শতাব্দীতে আর একজন ব্রিটিশ দার্শনিক লক ঐ অধিবিদ্যক দৃষ্টিভঙ্গীকে প্রকৃতি বিজ্ঞান থেকে দর্শনের মধ্যে নিয়ে আসেন এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ (মার্কসের সময়কাল) পর্যন্ত ঐ দৃষ্টিভঙ্গী একটা বিশেষ স্থান অধিকার করেছিল।
মধ্যযুগে ইউরোপে ধর্ম দর্শনকে প্রায় হাজার বছর ধরে নিষ্ক্রিয় করে রেখেছিল। হিবাশিয়াকে (Hibatia – ৪১৫ খ্রীষ্টাব্দে ইজিপ্টের আলেকজান্দ্রিয়ায় এক প্রসিদ্ধা গণিতজ্ঞা মহিলাকে) হত্যা করার সময় থেকেই এই পর্যায়ের শুরু। লাইব্রেরীগুলি পুড়িয়ে দিয়ে এবং বিশেষ আদেশ জারি করে রোমের সম্রাট দর্শন অধ্যয়ন করা বন্ধ করে দেয়। ইউরোপে রেনেসাঁর (পঞ্চদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে) আবির্ভাবে ঐ অবস্থার অবসান ঘটে। শহরের ধনিকশ্রেণীর সাহায্যে রাজপুরুষেরা সামন্ত প্রভুদের ক্ষমতা ধ্বংস করে এবং মূলত জাতীয়তাবাদের উপর ভিত্তি করে রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করে, এর মধ্য থেকেই আধুনিক ইউরোপীয় রাষ্ট্র ও আধুনিক বুর্জোয়া সমাজের বিকাশ ঘটেছে। যখন শহরের ধনিকশ্রেণী ও সামন্ত প্রভুরা পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত তখন জার্মানির কৃষক বিদ্রোহ, রঙ্গমঞ্চে কেবল বিদ্রোহী কৃষকদেরই নয়, হাতে লাল পতাকা আর কণ্ঠে সম্পদের সাধারণ মালিকানার দাবি নিয়ে আধুনিক সর্বহারাদের নামিয়ে দেয়; এবং এইভাবেই শ্রেণী সংগ্রামের পূর্বাভাস দেয়।
ইটালিতে শিল্পকর্মের অকল্পনীয় স্ফূরণ ঘটেছিল। ইটালি, ফ্রান্স ও জার্মানিতে নতুন সাহিত্য গড়ে উঠল। এর অনতিকাল পরেই চিরায়ত ইংরাজি ও স্প্যানিশ সাহিত্যের পর্যায় শুরু হয়। কুটির শিল্প থেকে বৃহৎ উৎপাদনে উত্তরণের এবং বিশ্বজোড়া বাণিজ্যের ভিত্তি প্রস্তুত হল আর এর থেকেই ঘটল আধুনিক শিল্পের সূচনা। মানুষের মনের উপর চার্চের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব ধ্বসে পড়ল। আরবদের কাছ থেকে অর্জিত এবং বাইজানটিয়ানের পতনের সময়ে রক্ষাপ্রাপ্ত পাণ্ডুলিপি হতে নব-আবিষ্কৃত গ্রীক দর্শনের দ্বারা লালিত 'মুক্ত' চিন্তার এক উৎসাহী জীবন ক্রমেই বেশি বেশি করে লাতিনদের মধ্যে দানা বাঁধতে শুরু করে -- এটাই অষ্টাদশ শতাব্দীতে বস্তুবাদের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল। মানবজাতির সেই সময় পর্যন্ত অভিজ্ঞতায় ঐটাই ছিল সর্বাপেক্ষা মহান বিপ্লব। তার মধ্য থেকে গড়ে উঠেছিল কিছু বিরাট ব্যক্তিত্ব যেমন, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, মেকিয়াভেলী, লুথার প্রভৃতি যাঁদের বর্তমান বুর্জোয়া শাসনের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে গণ্য করা যেতে পারে।
সংগ্রামের মধ্য দিয়েই প্রকৃতি বিজ্ঞান নিজের অস্তিত্বের অধিকারকে জয় করে এবং এই জয় আসে অনেক শহীদের জীবনের বিনিময়ে। ইনকুইজিশন (চার্চের আদালত, যা স্বাধীনভাবে প্রকৃতির অনুসন্ধানকে নাস্তিকতা বলে দমন করত) সার্ভেন্টিস ও জিওর্ডানো ব্রুণোকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারে। কিন্তু এইসব হত্যা সত্ত্বেও প্রকৃতি বিজ্ঞান তার অগ্রগতিকে অব্যাহত রাখে। কোপারনিকাসের অবিস্মরণীয় রচনার (সৌরজগত সম্পর্কিত) প্রকাশ ধর্মতত্ত্ব হতে প্রকৃতি বিজ্ঞানের স্বাধীনতা ঘোষণা করল।
প্রাচীন যুগ আমাদের দিয়েছে ইউক্লিভ ও টলেমির (Plolemire) সৌরজগতের ধারণা, আরবরা দিয়ে গেছে দশমিক পদ্ধতির ব্যবহার, বীজগণিতের সূচনা, আধুনিক সংখ্যাবিজ্ঞান এবং প্রাচীন রসায়নশাস্ত্র কিন্তু খ্রীষ্টিয় মধ্যযুগ কোনো অবদানই রাখেনি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একেবারে গোড়া থেকে শুরু করতে হয়েছিল। অনিবার্যভাবেই এই পরিস্থিতিতে মূল বিষয় হিসাবে পার্থিব ও নভোচরী বস্তুসমূহের গতি সম্পর্কিত বলবিদ্যা প্রথম স্থান অধিকার করে, এই যুগে বিজ্ঞানের ঐ শাখাগুলির অগ্রগতিতে নিউটন নির্দিষ্ট অবদান রাখেন। ডেকার্টে, নেপিয়ের, লিবনিজ গণিতশাস্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন, কেপলার গ্রহের গতি সম্পর্কে সূত্র প্রণয়ন করেন, লিম্যুরাস উদ্ভিদবিদ্যা ও প্রাণীবিদ্যার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নিয়মগুলি আবিষ্কার করেন।
কিন্তু ঐ পর্যায়ের বৈশিষ্ট্য ছিল একটা বিশেষ ধরনের সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গী, যার মর্মবস্তু হচ্ছে প্রকৃতির চরম অপরিবর্তনশীলতা। প্রকৃতি যেভাবেই সৃষ্টি হোক না কেন, অতীতে যে রকম ছিল যতদিন প্রকৃতি থাকবে সেই একই রকম রয়ে যাবে। গ্রহ ও উপগ্রহগুলি রহস্যময় কোনো “প্রথম ধাক্কা” দ্বারা একবার যে গতি পেয়েছিল তারপর তারা ঘুরতেই থেকেছে। সুতরাং বলতে হয় বর্তমানের “পাঁচটি মহাদেশ” চিরদিনই ছিল ও থাকবে, উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের প্রজাতিগুলি সৃষ্টি থেকেই চিরস্থায়ী -- এই রকম অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। প্রকৃতিতে সমস্ত পরিবর্তন ও বিকাশ অস্বীকার করা হল। প্রকৃতি বিজ্ঞান – যা প্রথমে এত বৈপ্লবিক ছিল, হঠাৎ তাকে রক্ষণশীলতার জালে আটকে পড়তে দেখা গেল। এটাই হচ্ছে যান্ত্রিক বস্তুবাদ – যা সমস্ত পরিবর্তনকে কেবলমাত্র স্থানের পরিবর্তন হিসাবে দেখে এবং শুধুমাত্র পরিমাণগত পরিবর্তনকেই স্বীকার করে।
১৭৫৫ সালে জার্মান দার্শনিক কান্ট প্রথম প্রকৃতি সম্পর্কে ঐ অনড় দৃষ্টিভঙ্গীকে আক্রমণ করেন। তাঁর “নীহারিকা প্রকল্প” “প্রথম ধাক্কার তত্ত্ব”কে খণ্ডন করে দেয়। পৃথিবী ও সৌরজগতকে মনে করা হল এমন একটা কিছু যা সময়ের গতিপথে সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি গড়ে ওঠা ভূতত্ত্ব পৃথিবীতে কিভাবে ভূস্তর গঠিত হয়েছে এবং একের পর এক সজ্জিত হয়েছে -- শুধুমাত্র এটাই নয়, আরও যা দেখালো তাহল ভূ-স্তরে চাপা পড়া বিপুল প্রাণীদের খোলা ও কঙ্কাল আর বিলুপ্ত উদ্ভিদের গুঁড়ি পাতা ও ফল। সুতরাং সিদ্ধান্ত করতে হল যে কেবলমাত্র সমগ্র হিসাবে পৃথিবীই নয়, পৃথিবীর বর্তমান উপরিস্তর এবং সেখানকার উদ্ভিদ ও প্রাণীগুলির রয়েছে এক দীর্ঘ সময়ের ইতিহাস।
প্রকৃতি বিজ্ঞানের একটা নির্দিষ্ট স্তরে অগ্রগতির ফলে অধিবিদ্যার আবির্ভাব অবশ্যম্ভাবী ছিল এবং একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ে অধিবিদ্যা ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছিল। বস্তুসমূহকে স্থির ও পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে বিবেচনা করার ফলে তাদের জানার প্রক্রিয়ায় কিছুটা সাহায্য হয়েছিল। যাই হোক প্রকৃতি বিজ্ঞানের উপরোল্লিখিত বিকাশের ফলে অধিবিদ্যক দৃষ্টিভঙ্গী মারাত্মক ধাক্কা খেল, কিন্তু অভ্যাসের শক্তির বলে আরও কিছু সময় পর্যন্ত অধিবিদ্যার প্রাধান্য ছিল। এটার একমাত্র ব্যাখ্যা পাওয়া যায় শ্রমবিভাগের মধ্যে -- যা ঐ সময়ে প্রকৃতি বিজ্ঞান অধ্যয়নে প্রধান দিক হিসাবে ছিল? শ্রমবিভাগ কম বা বেশি মাত্রায় প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার বিশেষ কাজের মধ্যেই নিয়োজিত করে রেখেছিল, শুধুমাত্র কয়েকজনই ছিলেন যাদের একটা সামগ্রিক জ্ঞান থেকে সরিয়ে রাখা যায়নি।
ঊনবিংশ শতাব্দীর তিনটি বিরাট আবিষ্কার অবশেষে অধিবিদ্যার মৃত্যু-ঘণ্টা বাজিয়ে দিল আর প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াগুলির মধ্যে আন্তঃসংযোগ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের দ্রুত বিকাশ ঘটাতে সাহায্য করল।
প্রথমটি হচ্ছে -- উদ্ভিদ এবং প্রাণীর একক হিসাবে কোষের আবিষ্কার। কোষের সংযোজন ও বিয়োজনের ভিতর দিয়েই সমস্ত উদ্ভিদ ও প্রাণীদেহের বিকাশ ঘটে। এইভাবে সমস্ত উচ্চতর জৈবিক পদার্থের বিকাশ ও বৃদ্ধি একটা সাধারণ নিয়মের অন্তর্গত বলে স্বীকার করা হল। এবং যেহেতু কোষের পরিবর্তনের ক্ষমতা আছে, তাই বোঝা গেল কিভাবে জৈবিক পদার্থ তাদের প্রজাতি পরিবর্তন করে।
দ্বিতীয় আবিষ্কার হচ্ছে -- শক্তির রূপান্তর। “যান্ত্রিক তাপ, আলো, তড়িৎ চৌম্বক ও রাসায়নিক শক্তি -- সব রকমের শক্তিই হচ্ছে গতির বিভিন্ন রূপ এবং তাদের একে অপরে রূপান্তরিত করা যায়।”
তৃতীয়টি হচ্ছে -- ডারউইনের বিবর্তনতত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুসারে মানুষ সমেত সমস্ত জৈবিক পদার্থ হচ্ছে এককোষী জীবাণু থেকে বিবর্তনের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফল। ঐ এককোষী জীবাণু আবার রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রোটিন হতে উৎপন্ন হয়েছে।
এই তিনটি মহান আবিষ্কারের ফলে, প্রকৃতিকে পুনরায় তার সর্বদা পরিবর্তনশীল অংশসমূহ ও তাদের মধ্যকার সব আন্তঃসম্পর্ক সমেত সামগ্রিকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হল। এতদিন পর্যন্ত অধিবিদ্যা প্রধান স্থান অধিকার করেছিল দ্বন্দ্বতত্ত্ব সেই স্থান গ্রহণ করল।
সুতরাং আমরা আবাস গ্রীক দর্শনের মহান স্রষ্টাদের যে দৃষ্টিভঙ্গী ছিল সেই ধরনটিতে ফিরে গেলাম। গ্রীকদের সাথে আমাদের মূলত যে পার্থক্য তা হল – গ্রীকদের ক্ষেত্রে যা ছিল চমৎকার সহজাত বোধ আমাদের ক্ষেত্রে তা হচ্ছে অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কঠোর বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফল। সুতরাং ঐ জ্ঞান আরও নির্দিষ্টভাবে ও সুস্পষ্টরূপে গড়ে উঠেছে। বিজ্ঞানের পরবর্তী আধুনিক আবিষ্কারগুলি যেমন, পরমাণুর মূল কণিকাগুলির আবিষ্কার বস্তু থেকে শক্তিতে (বস্তুর আর একটি রূপ) রূপান্তর, সাম্প্রতিককালের বিশ্বসৃষ্টির তত্ত্ব, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রভৃতি দ্বন্দ্বতত্ত্বকে আরও নিশ্চিত করে।
এঙ্গেলসের ভাষায়, “সুতরাং অন্য সমস্ত বিজ্ঞানের মতোই চিন্তার বিজ্ঞানও একটি ঐতিহাসিক বিজ্ঞান – মানব চিন্তার ঐতিহাসিক বিকাশের বিজ্ঞান। এবং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রগুলিতে চিন্তার বাস্তব প্রয়োগের প্রশ্নেও এর গুরুত্ব রয়েছে ...। এ্যারিস্টটলের সময় থেকে আজ পর্যন্ত ঔপচারিক তর্কবিদ্যা নিজেই তীব্র বাদানুবাদের মঞ্চ হিসাবে রয়েছে। এবং এ পর্যন্ত এ্যারিস্টটল আর হেগেল – কেবল এই দুজন চিন্তাবিদ দ্বন্দ্বতত্ত্বকে বেশ গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছেন। কিন্তু এই দ্বন্দ্বতত্ত্বই হল বর্তমান যুগে প্রকৃতি বিজ্ঞানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাপদ্ধতি; কারণ একমাত্র এটাই প্রকৃতি জগতের বিবর্তন প্রক্রিয়াগুলির, সাধারণভাবে আন্তঃসম্পর্কগুলির ও অনুসন্ধানের এক ক্ষেত্র থেকে অপর ক্ষেত্রে উত্তরণের প্রতিরূপ হাজির করে আর এই কারণেই এগুলিকে ব্যাখ্যা করার পদ্ধতিকেও সামনে আনে।” (এ্যান্টি ড্যুরিং-এর পুরনো ভূমিকা)
অধিবিদ্যা ও যান্ত্রিক বস্তুবাদের বিপরীতে হেগেলীয় দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি (১৭৭০ – ১৮৩১) দ্বন্দ্বতত্ত্বকে উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যায়। হেগেলই সর্বপ্রথম প্রকৃতি, ইতিহাস এবং বুদ্ধিবৃত্তিকে একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া হিসাবে উপস্থাপন করেন এবং এটাই তাঁর শ্রেষ্ঠ অবদান। হেগেলীয় দ্বন্দ্বতত্ত্ব অনুসারে সমগ্র বিশ্ব অন্তহীন প্রবাহ এবং বিরামহীন গতি আর পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে চলেছ; সব রকমের গতি ও সামগ্রিক বিকাশ যে আভ্যন্তরীণ সম্পর্কগুলির জন্য ঘটে থাকে, ঐ দ্বন্দ্বতত্ত্ব সেগুলিকে আবিষ্কার করার চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু হেগেল অন্য সমস্যার সমাধান করতে পারেননি, কারণ (১) ব্যক্তি হিসাবে তাঁর কিছু সীমাবদ্ধতা ছিলই, (২) তাঁর সময়ে প্রকৃতি বিজ্ঞানে ও সমাজে পূর্বোল্লিখিত (তিনটি আবিষ্কার) অগ্রগতি ঘটেনি, (৩) তিনি নিজে একজন ভাববাদী ছিলেন। ভাববাদী হিসাবে তাঁর মতে “চিন্তা” মানুষের মনে বস্তুজগতের প্রতিফলন নয়, বিপরীতে এমন কি পরিবর্তনশীল বস্তু নিজেই কোনো এক “পরম চিন্তার” প্রতিফলন। এই ভাববাদী ধারণার জন্যই হেগেল সব কিছু উল্টোভাবে দেখেছিলেন।
হেগেল দ্বান্দ্বিক নিয়মগুলিকে শুধুমাত্র “চিন্তার সূত্র” হিসাবে উপস্থাপন করেছিলেন। এইভাবে নিয়মগুলিকে প্রকৃতি ও ইতিহাসের মধ্য থেকে আবিষ্কার এবং বিকাশের পরিবর্তে সেগুলিকে প্রকৃতি ও ইতিহাসের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং বস্তুজগতকে চিন্তার এই পদ্ধতির (যা নিজেই মানুষের চিন্তাধারার বিকাশের ফলে) সাথে অবশ্যই খাপ খাইয়ে নিতে হবে।
কিন্তু হেগেলের দর্শনের প্রকৃত তাৎপর্য ও বিপ্লবী চরিত্র রয়েছে এখানেই যে এই দর্শন “মানুষের চিন্তা ও ক্রিয়াকলাপ হতে সৃষ্ট সব কিছুই চিরন্তন” এই মতবাদকে চিরতরে খণ্ডন করে। হেগেলের কাছে সত্য নিহিত রয়েছে জ্ঞানের প্রক্রিয়ার মধ্যে, বিভাজনের দীর্ঘ ঐতিহাসিক অগ্রগতির মধ্যে; যা ধাপে ধাপে জ্ঞানের নিরন্তর হতে উচ্চস্তরে উপনীত হয়। কিন্তু কখনই তথাকথিত চরম সত্যে -- যা এমন একটা বিন্দু যার পর অগ্রগতি থাকে না, যার পর আর কিছুই করার থাকে না -- সেই চরম সত্যে কখনোই উপনীত হওয়া যায় না। এটা ইতিহাসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যেমন একটা “বিশুদ্ধ” সমাজ বা একটা “বিশুদ্ধ” রাষ্ট্র কেবল কল্পনার মধ্যেই থাকতে পারে। বিপরীতে, প্রত্যেকটি পর্যায়ক্রমিক ঐতিহাসিক ব্যবস্থাই হচ্ছে নিম্নতর স্তর থেকে উচ্চতর স্তরে মানব সমাজের অন্তহীন বিকাশের প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী স্তর মাত্র। দ্বান্দ্বিক দর্শনে শেষ, চরম বা পবিত্র বলে কিছুই নেই।
উপরোক্ত দৃষ্টিভঙ্গীগুলি হেগেল এতো স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করেননি, তবে তাঁর পদ্ধতি থেকে এই সিদ্ধান্তগুলিই অপরিহার্য ভাবে বেরিয়ে আসে। এসত্ত্বেও তিনি অতীত ধারাবাহিকতার সঙ্গে সঙ্গতি রাখার জন্য দর্শনে এমন একটা পদ্ধতি প্রণয়ন করতে বাধ্য হয়েছিলেন যা অবশ্যই কোনো না কোনো চরম সত্যের সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। হেগেলের দর্শনের গোঁড়ামিপূর্ণ বিষয়বস্তুকে চরম সত্য হিসাবে ঘোষণা করা হয় – যদিও তা ছিল তাঁর নিজের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির সম্পূর্ণ বিরোধী। এইভাবে রক্ষণশীলতার দিকটি ভারী হওয়ায় বিপ্লবী দিকটি চাপা পড়ে গেল এবং দেখা গেল যে তাঁর “পরম চিন্তা” মূর্ত রূপ নেয় সম্পদশালী শ্রেণীর সীমাবদ্ধ, সংযত ও পরোক্ষ শাসনের মধ্যে যা সেই সময়ে পেটিবুর্জোয়া জার্মানির অবস্থাতে উপযোগী ছিল।
