বিমুদ্রাকরণের পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের ওপর বিপুল যন্ত্রণা চাপিয়ে দিয়েছে। এবং বাতিল নোটের স্থান পূরণে নতুন নোটের ঘাটতি ব্যাপক রূপে দেখা দেওয়ায় জনগণের নগদ-নির্ভর অংশ – বস্তুত প্রতি দশ জনের মধ্যে নয়জন – নগদ সংকটে জর্জরিত হয়ে বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছেন। একেকটা দিন যাচ্ছে আর ক্রমেই এটা স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে, নগদ সংকট আসলে একটা সিংহদুয়ার যার মধ্যে দিয়ে দেখা দেবে একটা বৃহত্তর ও গুরুতর সংকট, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে ধাক্কার মধ্যে দিয়ে এবং ফলে সর্বস্তরে জনগণের আয় এবং ব্যয়ের সংকোচনের মধ্যে দিয়েই যে সংকট হাজির হবে। সরকার গোড়ার দিকে বলেছিল যে, অল্প কয়েকদিনের জন্য অসুবিধা ভোগ করতে হবে, এখন কিন্তু ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, ঐ যন্ত্রণা দীর্ঘস্থায়ী এবং ক্ষয়ক্ষতি স্থায়ী এবং অপূরণীয় হতে চলেছে।
নোট বাতিল পদক্ষেপের ঘোষিত লক্ষ্য – কালো টাকা এবং জাল মুদ্রাকে নিষ্ক্রিয় করা – এখন নিছকই একটা অছিলা বলে দেখা যাচ্ছে। সরকার নিজেই এখন এর আগে প্রস্তাবিত আয় ঘোষণা প্রকল্পে দেয় জরিমানার চেয়ে মাত্র ৫ শতাংশ বেশি হারে জরিমানায় কালো টাকাকে সাদা করার প্রস্তাব দিয়েছে। মহেশ শাহর মতো এক ব্যক্তি ১৩৮০০ কোটি কালো টাকা আয়ের কথা ঘোষণা করলেন এবং প্রকাশ্যেই বললেন ওটা আসলে রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসাদারদের টাকা। তাকে কোনো শাস্তি ছাড়াই রেহাই দেওয়া হল এবং তার ঘোষণাকেও কোনো তদন্ত ছাড়াই খারিজ করা হল। আমরা এও জানি যে, ৮ নভেম্বরের ঘোষণার আগে বিজেপি কিভাবে সারা দেশে বিপুল পরিমাণ টাকাকে জমি সম্পদে রূপান্তরিত করেছে এবং বিজেপি নেতাদের নতুন চালু ২০০০ টাকার নোটে লক্ষ লক্ষ ও কোটি কোটি টাকা সহ দেখা যাচ্ছে। নগদ টাকার অভাবে সাধারণ মানুষকে বিবাহ উৎসব পিছোতে এবং চিকিৎসা পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে, অন্যদিকে জনার্দন রেড্ডি এবং নীতীন গডকরির মতো রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ অপিরমেয় টাকা খরচ করে রাজকীয় বিবাহ উৎসবের অায়োজন করেছেন।
এটা মোটামুটি পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, বাতিল মুদ্রার প্রায় সবটাই ব্যাঙ্ক ব্যবস্থায় ফিরে আসছে, যা বিপুল পরিমাণ মজুত করা নগদ টাকাকে নষ্ট করে ফেলার জল্পনা ও গুজবের অবসান ঘটিয়েছে, আর মোদী জনধন অ্যাকাউন্টগুলোকে কালো টাকার মজুত ভাণ্ডার রূপে অভিযুক্ত করে দরিদ্রদের ব্যাপক যন্ত্রণা ও অপমানে জর্জরিত করছেন।
বড় অর্থের নোটগুলো বাতিল করার বিশাল উদ্যোগের পিছনে অন্যতম যে উদ্দেশ্য ছিল বলে মনে হয় তা হল ব্যাঙ্কগুলোকে সংকট থেকে উদ্ধার করা, যে ব্যাঙ্কগুলোকে লুট করেছে ভারতের বড় বড় কর্পোরেট সংস্থাসমূহ এবং বিজয় মাল্যর মতো ঠগরা, যাকে বিজেপি রাজ্যসভার সাংসদ বানিয়েছিল এবং মোদী সরকার যাকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়। কর্পোরেট ক্ষেত্রকে বছর বছর ধরে ১১ লক্ষ কোটি টাকার ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ যোগানো হয়, যে ঋণকে এখন প্রণালীবদ্ধ ধারায় ধাপে ধাপে ব্যাঙ্কের খাতা থাকা থেকে বাতিল করা হচ্ছে।