যে সময়ে নব্য হেগেলপন্থীরা ভাববাদ-বস্তুবাদ সমস্যার সমাধানে ব্যস্ত ছিলেন সেই সময়ে উপস্থিত হল ফয়েরবাখের “খ্রিস্টীয় ধর্মের মর্মবস্তু” এক আঘাতেই ফয়েরবাঘ এই দ্বন্দ্বকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে পুনরায় বস্তুবাদকে জয়ীর আসনে বসান। তিনি বললেন যে, সমস্ত দর্শনের থেকে নিরপেক্ষভাবেই প্রকৃতির অস্তিত্ব আছে। প্রকৃতি থেকেই আমাদের সৃষ্টি, প্রকৃতিকে ভিত্তি করেই আমরা মানুষরা বড় হয়েছি। ধর্মীয় কল্পনায় সৃষ্ট উচ্চতর সত্তা হচ্ছে আমাদের অস্তিত্বেরই এক অবাস্তব প্রতিফলন। তখন হেগেলের যাদু কেটে গেল নব্য হেলেগপন্থীরা ফয়েরবাখপন্থী হয়ে উঠলেন।
ফয়েরবাখের ক্রমবিকাশের প্রক্রিয়াটি হল হেগেলীয়দের বস্তুবাদী হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া; এই ক্রমবিকাশ একটা নির্দিষ্ট স্তরে তাঁদের পূর্বপুরুষদের ভাববাদী ধারণাগুলির সাথে সম্পূর্ণ বিচ্ছেদের প্রয়োজনকে সামনে এনেছিল। ফয়েরবাখ বিশুদ্ধ বস্তুবাদী ছিলেন। তাঁর মতে, বস্তু মনের সৃষ্টি নয় বরং মন নিজেই বস্তুর সর্বোচ্চ উৎপাদন (product)। যদিও হেগেল ছিলেন ভাববাদী এবং ফয়েরবাখ ছিলেন বস্তুবাদী, তথাপি তাঁরা উভয়েই একটি বিষয়ে একমত ছিলেন। উভয়েই অষ্টাদশ শতাব্দীর বস্তুবাদকে যান্ত্রিক বস্তুবাদ বলে মনে করতেন। তাই তাঁরা সমালোচনা করেছিলেন এবং এই পদ্ধতির সাথে নিজেদের সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন।
যদিও প্রকৃতি-বিজ্ঞানের এই তিনটি মহান আবিষ্কার ফয়েরবাখের জীবদ্দশাতেই ঘটেছিল, তথাপি এগুলি সম্পর্কে তিনি অজ্ঞ ছিলেন। সমাজ অধ্যয়নের ক্ষেত্রে বস্তুবাদ প্রয়োগের গুরুত্বকে তিনি কখনোই বুঝতে পারেননি; এই ক্ষেত্রে তিনি ভাববাদের শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিলেন। সুতরাং, প্রকৃতি-বিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কারগুলি ও সমাজের নতুন অগ্রগতির সাথে সঙ্গতি রেখে বস্তুবাদের বিকাশ ঘটানোর দায়িত্ব ফয়েরবাখ নিতে পারেনি।
কিন্তু হেগেলীয় ধারার বিলুপ্তির মধ্য থেকে আর একটি ধারাও গড়ে ওঠে এবং একমাত্র এই ধারাটিই প্রকৃত ফলপ্রসূ হয়েছিল। মার্কসবাদী দর্শন এই ধারারই প্রতিনিধিত্ব করে। হেগেলীয় দর্শন থেকে বিচ্ছেদ হল বস্তুবাদী অবস্থানে প্রত্যাবর্তনের ফল। কিন্তু এই প্রথম, বস্তুবাদী বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গীকে প্রকৃতই গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করা হয় এবং অন্তত মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলির দিক থেকে এক অবিচলভাবে জ্ঞানের সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। হেগেলকে নিছক হঠিয়ে দেওয়াই হয়নি, বরং তাঁর দর্শনের বিপ্লবী দিকটি অর্থাৎ উপরোক্ত দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি থেকেই শুরু করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁর দর্শনে এই পদ্ধতিকে ব্যবহার করা সম্ভব ছিল না। তাই হেগেলীয় মতাদর্শগত বিকৃতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এই মার্কসীয় পদ্ধতি অনুসারে “চরম ধারণা”র প্রতিফলন হিসাবে বস্তুকে দেখার বিপরীতে, ধারণাকে বস্তুজগতের প্রতিফলন হিসাবে মনে করা হয়। সুতরাং 'ধারণা' সম্পর্কিত দ্বন্দ্বতত্ত্ব নিজেই বাস্তব জগতের দ্বান্দ্বিক গতির সচেতন প্রতিবিম্ব মাত্র। এইভাবে হেগেলীয় দ্বন্দ্বতত্ত্বকে সোজাভাবে দাঁড় করানো হল।
মার্কস-এঙ্গেলসের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দর্শনের এইভাবেই উৎপত্তি ঘটে। এখন আমরা এই দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলিকে তিনটি অংশে আলোচনা করব – দ্বন্দ্বতত্ত্ব, বস্তুবাদ এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদ।
প্লেখানভ অনুসৃত দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিগুলির দুর্বলতাগুলি তুলে ধরার সাথে সাথে লেনিন যার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন তা হল দ্বন্দ্বতত্ত্বের মর্মবস্তু হিসাবে বিপরীতের ঐক্যের নিয়ম। “প্রকৃত অর্থে দ্বন্দ্বতত্ত্ব হচ্ছে বস্তুসমূহের মূলে যে দ্বন্দ্ব রয়েছে তা অধ্যয়ন করা।” পরবর্তীকালে মাও সে তুঙ তাঁর সমৃদ্ধ রচনা 'দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গে' শীর্ষক প্রবন্ধে দ্বন্দ্বতত্ত্বের এই মূল বিষয়টি সুশৃঙ্খল ও সামগ্রিকভাবে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। সুতরাং দ্বন্দ্বতত্ত্বের আলোচনায় আমরাও এই মূল বিষয়টি অর্থাৎ বিপরীতের ঐক্য ও সংগ্রাম বা দ্বন্দ্বের উপর মনোনিবেশ করব।
(১) দ্বন্দ্বসমূহ অর্থাৎ পরস্পর বিপরীত সত্তাসমূহ প্রকৃতি বা সমাজের ক্ষেত্রেই হোক অথবা মানুষের চিন্তার ক্ষেত্রেই হোক, সর্বত্র এবং সকল প্রকার প্রক্রিয়ার মধ্যে উপস্থিত। বিপরীতের মধ্যকার সংগ্রামই কোনো প্রক্রিয়ার বিকাশের কারণ। এঙ্গেলস বলেছেন, “গতি নিজেই একটা দ্বন্দ্ব।” উদাহরণ হিসাবে বলা যায় –
গণিতের ক্ষেত্রে -- যোগ ও বিয়োগ, গুণ ও ভাগ।
তড়িতের ক্ষেত্রে - ধনাত্মক ও ঋণাত্মক।
সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে -- নতুন ও পুরাতন, অগ্রসর ও পশ্চাদপদ, ক্রীতদাস ও দাসমালিক, ভূমিদাস ও সামন্তপ্রভু, শ্রমিক শ্রেণী ও পুঁজিপতি শ্রেণী।
যুদ্ধক্ষেত্রে -- আক্রমণ ও আত্মরক্ষা, এগিয়ে যাওয়া ও পিছিয়ে আসা।
মানুষের চিন্তার ক্ষেত্রে -- বাস্তবতা ও কল্পনা।
এইরূপ আরও অনেক। অর্থাৎ প্রত্যেক ক্ষেত্রে ও প্রত্যেক প্রক্রিয়ায় দ্বন্দ্ব বা বিপরীতের ঐক্য ও সংগ্রাম শুরু থেকে শেষপর্যন্ত থাকে। সুতরাং অধিবিদ্যার প্রবক্তাদের “হ্যাঁ, হ্যাঁ” কিংবা “না, না” রীতি প্রয়োগের বিপরীতে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি কোনো বস্তু ঘটনা বা কোনো প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করার ক্ষেত্রে কেবলমাত্র একটা দিক না দেখে বস্তু বা ঘটনার অন্তর্নিহিত বিপরীত সত্তাগুলি ও তাদের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করার দাবি জানায়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, যখন আমরা আমাদের জাতিকে অধ্যয়ন করি তখন তার মধ্যকার পরস্পর বিপরীত শ্রেণীগুলি এবং তাদের মধ্যেকার শ্রেণীসম্পর্ক অনুসন্ধান করা উচিত। শ্রেণীসংগ্রামের ক্ষেত্রে -- আইনি ও বেআইনি সংগ্রাম, গণআন্দোলন ও সশস্ত্র সংগ্রাম এবং উভয় প্রকার সংগ্রামের মধ্যকার সম্পর্ক সম্বন্ধে আমাদের অধ্যয়ন করা উচিত।
যেহেতু সকল বস্তু বা ঘটনার মধ্যে বিপরীতের সংগ্রাম উপস্থিত এবং বিপরীতের সংগ্রামের ফলেই বস্তুর বিকাশ এবং গতি সৃষ্টি হয়, তাই দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি সব কিছু দেখার ক্ষেত্রে যে দৃষ্টিভঙ্গী আয়ত্ত করতে বলে তা হল সব কিছুই সর্বদা গতিশীল, প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল ও সব কিছুরই উৎপত্তি ও বিনাশ আছে। অধিবিদ্যা এই দৃষ্টিভঙ্গীর বিরোধিতা করে। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের কথা ধরা যাক। ২০ বৎসর পূর্বে যখন এই আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে, তখন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তা পরিচালিত হয়েছিল, কারণ সে সময়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী ভূমিকাই জাতিসমূহের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার পক্ষে ভীতির কারণ ছিল। এই বৎসরগুলিতে সমগ্র বিশ্বপরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে এবং প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে; সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির আপেক্ষিক অবস্থানেরও পরিবর্তন ঘটেছে। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন ক্রমেই বেশি বেশি করে সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। যাদের দৃষ্টিভঙ্গী আধিবিদ্যক তাঁরা এই ঘটনাকে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের ধারণা হতে বিচ্যূতি বলে মনে করেন কারণ শুরুতে এই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল মার্কিন এবং ঐ ব্যক্তিদের মতে আজও তাই থাকা উচিত। কিন্তু দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি অনুসারে পরিস্থিতির পরিবর্তন অনুযায়ী এই পরিবর্তন স্বাভাবিক।
উপরন্তু দ্বন্দ্ববাদ যে কোনো বিকাশকে তার মধ্যে বিদ্যমান দ্বন্দ্বের ফল হিসাবে বিশ্লেষণ করতে শেখায়। তাই পোল্যাণ্ডের শ্রমিকদের বিদ্রোহী হয়ে ওঠার মূল কারণ কখনই বিদেশী হস্তক্ষেপ হতে পারে না; মূল কারণ হল পোলিশ সমাজের মধ্যেই নিহিত দ্বন্দ্বসমূহ। সুতরাং 'বাহ্যিক কারণের তত্ত্ব' হাজির করা আধিবিদ্যক চিন্তাধারারই প্রকাশ।
(২) সকল বস্তুর বিকাশের প্রক্রিয়ায় দ্বন্দ্ব উপস্থিত এটা ঠিক, তবে তার অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক বস্তুর বিকাশের প্রক্রিয়ায় একই দ্বন্দ্ব থাকবে। যদি তাই হত তবে বিশ্বে কেবলমাত্র একই ধরনের বস্তু থাকত। অর্থাৎ বস্তুর গতির কেবলমাত্র একটাই রূপ থাকত। কিন্তু আমরা বিভিন্ন ধরনের বস্তু ও প্রক্রিয়াসমূহ দেখতে পাই। প্রত্যেকটি বস্তু ও প্রক্রিয়ার মধ্যে তার নিজস্ব বিশেষ দ্বন্দ্ব অর্থাৎ বিশেষ ধরনের বিপরীত সত্তা উপস্থিত থাকে এবং তার ফলে ঐ বস্তু বা প্রক্রিয়াটি অন্য বস্তু বা প্রক্রিয়া থেকে ভিন্ন হয়। গম ও বার্লি -- প্রতিটির মধ্যে বিভিন্ন রূপের দ্বন্দ্ব রয়েছে এবং এ কারণেই গম ও বার্লির মধ্যে রূপের ফারাক দেখা যায়। জ্ঞানের প্রতিটি শাখার মধ্যেই নিহিত থাকে তার বিশেষ দ্বন্দ্ব এবং এটাই তাকে জ্ঞানের অন্য শাখা থেকে পৃথক করে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, গণিতের ক্ষেত্রে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক তড়িৎ, সমাজবিজ্ঞানে উৎপাদিকাশক্তি ও উৎপাদন সম্পর্ক এবং পরস্পর বিপরীত শ্রেণীগুলি, এবং দর্শনের ক্ষেত্রে ভাববাদ ও বস্তুবাদ, অধিবিদ্যা ও দ্বন্দ্বতত্ত্ব প্রভৃতি। প্রত্যেকটি সমাজব্যবস্থাতেই তার নিজস্ব দ্বন্দ্ব বর্তমান। দাস সমাজের দ্বন্দ্ব – দাস ও প্রভুদের মধ্যে, ধনতান্ত্রিক সমাজের দ্বন্দ্ব শ্রমিকশ্রেণী ও পুঁজিপতি শ্রেণীর মধ্যে। তাই অধিবিদ্যার বিপরীতে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি দাবি করে যে সাধারণভাবে দ্বন্দ্বসমূহের অালোচনাই যথেষ্ট নয়; বরং যা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ তা হল প্রাকৃতিক বা সামাজিক যে কোনো বস্তু বা ঘটনার অন্তর্নিহিত এই বিশেষ দ্বন্দ্বটি অধ্যয়ন করা। যখন আমরা আমাদের জাতিকে অধ্যয়ন করি তখন কেবলমাত্র সাধারণ দ্বন্দ্বগুলিই নয় বরং সেই বিশেষ দ্বন্দ্বটিও অধ্যয়ন করা উচিত যা আমাদের জাতিকে অন্যান্য জাতি থেকে পৃথক করে। শুধুমাত্র সাধারণ শ্রেণীসংগ্রামই নয় বরং আমাদের দেশে শ্রেণীসংগ্রামের যে বৈশিষ্ট্য আছে তাও অধ্যয়ন করা উচিত; শুধুমাত্র সাধারণভাবে গণআন্দোলনগুলি অধ্যয়ন না করে প্রত্যেকটি গণআন্দোলনের মধ্যকার বৈশিষ্ট্যগুলিও অধ্যয়ন করা উচিত।
(৩) দ্বন্দ্বের বৈশিষ্ট্য স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক ক্ষেত্রেই কেবলমাত্র একটি বিশেষ দ্বন্দ্ব বিরাজ করে। দ্বন্দ্বতত্ত্ব আমাদের শেখায় যে কোনো একটি বস্তুর মধ্যে অনেকগুলি দ্বন্দ্ব উপস্থিত থাকতে পারে। কোনো বস্তুর মধ্যে দ্বন্দ্বের সংখ্যা যতই বৃদ্ধি পেতে তাকে ততই তা সরল হতে জটিলতর হয়ে ওঠে। সুতরাং যে কোনো সময়েই কোনো বস্তু বা প্রক্রিয়ার মধ্যে যখন একাধিক দ্বন্দ্ব থাকে তখন অবশ্যই একটি দ্বন্দ্বই হয় প্রধান, যার উপস্থিতি ও বিকাশ অন্যান্য দ্বন্দ্বসমূহের উপস্থিতি ও বিকাশকে নির্ধারিত বা প্রভাবিত করে। এই প্রধান দ্বন্দ্বের সমাধানের মধ্য দিয়ে সেই বস্তু বা সমাজব্যবস্থা বা প্রক্রিয়া বিকাশের এক নতুন পর্যায়ে উপনীত হয়। সুতরাং দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি অনুসারে কোনো বস্তু বা ঘটনা সম্পর্কে অধ্যয়ন করার সময় তার মধ্যকার প্রধান দ্বন্দ্বটি খুঁজে বের করতে হবে এবং তার সমাধান করতে হবে। এটা করতে না পারলে আমরা কুয়াশার মধ্যে হারিয়ে যাব। (সমাজের ক্ষেত্রে প্রধান দ্বন্দ্ব নির্ণয় করার প্রশ্নটি 'ঐতিহাসিক বস্তুবাদ' অধ্যায়ে আলোচনা করব)।
(৪) প্রধান দ্বন্দ্বের সমাধানের জন্য পরস্পর বিপরীত দিকগুলির উভয়কেই অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। দ্বন্দ্বতত্ত্ব অনুসারে যে কোনো দ্বন্দ্বেই অর্থাৎ এক জোড়া পরস্পর বিরোধী দিকের মধ্যে একটি প্রধান দিক থাকে ও অপরটি থাকে অপ্রধান দিক। মূলত দ্বন্দ্বের এই প্রধান দিকই বস্তুর প্রকৃতি নির্ধারণ করে। যে কোনো ব্যক্তির মধ্যেই ভালো এবং মন্দ উভয় দিকই আছে, যদি ভালো দিকটি প্রধান হয় তবে আমরা তাকে ভালো বলে থাকি। একটি দিক প্রধান বা কর্তৃত্বের ভূমিকায় থাকলেও অপ্রধান দিকটির উপস্থিতি সংগ্রাম ও গতির ধারাবাহিকতা সূচিত করে। বিশেষ অবস্থায় দ্বন্দ্বের দুটি দিক পরস্পর স্থান পরিবর্তন করে (আন্তঃপ্রবিষ্ট হয়)। অর্থাৎ প্রধান দিক অপ্রধান দিকে পরিণত হয় আর অপ্রধান দিক প্রধান হয়ে ওঠে। ভালো লোক খারাপ লোকে রূপান্তরিত হয়, সাহসী ভীরু হয়ে পড়ে এবং শোষিত শ্রেণী হতে আগত কোনো ব্যক্তি শোষকে রূপান্তরিত হয়। এখানে পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সামগ্রিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। এর অর্থ কেবলমাত্র দ্বন্দ্বের দুটি দিকের পৃথক অধ্যয়নই যথেষ্ট নয়, ঐ দ্বন্দ্বটির সহিত অন্যান্য দ্বন্দ্বসমূহের সম্পর্কেও অধ্যয়ন করা দরকার এবং এই সম্পর্কের পরিবর্তন আর দুটি দিকের উপর পরিবর্তনগুলির মিলিত প্রভাবকেও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। অন্য কথায়, যে কোনো বস্তু বা ঘটনাকে অধ্যয়ন করতে হবে অন্যান্য বস্তু বা ঘটনার সঙ্গে তার পরিবর্তনশীল আন্তঃসম্পর্ক এবং তার নিজস্ব অবস্থানের ওপর এই আন্তঃসম্পর্কের প্রভাবের পরিপ্রেক্ষিত। সুতরাং কোনো দ্বন্দ্বের প্রধান ও অপ্রধান দিকের অবস্থান পরিবর্তন বোঝার জন্য সর্বপ্রথম যা প্রয়োজন তা হল সামগ্রিক বস্তুগত অবস্থার অধ্যয়ন।