নোট বাতিল প্রক্রিয়া সাধারণ জনগণের সমস্ত সঞ্চয়কে শুষে নিয়েছে, এবং ব্যাঙ্কগুলোতে নগদের যোগান যথেষ্ট উন্নত হওয়ায় তাকে এখন আবার ধনী ও দুর্নীতিগ্রস্তদের জন্য সস্তায় ঋণে পরিণত করা হবে।
ব্যাঙ্কগুলোতে নতুন পুঁজি যোগানো ছাড়াও বিমুদ্রাকরণের আর একটা উদ্দেশ্য হল ডিজিটাল ভারতের প্রচার এবং কর্পোরেটপন্থী অর্থনৈতিক সংস্কারকে তার সমগ্র পরিসরে প্রবলভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, যার ফলে গোটা অর্থনীতির ওপর কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ আরও জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
যা কিছু ছোট মাপের, ছোট আয়তনের কৃষি ও ব্যবসা থেকে অসংগঠিত ক্ষেত্রের শিল্প এবং অন্যান্য উদ্যোগ ও পেশা, সব কিছুকেই আরও প্রবল কর্পোরেট আগ্রাসনের মুখে স্রেফ টিকে থাকার জন্য তীব্র লড়াই চালাতে হবে।
মোদী সরকারের বিমুদ্রাকরণ সৃষ্ট বিপর্যয়ের জন্য যে জনগণকে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে, তাদের যন্ত্রণা বিজেপির আরও একটা প্রবল পরাজয়ে পরিণত হোক।
মোদীর জরুরি অবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করুন,
বিমুদ্রাকরণ সৃষ্ট বিপর্যয়কে প্রতিরোধ করুন!
(দ্য ওয়ার পত্রিকায় ১৮/১২/২০১৬ তারিখে প্রকাশিত সিদ্ধার্থ ভাটিয়ার লেখার অংশবিশেষ)
এই পুস্তিকার মলাটের ছবিটাকে দেখুন (যা প্রথম প্রকাশিত হয় হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকায়, ছবির সৌজন্য : প্রভিন কুমার)
সেনাবাহিনীর প্রাক্তন সদস্য নন্দলাল গুরগাঁওয়ে এসবিআই-এর এক শাখার বাইরে লাইনে দাঁড়িয়ে সেখান থেকে ছিটকে যাওয়ার পর অঝোরে কাঁদছেন।
ছবিটাকে ভালো করে লক্ষ্য করুন। মানুষটার মুখ আমাদের যন্ত্রণা ভোগের এবং মনের জোরে দুর্দশা সহ্যের অসংখ্য কাহিনী বলছে। এখন আমরা জেনে গেছি যে, তিনি ছোট একটা ঘরে একাই থাকেন এবং তিনি হলেন প্রাক্তন সেনা; তিনি শত্রুর বুলেট এবং আরও অনেক কিছুর মোকাবিলা করতে পারতেন, কিন্তু তিন দিন লাইনে দাঁড়ানোর পরও কয়েকশো টাকা তুলতে না পারাটা তাঁর কাছে অসহনীয় হয়ে দাঁড়ালো। আবার নতুন করে লাইনে দাঁড়াতে হবে এবং দাঁড়ানোর পরও তাঁকে শূন্য হাতে ফিরতে হতে পারে, এ কথাটা উপলব্ধির পর তাঁর অবরুদ্ধ আবেগের বাঁধ ভাঙলো।
তাঁর আশেপাশে যাঁরা ছিলেন তাঁরাও ছবিটাকে প্রকৃত তাৎপর্যে মণ্ডিত করলেন। লাইনে দাঁড়ানো মহিলারা তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল হতেও পারেন, আবার নাও পারেন, কিন্তু কেউই লাইন ছেড়ে বেরিয়ে তাঁকে সান্ত্বনা দিতে রাজি নন, কেননা তার ফলে তাঁরাও লাইন থেকে ছিটকে যেতে পারেন। চাচা আগে আপন প্রাণ বাঁচা, তার পরে সহানুভূতি ও সংহতি। মহিলাদের মুখগুলোতেও একটা চাপা মরিয়াভাব, কেননা তাঁদের সবাইকেও টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরতে হূবে, তা সে যত সামান্যই হোক না কেন, অন্যথায় তাঁদের পরিবারকে দুর্ভোগ পোহাতে হবে। যন্ত্রণা সহ্যের ব্যাপারে দেশ ঐক্যবদ্ধ, কিন্তু নগদ টাকার যোগান এত কম এবং সামান্য কিছু জোগাড় করাটাও এতো কষ্টের যে, প্রত্যেক নারী-পুরুষের ক্ষেত্রেই চাচা আগে আপন প্রাণ বাঁচা, অন্যের দুঃখে দরদের কথা পরে। ... ...
বিমুদ্রাকরণের যন্ত্রণা খুব তাড়াতাড়ি যাওয়ার নয় এবং সেটা অবশেষে যখন যাবে তখনও দরিদ্র মানুষের জীবনে কোনো উন্নতি ঘটবে না। ব্যাঙ্কের সামনে লাইন আর থাকবে না, কিন্তু এমন এক জমানার মোকাবিলা তাদের করতে হবে যা তাদের ঘাড়ে প্রযুক্তি চাপিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর; নগদে টাকা তোলার সীমাকে বেঁধে রাখাটা যদি স্থায়ী ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে কি হবে? এই চরম পদক্ষেপকে খামখেয়ালের বশে ঘটিয়ে ফেলা একবারের জন্য একটা সিদ্ধান্ত বলে মনে করলে মুর্খামি হবে; এটা একটা বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ যার মধ্যে শুধু দেশ পরিচালনার ধারাকে নতুন পথে চালিত করার লক্ষ্যই নেই, নাগরিকরা নিজেদের জীবনকে কিভাবে চালিত করবেন তার ধারাকে নতুন পথে চালিত করার লক্ষ্যও রয়েছে। ইতিমধ্যে, লাইন ছোট হয়ে ওঠার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না এবং নগদ টাকা হাতে পাওয়াটাও মানুষের কাছে সহজ হচ্ছে না।
মানুষের যন্ত্রণার আরও অনেক কাহিনী এবং আরও অনেক ছবি সামনে আসবে। নন্দলালকে ভুলে গিয়ে পৃথিবীর এগিয়ে চলার ঘটনাও বুঝিবা ঘটবে। কিন্তু তার ছবিটা আমাদের চেতনায় না হলেও সমবেত স্মৃতিতে যন্ত্রণার চিহ্ন হয়েই থাকবে। তবে এটা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রসঙ্গ যে, তার যন্ত্রণাকে লাঘব করা যাদের পক্ষে সম্ভব এবং তা করা উচিতও বটে, তারা ঐ ধরনের কোনো উভয় সংকটের মধ্যে আদৌ পড়বেন না, কেননা, প্রথমত ওর ছবিটা ওদের মনে একটুও দাগ কাটেনি।
প্রধানমন্ত্রী মোদীর ৮ নভেম্বরের নোট বাতিলের ঘোষণায় ক্ষতিগ্রস্ত ভারতের সাধারণ জনগণ প্রথমে ভেবেছিলেন যে, দেশকে কালো টাকা থেকে পরিশুদ্ধ করা এবং কালো টাকার মালিকদের শাস্তি দেওয়ার মহান কাজের জন্য তাদের সাময়িকভাবে কষ্ট স্বীকার করতে হবে। দিন যত এগিয়েছে এবং মোদীর ঘোষণা মতো ৫০ দিনের সময়সীমাও যখন পেরিয়ে গেছে, নোট বাতিলের প্রকৃত আখ্যানও ক্রমে ক্রমে প্রকাশ হতে থেকেছে। নীচের লেখাগুলোতে আমরা বিমুদ্রাকরণের লম্বা-চওড়া প্রতিশ্রুতিগুলোর সঙ্গে তার থেকে উদ্ভুত কঠোর এবং যন্ত্রণাদায়ক বাস্তবতার তুলনাকে তুলে ধরার চেষ্টা করব।
প্রধানমন্ত্রীর লম্বাচওড়া দাবিগুলো একে একে বানচাল হয়ে গেছে -- মিথ্যা বলে প্রতিপন্ন হয়েছে ... ...