সুতরাং বিশেষ অবস্থায় পরিবর্তনটি ঘটে দুটি দিকের আপেক্ষিক অবস্থানের মধ্যে। কিন্তু শুরুতেই এই পরিবর্তন ঘটতে থাকে খুব মন্থর গতিতে; পরিমাণগতভাবে। উদাহরণ হিসাবে ধরা যাক কোনো ব্যক্তির ভালো ও মন্দ দিকের আনুপাতিক হিসাব ৭০ : ৩০। এই অনুপাত পরিবর্তিত হয়ে ৬০ : ৪০ হল। এই অবস্থায় ঐ ব্যক্তির প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়েছে ঠিকই কিন্তু এই পরিবর্তন আপাতভাবে বোঝা যায় না অর্থাৎ এখনও ঐ ব্যক্তিকে আমরা ভালো বলব কারণ ভালো দিকটি এখনও প্রধান। কিন্তু বিকাশের প্রক্রিয়ায় ভালো ও মন্দ দিকের অনুপাত আমূল পরিবর্তিত হয়ে ৩০ : ৭০ হল। এখন পরিমাণগত পরিবর্তন রূপান্তরিত হল। অর্থাৎ দ্বন্দ্বের প্রধান ও অপ্রধান দিকের অবস্থানের পরিবর্তন হয়েছে -- অপ্রধান দিক প্রধান দিকের অবস্থান গ্রহণ করেছে এবং প্রধান দিক অপ্রধান দিকে পরিবর্তিত হয়েছে। ব্যক্তিটির প্রকৃতিও পরিবর্তিত হয়েছে -- সে ভালো লোক থেকে মন্দ লোকে রূপান্তরিত হয়েছে। এই গণগত পরিবর্তনকে বিকাশের প্রক্রিয়ায় একটা উল্লম্ফনও বলা হয়। অধিবিদ্যা বিকাশের প্রক্রিয়ায় এরূপ উল্লম্ফনকে স্বীকার করে না। অধিবিদ্যক ধারণার সব পরিবর্তনই যান্ত্রিক ও পরিমাণগত।
সুতরাং অধিবিদ্যার বিপরীতে, দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি দাবি করে যে শুধুমাত্র সাধারণ, বিশেষ এবং প্রধান দ্বন্দ্বের অধ্যয়নই যথেষ্ট নয়, আমাদের দ্বন্দ্বের দুটি দিক সম্পর্কেও অনুসন্ধান করা উচিত, সামগ্রিক পরিবর্তনশীল (গুণগত ও পরিমাণগত) পরিস্থিতির এবং ফলস্বরূপ দ্বন্দ্বের দুটি দিকের উপর তার ক্রিয়া কি হয় তার বিশ্লেষণ করা উচিত। সুতরাং একটি বিপ্লবী পার্টি সর্বদাই পরিবর্তনশীল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং দ্বন্দ্বের (জনগণ বনাম শাসকশ্রেণী) দুটি দিকের উপর তার ক্রিয়া বিশ্লেষণ করে এবং এইভাবে বিপ্লবী পার্টি সর্বদা তার লাইন কর্মনীতিগুলি বা শ্লোগানগুলি সমৃদ্ধ করে বা পরিবর্তন করে। (প্রসঙ্গত স্মরণ রাখতে হবে সে দ্বন্দ্বের দুটি দিকের পরিবর্তন আবার সামগ্রিক পরিস্থিতির উপর প্রভাব বিস্তার করে)। শ্রেণী সংগ্রামের ক্ষেত্রে শাসকশ্রেণীর শাসিতে এবং শাসিত জনগণের শাসকশ্রেণীতে পরিণত হওয়াটা একটা গুণগত পরিবর্তন। কিন্তু এটা একটা দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়া এবং এর মধ্যে সর্বদাই শাসক ও শাসিত জনগণের আপেক্ষিক অবস্থানের পরিমাণগত পরিবর্তন ঘটতে থাকে। শ্রেণীসংগ্রামের প্রক্রিয়ায় শাসকশ্রেণীর মধ্যে থেকেই স্বৈরতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভাব ঘটে এবং জনগণের বিভিন্ন অংশের সংগ্রাম এই শক্তির বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়, এখন যদি বিপ্লবী শক্তিগুলি দ্বন্দ্বের দুটি দিকের আপেক্ষিক অবস্থানের এই পরিমাণগত পরিবর্তন মূল্যায়ন না করেন, যদি স্বৈরতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামকে কেন্দ্রীভূত করার জন্য এবং ব্যাপক বিস্তৃত জনগণের যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলার জন্য তাদের কর্মনীতিগুলি ও স্লোগানগুলি সমৃদ্ধ না করেন তবে তাঁরা শ্রেণী সংগ্রামকে নেতৃত্ব দিয়ে শেষপর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন না; অর্থাৎ তাঁরা গুণগত পরিবর্তনটি ত্বরান্বিত করতে সক্ষম হবেন না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চীন বিপ্লবে মাও-সে-তুঙ ও চারটি গোষ্ঠী (চিয়াং-কাইশেক, টি টি সুঙ, এইচ এইচ সুঙ, চেন-লি-ফু) এবং কুয়োমিন্টাঙের মধ্যকার কিছু কট্টরপন্থীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম কেন্দ্রীভূত করেন এবং সমস্ত শান্তিপ্রিয় গণতান্ত্রিক শক্তিগুলিকে সঙ্গে নিয়ে ব্যাপক বিস্তৃত যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন। সুতরাং দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির মধ্যে গোঁড়ামীবাদের কোনো স্থান নেই।
৫। দ্বন্দ্বের পরস্পর বিরোধী দুটি দিকের মধ্যে স্থানান্তর ঘটে থাকে -- তার অর্থ এই নয় যে সর্বদাই একই প্রধান ও অপ্রধান দিক স্থান পরিবর্তন করবে, যদি তাই হত তবে কোনো বস্তুর বিকাশ একই বৃত্তের চারিদিকে আবর্তিত হত। দ্বন্দ্বতত্ত্ব অনুসারে কোনো বস্তুর মধ্যে বিপরীতের সংগ্রামে সর্বদাই বিপরীতগুলি নিজেদের পরিবর্তন সাধন করে; যখন অপ্রধান দিকটি প্রধান দিকে পরিপর্তিত হয় তখন এক নতুন বস্তুর সৃষ্টি হয় এবং এর সাথে সাথে নতুন ধরনের দ্বন্দ্ব উপস্থিত হয়; অর্থাৎ নতুন এক জোড়া বিপরীত সত্তার আবির্ভাব ঘটে। পুরাতন প্রক্রিয়া শেষ হয় শুরু হয় এক নতুন প্রক্রিয়া। নতুন প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকে নতুন দ্বন্দ্বসমূহ এবং এই প্রক্রিয়া তার দ্বন্দ্বগুলির বিকাশের নিজস্ব ইতিহাস শুরু করে। প্রত্যেকটি দ্বন্দ্বের সমাধান একই সাথে নতুন ধরনের দ্বন্দ্বের সূচনা বিন্দু। উদাহরণ হিসাবে কৃষকদের সংগঠিত করার কথাই ধরা যাক। এই প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ধরনের বিররীত দিকগুলি দেখতে পাওয়া যাবে -- একদিকে দেখা যায় জমির উপর অধিকার লাভ করার জন্য কৃষকদের সংগঠন গড়ে তোলার আকাঙ্খা, অপরদিকে রয়েছে জমির উপর জমিদারদের মালিকানা; কৃষকদের সংগঠিত হওয়ার প্রচেষ্টা অপরদিকে জমিদারদের বাধা; কৃষকদের অসংগঠিত জীবন এবং সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা -- প্রভৃতি। সুতরাং অসংগঠিত কৃষকদের সংগঠিত করা একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়া -- যে প্রক্রিয়ায় জমিদারদের আক্রমণ প্রতিরোধ করার মধ্য দিয়ে এবং সংগ্রাম চলাকালীন নিজেদে নৈরাজ্যবাদী ধারণাগুলি অতিক্রম করার মধ্য দিয়ে কৃষকরা নিজেদের সংগঠিত করেন এবং এ যাবৎকাল তাঁরা যে জমি চাষ করে এসেছেন তার মালিক হন। এরই সাথে সাথে জমিদার শ্রেণী নির্মূল হয়। এইভাবেই বিপরীত দিকগুলির স্থান পরিবর্তন ঘটে -- অসংগঠিত কৃষক সংগঠিত হয়, ভূমিহীন কৃষক জমির মালিক হয়, শাসিত কৃষক শ্রেণী শাসক কৃষক শ্রেণীতে রূপান্তরিত হয় এবং অপরদিকে শাসক জমিদার শ্রেণী শাসিতে পরিণত হয়। গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন ঘটে এক নতুন সমাজ জন্মগ্রহণ করে। এই নতুন সমাজ ব্যবস্থায় পুরাতন দ্বন্দ্বগুলি অর্থাৎ পুরাতন বিপরীত সত্তাগুলি কিছু সময় পর্যন্ত থেকে গেলেও ক্রমশ তারা বিলুপ্ত হয়ে যায়। আর নতুন সমাজের সাথে উপস্থিত হয় নতুন দ্বন্দ্বসমূহ – জমির অধিকারী সংগঠিত কৃষক শ্রেণী ও পশ্চাদপদ কৃষি ব্যবস্থার দ্বন্দ্ব, কৃষক শ্রেণীর ক্রমবর্ধমান চাহিদা আর ভোগ্যপণ্যের ঘাটতির মধ্যে দ্বন্দ্ব, নতুন অবস্থায় কৃষকশ্রেণীর নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব, নতুন ও পুরাতনের মধ্যে, আর অগ্রবর্তী ও পশ্চাদবর্তী অংশের মধ্যে দ্বন্দ্ব।
শ্রেণীসংগ্রামের ক্ষেত্রে, রাজনৈতিক সংগ্রাম ও সশস্ত্র সংগ্রাম – এই দুটি দিকও তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে, কোনো সময় প্রথমটি আবার কোনো সময় পরেরটি প্রধান দিক হয়ে ওঠে। কিন্তু স্থান পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়ায় দুটি দিকই নিজেদেরও পরিবর্তন করে। তাই এই পারস্পরিক পরিবর্তন বারবার একইভাবে ঘটে না। প্রত্যেকবারেই এই দুটি দিক অামাদের সামনে নতুন বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির হয়। তাই পুরাতন ধরনের সশস্ত্র সংগ্রাম বা পুরাতন ধরনের রাজনৈতিক সংগ্রামের যান্ত্রিক পুনরাবৃত্তি আধিবিদ্যক ধারণারই প্রকাশ।
(৬) যদি বিকাশের প্রক্রিয়ায় পুরাতন দ্বন্দ্বসমূহ অন্তর্হিত হয় ও নতুন দ্বন্দ্বসমূহের আবির্ভাব ঘটে, যদি প্রকৃতি ও সমাজে এতো বিভিন্ন ধরনের দ্বন্দ্বের সমাবেশ থাকে, তবে সব দ্বন্দ্বই কি আমরা একইভাবে সমাধান করতে পারি! অবশ্যই নয়। দ্বন্দ্বতত্ত্ব অনুসারে গুণগতভাবে পৃথক বিভিন্ন দ্বন্দ্বের সমাধানের পদ্ধতিও হবে গুণগতভাবে পৃথক। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, সর্বহারা শ্রেণী ও বুর্জোয়া শ্রেণীর মধ্যকার দ্বন্দ্বের সমাধান হয় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব দ্বারা, ব্যাপক জনগণ ও সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যকার দ্বন্দ্বের সমাধান ঘটে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে, উপনিবেশ সমূহ এবং সাম্রাজ্যবাদের মধ্যকার দ্বন্দ্বের সমাধান হয় উৎপাদিকা শক্তিগুলির বিকাশ ঘটানোর সাহায্যে ইত্যাদি। তাই সমাজ বিকাশের প্রক্রিয়া পরিচালনা করতে হলে শুধুমাত্র বিভিন্ন ধরনের দ্বন্দ্বসমূহ জানাটাই যথেষ্ট নয়, আরও যা প্রয়োজন তা হল বিভিন্ন ধরনের দ্বন্দ্ব – যেমন জনগণ ও শত্রুর মধ্যকার দ্বন্দ্ব, গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহের মধ্যকার দ্বন্দ্ব, অগ্রগামী সর্বহারা বাহিনী ও গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ইত্যাদি সমাধানে বিভিন্ন পদ্ধতি স্থির করা।
এ পর্যন্ত আমরা দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির কতকগুলি প্রধান বৈশিষ্ট্য আলোচনা করেছি। এক কথায় বলতে গেলে, লেনিন যেমনটি বলেছেন, “দ্বন্দ্বতত্ত্বের সারবস্তু হল একটি অখণ্ড বস্তুকে দুই ভাগে বিভক্ত করা এবং তার বিরোধী অংশগুলিকে জানা”। সুতরাং দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিকে “এক ভেঙ্গে দুই” এই ভাবেও বলা যেতে পারে। এই পদ্ধতি হল “হ্যাঁ, হ্যাঁ; না, না; হয় এটা নতুবা ওটা” এই অধিবিদ্যক পদ্ধতির একেবারে বিপরীত। এই পদ্ধতির জন্যই অধিবিদ্যা বিশ্বের পরিবর্তনগুলি ব্যাখ্যা করতে পারে না এবং কোনো বিপ্লবী আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিতে পারে না।
কিন্তু দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির অনুগামীদের মধ্যে কেউ কেউ 'বিপরীতের ঐক্য ও সংগ্রামের' উপর গুরুত্ব আরোপ করেন না। ঠিক এই কারণেই প্লেখানভ অনুসৃত পদ্ধতি সম্পর্কে লেখার সময় লেনিন এর উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি আরো বলেছেন, “সংক্ষেপে, দ্বন্দ্বতত্ত্বকে বিপরীতের ঐক্যের নিয়ম হিসাবে সংজ্ঞা দেওয়া যেতে পারে। দ্বন্দ্বতত্ত্বের এটা শাঁস বা সারবস্তু কিন্তু এর ব্যাখ্যা ও বিকাশের প্রয়োজন আছে।” তাই লেনিন শুধুমাত্র নিয়মটির উপরই গুরুত্ব আরোপ করেননি, তিনি তার আরও ব্যাখ্যা ও বিকাশের প্রয়োজনের উপরেও গুরুত্ব আরোপ করেছেন। অর্থাৎ লেনিন এই নিয়মটিকে আধিবিদ্যক পদ্ধতিতে নয়, দ্বান্দ্বিকভাবেই পর্যালোচনা করেছেন এবং এর আরও ব্যাখ্যা ও বিকাশের প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এছাড়া মাও-সে-তুঙ তাঁর রচনার মধ্যে ঠিক এই কাজটিই করেছেন। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই আমাদের নিত্য পরিবর্তনশী দুনিয়ায় ঐ নিয়মের ব্যাখ্যা এবং বিকাশের সমস্যাটি এখানেই শেষ হয়ে যায়নি।
উপরন্তু, যাঁরা বিপরীতের ঐক্য ও সংগ্রামের নিয়ম অনুসরণ করেন তাঁদের মধ্যে কিছু কিছু ব্যক্তি ঐক্যের উপর এমনভাবে গুরুত্ব আরোপ করেন যাতে এই নিয়মটিই তার বিপরীতে অর্থাৎ জগাখিচুড়ি মতবাদে (Eclecticism) পরিণত হয়। মাও সে তুঙ বিপরীতের ঐক্য ও সংগ্রাম প্রসঙ্গে বলেছেন, সকল বস্তুর মধ্যে গতির দুটি অবস্থা আছে, আপেক্ষিক নিশ্চলতা এবং দৃশ্যমান পরিবর্তন। উভয়ই বস্তুর মধ্যে নিহিত দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী উপাদানের মধ্যকার সংগ্রাম থেকে উদ্ভূত হয়। যখন বস্তুটি গতির প্রথম অবস্থাটিতে থাকে, তার আগেই প্রথম অবস্থাটির পরিমাণগত পরিবর্তন কোনো চরম বিন্দুতে পৌঁছে যায় এবং একটা একক বস্তুর বিয়োজন সংঘটিত করার এবং অবিলম্বে একটা গুণগত পরিবর্তন উদ্ভূত হয়; অতএব তার দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটতে দেখা যায়। আমরা প্রাত্যহিক জীবনে যেরূপ একত্ব, সংহতি, সংযুক্তি, সামঞ্জস্য, সমক্রিয়া, অচলাবস্থা, বদ্ধাবস্থা, নিশ্চলতা, সুস্থিতি, ভারসাম্য, জমাট অবস্থা ও আকর্ষণের ধ্বংস এবং প্রত্যেকটির বিপরীতে পরিবর্তন – এসবই হল গুণগত পরিবর্তনের অবস্থায়, একটি প্রক্রিয়া থেকে অন্য প্রক্রিয়ায় রূপান্তরকালে বস্তুর বাইরের চেহারা। বস্তু সর্বদাই নিজেদের গতির প্রথম অবস্থা থেকে দ্বিতীয় অবস্থায় রূপান্তরিত করে চলেছে, আর উভয় অবস্থাতেই বিপরীতগুলোর সংগ্রাম চলতে থাকে, এবং দ্বন্দ্বের মীমাংসা হয় দ্বিতীয় অবস্থার মধ্যে দিয়ে। এজন্যই আমরা বলি যে, বিপরীতগুলোর একত্ব হচ্ছে শর্তসাপেক্ষ, অস্থায়ী ও আপেক্ষিক, আর পরস্পর ব্যতিরেকে -- বিপরীতগুলোর সংগ্রাম হচ্ছে অনাপেক্ষিক।
জগাখিচুড়ি মতবাদ কেবলমাত্র গতির প্রথম অবস্থাই বুঝতে পারে, তাই তা কোনো দ্বন্দ্বের সমাধান করতে পারে না।
(১) লেনিন বলেছেন, “বিকাশ (বা গতি) হচ্ছে দুটি বিপরীতের সংগ্রাম।” বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গীতে, গতির মধ্যেই বস্তুর অস্তিত্ব। মহাজাগতিক গতি, বিভিন্ন গ্রহ নক্ষত্রের মধ্যে ক্ষুদ্রতর বস্তুসমূহের যান্ত্রিক গতি, তাপ, চুম্বক বা তড়িৎ প্রবাহরূপে অণুর কম্পন, রাসায়নিক বিয়োজন বা সংযোজন, জৈব জীবন – বিশ্বের প্রতিটি বস্তুর প্রত্যেক পরমাণু, প্রতিটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে গতি কোনো না কোনো রূপের মধ্য দিয়ে অথবা একই সাথে কয়েকটি রূপের মধ্য দিয়ে চলেছে। সুতরাং এই বিশ্বে “চরম আত্মা” বা “সর্বত্র বিরাজমান ঈশ্বরের” অস্তিত্ব নেই, বিশ্বের কোনো “কোনো প্রথম ধাক্কারও প্রয়োজন হয়নি”। কিন্তু সমগ্র বিশ্ব গতিময় বস্তু ভিন্ন আর কিছু নয়।
প্রকৃতি বিজ্ঞান হতে জানা যায় যখন প্রাণের অস্তিত্ব বা মানবজাতি ছিল না তখনও বস্তুজগতের অস্তিত্ব ছিল। সুতরাং বস্তুজগতের অস্তিত্ব আমাদের চেতনা নিরপেক্ষ। পরিমাণগত পরিবর্তন হতে গুণগত পরিবর্তনের বিকাশের প্রক্রিয়ায় অজৈব বস্তু হতে জৈব জীবনের বিকাশ ঘটে এবং ক্রমে ক্রমে জৈব সত্তা থেকে মানুষের উদ্ভব হয়। সুতরাং সমগ্র বিশ্ব এবং মানুষের মস্তিষ্ক বস্তুর দ্বান্দ্বিক বিকাশের ফল। মস্তিষ্ক নিজেই হল বস্তুর সর্বোচ্চ বিকাশ। তাই চেতনার উদ্ভব বস্তু থেকেই।
সুতরাং বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী আমাদের অবশ্যই বাস্তব অবস্থা থেকে শুরু করতে হবে, অবশ্যই নির্দিষ্ট তথ্যাদি এবং বস্তুর মধ্যেকার বিপরীতের ঐক্য ও সংগ্রাম থেকে শুরু করতে হবে এবং আমাদের অবশ্যই মনোগত আকাঙ্খা অথবা ধার করা কোনো ফর্মুলা অনুযায়ী করা উচিত নয়।
(২) বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী বস্তু ও চেতনার মধ্যে বস্তুই মুখ্য ও চেতনা গৌণ। যা আমাদের ইন্দ্রিয়ের উপর ক্রিয়া করে অনুভূতি সৃষ্টি করে কিন্তু যার অস্তিত্ব আমাদের ইন্দ্রিয় বা অনুভূতি নিরপেক্ষ তাকেই বস্তু বলা হয়। কিন্তু ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে আমরা বস্তুর কোনো একটি রূপ সম্পর্কে জানতে পারি কারণ “বিশুদ্ধ বস্তু” বলে কিছু নেই। যেমন ফলের অস্তিত্ব হিসাবে আমরা দেখি 'আম, আপেল, কলা' প্রভৃতি। কিন্তু শুধু ফল বলে কিছু নেই। সুতরাং 'বস্তু' হল বস্তুর বিভিন্ন রূপে সাধারণ দার্শনিক নাম – যেমন, বিভিন্ন ধরনের ফলের (আম, আপেল, কলা প্রভৃতি) সাধারণ নাম হল ফল।
চেতনা বা চিন্তা হচ্ছে মানুষের মনে বস্তু জগতের প্রতিফলন। এর একমাত্র উৎস বস্তু জগত। এটা হচ্ছে একটা দিক, অপর দিক হচ্ছে একবার চিন্তা বা চেতনার সৃষ্টি হলে তা আবার বস্তুর উপর প্রভাব ফেলে। কোনো বস্তু সম্পর্কে সচেতন হওয়ার পর আমরা তার পরিবর্তন ঘটাতে শুরু করি। উপরন্তু বস্তুগত অবস্থার পরিবর্তন ঘটলেও চিন্তা বা চেতনা সঙ্গে সঙ্গে অবলুপ্ত হয় না, বস্তুর বিকাশ ধারাকে প্রভাবিত করতে থাকে। সামন্ততন্ত্র ও ধনতন্ত্র উচ্ছেদ হওয়ার পর প্রধানত সামন্ততান্ত্রিক ও ধনতান্ত্রিক চিন্তার বস্তুগত ভিত্তি মূলত বিলুপ্ত হয় কিন্তু এ সত্ত্বেও সামন্ততান্ত্রিক ও ধনতান্ত্রিক চিন্তাগুলি থেকে যায় এবং সমাজের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। একইভাবে, নতুন বস্তুগত অবস্থার উৎপত্তি নতুন চেতনার জন্ম দেয় এবং এই নতুন চেতনা সমাজের বিকাশে নতুন গতি সঞ্চার করে। এই কারণে মার্কস বলেছেন, “যখন জনগণ কোনো ধারণাকে আঁকড়ে ধরেন তখন তা এক বস্তুগত শক্তিতে পরিণত হয়।”
সুতরাং বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী আমাদের “খাঁটি সর্বহারা” “খাঁটি কৃষক” “খাঁটি বুদ্ধিজীবীদের” সন্ধান করা উচিৎ নয়। কারণ “খাঁটি সর্বহারা” হল সর্বহারা শ্রেণীর বিভিন্ন সদস্যদের মধ্যে যে সমস্ত গুণ দেখা যায় সেগুলির এক সাধারণ নাম এবং এটা “খাঁটি বুদ্ধিজীবীদের” ক্ষেত্রেও সত্য। এর বিপরীতে বিভিন্ন শ্রমিক ও কৃষক কর্মীদের তাঁদের গুণ অনুসারে কাজে লাগাতে আমাদের দক্ষ হতে হবে এবং এই সমস্ত কাজের সাধারণ নাম হল বিপ্লবী কাজ। একইভাবে “বিশুদ্ধ গণ-আন্দোলন” বা “বিশুদ্ধ সশস্ত্র সংগ্রাম” এর কোনো অস্তিত্ব নেই। আসলে এগুলো হল গণ-আন্দোলন ও সশস্ত্র সংগ্রামের বিভিন্ন রূপের সাধারণ নাম। ক্যাডারদের সঠিকভাবে পরিচালিত করা এবং যথাযথভাবে আন্দোলন চালানো বলতে আমরা এটাই বুঝি।
দ্বিতীয়ত আন্দোলন চলাকালে আন্দোলন থেকে উদ্ভূত নতুন চিন্তাগুলিকে ধারাবাহিকভাবে শুধু প্রচার করে গেলেই চলবে না এর সাথে সাথে পুরাতন ধারণাগুলির বিরুদ্ধেও লাগাতার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। কেবলমাত্র তবেই আন্দোলনের বিকাশে বস্তুগত উল্লম্ফন ঘটানো যায়।
কেউ কেউ “বিশুদ্ধ ক্যাডার” ও “বিশুদ্ধ আন্দোলনের” খোঁজে ঘুরে বেড়ান, ফলে তাঁরা একটি ক্যাডারও রক্ষা করতে বা কোনো আন্দোলন পরিচালনা করতে সক্ষম হন না! তাঁরা নতুন বস্তুগত বিকাশ থেকে উদ্ভূত নতুন ধারণাগুলি আয়ত্ত করতে পারেন না এবং বাঁধাধরা একই ধরনের পুরাতন কথার পুনরাবৃত্তি করে চলেন। অপরদিকে অনেক সময়ে তাঁরা নতুন চিন্তার কথা বলে পুরনো চিন্তাগুলির “বস্তুগত উপস্থিতি” এবং আন্দোলনের বিকাশে ঐ পুরনো ধ্যান-ধারণার “বস্তুগতভাবে নেতিবাচক প্রভাবকে” অস্বীকার করেন। নির্দিষ্ট অবস্থা অনুসারে বিভিন্ন ধরনের আন্দোলনে বিভিন্ন ধরনের শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো এবং পুরনো ধ্যানধারণার বস্তুগত অস্তিত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে নতুন চিন্তার পতাকাকে তুলে ধরাটাই হল দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের বৈশিষ্ট্য।
৩। বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী বিশ্ব রহস্যময় এমন কিছু নয় যে তাকে জানা যাবে না, অনুশীলনের মধ্য দিয়েই বিশ্ব সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করা যায়। মানবজাতির অনুশীলন প্রতিনিয়তই রহস্যের আবরণ ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে।
অনুশীলনের মাধ্যমে মানুষ প্রথমে ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞান অর্জন করে। এরপর তা থেকে পাওয়া তথ্যগুলিকে সাজানো, পুনর্গঠন করা ও বারবার চিন্তা করার মাধ্যমে সেইগুলি সংশ্লেষিত (synthesis) করে মানুষ যুক্তিগ্রাহ্য জ্ঞানে উপনীত হয়। কিন্তু জ্ঞানের প্রক্রিয়া এখানেই শেষ হয়ে যায় না। জ্ঞানলাভের প্রক্রিয়ার এটা প্রথম পর্যায় – বস্তু থেকে বিষয়ীগত চেতনায়, অস্তিত্ব থেকে চিন্তায় উপনীত হওয়ার পর্যায়। কোনো ব্যক্তির চেতনা বা চিন্তাধারা বাস্তব অবস্থার সঠিক প্রতিফলন ঘটাচ্ছে কিনা এই পর্যায়ে তা প্রমাণিত হয় না। এরপর আসে জ্ঞানলাভ প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় পর্যায় – চেতনা হতে বস্তুতে, চিন্তা হতে অস্তিত্বে ফিরে যাওয়ার পর্যায়, কারণ অনুশীলনই হচ্ছে সত্যের একমাত্র মাপকাঠি। বারবার এই প্রক্রিয়া চালানোর মধ্য দিয়ে আমরা সঠিক ও নির্ভরযোগ্য জ্ঞানলাভ করতে পারি। কিন্তু যেহেতু বস্তুজগত নিজেই গতিময় তাই প্রায়ই আমাদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করতে হয়। আর এই কারণে জ্ঞানের প্রক্রিয়া কখনও শেষ হয় না।
জ্ঞানের নির্ভরযোগ্যতা প্রসঙ্গে এঙ্গেলস লিখেছেন, “যদি কোনো প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে নিজেরা নির্মাণ করে আমাদের ধারণাকে নির্ভুল বলে প্রমাণ করতে পারি এবং যদি অনুকূল পরিবেশে তাকে প্রস্তুত করে ও নিজেদের প্রয়োজন মতো ব্যবহার করে প্রমাণ করি, যখন কান্টের 'অজ্ঞেয় স্বয়ং সিদ্ধ সত্তা' সেই সঙ্গেই লোপ পায়। ... ... তিনশো বছর ধরে কোপারনিকাসের সৌরমণ্ডল সংক্রান্ত তত্ত্ব একটা অনুমান মাত্র ছিল। ... ... কিন্তু এই অনুমান থেকে সংগৃহীত তথ্যের সাহায্যে যখন লেভেরিয়ে একটা অজানা গ্রহের অস্তিত্বের অবশ্যম্ভাবিতা আবিষ্কার করেই ক্ষান্ত হলেন না, সৌরমণ্ডলে নিশ্চিতভাবে তার স্থান কোথায় তাও গণনার ফলে স্থির করলেন এবং গ্যাল সত্যই ঐ গ্রহকে খুঁজে বের করলেন তখন কোপারনিকাসের তত্ত্ব সত্যই বলে প্রমাণিত হল।”
সুতরাং অনুশীল হচ্ছে সমস্ত জ্ঞানের উৎস, সাঁতার শিখতে হলে অবশ্যই জলে ঝাঁপ দিতে হবে। একইভাবে বারবার অনুশীলনের মধ্য দিয়েই রাজনৈতিক সংগ্রাম ও সশস্ত্র সংগ্রাম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান লাভ করা যায় এবং এই পর্যায়ে সংঘটিত ভুলত্রুটিগুলি জ্ঞানার্জন প্রক্রিয়ারই অপরিহার্য অঙ্গ। সুতরাং দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ কাজে যুক্ত হতে, অনুশীল করতে এবং ঝড়-ঝঞ্ঝার সম্মুখীন হতে অনুপ্রাণিত করে; তা কখনোই আমাদের ভুলের ভয়ে কাজ থেকে বিরত করে না। উপরন্তু বস্তুবাদীরা সর্বপ্রথমে নির্দিষ্ট বাস্তব ঐক্য এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন, অপরদিকে ভাববাদে ভুগছেন যে সব ব্যক্তি, তারা বিমূর্ত তত্ত্ব বা ফর্মুলার গুরুত্ব আরোপ করেন এবং অভিজ্ঞতা বিনিময় করা পরিহার করে চলেন।
কার্ল মার্কস এবং ফ্রেডরিক এঙ্গেলস ইতিহাসকে অধ্যয়ন করেছিলেন দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে আর মানুষের সামাজিক জীবনকে বিশ্লেষণ করেছিলেন বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে, এইভাবেই আবির্ভাব ঘটেছিল ঐতিহাসিক বস্তুবাদের। আমরা এখন ঐতিহাসিক বস্তুবাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করব।
(১) ভাববাদের মত, ঐতিহাসিক বস্তুবাদ কোনো “সার্বজনীন সত্তা” বা “অতিপ্রাকৃত শক্তি”র মধ্যে সামাজিক অগ্রগতির কারণ অনুসন্ধান করে না, বরং মানুষের বাস্তব জীবনেই তার অনুসন্ধান চালায়। বাঁচার জন্য মানুষের প্রয়োজন খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শক্তি ইত্যাদি অনেক কিছু। আর এইসব কিছু পাওয়ার জন্য মানুষকে এগুলি উৎপাদন করতে হয়। উৎপাদনই হল প্রথম ঐতিহাসিক কাজ যা মানবসমাজকে বাকি প্রাণীজগত থেকে আলাদা করে। উৎপাদনের জন্য মানুষের চাই উৎপাদনের উপকরণ (লাঙল, যন্ত্র ইত্যাদি)। উৎপাদনের উপকরণ, মানুষের শ্রম, শ্রমের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা (যার সাহায্যে মানুষ উৎপাদন করে) -- এই সব কিছু মিলিয়ে হল উৎপাদিকা শক্তি। কিন্তু এটা উৎপাদনের একটি দিক মাত্র। উৎপাদনের জন্য, প্রকৃতি থেকে বেঁচে থাকার উপাদান আহরণের জন্য, কেবলমাত্র উৎপাদিকা শক্তিই যথেষ্ট নয়। একমাত্র নিজেদের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেই মানুষ প্রকৃতি থেকে জীবনধারণের উপকরণ সংগ্রহ করতে পারে, এই সম্পর্ক যেমন পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্ক হতে পারে, তেমনি জনসমষ্টির এক অংশ দ্বারা অন্য অংশকে দাবিয়ে রাখার সম্পর্কও হতে পারে। উৎপাদনের প্রক্রিয়ায়, মানুষের নিজেদের মধ্যে যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে তাকে বলা হয় উৎপাদন সম্পর্ক। উৎপাদনের সাহায্য করার জন্য উৎপাদন সম্পর্ক উৎপাদিকা শক্তির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। উৎপাদিকা শক্তি এবং উৎপাদন সম্পর্ক দুইয়ে মিলে গঠিত হয় উৎপাদন ব্যবস্থা বা উৎপাদনের ধরন (mode of production)। উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ফলে সমাজের পরিবর্তন ঘটে।
(২) অধিবিদ্যার মতো ঐতিহাসিক বস্তুবাদ এই উৎপাদন ব্যবস্থাকে এক স্থির, জড় এবং স্থায়ী ব্যাপার হিসেবে দেখে না, বরং সদাপরিবর্তনশীল ও রূপান্তরময় হিসেবে মনে করে। যে কোনো উৎপাদন ব্যবস্থাতেই প্রথমে ঘটে উৎপাদিকা শক্তির পরিবর্তন এবং উৎপাদিকা শক্তির মধ্যে আবার উৎপাদনের উপকরণে পরিবর্তন আসে সবার আগে। এই কারণে, যে কোনো উৎপাদন ব্যবস্থাতেই উৎপাদনের উপকরণ হল সবচেয়ে সচল উপাদান। উৎপাদনের উপকরণের দ্বারা শ্রমের সংগঠন নির্ধারিত হয়। নতুন উৎপাদিকা শক্তি উৎপাদন সম্পর্কে পরিবর্তন দাবি করে -- চলতি পুরনো উৎপাদন সম্পর্কের সঙ্গে তার সংঘাত ঘটে। পরিশেষে পুরনো উৎপাদন সম্পর্ক ধ্বংস হয়, আসে নতুন উৎপাদন সম্পর্ক বা নতুন উৎপাদিকা শক্তির বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করে। পৃথিবীর ইতিহাসে আমরা আজ পর্যন্ত পাঁচ ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থা এবং তার ফলে পাঁচ রকমের সমাজব্যবস্থা দেখেছি -- আদিম সাম্যবাদ, দাসব্যবস্থা, সামন্ততন্ত্র, পুঁজিবাদ এবং সমাজতন্ত্র।
(৩) অধিবিদ্যার বিপরীতে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ মনে করে যে, উৎপাদিকা শক্তিও – পরিমাণ থেকে গুণ, নিম্নতর থেকে উচ্চতর, সরল থেকে জটিল – এইভাবেই বিকাশলাভ করে। আদিম যুগে, মানুষের ছিল শুধু পাথরের হাতিয়ার, তাই একমাত্র একটি সমষ্টিবদ্ধ ইউনিট (পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত) হিসেবেই তাদের পক্ষেও প্রাকৃতিক প্রতিকূলতাগুলির মোকাবিলা করা এবং কোনো রকমে বেঁচে থাকা সম্ভব ছিল। কিন্তু উন্নত ধরনের পাথরের সন্ধানের (তাদের পাথরের যন্ত্রকে আরও মসৃণ ও ছূঁচালো করার উদ্যেশ্যে) প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তারা আবিষ্কার করল তামা এবং অন্যান্য ধাতু। ধাতুর আবির্ভাব আদিম মানুষের উৎপাদনের উপকরণে এবং ধীরে ধীরে তাদের সমগ্র সামাজিক জীবনে আনল বৈপ্লবিক পরিবর্তন। পাথরের হাতিয়ারে পরিমাণগত পরিবর্তন ধীরে ধীরে এক গুণগত উল্লম্ফনের দিকে মোড় নিল। তাদের উৎপাদনের উপকরণে পরিমাণগত পরিবর্তন তাদের চলতি উৎপাদন সম্পর্ককে বড় একটা প্রভাবিত করেনি। কিন্তু উৎপাদন উপকরণে এই গুণগত উল্লম্ফন উৎপাদনের নিরবচ্ছিন্নতা বজায় রাখার স্বার্থে দাবি জানালো নতুন উৎপাদন সম্পর্কের। এই নতুন উৎপাদন উপকরণ জীবনধারণের নতুন নতুন রাস্তা খুলে দিল – কেউ চাষাবাদকে জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করল, কেউ বেছে নিল ধাতুর কাজ ও হস্তশিল্প, কেউ বা শিকার নিয়েই পড়ে রইল। এলো শ্রমের বিভাজন, শুরু হল বিনিময়ের প্রত্যক্ষ রূপ, এবং ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত সম্পত্তির সৃষ্টি হল। এইভাবে গোষ্ঠী মানবের (tribals) জীবনে ধাতুর প্রবেশ তাদের আদিম সামাজিক জীবনকে সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দিল। উৎপাদন বৃদ্ধি পেল, কিছু উদ্বৃত্ত উৎপাদন সম্ভব হল এবং কিছু কিছু উৎপাদনের উপকরণ অতিরিক্ত হয়ে পড়ল। এই অতিরিক্ত উৎপাদন উপকরণকে যথাসম্ভব কাজে লাগাবার জন্য নতুন উৎপাদন সম্পর্কের প্রয়োজন হয়ে পড়ল এবং প্রতিষ্ঠিত হলও। গোষ্ঠীযুদ্ধে পরাজিত বন্দীদের মেরে না ফেলে এখন থেকে তাদের দাস হিসেবে উৎপাদিকা শ্রমে নিয়োগ করা হল। পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পুরনো উৎপাদন সম্পর্ক ভেঙে গিয়ে এইভাবে প্রতিষ্ঠিত হল দাস ব্যবস্থার ভিত্তিতে নতুন সম্পর্ক।
(৪) উৎপাদন উপকরণের বিকাশের প্রক্রিয়ায় নতুন উপকরণ যে সামাজিক পরিবর্তনকে ডেকে আনতে পারে সেকথা মাথায় রেখে মানুষ সচেতনভাবে নতুন উৎপাদন উপকরণ আবিষ্কার করে না। তার আশু প্রয়োজন মেটাতেই মানুষ নতুন উপকরণ আবিষ্কার করে। তাই উৎপাদনের উপকরণের বিকাশকে একটা পর্যায় পর্যন্ত স্বতস্ফূর্ত ও অসচেতন বলা যেতে পারে, কিন্তু এটা একটা পর্যায় পর্যন্তই। পুরনো উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যেই নতুন উৎপাদিকা শক্তি যখন পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হয়, তখনই তাদের প্রতিনিধিত্বকারী নতুন শ্রেণীসমূহের আবিষ্কার ঘটে, এবং এই নতুন শ্রেণীসমূহের সাথে আসে নতুন চিন্তা, নতুন রাজনীতি, নতুন আইন ইত্যাদি। অর্থাৎ এক কথায় নতুন উৎপাদিকা শক্তি প্রতিনিধিত্বকারী নতুন তত্ত্ব আবির্ভূত হয়। তারপর এই নতুন তত্ত্ব নতুন শ্রেণীগুলোকে সমাবেশিত করে এবং সচেতন প্রয়াসের মধ্য দিয়ে তারা পুরনো উৎপাদন সম্পর্কের প্রতিনিধিত্বকারী পুরনো শ্রেণীসমূহকে ক্ষমতাচ্যূত করে। এইখানেই তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এবং এই কারণেই লেনিন বলেছেন, “বিপ্লবী তত্ত্ব ছাড়া বিপ্লবী আন্দোলন হতে পারে না।” মার্কসের ভাষায়, “এই উৎপাদন সম্পর্কগুলি একত্রিত হয়ে সমাজের অর্থনৈতিক বনিয়াদ সৃষ্টি করে, এই বনিয়াদের সঙ্গে নির্দিষ্ট ধরনের সমাজচেতনার সামঞ্জস্য আছে, এবং এই বাস্তব ভিত্তির উপরই আইনগত ও রাজনৈতিক ইমারত গড়ে ওঠে। সামাজিক, রাষ্ট্রিক ও বৌদ্ধিক জীবনধারাকে সাধারণভাবে বাস্তব জীবনের উৎপাদন পদ্ধতিই নিয়ন্ত্রণ করে। মানুষের চেতনা মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে না বরং বিপরীত দিক থেকে মানুষের সামাজিক সত্তাই তার চেতনাকে নিয়ন্ত্রণ করে। বিকাশের একটি বিশিষ্ট স্তরে সমাজের বাস্তব উৎপাদিকা শক্তির সঙ্গে উৎপাদন-ব্যবস্থার পারস্পরিক সম্পর্কগুলির বিরোধ ঘটে, কিংবা ঐ একই ব্যাপারকে আইনের ভাষায় বলতে গেলে, যে সম্পত্তি-সম্পর্কের গণ্ডিতে উৎপাদিকা শক্তি বিকাশলাভ করেছিল তার সঙ্গেই বিরোধ বাধে। উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের বিভিন্ন রূপ থেকে এখন এই সম্পর্কগুলিই সে-শক্তির শৃঙ্খলে পরিণত হয়। তখন আরম্ভ হয় সামাজিক বিপ্লবের যুগ। অর্থনৈতিক বনিয়াদের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র বিরাট ইমারত অল্পাধিক দ্রুত বেগে বদলে যেতে থাকে।” সহজেই দেখা যায় যে উৎপাদন ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক বনিয়াদ পরিবর্তিত হওয়ার পরেও কিছু সময় পর্যন্ত পুরনো উপরিকাঠামো (পুরনো ধ্যান-ধারণা, সংস্কৃতি অভ্যাস) থেকে যায় এবং নতুন উৎপাদন ব্যবস্থার বিকাশে বাধা দেয়। সুতরাং উৎপাদন ব্যবস্থা উপরিকাঠামোকে নির্ধারণ করে এবং এই উপরিকাঠামোও আবার উৎপাদন ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে।