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দুর্নীতিপরায়নদের অন্ধকারে রাখতে নোট বন্দীর সিদ্ধান্তকে গোপন রাখা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলগুলোকে বিদ্রুপ করে বলেছেন যে, ওরা এই জন্যই অভিযোগ করছে যে, ‘প্রস্তুতি' নেওয়ার সময় ওরা পায়নি। কিন্তু এই প্রশ্নটা উঠছে যে : মোদী নিজেই কি তার দল এবং বন্ধুদের এ সম্পর্কে আগেই অবহিত করেছিলেন এবং নোট বন্দীর পরিপ্রেক্ষিতে 'প্রস্তুতি' নেওয়ার যথেষ্ট সময় দিয়েছিলেন যাতে তারা কালো টাকার নিষ্পত্তি করতে পারে?
নিরপেক্ষ সংস্থা দিয়ে বিজেপির এই নোট ব্যাঙ্ক কেলেঙ্কারির তদন্ত করতে হবে !
‘ভারতের পরিহাস' নামক ওয়েব পোর্টাল ২০১৬-র ১৪ ডিসেম্বর গোরখপুর থেকে জানিয়েছে : “জঙ্গল চৌরিতে আমরা বিজেপির স্টিকার লাগানো অন্ততপক্ষে ২৪৮টি টিভিএস বাইক দেখেছি, বিতরণের জন্য সেগুলো পার্ক করা আছে।"
এই বাইকগুলোর মধ্যে বিজেপির বেনিগঞ্জ অফিস অন্ততপক্ষে ১৮৮টা বাইক কিনেছে। উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনে প্রচারের জন্য প্রতিটি কেন্দ্র ৪টি করে বাইক পাবে।
রেজিস্ট্রেশন ফি সহ প্রতিটি বাইকের দাম মোটামুটি ৩৭১০৫ টাকা : এর অর্থ ২৪৮টা বাইক কিনতে লেগেছে ৯১৮০০০০ টাকা। এগুলো কি সাদা টাকায় কেনা হয়েছে? নির্বাচনী খরচের হিসাব-নিকাশে এই টাকা কি নির্বাচন কমিশনের কাছে দেখানো হবে?
প্রধানমন্ত্রী বলছেন, "নগদহীনতার পথে যাও।" নগদ টাকার ৮৬ শতাংশকে ধ্বংস করে এবং ছোট অর্থের নোট ছাপার বদলে ২০০০ টাকার নোট ছেপে সরকার অর্থনীতি এবং জনগণকে জোরজবরদস্তি নগদহীনতার পথে নিয়ে যাচ্ছে, দরিদ্র, রাস্তার বিক্রেতা ও ছোট দোকানদার, নাগরিকদের ওপর এই জোরজবরদস্তি নগদহীন করে তোলার প্রতিক্রিয়াটা কি রকম হচ্ছে?
ভারতের গ্রামাঞ্চলে অধিকাংশ স্থানে বিদ্যুৎ নেই, ইন্টারনেট থাকার কথা তো ওঠেই না। ভারতের দরিদ্ররা কিভাবে নগদহীন হয়ে উঠতে পারে? কাশ্মীরে ও মণিপুরে প্রায়শই নিরাপত্তার নামে ইন্টারনেট ও মোবাইল পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্ণবাদী বা সাম্প্রদায়িক হিংসা বন্ধের নামে বেঙ্গালুরুর মতো শহরেও তা করা হয়েছে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে নগদ টাকা ছাড়া মানুষ বাঁচবে কি করে?
নোট বাতিল সম্পর্কে প্রথমদিকে লোকে বলেছিল, "উদ্দেশ্য ভালো, কিন্তু তার প্রয়োগ হচ্ছে বাজে ভাবে।" কিন্তু বাস্তব ঘটনাসমূহ নোট বাতিলের পিছনে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্য নিয়েই আমাদের প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করছে। নোট বাতিলের পদক্ষেপ কি নিছকই নিজেকে শক্তিমান মনে করা মোদীর এক নিষ্ঠুর খামখেয়াল, যাতে মোদী নিজের ক্ষমতাকে তুঘলক ও হিটলারের ক্ষমতার যোগফল হিসাবে মনে করতে পারেন?