আজকের দুনিয়াতে বৃহৎ বুর্জোয়ারা অনেক কারখানা ও উৎপাদন উপকরণের মালিক এবং মুনাফার উদ্দেশ্যে তারা উৎপাদনকে নিয়ন্ত্রণ করে। যখন তাদের মুনাফা কমতে থাকে তারা কারখানা বন্ধ করে দেয়, হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ে, বিপুল পরিমাণে উৎপাদিকা শক্তির ধ্বংস হয়। উৎপাদিকা শক্তি আজ পুরনো উৎপাদন সম্পর্কের অর্থাৎ পুঁজি আর মজুরিশ্রমের সম্পর্কের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত। এর ফলে বর্তমান যুগ সমাজ বিপ্লবের যুগ। নতুন উৎপাদিকা শক্তির প্রতিনিধি আন্তর্জাতিক সর্বহারা বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হচ্ছে। একমাত্র নতুন উৎপাদন সম্পর্ক অর্থাৎ উৎপাদন উপকরণের ওপরে সাধারণ মালিকানার সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্কই পারে আজ নতুন উৎপাদিকা শক্তির বিকাশকে বাধামুক্ত করতে।
কৃষকরা চায় উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ – নিজের আওতায় এনে আরও বেশি বেশি জমি (জমিদাররা যা অনুৎপাদনকারী বা স্বল্প উৎপাদনকারী করে রেখেছে) চাষ করতে ও কৃষিকে উন্নত করে তুলতে। কিন্তু চলতি উৎপাদন সম্পর্কের সাথে উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ ঘটানোর এই প্রচেষ্টার বিরোধ বাধে। একমাত্র জমিদার ও তাদের স্বার্থরক্ষাকারী রাষ্ট্রকে ধ্বংস করেই তাদের (কৃষকদের) পক্ষে উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ ঘটানো সম্ভব।
অতএব নতুন উৎপাদন উপকরণ নিজেই উৎপাদন সম্পর্ককে পরিবর্তিত করে না। সুনিশ্চিতভাবেই এই নতুন উৎপাদন উপকরণসমূহ পুরনো উৎপাদন সম্পর্কের ভিত্তির ক্ষয় ডেকে আনে, কিন্তু তবুও সমাজ বিপ্লব ছাড়া গুণগত পরিবর্তন আসে না। ধরা যাক পুরনো উৎপাদন সম্পর্কই বজায় আছে এবং ওপর থেকে কিছু মাত্রায় নতুন উৎপাদন উপকরণ ঢুকিয়ে দেওয়া হল – তাহলে কী হবে? নিশ্চিতভাবেই এতে উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ বাধামুক্ত হবে না। পরিবর্তে বরং এতে কিছু নতুন সামাজিক গঠনের জন্ম হবে, পুরনো শ্রেণীগুলিকে নতুন ধাঁচে দেখা যাবে। ভারতবর্ষে 'সবুজ বিপ্লব' এর জ্বলন্ত প্রমাণ।
অধিবিদ্যা কোনো উৎপাদন ব্যবস্থাকে অন্যান্য উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হিসেবে দেখতে অস্বীকার করে, এর ফলে ঐ উৎপাদন ব্যবস্থার কিছু কিছু ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে তা অক্ষম [যেমন, কেন লাগাতার কৃষি উন্নতি ঘটাবার মতো মূলকাঠামোগত সুযোগসুবিধা (Infrastructural Facilities) ভারতের কম ছিল, কেন সাম্রাজ্যবাদী প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রামীণ উন্নতি বা 'সবুজ বিপ্লব' প্রকল্পে টাকা ঢেলেছে, কেন অতিরিক্ত উৎপাদন সত্ত্বেও ভারত আজ গম আমদানি করে ইত্যাদি]। যে গতি সূত্রগুলো কোনো উৎপাদন ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে সেগুলো সম্পর্কে এবং কিভাবে বিভিন্ন ঐতিহাসিক অবস্থায় উৎপাদন উপকরণ বিভিন্নভাবে উৎপাদন সম্পর্কের উপর ক্রিয়া করে এবং এর ফলে কিভাবে শ্রেণীসমূহে ও সামাজিক কাঠামোসমূহে পর্বর্তিন সংঘটিত হয় সে সম্পর্কে অধিবিদ্যা পুরোপুরি অজ্ঞ। অধিবিদ্যাবাগীশরা শ্রেণীসমূহকে বা সামাজিক গঠনসমূহকে এক রকম ছকেবাঁধা প্রস্তুরীভূত জিনিসের মতো করে দেখে। ভাসা ভাসা জ্ঞান নিয়ে আধিবিদ্যক পণ্ডিতেরা গ্রামভারতের জায়গায় জায়গায় গুটিকয়েক ট্রাক্টর দেখেই চেঁচিয়ে ওঠেন : “গ্রাম-ভারতে পুঁজিবাদ বিকাশলাভ করছে।”
বিভিন্ন ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে, বিকাশের রূপ কিভাবে বিভিন্ন রকমের হয় তা আরও ভালোভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য আসুন আমরা পুঁজির বিকাশের উদাহরণটি দেখি :
ভারতবর্ষ ও আমেরিকা আবিষ্কৃত হয়, বিশ্ববাজার জন্মলাভ করে, পণ্যদ্রব্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদার ফলে ব্রিটেন ও ফ্রান্সে পণ্য উৎপাদন দ্রুত বিকাশলাভ করে, ধীর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ছোট কারিগর ( journeymen) ও গিল্ড মালিকরা (guild-masters) পুঁজিপতিতে পরিণত হয়। মার্কসের ভাষায়, এটাই ছিল পুঁজিবাদের বিকাশের প্রকৃত বিপ্লবী পথ।
ব্রিটেন ও ফ্রান্সে পুঁজিবাদ বিকশিত হয়, অনেক দেশ এদের উপনিবেশে পরিণত হয়, পুঁজিবাদী সংকটের (অত্যুৎপাদন) চক্র ইতিমধ্যেই এইসব দেশে শুরু হয়ে যায় এবং ব্যাপকহারে সর্বহারা আন্দোলনেরও সূচনা হয়। এই অবস্থায় জার্মানি ও রাশিয়াতে যে পুঁজির বিকাশ হয় তা স্বৈরতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে ছিল এবং সর্বহারা আন্দোলনকে ভীষণ ভয় করত, ফলে তা খুব ধীরে এবং সতর্কভাবে সামন্ততন্ত্রের ক্ষতিসাধন করতে থাকে এবং নানাভাবে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে একজন প্রত্যক্ষ উৎপাদকের পক্ষে পুঁজিপতিতে পরিণত হওয়াটা ছিল বড়ই কঠিন। বাণিজ্যিক শ্রেণী (ব্যবসায়ী সম্প্রদায়) উৎপাদনের ওপরে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে এবং পুঁজিপতিতে পরিণত হয়। এই পুঁজির চরিত্র হল রক্ষণশীল এবং দীর্ঘদিন ধরে স্বৈরতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের রক্ষণাধীনে তা বিকশিত হয়।
সাম্রাজ্যবাদের প্রাক্কাল পরবর্তীতে সাম্রাজ্যবাদের যুগ – সমগ্র পৃথিবী মুষ্টিমেয় একচেটিয়া বুর্জোয়াদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়ে গেছে। এই একচেটিয়া বুর্জোয়াদের দল প্রচুর পুঁজি জড়ো করল, প্রায় সমস্ত উন্নত প্রযুক্তিবিদ্যা ও পরিচালন দক্ষতার ওপরে কায়েম করল তাদের একচেটিয়া মালিকানা। তাদের পৃথিবীব্যাপী বিক্রয়সংস্থা ছিল এবং কাঁচামালের উৎসগুলির ওপর নিয়ন্ত্রণও ছিল এবং পণ্য-রপ্তানির তুলনায় পুঁজি-রপ্তানি তাদের কাছে ইতিমধ্যেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। এই রকম পরিস্থিতিতে উপনিবেশসমূহে পুঁজি জয়লাভ করল। পুঁজি, প্রযুক্তিবিদ্যা, পরিচালনা, বাজার এবং কাঁচামাল – যাবতীয় ব্যাপারেই এই পুঁজিপতিরা সাম্রাজ্যবাদীদের উপর নির্ভরশীল ছিল। বিদেশী পুঁজির বৃদ্ধি ছিল তার নিজস্ব বিকাশের প্রাথমিক শর্ত। উপনিবেশসমূহের অতিরিক্ত সম্পদ গ্রাস করে নেওয়ার জন্য বিদেশী পুঁজির কাছে আরও একটি মাধ্যম এভাবে তৈরি হল। আজও এই অবস্থা অব্যাহত রয়েছে। এইভাবে উপনিবেশসমূহে যে পুঁজির আবির্ভাব ঘটল, তার চরিত্র হল মর্মবস্তুতে মুৎসুদ্দি (Comprador)।
অধিবিদ্যা বাস্তব ঐতিহাসিক পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্নভাবেই পুঁজির বিকাশকে দেখে। তাই যাঁরা অধিবিদ্যায় ভুগছেন তাঁরা অনেক সময় উপনিবেশের পুঁজিকে ব্রিটিশ ও ফরাসি পুঁজির মতো বিপ্লবী চরিত্র-বিশিষ্ট মনে করেন। তাঁদের মধ্যে অন্য কেউ কেউ আবার রাশিয়া ও জার্মানির পুঁজির সঙ্গে এর তুলনা করেন।
এখানে আমরা তিনটি ঐতিহাসিক পরিবেশে পুঁজির প্রভাবশালী (প্রধান) দিকটি সম্পর্কে আলোচনা করেছি। দ্বন্দ্ববাদ অনুসারে, পুঁজির বিকাশের ক্ষেত্রে এই প্রভাবশালী, প্রধান অংশের পাশাপাশি একটি গৌণ অংশও থাকে।
ইংল্যান্ডে টোরী আর হুইগ, ফ্রান্সে জিরান্দোপন্থী ও জ্যাকোবিনপন্থী, জার্মানি ও রাশিয়াতে রক্ষণশীল ও উদারনৈতিক বুর্জোয়া উপনিবেশসমূহে মুৎসুদ্দি ও জাতীয় বুর্জোয়া -- এরাই হল যথাক্রমে প্রধান ও অপ্রধান অংশের প্রতিনিধি। উভয় ক্ষেত্রেই দ্বিতীয় অংশটি হল ছোট ও মাঝারি বুর্জোয়া। অধিবিদ্যা পুঁজির বৃদ্ধি ও বিকাশের মাত্র একটি দিককেই দেখে, ফলে লাইন, কর্মনীতি, স্লোগান সবকিছুু নির্ধারণেই গুরুতর ভুল করে।
(৫) শ্রেণীবিভক্ত সমাজে, প্রতিটি উৎপাদন ব্যবস্থা ও একটি ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকে। যেমন, প্রাচীন পৃথিবীতে দাস-মালিকদের রোমান সাম্রাজ্য, গ্রীসের সামন্ত সাম্রাজ্য এবং বর্তমান দুনিয়ায় পুঁজির বিশ্ব-সাম্রাজ্যবাদ। প্রত্যেক ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য থাকে, যা উপনিবেশ স্থাপনকারী দেশসমূহের উৎপাদন ব্যবস্থা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। ঔপনিবেশক ব্যবস্থার উৎস হল শোষণভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা -- যার নিজস্ব একটা প্রবণতাই হল নিজের সমাজের এবং সাথে সাথে এই প্রক্রিয়ায় অন্য দেশেরও বেশি বেশি অতিরিক্ত উদ্বৃত্ত গ্রাস করা। বিভিন্ন জাতির অসম বিকাশের ফলে এটা সম্ভবও হয়। ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার সর্বোচ্চ রূপ যুক্ত থাকে পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ রূপ সাম্রাজ্যবাদের সাথে। আজকের দিনের নয়া-উপনিবেশবাদ হল উপনিবেশবাদের সবচেয়ে উন্নত (sophisticated) রূপ। মুষ্টিমেয় কিছু আন্তর্জাতিক একচেটিয়া গোষ্ঠী, কেবলমাত্র পুঁজি, প্রযুক্তিবিদ্যা, পরিচালন দক্ষতা, বাজারের সুবিধা ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাদের ছাড়াই, অভূতপূর্বভাবে পৃথিবীব্যাপী সমস্ত অনুন্নত ও দুর্বল দেশসমূহ থেকে প্রায় সমস্ত উদ্বৃত্ত কেড়ে নিচ্ছে। সারা পৃথিবীর বিশাল উৎপাদিকা শক্তি কেবলমাত্র মুষ্টিমেয় একচেটিয়া কারবারির বিপুল মুনাফা সৃষ্টির কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এই কারবারিরা -- যখনই তাদের বিপুল পুঁজি সংকটের মুখে পড়ে তখনই গোটা পৃথিবীকে ঠেলে দেয় শ্রমশক্তি ও সম্পদেল বিরাট ধ্বংসের মধ্যে। এমনকি বিশ্বযুদ্ধের অগ্নিকুণ্ডের মধ্যেও। এইভাবে বিশ্বজোড়া উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সাম্রাজ্যবাদ। সারা বিশ্বের সমস্ত দেশের অতিরিক্ত (surplus) সম্পদ গ্রাস করার জন্য, সাম্রাজ্যবাদ সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া ও অনুন্নত আধা-সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্কগুলিকে টিকিয়ে রেখেছে। কিন্তু একই সাথে সে তার বিপরীতকেও নিয়ে এসেছে -- তাহল আন্তর্জাতিক সর্বহারা, নিপীড়িত জনগণ ও জাতিসমূহের ঐক্য।
(৬) সমাজের গতিসূত্রগুলিকে তুলে ধরে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ সেই সূত্রের ওপর ভিত্তি করে সমাজগঠনে আমাদের অনুপ্রাণিত করে। যদি নতুন উৎপাদিকা শক্তি এবং পুরনো উৎপাদন সম্পর্কের দ্বন্দ্ব, পরস্পরের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত শ্রেণীসমূহের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এবং নতুন ও পুরনোর দ্বন্দ্বের ফলেই সমাজ বিকশিত হয়, তবে উৎপাদিকা শক্তির বিকাশে কোন উৎপাদন সম্পর্ক আজ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তা দেখতে হবে। সমাজের মধ্যে প্রধান দ্বন্দ্ব খুঁজে বের করবার এটাই হল ঐতিহাসিক বস্তুবাদী পদ্ধতি। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদী উৎপাদন সম্পর্কই নতুন উৎপাদিকা শক্তির বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে বিশ্ব-জনগণের দ্বন্দ্বই প্রধান দ্বন্দ্ব। কিন্তু দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি অনুযায়ী যে কোনো ঐতিহাসিক পর্যায়েই আমাদের বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে একটি একক সত্তা হিসেবে দেখলে চলবে না। তাই নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সঙ্গে বিশ্ব-জনগণের দ্বন্দ্বই আজ প্রধান দ্বন্দ্ব হয়ে উঠেছে।
এই একই পদ্ধতিতে জাতীয় ক্ষেত্রেও প্রধান দ্বন্দ্ব খুঁজে বের করতে হবে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে জনগণের দ্বন্দ্ব প্রধান দ্বন্দ্ব বলে একথা ধরে নেওয়ার কোনো কারণ নেই যে, প্রত্যেক দেশের ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য। এই ধরনের সূত্রায়ণ অধিবিদ্যার পরিচয় দেয়। যখন আমরা বলি যে, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে জনগণের দ্বন্দ্বই প্রধান দ্বন্দ্ব, তখন সেটা বিভিন্ন দেশে বিদ্যমান বিভিন্ন দ্বন্দ্বের সাধারণ রূপ মাত্র। তাই বিভিন্ন দেশে প্রত্যক্ষ সামরিক অনুপ্রবেশ রয়েছে, সেখানে অনুপ্রবেশকারী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি উৎপাদিকা শক্তির বিকাশে সবচেয়ে বড় বাধা। তাই সেখানে সেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সঙ্গে ব্যাপক জনগণের দ্বন্দ্বই প্রধান দ্বন্দ্ব হয়ে ওঠে। কিন্তু যে সমস্ত দেশে প্রত্যক্ষ সামরিক অনুপ্রবেশ নেই, সেখানে দেশের মধ্যকার কোনো উৎপাদন সম্পর্কই উৎপাদিকা শক্তির বিকাশে প্রত্যক্ষ বাধা হিসাবে কাজ করে। সুতরাং সেই উৎপাদন সম্পর্কের সঙ্গে ব্যাপক জনগণের দ্বন্দ্বই প্রধান দ্বন্দ্ব হিসাবে থাকে। তাই যদি একাধিক পুরনো উৎপাদন সম্পর্ক প্রত্যক্ষ বাধা হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে এই দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি প্রয়োগ করেই আমাদের প্রধান বাধা খুঁজে বার করতে হবে। একমাত্র এই প্রধান দ্বন্দ্বের সমাধান করেই সামাজিক বিকাশে উল্লম্ফন ঘটানো যায়।
(৭) আজ পর্যন্ত ইতিহাসে যে কোনো উৎপাদন ব্যবস্থাতেই কোনোরকমে বেঁচে থাকার জন্য পরিশ্রমেই সমাজের অধিকাংশ সদস্যের সমস্ত বা প্রায় সমস্ত সময় ব্যয়িত হয়েছে। সেইজন্য সমগ্র মানবসমাজ প্রকৃতির নিয়মসমূহ অনুধাবন করে তাকে পরিবর্তিত করা এবং তার উপর প্রভুত্ব অর্জন করবার মতো অবস্থায় কখনোই উপনীত হয়নি। কিন্তু অভূতপূর্ব উৎপাদন ক্ষমতার অধিকারী আধুনিক শিল্প আজ আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। যদি আধুনিক শিল্পকে পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে তার প্রচণ্ড উৎপাদন ক্ষমতাকে কাজে লাগানো যায় তাহলে মানবসমাজ স্বল্প সময়েই তার জীবনধারণের উপকরণ সংগ্রহ করতে পারবে এবং দৈনন্দিন জীবনের ঝামেলা থেকে মুক্তি পেয়ে প্রকৃতির প্রভুত্ব অর্জনের পথে দ্রুত এগোতে পারবে। আধুনিক শিল্প এই কাজকে সম্পূর্ণ করার বাস্তব শর্ত তৈরি করেছে। আমাদের সঙ্গে রয়েছে বিকাশের পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়ার ইতিহাস (আদিম সাম্যবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে ভবিষ্যতের উচ্চতর সাম্যবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার বাস্তব ভিত্তি সৃষ্টি পর্যন্ত)। শুধু তাই নয়, যে শ্রেণী আধুনিক ইতিহাসকে পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কের জোয়াল থেকে মুক্ত করতে সক্ষম, সেই সর্বহারাও একটি স্বাধীন শক্তি হিসেবে গত শতাব্দীর মধ্যভাগে মঞ্চে আবির্ভূত হয়েছে। এবং সেই সময় থেকে অক্টোবর বিপ্লব এবং মহান চীন বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সর্বহারা তার লক্ষ্য পূরণের দিকে অনেক দূর এগিয়েও গেছে। যদিও তার অগ্রগতির পথ আঁকাবাঁকা, এই পথে কিছু ধাক্কাও আসতে পারে, তবু প্রয়োজনীয়তার জগত থেকে স্বাধীনতার জগতে তার উত্তরণ অব্যাহত থাকবে।
“প্রয়োজনকে যতটা বোঝা না যায় ততটাই সে অন্ধ। প্রাকৃতিক নিয়মাবলী থেকে কোনো কাল্পনিক মুক্তির মধ্যে স্বাধীনতা নেই, স্বাধীনতা রয়েছে এই নিয়মগুলো বোঝা এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সুনির্দিষ্টভাবে এই নিয়মগুলোকে প্রয়োগ করবার যে সম্ভাবনা এ থেকে জন্ম নেয় তার মধ্যে। প্রাকৃতিক প্রয়োজন সম্পর্কিত জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে এইভাবে আমাদের নিজেদের ওপরে এবং বাহ্যিক প্রকৃতির ওপরে যে নিয়ন্ত্রণ জন্মায় তাতেই রয়েছে স্বাধীনতা। স্বাধীনতা তাই অবশ্যই ঐতিহাসিক বিকাশের ফসল।” দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদের পথ নির্দেশক দর্শনে বলীয়ান সর্বহারা অবশ্যই সাম্যবাদী সমাজ গড়ে তোলার মহান ব্রত সফল করে তুলবে, যে সময়ের কথা ভেবে এঙ্গেলস বলেছিলেন, “একমাত্র এই সময়েই মানুষ শেষপর্যন্ত বাকি প্রাণীজগত থেকে নিজেকে এক অর্থে আলাদ করে নেয় এবং অস্তিত্বের জান্তব অবস্থা থেকে যথার্থ মানবিক অবস্থায় উত্তীর্ণ হয়। ... ... যে সমস্ত বাহ্যিক বস্তুগত শক্তি এতদিন পর্যন্ত ইতিহাসের ওপর প্রভুত্ব করেছে তারা এবার মানুষের নিজের নিয়ন্ত্রণে আসতে থাকে। একমাত্র এই সময় থেকেই মানুষ সম্পূর্ণ সচেতনভাবে নিজের ইতিহাস রচনা করবে ... ... এটাই হবে প্রয়োজনীয়তার জগত থেকে স্বাধীনতার জগতে মানবসমাজের উল্লম্ফন।”
এখানে আমরা ঐতিহাসিক বস্তুবাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছি। এ থেকে সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা আমরা পাই তাহল অর্থনীতির ভিত্তির ওপরেই সমগ্র সামাজিক সৌধ নির্মিত হয়। তাই আমাদের পরবর্তী পুস্তিকায় আমরা অর্থনীতি প্রসঙ্গে আলোচনা করব।
মার্কসীয় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দর্শনের দুটি বিশেষ দিক রয়েছে। একটি হল এর শ্রেণীচরিত্র – এই দর্শন প্রকাশ্যেই ঘোষণা করে যে তা সর্বহারার সেবায় নিয়োজিত। দ্বিতীয়টি হল এর বাস্তবমুখিতা। এই দর্শন এ বিষয়ে জোর দেয় যে তত্ত্ব অনুশীলনের ওপর নির্ভরশীল, অনুশীলনকে ভিত্তি করেই তা গড়ে ওঠে, আবার অনুশীলনেরই সেবা করে।
সর্বহারা এমন একটি শ্রেণী যার কোনো বক্তিগত সম্পত্তি নেই। শৃঙ্খল ছাড়া তার হারাবার কিছুই নেই, অন্যদিকে জয় করবার জন্য তার সামনে আছে গোটা পৃথিবী। তাই ক্ষুদে উৎপাদকদের সংকীর্ণ গোষ্ঠীগত মানসিকতা থেকে তা মুক্ত এবং কোনো বস্তুকে দেখার ক্ষেত্রে একমাত্র তারই এক নিরপেক্ষ, সংস্কারমুক্ত ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মনোভাব থাকা সম্ভব। যেহেতু সর্বহারা একটি পুরোপুরি বিপ্লবী শ্রেণী যার লক্ষ্য সমগ্র মানবজাতির মুক্তি, সেহেতু সর্বহারাই পারে মানবিক চিন্তার সর্বাঙ্গীণ বিপ্লবী পদ্ধতি -- দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদকে কাজে লাগাতে। নিজেদের গোষ্ঠীগত উদ্দেশ্য চরিতার্থ করবার জন্য অন্য কোনো শ্রেণীই এই বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গী ব্যবহার করতে পারে না। আজ পর্যন্ত মানবজাতির যা কিছু ভালো জিনিস বা বিকাশমান চমৎকার ঐতিহ্য – সর্বহারা এই দর্শনের অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করবে এবং আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে। সমস্ত বস্তু, শক্তি, সংগঠন ও ব্যক্তিকেই – তাদের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক ও দ্বন্দ্বের সমাবেশে এবং বিকাশের প্রক্রিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে দেখে। সর্বহারার মনের প্রসারতা ও ক্ষুদে উৎপাদকের গোষ্ঠীগত সংকীর্ণতার মধ্যে পার্থক্যের এটাই হল দার্শনিক ভিত্তি।
দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ কোনো স্বপ্নবিলাসকে প্রশ্রয় দেয় না বরং বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ দাবি করে। কোনো পরিবর্তন আনতে গিয়ে হতাশাগ্রস্ত বা হঠকারী কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করা থেকে সর্বহারাকে এই দর্শন রক্ষা করে। আত্মমুখীনতার নির্মম শত্রু হল এই দর্শন এবং তা সর্বহারা ও জনগণকে যেমন ভবিষ্যতে আস্থা রাখতে শেখায় তেমনি তাদেরকে বিকাশের যে কোনো নির্দিষ্ট পর্যায়ে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে সঠিক রণনীতি, কর্মনীতি ও কৌশল সূত্রবদ্ধ করতে ও ধাপে ধাপে বিজয়ের দিকে এগিয়ে যেতে শিক্ষা দেয়। মার্কস বলেছিলেন, “আজ পর্যন্ত দার্শনিকেরা পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করেছেন কিন্তু আসল ব্যাপার হল তাকে পরিবর্তন করা।” মার্কসীয় দর্শন, দর্শনকে 'দার্শনিকদের' মৃত বইয়ের মধ্যে বন্দিদশা থেকে বের করে এনে, তার রহস্যের আবরণটাকে ভেঙ্গে দিয়ে ব্যাপক জনগণের হাতে পরিবর্তনের এই অস্ত্রই তুলে দিয়েছে।
এই অস্ত্র হাতে নিয়ে আমরা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারি যে পৃথিবীতে আজকের গোলযোগ পুরনো ব্যবস্থার ভাঙ্গন ও নতুনের সৃষ্টি -- এই প্রক্রিয়ারই ফল, বুঝতে পারি এই ভাঙ্গনের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে শান্তি প্রগতি ও স্থায়িত্বের নতুন যুগ আনার কাজে বিপ্লবী অগ্রবাহিনীর কী ভূমিকা।
আমরা এর আগেই দেখেছি যে দর্শনশাস্ত্রের উদ্ভব এবং বিকাশ অগ্রগতি এবং অচল অবস্থা এই সবকিছুই নির্ভর করে সমাজের উৎপাদিকা শক্তির ক্রমবিকাশের উপর; উৎপাদন সংগ্রাম, শ্রেণীসংগ্রাম এবং বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্রমবিকাশের উপর। ভারতীয় সমাজ আদিম সাম্যবাদী ব্যবস্থা ও দাসব্যবস্থার যুগ পেরিয়ে এসেছে এবং সামন্ত সমাজে উপনীত হওয়ার পর অচলাবস্থার সম্মুখীন হয়। ঐ একই সামাজিক কাঠামো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি আসার আগে পর্যন্ত অটুট থেকে গিয়েছিল। এইভাবে আমাদের প্রাচীন সমাজ দুটি উত্তরণ পর্বের মধ্যে দিয়ে গেছে -- প্রথমটি হল আদিম সাম্যবাদী ব্যবস্থা থেকে দাসব্যবস্থার যুগে এবং দ্বিতীয়টি হল দাসব্যবস্থা থেকে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার যুগে। এই দুটি উত্তরণ পর্বে নতুন নতুন উৎপাদিকা শক্তি ও বিজ্ঞানের উন্নতি কয়েকটি দার্শনিক চিন্তাধারার জন্ম দিয়েছিল। এগুলির মধ্যে আমরা এমন কিছু মৌলিক প্রশ্নের ওপর বিতর্ক দেখতে পাই যেগুলি গ্রীক দর্শনেও দেখা গিয়েছিল। তবুও ভারতীয় সমাজব্যবস্থার রূপান্তরের নির্দিষ্ট ধারা তাতে কিছু বৈশিষ্ট্যও যোগ করেছিল।
নতুন উৎপাদিকা শক্তিগুলি অচলাবস্থায় উপনীত হওয়ার পরেও দর্শনের বিভিন্ন ধারাগুলির মধ্যে সংগ্রাম চলতেই থাকল। কিন্তু যে বস্তুগত ভিত্তি পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করতে পারত তার অভাবে এই সংগ্রাম বাস্তব জগত থেকে ক্রমশই দূরে সরে গেল। আর শেষপর্যন্ত “ব্রহ্ম সত্য জগত মিথ্যা” -- বলে দুনিয়াটাকেই অস্বীকার করে বসল। এর পরে অনেক আঁকা-বাঁকা পথ, এক কৌতুহলোদ্দীপক পথ পেরিয়ে এসে দর্শন তার আপন গতিকেই রুদ্ধ করে দিল। ১০০০ খ্রিঃ পূঃ থেকে ১০০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতীয় দর্শনের গতি এই প্রশ্নগুলি থেকেই এসেছে : “তখন সদ বা অসদ কিংবা আকাশ বা তার থেকে দূরবর্তী মহাকাশ (ব্যোম)-- কিছুই ছিল না। তাহলে কে তাদের ঘিরে রেখেছিল? এবং কোথায়? কে তাদের রক্ষাকর্তা ছিল? তা কি ছিল অগাধ জলরাশি?” (ঋকবেদ, নাসদিয়া সুক্ত ১০/১২৯) – এই থেকে শুরু করে শঙ্করাচার্যের “ব্রহ্ম সত্য জগত মিথ্যা” এই উক্তি পর্যন্ত (শঙ্করাচার্য, ৭৮৫-৮২০ খ্রিস্টাব্দ) বস্তু ও চেতনার মধ্যে কোনটি আদি এবং এদের মধ্যেকার পারস্পরিক সম্পর্ক কী -- এই প্রশ্নে সেই সময়ে ভারতীয় দার্শনিকদের বিতর্কের মধ্যেই সমস্ত অাধুনিক দার্শনিক ধারার বীজগুলি স্পষ্ট দেখা যায়।
পরে পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের যুগে এই দার্শনিক প্রশ্নগুলি অাবার মাথাচাড়া দিয়েছিল, কিন্তু নতুন উৎপাদিকা শক্তিগুলি যে বস্তুগত ভিত্তি সৃষ্টি করে তার অভাবের দরুণ দর্শনের আধুনিক যুগে প্রবেশের দরজা ছিল বন্ধ। আরবীয়দের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য (বিশেষ করে আরবীয় জ্ঞান, বিজ্ঞান ও ইসলাম), কৃষক বিদ্রোহগুলি এবং কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রশক্তির অভাব ভারতবাসীর মনকে প্রভূত পরিমাণে প্রভাবিত করেছিল, এর ফলে বিভিন্ন নতুন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ও চর্চার উদ্ভব ঘটে। ব্রিটিশ শাসনের সময় পশ্চিমী দর্শনের প্রভাব, সারা দেশে জাতীয় চেতনার জাগরণ, আধুনিক শিল্পের পত্তন ও সর্বহারা শ্রেণীর উদ্ভব, দেশব্যাপী প্রচণ্ড বৈপ্লবিক অভ্যুত্থান এবং মহান অক্টোবর বিপ্লবের ফলে ভারতের বুকে মার্কসবাদ লেনিনবাদের প্রবেশ ভারতীয় দর্শনে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করল।
*** *** *** *** *** *** *** *** *** *** *** *** *** ***
সমগ্র ভারতীয় দর্শনকে মোটামুটি দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। (১) বৈদিক, (২) অবৈদিক। আবার বৈদিক দর্শনের (যে শাখাগুলি বেদকে ভিত্তি করে আছে) মধ্যে ছয়টি ধারা আছে, (ক) মীমাংসা (আদি), (খ) বেদান্ত (উপনিষদ বা উত্তর মীমাংসা), (গ) ন্যায়, (ঘ) বৈশেষিক, (ঙ) যোগ এবং (চ) সাংখ্য। অবৈদিক দর্শনকেও মোটামুটি তিনভাগে ভাগ করা যায়, (ক) লোকায়ত বা চার্বাকীয় বস্তুবাদের ধারা, (খ) জৈনীয় নিরীশ্বরবাদ (বহুত্ববাদ) এবং (গ) বৌদ্ধ দর্শন ভৌত – অনাত্মাবাদী অনিত্যবাদী অভৌতিকবাদ। বৈদিক দর্শনের এই ছয় এবং অবৈদিক দর্শনের এই তিন ধারার মধ্যে আমরা দ্বন্দ্বতত্ত্ব বস্তুবাদের বীজ বিক্ষিপ্ত অবস্থায় দেখতে পাই।
ভারতীয় দর্শন অধ্যয়নে একটি বিরাট বাধা হল লিখিত ইতিহাসের অভাব ও লিখিত উপাদানের অভাব। বৈদিক, লোকায়ত বা বৌদ্ধ যাই হেকা না কেন, সমস্ত দর্শনেই সামগ্রিক বিষয়বস্তুগুলি মুখস্ত করা হত ও এইভাবে বংশ পরম্পরায় বহন করা হত এবং এগুলি লিখিত হতে শুরু করে বহু পরে। উপরন্তু বিভিন্ন সম্প্রদায় বিভিন্নভাবে এগুলি লেখার ফলে বহু বিভ্রান্তির সুযোগও থেকে গেছে। স্পষ্টতই আদি ভাষ্যগুলি আলাদা করা এবং ঐতিহাসিক পর্ব ধরে সেগুলি সাজানো একটি জটিল ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য আধুনিককালে দর্শনের পণ্ডিতেরা এই বিষয়ের উপর কিছু মূল্যবান কাজ করেছেন। তথাপি ভারতীয় দর্শনের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন আজও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
১। মীমাংসা : মীমাংসা হল বেদভিত্তিক (ঋকবেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ, অথর্ববেদ)। ম্যাক্সমুলারের মতে ১২০০ খ্রিঃ পূঃ থেকে ৬০০ খ্রিঃ পূঃ পর্যন্ত এগুলি ক্রমে ক্রমে ছন্দোবদ্ধ করা হয়েছিল। আর রাধাকৃষ্ণাণের মতে এগুলির রচনাকাল হল খ্রিঃ পূঃ ১৫০০ থেকে খ্রিঃ পূঃ ৬০০ পর্যন্ত। কিন্তু মীমাংসার সূত্রকার (প্রায় ৩০০০ সূত্র) জৈমিনীর সময়কাল ধরা হয় খ্রিঃ পূঃ ২০০ থেকে ২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কোনো এক সময়। প্রাথমিক বৈদিক মন্ত্রগুলি রচনা করা হয় যখন আর্য গোষ্ঠীগুলি পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার (paternal system) মধ্যে ছিল এবং শ্রেণী বিভক্ত সমাজে এর উত্তরণ ঘটতে শুরু করেছিল। কিন্তু তখনও পর্যন্ত পুরোপুরিভাবে দাস ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সুতরাং তাদের অবলুপ্ত প্রায় যৌথ-জীবন এবং পূর্বপুরুষদের বন্দনা এই রচনাগুলির বিষয়বস্তু ছিল। স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাদের সামনে আত্মার অস্তিত্বের প্রশ্নটি দেখা দিল। উৎপাদন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তারা ইতিমধ্যেই জল, আগুন, বাতাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক শক্তিগুলির অসীম গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিল। তাই তারা পূর্বপুরুষদের আত্মাকে তৃপ্ত করার জন্য এবং প্রাকৃতিক শক্তিগুলিকে বশে আনার জন্য মন্ত্র ও বন্দনাগানগুলি রচনা করল। তাদের ধারণাগুলি তখনও পর্যন্ত বাস্তব জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। বরং তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলির (যজ্ঞ, পূজা, বন্দনা-গান, ডাকিনী-বিদ্যা) মূল উদ্দেশ্য ছিল তাদের জীবনধারণের অবস্থাকে উন্নত করা। কিন্তু সামাজিক অবস্থার ক্রমবিকাশ এই আদিম বস্তুবাদী ধারণাগুলিকে হটিয়ে দিল। তাই তাদের সমগ্র রচনাগুলির মধ্যে ভাববাদী প্রাথমিক ধারণাগুলির সাথে সাথে ছড়ানো ছিটানো ভাবে আদিম বস্তুবাদী ধারণাগুলির চিহ্নও দেখা যায়। সেইজন্য শ্রেণীবিভক্ত সমাজের পরবর্তী বিকাশের পর বেদের মধ্যকার পরস্পর বিরোধী দিকগুলি দুটো ভাগে ভাগ হয়ে যায়। একদিকে এই রচনাগুলি উপনিষদ নির্ভর বেদান্তের অতীন্দ্রিয়বাদের ভিত্তি গড়ে তোলে, যা হল বৈদিক ভাববাদের চরম বিকাশ; অপরদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বস্তুবাদের দিকগুলি বিকশিত হয়ে অবশেষে সাংখ্যের বস্তুবাদী রচনাগুলির মধ্যে স্থান নেয়। এই সাংখ্যের রচয়িতা কপিল (৪০০ খ্রিঃ পূঃ)।