নরেন্দ্র মোদী ও তার সরকার ফ্যাসিবাদের এক মহড়া হিসাবেও নোট বাতিল পদক্ষেপকে কাজে লাগাচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে নরেন্দ্র মোদী আরবিআই, নিজের মন্ত্রীসভা ও সংসদের মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থাগুলোকে এড়িয়ে গিয়েছিলেন। তিনি দেখতে চাইছিলেন যে প্রজাতন্ত্রের ওপর গোপনে গোপনে ধ্বংসাত্মক ও অগণতান্ত্রিক এক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে তিনি কতদূর যেতে পারেন।
গরিবরা বুঝতে শুরু করেছেন যে নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত ধনী ও দুর্নীতিগ্রস্তদের বিরুদ্ধে যাবে এবং তা দরিদ্রমুখী বলে মোদী যা বলেছিলেন তা আসলে মিথ্যা। আর তাই এখন আরএসএস বাহিনী গুজব ছড়াতে ব্যস্ত যে মোদী নাকি গরিবদের জন্য আবাসন ও অন্যান্য সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। এ হল পুরোপুরি ফাঁকা প্রতিশ্রুতি। বস্তুতপক্ষে মোদী ও তার সরকার এমএনআরইজিএ ও খাদ্য নিরাপত্তা সহ গরিবদের জন্য সমস্ত কল্যাণ প্রকল্পে কাটছাঁট করছে।
মোদী ভক্তরা ছাত্রদের দেশদ্রোহী হিসাবে চিহ্নিত করছে এবং মোদীকে সমালোচনা করায় ছাত্রদের পেটাচ্ছে। তারা সমস্ত বিরোধী কণ্ঠস্বরকে দমন করছে এবং যে মহিলারা প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলছেন বা সমালোচনা করছেন তাঁদেরকে গালাগাল করছে। এখন বিপর্যয়কর নোট বাতিল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সমালোচনা করাটাও 'দেশদ্রোহিতা' বলে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। মোদীর নোট বাতিল সিদ্ধান্তকে সমালোচনা করার জন্য দিল্লীর একজন ব্যক্তি লালন সিং খুসওয়াহাকে কিছু দুষ্কৃতি মারধোর করে।
সাংবাদিক রাভিস কুমার যেমন বলেছেন, যতই কষ্টভোগ করতে হোক না কেন, প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন করা চলবে না এবং সমস্ত নাগরিকদের অবশ্যই গাইতে হবে 'বাগোঁ মে বাহার হ্যায়’ ('এখন বইছে বসন্তের বাতাস / সুখী মোরা সকলে')। এক ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করে প্রশ্ন করার মুখ বন্ধ করা হচ্ছে। এটা যদি জরুরি অবস্থা না হয়, তবে সেটা কি?