জৈমিনী যখন মীমাংসা সূত্রগুলি ছন্দোবদ্ধ করেন, তখন ইতিমধ্যেই আর্য সমাজ চারটি বর্ণে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, নতুন উৎপাদিকা শক্তিগুলির বিকাশ ঘটেছে এবং শ্রেণী শোষণ নির্মম রূপ নিয়েছে। জৈমিনীর কাছে বেদের বাণীগুলি ছিল শ্বাশত ও স্বয়ম্ভু। তিনি বৈদিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলির উৎসাহী সমর্থক ছিলেন। তিনি ছিলেন নাস্তিক এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয় এমন কোনো অতি প্রাকৃত বা অতীন্দ্রিয় শক্তির উপর তাঁর কোনো বিশ্বাস ছিল না; এবং এই ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন বস্তুবাদী। কিন্তু বৈদিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলির প্রতি তাঁর ভক্তি এগুলিকে ও বৈদিক বাণীগুলিকে অত্যন্ত বাড়িয়ে দেখায়; আর এগুলিকে তাঁর শিষ্যরাও অদৃশ্য শক্তির সৃষ্টিকর্তা হিসাবেই দেখত। এইভাবে তিনি নিজেই তাঁর বস্তুবাদকে নাকচ করেছিলেন। যে পরিবেশে জৈমিনী তাঁর সূত্রগুলি রচনা করেছিলেন, সেই ঐতিহাসিক পরিবেশের প্রভাব থেকে তিনি নিজে মুক্ত হতে পারেননি। তাই তিনি বৈদিক ধর্মানুষ্ঠানে অংশগ্রহণের অধিকার থেকে শূদ্রদের বঞ্চিত করেন। আবার যখন নতুন উৎপাদিকা শক্তির বিকাশে অগ্রগতির নতুন দিগন্ত খুলে গেল, তখন পুরনো রূপে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পুনরাবৃত্তি হয়ে দাঁড়াল উৎপাদিকা শক্তি এবং সামাজিক সম্পদের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয় (যেমন যজ্ঞে বিপুল পরিমাণ আহুতি দেওয়া)। তাই বৈদিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে বেদের অতীন্দ্রিয়বাদকে উপনিষদীয় ভাববাদে বিকাশ ঘটানোর প্রচেষ্টাকে বিরোধিতা করে জৈমিনী ও তাঁর অনুগামীরা তাঁদের মধ্যে সমস্ত বস্তুবাদী দিক থাকা সত্ত্বেও বেদান্ত ভাববাদীদের চেয়েও সমাজে বেশি প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকা নিয়েছিলেন।
মীমাংসা সূত্রের প্রধান ভাষ্যকারেরা হলেন সবর স্বামী (৪০০ খ্রিস্টাব্দ), কুমারিল ভট্ট (৫৫০ খ্রিস্টাব্দ) এবং প্রভাকর (কুমারিলের শিষ্য)।
২। বেদান্ত : (৭০০ খ্রিঃ পূঃ -- ১০০ খ্রিঃ পূঃ) যদিও বেদান্তের বেদগুলির শেষাংশ বা উপনিষদ প্রথম দিকের রচয়িতারা বাস্তব জীবন থেকে ও বৈদিক ধর্মীয় অভ্যাসগুলি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিলেন না, তথাপি বেদান্তের মূল দর্শন হল ভাববাদ। দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে শুধুমাত্র দুটি প্রধান উপনিষদ ছন্দোগ্য (৭০০ খ্রিঃ পূঃ) ও বৃহদারণ্যক (৬০০ খ্রিঃ পূঃ) হল বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং এগুলি বুদ্ধের আগেই ছন্দোবদ্ধ করা হয়েছিল। উপনিষদের প্রধান দার্শনিকরা হলেন প্রবাহণ জৈবালী (৭০০ খ্রিঃ পূর্ব – ৬৫০ খ্রিঃ পূর্ব), গৌতম বা উদ্দালক আরুণী (৬৫০ খ্রিঃ পূর্ব), যাজ্ঞবল্ক্য (৬৫০ খ্রিঃ পূর্ব), সত্যকাম জাবাল (৬৫০ খ্রিঃ পূর্ব) প্রভৃতি। এই ভাববাদের বাস্তব ভিত্তি ছিল দাস ব্যবস্থা এবং প্রকৃত শ্রম থেকে বিচ্ছিন্ন একটি শ্রেণী, যারা “বিশুদ্ধ চিন্তায়” ভালোরকম এগিয়ে গিয়েছিল। অতএব এই ভাববাদের শ্রেণীভিত্তি ছিল দাস মালিকেরা। এই কারণেই উপনিষদে ক্ষত্রিয়ের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা আমরা দেখতে পাই।
যাই হোক না কেন এই ভাববাদের মধ্যে অনেকগুলি ধারা ছিল যেগুলিকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায় – (১) অদ্বৈত্যবাদী -- যারা সর্বশক্তিমান ব্রহ্ম ছাড়া আর অন্য কিছুর অস্তিত্ব স্বীকার করত না; (২) দ্বৈতবাদী -- যারা ব্রহ্মই আদি, একথা স্বীকার করা সত্ত্বেও, বাস্তব জগতের অস্তিত্বও স্বীকার করত। দ্বিতীয় ধারার অন্যতম প্রধান প্রবক্তা ছিলেন রামানুজ।
ততক্ষণে ইতিমধ্যেই সমাজে শ্রেণী বিভাজন তীব্র হয়েছে। সেই জন্য তারা পুনর্জন্মের তত্ত্ব আবিষ্কার করল এবং শূদ্রদের শেয়াল কুকুরের পর্যায়ে নামিয়ে দিল। এইভাবে উপনিষদের ভাববাদ শ্রেণী-শোষণের সবচেয়ে জঘন্য মতাদর্শগত হাতিয়ার হিসাবে কাজ করেছিল।
উপনিষদের ভাববাদ তার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছাল শংকরাচার্যের সময় যখন সমগ্র বাস্তব জগতকে মায়া বলে ঘোষণা করা হল।
৩। ন্যায় : গৌতমকে ন্যায় সূত্রের রচয়িতা হিসাবে মনে করা হয়। দর্শন শাস্ত্রের উদ্ভব ও এর বিভিন্ন ধারার মধ্যকার সংগ্রাম এবং এর থেকে উদ্ভূত দার্শনিক বিতর্কগুলি তর্কশাস্ত্র নামে জ্ঞানের এক নতুন শাখার জন্ম দেয় – যার বিষয়বস্তু হল আলোচনার পদ্ধতি। ভারতবর্ষে জ্ঞানের একটি স্বাধীন শাখা হিসাবে তর্কশাস্ত্রের সূচনা হয়েছে গৌতমের রচনা 'ন্যায় সূত্রের' সাথে সাথে। গৌতম মনোজগত থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন এক বাস্তব জগতের অস্তিত্ব স্বীকার করেন এবং এই ক্ষেত্রে তিনি বৈশেষিকদের কাছাকাছি। কিন্তু গৌতমের রচনার কেন্দ্রীয় বিষয় হল জ্ঞানতত্ত্ব যাতে বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির ছাপ আছে। তাঁর মতে কোনো বস্তু সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে হলে পাঁচটি বিষয় একান্ত প্রয়োজন। (ক) বস্তু, (খ) বাহ্যিক যন্ত্র, (গ) ইন্দ্রিয়, (ঘ) মন এবং (ঙ) জ্ঞান আহরণে ইচ্ছুক ব্যক্তি।
৪। বৈশেষিক : এই দার্শনিক ধারার প্রতিষ্ঠাতা হলেন কনাদ। চেতনা থেকে স্বাধীন এক বাস্তব জগতের অস্তিত্বকে তিনি স্বীকার করেন এবং অণুকে বিশ্বজগতের প্রাথমিক কণা হিসাবে মনে করেন। তাঁর মতে বিশ্বে নয়টি মৌলিক উপাদান আছে মাটি, বাতাস, আগুন, জল, মহাকাশ, সময়, আয়তন, আত্মা ও মন। অণু হল শাশ্বত ও অবিনশ্বর। প্রত্যেকটি বস্তু কিছু সাধারণ উপাদান এবং একই সাথে কিছু বিশেষ উপাদান নিয়ে গঠিত যা এক বস্তু থেকে অপর বস্তুকে পৃথক করে। বস্তুর এই বিশেষীকরণের ধারণার জন্য তাঁর দর্শনকে বলা হয় বৈশেষিক (particularist)। যে কোনো প্রতিক্রিয়াকে তিনি বস্তুর মধ্যে অবস্থিত অন্তর্নিহিত কারণগুলির ফল হিসাবে মনে করেন, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে অদৃশ্য কারণের অস্তিত্বও তিনি স্বীকার করেন।
স্পষ্টত বৈশেষিক হল তৎকালীন বাস্তব অবস্থার দ্বারা সীমাবদ্ধ এক বস্তুবাদী দর্শন। এই সীমাবদ্ধতার জন্যই মৌলিক উপাদানগুলির মধ্যে কিছু অ-পদার্থকে (যেমন আত্মা) তিনি যুক্ত করেন। একইভাবে কিছু ক্ষেত্রে কিছু অদৃশ্য কারণের অস্তিত্বকে তিনি স্বীকার করেন। এই দুর্বলতার জন্য তিনি তাঁর বস্তুবাদী পদ্ধতির ভাববাদী বিকৃতি ঘটানোর পথ করে দেন।
৫। যোগ : শারীরিক ও মানসিক নিয়মানুবর্তিতার মাধ্যমে কামনাকে দমন করার মারফৎ আত্মার উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে বহির্জগত থেকে আত্মাকে বিচ্ছিন্ন করার মারফৎ সর্বোচ্চ স্বর্গসুখের অবস্থান অর্জন করার লক্ষ্যেই মূলত পাতঞ্জলির যোগসূত্র রচনা হয়েছে। এটা মনে রাখা দরকার যে এই সময় পর্যন্ত উৎপাদিকা শক্তির এতদূর বিকাশ ঘটেনি যেখানে দার্শনিকরা সমগ্র সমাজের পটভূমিতে চিন্তা করতে পারতেন; সেইজন্য তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে সর্বোচ্চ সুখ অর্জনের পথ অনুসন্ধান করতেন। যোগ হচ্ছে এই অনুসন্ধানেরই একটা অংশ। নাস্তিকদের কাছে যোগ নিজেই ছিল লক্ষ্য। ভাববাদীদের কাছে যোগ হচ্ছে একটা মাধ্যম যার সাহায্যে ব্রহ্মের সাথে একত্ব অনুভব করা যায় এবং এক হওয়ার এই অবস্থাই হল সর্বোচ্চ সুখের অবস্থা। এইভাবে এর প্রথম ধারাটি বস্তুবাদের এক চরম নিষ্ক্রিয় রূপকে দেখিয়ে দেয়। এটা হল পলায়নবাদী বস্তুবাদ। আর দ্বিতীয় ধারাটিও হল ভাববাদের এক চূড়ান্ত পলায়নবাদী রূপ। স্বাস্থ্য-বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে যোগের কিছু ইতিবাচক দিক থাকতে পারে, কিন্তু দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা নিছক পলায়নবাদ।
৬। সাংখ্য : বৈদিক ধারার অন্তর্গত উপনিষদের ভাববাদের সম্পূর্ণ বিপরীত এক বস্তুবাদী ধারণা -- সাংখ্যের রচয়িতা হলেন কপিল। সাংখ্যের মধ্যে ঈশ্বর বা ব্রহ্মর কোনো স্থান নেই, বস্তু নিজেই হল মৌলিক উপাদান, তবুও বস্তু ও চেতনার মধ্যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ককে কপিল ধরতে পারেননি। তাই তিনি একটি গৌণ ও নিষ্ক্রিয় উপাদান হিসাবেই চেতনার স্বাধীন অস্তিত্বকে স্বীকার করে নিয়েছিলেন।
অন্যান্য বস্তুবাদী দার্শনিকদের মধ্যে উপনিষদে সযুগ্যা রৈক্য (Sayugba Raikya) নামে এক দার্শনিকের উল্লেখ আছে যিনি বাতাসকে মৌলিক উপাদান হিসাবে মনে করতেন। প্রাক বৌদ্ধ যুগের দার্শনিকদের মধ্যে অজিত কেশ কম্বলের নাম উল্লেখযোগ্য যিনি মাটি, জল, আগুন ও বাতাসকে মৌলিক উপাদান বলে মনে করতেন।
বৈদিক দর্শনের ধারাগুলিতে আর্যদের সামাজিক জীবন অর্থাৎ শ্রেণীবিভক্ত সমাজ প্রতিফলিত হয়েছে।
৭। লোকায়ত : অবৈদিক দার্শনিক ধারাগুলির মধ্যে চার্বাকের বস্তুবাদী ধারা হল সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রাচীন। এই ধারাকে “লোকায়ত”ও বলা হয়। লোকায়ত নামটার মধ্যেই এর জনপ্রিয় রূপটি চোখে পড়ে। এই দর্শনের সমস্ত লিখিত উপাদানগুলি ধ্বংস হয়ে গেছে। তাই কেবলমাত্র বিরোধীপক্ষের লেখার মধ্যেই আমরা দর্শনের এই ধারা সম্পর্কে জানতে পারি।
লোকায়তের মতে,
(১) মাটি (পৃথিবী), জল, আগুন ও বাতাস এই চারটি মৌলিক উপাদান আছে।
(২) বিভিন্ন পরিমাণে এই চারটি উপাদানের মিশ্রণের মধ্য দিয়ে জগতের যাবতীয় বস্তুর এমনকি চেতনারও সৃষ্টি হয়েছে। যখন পান, সুপারি ও চুন মেশানো হয় আমরা লাল রং পাই, যদিও তিনটির মধ্যে কারোরই রং লাল নয়। একইভাবে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে মাটি, আগুন, জল এবং বাতাসের মিশ্রণ চেতনার সৃষ্টি করেছে। যদিও এগুলির কারোরই চেতনা নেই।
(৩) ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলি বুদ্ধিহীন এবং দুর্বল লোকেদের প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।
(৪) স্বর্গ, নরক, পুনর্জন্ম প্রভৃতি সমস্তই হল মিথ্যা।
(৫) লোকায়ত শুধুমাত্র সেই বস্তুগুলিরই অস্তিত্বকে স্বীকার করত যেগুলি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য। জ্ঞানের একমাত্র উৎসই হল ইন্দ্রিয় অনুভূতি। জ্ঞান অর্জনের জন্য অনুমান এবং সাক্ষ্য প্রমাণের (testimony) উপরই নির্ভর করা যায় না।
মনে হয়, প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণীগুলি এই দর্শনের বদনাম করার জন্য এর বিরুদ্ধে কুৎসা প্রচার করেছিল এবং “যাবৎ জীবেৎ সুখম জীবেৎ, ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ”-- এই ধরনের নিছক সুখসর্বস্ব দর্শন হিসাবে চিত্রিত করেছিল। যাই হোক “ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হওয়াটাই অস্তিত্বের একমাত্র প্রমাণ” এটা ঘোষণা করে লোকায়ত দর্শনও জ্ঞানের পরিধিকে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে।
ভারতীয় ইতিহাসে খ্রিঃ পূর্ব ষষ্ঠ দশক হল একটি নতুন মোড় নেওয়ার কাল। উত্তর-পশ্চিম ভারতে বসবাসকারী আর্যদের মধ্যে দাস এবং বর্ণ ব্যবস্থা প্রায় পুরোপুরি চালু হয়েছিল, কিন্তু পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতে অনার্য জাতিরা তখনও পর্যন্ত গোষ্ঠী হিসাবে এবং 'গণ' (গোষ্ঠী-প্রজাতন্ত্র) ব্যবস্থায় বাস করত। এমনকি পূর্বভারতে নতুন প্রতিষ্ঠিত আর্য উপনিবেশগুলিতেও তখনও পর্যন্ত পিতৃতান্ত্রিক গোষ্ঠী-ব্যবস্থা চালু ছিল অথবা দাস ব্যবস্থা সবেমাত্র শুরু হয়েছে। বর্ণ ব্যবস্থার কড়াকড়ি তখনও পর্যন্ত আসেনি। ইতিমধ্যে লোহার ব্যাপক ব্যবহার, রাজগীরের আশেপাশে পাহাড়গুলিতে ব্যাপক পরিমাণে খনিজ লোহার সন্ধান পাওয়া, গঙ্গা দিয়ে নৌ-চালন, বাণিজ্যের বিকাশ প্রভৃতি উৎপাদিকা শক্তিগুলির বিকাশের পথ খুলে দেয় এবং সামন্ত ব্যবস্থার ভিত্তি প্রস্তুত করে। পূর্ব ভারতে এই গাঙ্গেয় উপত্যকা নতুন উৎপাদিকা শক্তিগুলির বিকাশের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়। সেইজন্য এটি নতুন দার্শনিক ধারার উৎপত্তি স্থলও হয়ে ওঠে। যেখানে বেদ ও উপনিষদের উৎপত্তি হয়েছিল সেই কুরুপাঞ্চাল আর দর্শনশাস্ত্রের কেন্দ্র হিসাবে থাকল না। এই বিকাশের রাজনৈতিক রূপ দেখা যায় মগধের মতো নতুন রাজ্যগুলিতে। এই রাজ্যগুলির শাসকরা চিরাচরিত ক্ষত্রিয় থেকে নয়, বরং শিশুনাগ, নন্দ রাজবংশের মতো নীচু বর্ণ থেকে এমনকি শূদ্র থেকে এসেছে। এই বাস্তব পরিস্থিতিতে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের উদ্ভব ঘটে এই ধর্ম অখ্যাত নাস্তিক দার্শনিকদের অনেক ধারণাকে গ্রহণ করে।
৮। মহাবীর বর্ধমান : মহাবীর বর্ধমান (৫৯৬ খ্রিঃ পূর্ব – ৪৮৫ খ্রিঃ পূর্ব) ছিলেন জৈনদের চতুর্বিংশ এবং শেষ তীর্থঙ্কর (সম্প্রদায়ের ধর্মীয় প্রধান)। তিনি ছিলেন নাস্তিক এবং বেদ ও বৈদিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলির বিরোধী। তবে তিনি আত্মার অস্তিত্বকে স্বীকার করতেন। তাঁর মতে, দুটি মাত্র মৌলিক উপাদান আছে চেতন পদার্থ, অচেতন পদার্থ। এই দুটিকে সৃষ্টি করা যায় না -- এগুলি হল শাশ্বত।
স্বাধীন অস্তিত্ব থাকলেও এই দুটি পারস্পরিক সম্পর্ক যুক্ত। জৈন ধর্মের মতে এই দুটির মধ্যে চেতন (জীবন্ত) প্রধানস্থান দখল করে আছে। মহাবীরের মতে জ্ঞান হচ্ছে আপেক্ষিক এবং জ্ঞানতত্ত্বের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ জ্ঞান ছাড়াও তিনি ধারণা ও সাক্ষাৎ প্রমাণকে অনুমোদন করেছিলেন। “আমাদের জ্ঞান একটি দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক হতে পারে, আবার অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে ভুল হতে পারে। একটা বস্তু আছে আবার নেইও।” মহাবীর এই দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির মাধ্যমে লোকায়তদের হাত থেকে জ্ঞানতত্ত্বকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু “আমরা বস্তু সম্পর্কে পুরোপুরি জ্ঞান অর্জন করতে পারি না”-- এই কথা বলার মধ্য দিয়ে ও জ্ঞানের আপেক্ষিকতার নামে তিনি অজ্ঞেয়বাদের (agnosticism) শিকার হয়ে পড়েন। অপরদিকে তীর্থঙ্করদের “সর্বজ্ঞ” হিসাবে ঘোষণা করে তিনি নিজেই অজ্ঞেয়বাদকে নাকচ করেন এবং এইভাবে অপর প্রান্তে পৌঁছে গিয়ে জ্ঞানতত্ত্বকেই অস্বীকার করে বসেন।
জৈনরাও ব্যক্তিগত মোক্ষলাভের উপর জোর দিতেন। কিন্তু তাঁরা মনে করতেন এই মোক্ষলাভ ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সম্ভব নয়, বরং সঠিক বিশ্বাস, সঠিক জ্ঞান ও সঠিক আচরণের মধ্য দিয়েই সম্ভব। সঠিক আচরণের জন্য তাঁরা পাঁচটি মহান অনুশাসনের কথা প্রচার করলেন – অহিংসা, সত্য বলা, কেউ দেয়নি এমন কোনো জিনিস গ্রহণ না করা, ব্রহ্মচর্য এবং অপরিগ্রহ। এগুলির মধ্যে অহিংসা হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