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে দেশের জন্গণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যদি ৫০ দিন পরেও গরিবদের কষ্টভোগ করতে হয়, তাহলে সমগ্র দেশেই রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে জনগণ তাঁকে শাস্তি দেবেন। ৫০ দিন পেরিয়ে গেছে, কিন্তু নোট বাতিলজনিত কষ্টভোগ স্থায়ী হয়ে আছে। আমরা রাস্তার মোড়গুলোতে জনশুনানি করব এবং প্রধানমন্ত্রীকে উপস্থিত থাকার জন্য বলব। যদি তিনি জনগণের ক্রোধের মুখোমুখি হতে সাহস না করেন তবে আমরা তাঁর কুশপুতুল পোড়াব।
নোট বাতিল সিদ্ধান্ত দেশের কাছে, দেশের অর্থনীতির কাছে, গরিবদের কাছে এক বিপর্যয় নামিয়ে আনার চেয়ে কম কিছু নয়। যারা কোনোক্রমে জীবনধারণ করছিল, তাদের নিস্বঃ করে নিদারুণ দারিদ্রতার সীমায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে। কাজ হারিয়ে, চিকিৎসা ও পড়াশোনার খরচ যোগাতে না পেরে, অনাহারের মুখে দাঁড়িয়ে জনগণ মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এই বিপর্যয়কর সিদ্ধান্তের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে দায়িত্ব নিতে হবে। যখন কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে, তখন প্রধানমন্ত্রী ও সরকারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। এখন নোট বাতিলের মতো বিপর্যয়ে, যা মোদী নিজের হাতেই সৃষ্টি করেছেন, জনগণ নিজেদের কোনো দোষ ছাড়াই যে বিপর্যয় ও ক্ষতির মুখে পড়লেন তার জন্য সরকারকে অবশ্যই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
সর্বোপরি, সরকারকে অবশ্যই কালো টাকার মজুতদারদের প্রকৃত অর্থেই আঘাত করতে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিতে হবে, ‘নোট বাতিল'-এর ধূম্রজালের আড়ালে দুর্নীতিগ্রস্তদের রক্ষা করা নয়।
সরকারকে অবশ্যই অবিলম্বে --
• নোট বাতিল বিপর্যয়ের জন্য প্রতিটি নাগরিককে ১ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
• সমস্ত সরকারী ও বেসরকারী হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও খাদ্য দিতে হবে।
• সমস্ত কৃষকের ঋণ এবং স্কুল-কলেজে ছাত্রদের ফি মকুব করতে হবে।
• ব্যাঙ্কের ঋণখেলাপিদের ও বিদেশী ব্যাঙ্কে গচ্ছিত কালো টাকার মালিকদের তালিকা প্রকাশ করতে হবে।
• রাজনৈতিক পার্টিগুলোর কাছে আসা টাকার উৎস জনসমক্ষে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
• মোদী সরকার কেন এখনও একজন লোকপাল নিয়োগে ব্যর্থ হল? আর দেরী না করে লোকপাল নিয়োগ করা হোক।
এন এম অ্যাপ 'সমীক্ষা'র প্রশ্নগুলো হল ঠিক যেন অর্ণব গোস্বামীর দ্বারা মোদীকে ইন্টারভিউ করার জন্য তৈরি করা প্রশ্নাবলী, যা হল আগে থেকেই তৈরি উত্তরগুলো পাওয়ার জন্য সুবিধাজনক প্রশ্নমালা। মোদী বা নোট বাতিল সম্পর্কে সমালোচনামূলক কোনো প্রশ্ন বা উত্তরের কোনো স্থান এখানে ছিল না। খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোতে 'ভিন্নমত প্রকাশের' কোনো সুযোগও ছিল না। ধরেই নেওয়া হয়েছিল যে সমস্ত সমালোচকই দুর্নীতি ও সন্ত্রাসবাদীদের পক্ষে। সর্বোপরি, যেখানে ১৭ শতাংশ ভারতীয় স্মার্ট ফোন ব্যবহার করেন (স্বাভাবিকভাবেই গ্রাম ভারতে খুবই কম), সেখানে অ্যাপভিত্তিক 'সমীক্ষা' এক প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়। এই ভুয়ো সমীক্ষার বদলে আমরা একপ্রস্থ প্রশ্নমালা তৈরি করেছি, যা এক দায়িত্বশীল প্রধানমন্ত্রী করতেন, কিন্তু মোদী করেননি। এর সাথে রয়েছে একপ্রস্থ রাজনৈতিক প্রশ্ন যার উত্তর সংসদে, প্রচার মাধ্যমে ও জনসমক্ষে মোদীর দেওয়া উচিত -- কিন্তু তিনি তা দেবেন না।
১। ব্যাঙ্ক/এটিএম-এর সামনে আপনি কতক্ষণ ধরে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন?
২। আপনি কি আপনার প্রয়োজন মতো টাকা তুলতে পেরেছিলেন? যদি তাই হয়, তবে আপনাকে কতবার চেষ্টা করতে হয়েছে?
৩। আপনার এলাকায় এটিএম/ব্যাঙ্কে যথেষ্ট পরিমাণে টাকা সরবরাহ হয় কি?
৪। আপনার এলাকায় কি স্থানীয় মুদিখানা, চায়ের দোকান, সব্জির দোকান, ক্যান্টিন, দুধের দোকান, স্কুল ইত্যাদি নগদ ছাড়া পেমেন্ট নেয়? নগদহীনভাবে পেমেন্ট দেওয়ার আপনার কি কোনো উপায় আছে?
৫। কোনো ডিলার/দালাল কি আপনার পুরনো ৫০০ টাকা বা ১০০০ টাকার নোট পাল্টে দেওয়ার বিনিময়ে কম টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে?
৬। নোট বাতিলের জন্য আপনি কি কি অসুবিধার মধ্যে পড়েছেন?
(ক) পুরনো টাকাতেই কি আপনার মজুরি মেটানো হচ্ছে?
(খ) নোট বাতিল কি আপনার দৈনন্দিন যাতায়াত, অাপনার খাদ্য ও অন্যান্য অভ্যাসকে ধাক্কা দিয়েছে? আপনাকে কি কম খেয়ে থাকতে হয়েছে?
(গ) আপনার কাছে উপযুক্ত পরিমাণে নতুন টাকা না থাকার জন্য হাতপাতাল কি আপনাকে বা আপনার নিয়ে যাওয়া রোগীকে চিকিৎসা করতে অস্বীকার করেছে বা ওষুধের দোকান ওষুধ দিতে অস্বীকার করেছে?
(ঘ) ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়াবার জন্য আপনার কি মজুরি কাটা গেছে? যদি তাই হয় তাহলে আপনার কতদিন মজুরি কাটা গেছে?
(ঙ) নোট বাতিলের ফলে আপনার পরিবারে বা কর্মজীবনে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ কি নষ্ট হয়েছে -- যেমন বিবাহ অনুষ্ঠান, কাউকে হাসপাতালে ভর্তি করা, কোথাও যাওযার কাজ, চাষের জন্য বীজ কেনা ইত্যাদি?
(চ) আপনার প্রাত্যহিক প্রয়োজন মেটাতে নতুন ২০০০ টাকার নোট ব্যবহার করতে আপনার কি কোনো অসুবিধা হয়েছে?
৭। নোট বাতিলজনিত কষ্টের জন্য দায়ী কোনটা?
(ক) কালো টাকার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এটা প্রয়োজনীয় আত্মত্যাগ
(খ) এর কারণ হল সরকারের পরিকল্পনার ঘাটতি এবং সাধারণ মানুষদের জন্য উদ্বেগের অভাব
৮। আপনার কাছে নিম্নলিখিত দুটির মধ্যে কোনটা ঠিক বলে মনে হয়?
(ক) পুরনো ৫০০/১০০০ টাকার নোট বাতিল করা এবং ২০০০ টাকার নোট সরবরাহ করার মধ্যে দিয়ে দুর্নীতি ও জাল টাকাকে নির্মূল করা যাবে এবং সন্ত্রাসবাদী চক্রকে পঙ্গু করে দেওয়া যাবে
(খ) দুর্নীতিগ্রস্তদের পক্ষে কালো টাকা মজুত করার জন্য ২০০০ টাকার নোট সুবিধাজনক, ২০০০ টাকার নোটে অতিরিক্ত কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই ও সহজেই জাল হতে পারে এবং সন্ত্রাসবাদীদের হাতে এই নোট ইতিমধ্যেই দেখা গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে
৯। আপনার মতে এই নোট বাতিল সবচেয়ে বেশি কাদের আঘাত করেছে?
(ক) অতি ধনী ও দুর্নীতিগ্রস্তদের
(খ) গরিব ও সাধারণ মানুষদের
১০। নোট বাতিলের পদক্ষেপ সম্পর্কে আপনার মতামত কি?
(ক) উদ্দেশ্য ভালো, কিন্তু বাস্তবায়নের ধরন খারাপ
(খ) রাজনৈতিক চমক, যা উল্টো ফল দিয়েছে
(গ) এর উদ্দেশ্য হল নগদহীন অর্থনীতিকে উৎসাহিত করে ব্যক্তিগত আর্থিক গোপনীয়তাকে মুছে দিয়ে পেটিএম/বিগ বাজারের মতো কর্পোরেটদের সুবিধা করে দেওয়া; ছোট ব্যবসায়ী, দোকানদার ও গরিবদের আঘাত করা।