৯। গৌতম বুদ্ধ : গৌতম বুদ্ধ (৫৬৩ খ্রিঃ পূর্ব – ৪৮৩ খ্রিঃ পূর্ব) প্রাচীন ভারতে দ্বন্দ্বতত্ত্বের সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। উপনিষদ, বৈশেষিক, লোকায়ত এবং জৈনদের প্রবন্ধগুলিতে বিক্ষিপ্তভাবে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির ব্যবহার দেখা গেলেও বৌদ্ধরাই এটির সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। বুদ্ধ নাস্তিক ছিলেন এবং কোনো রূপ চিরন্তন আত্মার অস্তিত্বকে অস্বীকার করতেন। কিন্তু তিনি বস্তুবাদীও ছিলেন না। তিনি আত্মার অস্তিত্বকে স্বীকার করে নিয়েছিলেন বটে কিন্তু মনে করতেন যে এটিরও পরিবর্তন হয় এবং এটি কোনো চিরন্তন বস্তু নয়। তিনি বেদ ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করতেন। তাঁর মতে কেবলমাত্র চারটি মহান সত্য আছে -- (ক) সবকিছুই দুঃখ কষ্টে ভরা, (খ) এই দুঃখ কষ্টের কারণ আছে, (গ) এই দুঃখ কষ্ট নিবারণ করা যায় এবং (ঘ) এই নিবারণ করার একটি পথ আছে। তাঁর মতে, এই দুঃখ কষ্টের মূল উৎস হল মানুষের তৃষ্ণা। এবং এই দুঃখ কষ্টকে দূর করা যায় যদি তৃষ্ণাকে নিবারণ করা যায়। দুঃখ কষ্টকে দূর করার জন্য তিনি আটটি বিষয় সম্বলিত পথের কথা প্রচার করেন – (ক) সঠিক বিশ্বাস, (খ) সঠিক সংকল্প, (গ) সঠিক কথা, (ঘ) সঠিক কাজ, (ঙ) সঠিক জীবনযাপন, (চ) সঠিক প্রচেষ্টা, (ছ) সঠিক চিন্তা এবং (জ) সঠিক একাগ্রতা বা সমাধি। সঠিক বিশ্বাসের অর্থ হল হিংসাকে পরিত্যাগ করা, চুরি না করা, লাম্পট্য না করা এবং মিথ্যা কথা না বলা। সঠিক সংকল্পের অর্থ অহিংস সংকল্প এবং সঠিক জীবনযাপনের অর্থ হল অস্ত্র, প্রাণী, মাংস, মদ, এবং বিষ নিয়ে ব্যবসা না করা।
বুদ্ধের দ্বন্দ্বতত্ত্বকে 'প্রতীত্য সমুৎপাদ' (বস্তুর নির্ভরশীল উদ্ভবের ধারণা) বলা হয়। সমগ্র বিশ্ব একটি নিরবচ্ছিন্ন গতির মধ্যে আছে। কোনো বস্তুর ধ্বংস এবং তার স্থলে আর একটি বস্তুর উৎপত্তির প্রক্রিয়া অনবরত চলছে। কিন্তু বুদ্ধের মতে এই ধ্বংস ও উৎপত্তির নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া হল একটি নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া এবং বাস্তবে এই গতি হল চক্রাকার গতি। শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন আত্মার অস্তিত্ব আছে। কিন্তু এটা উপনিষদে বর্ণিত অবিনশ্বর আত্মা নয়, বরং এক বিচ্ছিন্ন গতি (অর্থাৎ প্রতিটি ধ্বংসের পরেই আসে উৎপত্তি) হিসাবে এর অস্তিত্ব আছে এবং দেহের মৃত্যুর পরও এই গতি অব্যাহত থাকে। তাই বুদ্ধ পুনর্জন্মকেও স্বীকার করেছেন। তাঁর মতে নির্বাণের অর্থ হল তৃষ্ণার বিলোপ সাধন এবং এর পরেই পুনর্জন্ম গ্রহণের বাধ্যতা থেকে আত্মা মুক্তি পায় এবং এইভাবেই আত্মা নির্বাণ লাভ করে। এছাড়া বুদ্ধ বাস্তব জগতকে নাকচ করেননি, বরং বাস্তব জগত ও আত্মা উভয়ের উপর তিনি তাঁর 'প্রতীত্য সমুৎপাদ'কে প্রয়োগ করেছিলেন।
পরবর্তীকালে বৌদ্ধরাও দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েন : (ক) হীনযান এবং (খ) মহাযান, এবং এঁদের মধ্যে প্রত্যেকটি আবার দুটি করে ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েন। তাঁরা হলেন যথাক্রমে সর্বস্তিবাদী ও সৌতান্ত্রিক এবং মাধ্যমিক ও যোগাচারী। হীনযানের অনুগামীরা অনেক বেশি বাস্তববাদী হলেও মহাযানের অনুগামীরা মূলত ভাববাদী ছিলেন।
মাধ্যমিকদের প্রধান নেতা নাগার্জুন ঘোষণা করেছিলেন “এই বিশ্বজগতের কিছুই চিরন্তন নয় এবং সব কিছুই ক্ষণস্থায়ী” এবং এর ভিত্তিতে তিনি বাস্তব জগতকেই অস্বীকার করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “শূন্য ছাড়া আর কিছুই নেই।” এই জন্যই তাঁর মতকে শূন্যতাবাদও (voidism) বলা হয়। তাঁর বিপরীতে যোগাচারীরা (অসঙ্গ, বসুবন্ধু, দিঙনাগ, ধর্মকীর্তি ও শান্ত রক্ষিত প্রমুখ) চিন্তার প্রাধান্য স্বীকার করা সত্ত্বেও বাস্তব জগতের অস্তিত্বকে স্বীকার করেছিলেন। জ্ঞানতত্ত্ব সম্বন্ধে তাদের ধারণা ছিল বস্তুবাদী।
তাঁর সমস্ত দুর্বলতা সত্ত্বেও বৌদ্ধ দর্শন পুরনো পচাগলা দাস ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রাধান্য লাভ করেছিল, কারণ এটি গোড়া থেকেই বর্ণ ব্যবস্থার বিরোধী ছিল। তাই পরবর্তীকালে বৈদিক ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে তত্ত্বগত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ভারতীয় দর্শন বিকাশলাভ করেছিল। মৌর্যবংশের পতনের পর সামন্ত প্রভু ও রাজারা তাদের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত হাতিয়ার হিসাবে বৈদিক ধর্মকে বেছে নিয়েছিল। তা সত্ত্বেও বৌদ্ধধর্ম তার প্রাধান্য বজায় রাখতে পেরেছিল। কিন্তু গুপ্তযুগ পর্যন্ত বৈদিক ধারা প্রয়োজনীয় তাত্ত্বিক প্রস্তুতি চালিয়ে যায়, আর সেই সময় বৌদ্ধধর্ম নাগার্জুনের ভাববাদের দ্বারা বেশি পরিমাণে প্রভাবিত হয়ে পড়ে এবং ক্রমশ সাধারণ জনগণের সমর্থন হারিয়ে ফেলে। তাই গুপ্তযুগের পর যখন ভারতবর্ষ আবার অসংখ্য ছোট ছোট রাষ্ট্রে বিভক্ত হয় পড়ল তখন বৈদিক ধর্ম প্রাধান্য লাভ করবার সুবর্ণ সুযোগ পেল। অবশেষে শঙ্করাচার্য বৌদ্ধ ধর্মকে ধ্বংস করার জন্য উপনিষদের ব্রহ্মবাদের সঙ্গে নাগার্জুনের শূন্যতাবাদের (Voidism) মিশ্রণ ঘটিয়ে তাঁর নিজের অস্ত্র মায়াবাদের জন্ম দিয়েছিলেন, যা পরবর্তীকালে সুপ্রতিষ্ঠিত, প্রতিক্রিয়াশীল এবং অচল সামন্ততন্ত্রের প্রধান দর্শন হয়ে ওঠে। সেই জন্য শঙ্করাচার্য এবং সমস্ত অদ্বৈতবাদীকে প্রায়ই ছদ্মবেশী বৌদ্ধ বলা হয়।
অজ্ঞেয়বাদ : প্রকৃতি সম্পর্কে অজ্ঞেয়বাদীদের ধারণা হল আগাগোড়াই বস্তুবাদী। তাঁদের মতে সমস্ত বিশ্বপ্রকৃতি নিয়মের দ্বারা পরিচালিত হয় এবং বাইরে থেকে কোনো শক্তির হস্তক্ষেপকে তাঁরা পুরোপুরি নাকচ করেন। কিন্তু তাঁরা এটাও মনে করেন যে আমাদের জানা জগতের বাইরে কোনো উপায় আমাদের নেই। অজ্ঞেয়বাদীরা স্বীকার করেন যে আমাদের সমস্ত জ্ঞান ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তথ্যের উপর ভিত্তি করে আছে কিন্তু এ প্রশ্নও তাঁদের আছে “আমরা কিভাবে জানবো যে আমাদের ইন্দ্রিয়, বস্তু সম্বন্ধে আমাদের সঠিক বিবরণ দেয়?” এইভাবে কোনো বস্তু সম্পর্কে জানার ব্যাপারে তাঁরা যতদূর পর্যন্ত দাবি করেন ততদূর পর্যন্ত তাঁরা বস্তুবাদী এবং যে ক্ষেত্র সম্পর্কে তাঁরা কিছুই জানেন না সেইক্ষেত্রে তাঁরা ভাববাদী। তাঁদের মতে যে কেউ কোনো বস্তুর গুণকে (তার স্বাদ, বর্ণ, গন্ধ ইত্যাদি) সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারে কিন্তু কেউ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বা মনন প্রক্রিয়ার সাহায্যে সঠিকভাবে 'নিজের মধ্যে বস্তুকে' (thing in itself) উপলব্ধি করতে পারে না। যদিও এই দর্শনশাস্ত্র গ্রীস দেশে তৃতীয় এবং চতুর্থ খ্রিস্টাব্দে দেখা গিয়েছিল, কিন্তু কান্ট (১৭২৪-১৮০৪) এবং হিউম (১৭১১-৭৬) এটিকে পুনরুজ্জীবিত করেন। পরবর্তীকালের প্রত্যক্ষবাদীরা এই তত্ত্বকে বিকশিত করেন।
প্রত্যক্ষবাদ (Positivism) : ১৮৪০-এর দশকে ফরাসি বস্তুবাদ ও নাস্তিকতার বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষবাদ দর্শনশাস্ত্রের একটি ধারা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। এই ধারা অনুযায়ী বৈজ্ঞানিক চিন্তার প্রধান কাজ হল “বিশুদ্ধ অভিজ্ঞতা”লব্ধ তথ্যগুলিকে সংগ্রহ করা এবং সেগুলিকে সাধারণীকরণ করা। আমাদের অভিজ্ঞতালব্ধ ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে বাস্তব জগতের অস্তিত্ব আছে কি নেই কিংবা বস্তু মুখ্য না গৌণ, এই দার্শনিক সিদ্ধান্তে আমরা পৌঁছাতে পারি না। প্রত্যক্ষবাদীরা দর্শনশাস্ত্রের মধ্যে একটি তৃতীয় ধারা প্রবর্তনের দাবি করেন যা বস্তুবাদীও নয় ভাববাদীও নয় বরং উভয়ের থেকেই যা উন্নততর। আগস্ট কোঁৎ, জন স্টুয়ার্ট মিল, হারবাট স্পেনসার, আর্নস্ট ম্যাক, বারট্রান্ড রাসেল হলেন এই দর্শনশাস্ত্রের অগ্রণী প্রবক্তা -- যদিও গভীরে বিশ্লেষণ করলে তাঁদের নিজেদের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়।
নিয়তিবাদ (Deteriminism) : এটি হল অষ্টাদশ শতাব্দীর অমার্জিত যান্ত্রিক বস্তুবাদের একটি রূপ। এটি হল সেই সময় যখন আধুনিক প্রকৃতি বিজ্ঞান তার বিকাশের প্রথম পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। স্বাভাবিকভাবে এই সময়ে বিজ্ঞান একদিকে যেমন প্রকৃতির গতিশীল ভূমিকাকে ব্যাখ্যা করার স্তরে ছিল না, অপরদিকে তেমনই ধর্মীয় শৃঙ্খলকেও ছিন্ন করতে পারেনি। এর দৃষ্টিভঙ্গীটি হল : প্রকৃতি যেভাবেই সৃষ্টি হোক না কেন, একবার সৃষ্টি হওয়ার পর এর পরিবর্তন হয় না এবং এর মধ্যেকার প্রতিটি বস্তুকেই পূর্বনির্ধারিত ভূমিকা পালন করতে হয় এবং তারা এটা এড়িয়ে যেতে পারে না; বরং বলা যায় নিজেদের ভূমিকা এককভাবে পালন করার জন্য তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। উলফ যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন : ইঁদুরের সৃষ্টি হয়েছে কেবলমাত্র বিড়ালের খাদ্য হিসাবে এবং বিড়ালের সৃষ্টি হয়েছে ইঁদুরকে খাবার জন্য। স্পষ্টতই এই সম্প্রদায় নিষ্ক্রিয়তা প্রচার করে, সমস্ত ধরনের গতিশীলতার বিরোধিতা করে এবং নিজেদের সামাজিক জীবনের পরিবর্তন আনার জন্য জনগণের প্রচেষ্টাকে বাধা দেয়।
ব্যবহারিকতাবাদ (Pragmatism) : বিংশ শতাব্দীর গোড়াতে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে উইলিয়াম জেমস (১৮৪২-১৯১০) এটির বিকাশ ঘটান। ব্যবহারিকতাবাদী বা প্রয়োগবাদীদের কাছে কোনো একটি মতবাদ, বিশ্বাস বা তত্ত্বের সঠিকতা নির্ভর করে পৃথিবীর উপর এর প্রয়োগের ফলাফল দ্বারা। তাই শুধুমাত্র ফলাফল এবং অভিজ্ঞতাকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাঁরা দেখান যে যেহেতু শুধু বিশ্বাসেও রোগ সারে এবং কিছু লোকের ঈশ্বরের সাথে কথা বলার অভিজ্ঞতা আছে তাই ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা যায় না। অপরদিকে বিজ্ঞানের বিকাশকেও অস্বীকার করা যায় না যদিও তা কয়েকটি ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে পারেনি, তাই বিজ্ঞানকে সম্পূর্ণরূপে বাস্তুবানুগ হিসাবে গ্রহণ করা যায় না। তাই শুধুমাত্র ব্যবহারিকতার উপরই নির্ভর করাই ভালো, শুধুমাত্র সেই জ্ঞানকেই গ্রহণ করা উচিত যা বাস্তব বলে যাচাই ও প্রমাণ করা যায়। কিন্তু সেই জ্ঞানের উপর নির্ভর করা উচিত নয় যা নিছক তর্কশাস্ত্রের উপর ভিত্তি করে আছে। এইভাবে তাঁরা ভাববাদ ও বস্তুবাদ উভয়কেই খণ্ডন করেন। একটি তৃতীয় বাস্তববাদী ধারার জন্ম দেওয়ার ভান করেন। মর্মবস্তুতে এই ধারা হল বস্তুবাদের একটি নতুন রূপ। ভাববাদের প্রতি এর সুচতুর ঝোঁক এটিকে বিংশ শতাব্দীর সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে।
অস্তিত্ববাদ (Existentialism) : এটি একটি চরম ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী, নৈরাজ্যবাদী দার্শনিক ধারা, আজকের যুগে যার মূল প্রবক্তা ছিলেন জাঁ পল সার্ত্রে। অস্তিত্ববাদ ব্যক্তির অবাধ-বিকাশের ওকালতি করে এবং সমস্ত ধরনের সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার বিরোধিতা করে। যেহেতু সাম্রাজ্যবাদ শ্রমিকশ্রেণীর ব্যক্তিগত জীবনকে ধ্বংস করেছে, সাধারণ জনগণের একান্ত নিজস্ব জীবনকে ধ্বংস করেছে, তাই শ্রমিকশ্রেণী ও সাধারণ জনগণের মধ্যে ব্যক্তি স্বাধীনতার এক অকৃত্রিম আকাঙ্খা আছে। তাই দর্শনের এই ধারা ইউরোপীয় যুবকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। কিন্তু এই অকৃত্রিম আকাঙ্খাকে কাজে লাগিয়ে এটি এক নৈরাজ্যবাদী তত্ত্ব হাজির করে। সেই জন্য সংগঠিত আন্দোলন গড়ে তোলার পথে এটি বাধার সৃষ্টি করে।
প্রাচীন : ডেমোক্রিটাস থেকে প্লেটো এবং হিরাক্লিটাসের দ্বন্দ্বতত্ত্ব পর্যন্ত।
রেনেসাঁ : দেকার্ত বনাম গ্যাসেন্দি (স্পিনোজা?)
অাধুনিক : হোল বাখ – হেগেল (বার্কেল, ইউম ও কান্টের মধ্য দিয়ে হেগেল-ফয়েরবাখ-মার্কস।
১। পূর্বে সমস্ত (পশ্চিম ও মধ্য) ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলি 'পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের' অধীনে ছিল। কিন্তু পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে যখন ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলিতে পুঁজিবাদের বিকাশ হতে শুরু করে, সেই সময় উঠতি বুর্জোয়াদের সাহায্যে বিভিন্ন দেশের স্থানীয় রাজারা 'পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যে'র সাথে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং এই জাতীয় রাষ্ট্রগুলি গঠনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। আমরা এখানে এই ঘটনারই উল্লেখ করেছি।
সংস্কার (Reformation) : রোমান ক্যাথলিক চার্চের বিরুদ্ধে একটি ব্যাপক বিস্তৃত সামাজিক আন্দোলন যা ষোড়শ শতাব্দীতে অনেকগুলি ইউরোপীয় দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। এটি ছিল পুঁজিবাদের বিকাশের একটি প্রকাশ। বেশিরভাগ দেশে তীব্র শ্রেণীসংগ্রামের সাথে সংস্কার মিশে গিয়েছিল। এই আন্দোলনের পতাকাতলে জার্মানির কৃষক যুদ্ধ (১৫২৪ – ১৫২৫ খ্রিঃ) চালানো হয়েছিল।
রেনেসাঁ : পঞ্চদশ, ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে ইউরোপে শিল্প-সাহিত্য-বিজ্ঞান দর্শন এবং জ্ঞানের অন্যান্য শাখার এক অভূতপূর্ব বিকাশের ফল। পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে সেলজুক তুর্কীরা কনস্টান্টিনোপল দখল করে এবং এর ফলে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের (যার রাজধানী ছিল কনস্টান্টিনোপল বা বাইজান্টিয়ান) পতন ঘটে। পুরনো গ্রীক পুঁজিগুলি সাথে নিয়ে বহু লোক পূর্ব অথবা মধ্য ইউরোপে পালিয়ে যায়। এই সময়ে, ইসলামের পতাকা হাতে আরব কর্তৃক স্পেন দখল এবং ইউরোপীয় রাজাদের দ্বারা স্পেনের বিরাট ভূখণ্ডের পুনরুদ্ধারের মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবী সমাজ আরব দর্শনের সংস্পর্শে আসে। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে ভারত ও আমেরিকা আবিষ্কার হয়। পুঁজিবাদের দ্রুত বিকাশ ঘটে। ষষ্ঠদশ শতাব্দীর প্রথম ও মধ্যভাগে অনেকগুলি দেশে সংস্কার আন্দোলন দেখা যায়। এই বিষয়গুলিই রেনেসাঁর ভিত্তি গড়ে তোলে।
২। নব্য হেগেলীয় : এরা হলেন হেগেলর অনুগামী, যাঁরা দ্বান্দ্বিক বিষয়টির উপর জোর দেন। প্রথম দিকে মার্কস নিজেই ছিলেন 'নব্য হেগেলীয়'।
৩। টোরী এবং হুইগ : ব্রিটিশ বুর্জোয়াদের রক্ষণশীল অংশকে (যাদের সামন্ত প্রভুদের সাথে আঁতাত ছিল) টোরী বলা হত – এবং উদারনৈতিক অংশটিকে বলা হত হুইগ।
জিরান্দোঁ : অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে ফরাসি বিপ্লবের সময় ফরাসি বুর্জোয়াদের যে দোদুল্যমান অংশটি রাজতন্ত্রের সাথে আপোষ করেছিল তাদের জিরাদোঁ বলা হত। তাদের এই নামে ডাকা হত এই জন্য যে তারা জিরান্দ প্রদেশ থেকে এসেম্বলীতে প্রতিনিধিত্ব করত।
জ্যাকোবিন : অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে ফরাসি বুর্জোয়াদের এই বাম অংশটি দৃঢ়ভাবে স্বৈরতন্ত্র ও সামন্ততন্ত্রের বিলোপের পক্ষে ছিল।
এখানে আমরা পুঁজিবাদের বিকাশের পর্যায়ের দুটি ধারার কথা উল্লেখ করেছি। পরবর্তীকালে বিশেষ করে সাম্রাজ্যবাদের যুগে বুর্জোয়াদের জোট বাঁধাবাঁধির ক্ষেত্রে বড় বড় পরিবর্তন ঘটে গেছে।