প্রকাশক :
সিপিআই(এমএল) লিবারেশন
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
২১/১/১ ক্রীক রো, কলকাতা - ১৪
সিঙ্গুরের কৃষক আন্দোলনকে ব্যবহার করে কৃষকদরদী সেজেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। ৩১ আগস্ট ২০১৬, সর্বোচ্চ আদালত কারখানা ভেঙ্গে জমি কৃষকদের ফিরিয়ে দিতে বলার ৬ মাসেরও কম সময়ে এ রাজ্যের বিদ্যালয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছে গেছে অষ্টম শ্রেণীর ইতিহাস বই। এই পাঠ্যপুস্তকটিতে সংযোজিত হয়েছে সিঙ্গুর অধ্যায়, যার সিঙ্গুর সংক্রান্ত আলোচনার মোট ছয় পৃষ্ঠায় মুখ্যমন্ত্রীর ছবি পাঁচটি। এই ইতিহাসে উপেক্ষিত হয়েছেন সংগ্রামী কৃষকরা, উদ্ভাসিত হয়েছেন মমতা ব্যানার্জী ও তাঁর অনুগতরা। সিঙ্গুর আন্দোলনের বহু বর্ণের, বহু মাত্রার ইতিহাসকে তৃণমূলী রং-এ রঞ্জিত করে উপস্থাপিত করেছেন মুখ্যমন্ত্রীর স্নেহধন্যরা।
এ প্রসঙ্গে আসুন স্মরণ করি সিঙ্গুরকেই।
২০০৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর সিঙ্গুরে এক জনসভায় সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য বলেছিলেন, “... তাঁরা নেতারা ভেবেছিলেন, এখানে শিল্পপতিদের জমি দিতে গেলে কেউ বিরোধিতা করবে না, কেউ শব্দ করবে না। কিন্তু তাঁদের ‘থ’ বানিয়ে দিয়ে সিঙ্গুরের কৃষকরা শব্দ করছেন। সিঙ্গুরের কৃষকদের উপর অত্যাচার চালালে শুধু রক্তগঙ্গা বইবে না, যে রক্তস্রোতের সৃষ্টি হবে তাতে বামফ্রন্ট সরকার ভেসে যাবে, রাইটার্সের লালবাড়ি ভেসে যাবে।” বাস্তবে এটাই ঘটেছিল। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মতোই সিঙ্গুরের এই ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে নারাজ বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীও। এ কারণে সিঙ্গুরের প্রকৃত ইতিহাসকে তিনি আড়াল করতে চাইছেন, বিকৃতভাবে উপস্থাপিত করতে চাইছেন। অন্যদিকে ভাঙড়ে আন্দোলনকারী কৃষকদের উপর চাপিয়ে দিচ্ছেন ইউএপিএ সহ অসংখ্য ধারায় মিথ্যা মামলা। আরাবুল, সব্যসাচীদের পাঠিয়ে হত্যা করছেন মফিজুল, আলমগীরদের। সিঙ্গুরের ইতিহাস আজ এভাবে ভাঙড়-পর্বে প্রবেশ করেছে।
সিঙ্গুরের প্রতারণা, ভাঙড়ের প্রতারণার এই পথ ধরেই বাংলা আজ নতুন বর্গী হামলার মুখোমুখি। বিজেপির এই নয়া বর্গীরা রাম-রহিমে যুদ্ধ বাধাতে চায়। কৃষক ঐক্যের বাতাবরণে ফাটল ধরাতে চায়। নতুন জমি অধিগ্রহণ আইন ২০১৩-তে কৃষকরা রক্ত-ঘামের বিনিময়ে যেটুকু অধিকার ছিনিয়ে এনেছে, এদেরই কেন্দ্রীয় স্তরের নেতারা সেটুকুও খারিজ করতে চায় – এই অশুভ উদ্দেশ্যে দফায় দফায় অর্ডিন্যান্স জারি করে। এরাই নতুন ভূমি আইন বাতিলের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে সংসদে।
জটিল এই প্রেক্ষাপটে প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার দায়বদ্ধতা অনুভব করি আমরা। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই এই পুস্তিকার পরিকল্পনা।
সাম্প্রতিক সময়ে শিল্পায়নের নামে কৃষিজমি দখলের বিরুদ্ধে কৃষক প্রতিরোধের অন্যতম নাম সিঙ্গুর। ২২ মে ২০০৬ কারখানা স্থাপনের লক্ষ্যে সরেজমিনে জমি দেখতে আসা সরকারী আধিকারিক সহ টাটা কোম্পানির প্রতিনিধিদের ঝাঁটা হাতে গ্রাম থেকে বিতাড়িত করেছিলেন কৃষিজীবী মহিলা-পুরুষরা। প্রতিবাদের এই একুশ শতকী বজ্রনির্ঘোষে চমকে উঠেছিল গোটা দেশ। অনেক লড়াই, অনেক আত্মত্যাগের এক দশক পর ৩১ আগস্ট ২০১৬ এদেশের সুপ্রীম কোর্টেও মান্যতা পেল এই আন্দোলনের ন্যায্যতা। আলোড়ন ফেলা রায়ে আদালত জানাল, সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণ অবৈধ ছিল, নির্দিষ্ট সময়সীমা মেনে তিন মাসের মধ্যে পূর্বাবস্থায় ৯৯৭.১১ একর কৃষিজমি কৃষকদের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে। কৃষকরা ইতিমধ্যে জমির দলিলপত্র ফিরে পেয়েছেন। একাংশে ফসল উৎপাদনও শুরু হয়েছে। যদিও মূল কারখানা যে জমিতে নির্মিত হয়েছিল, সেই অংশ এখনও চাষযোগ্য করতে পারেনি সরকার। সব মিলিয়ে গণআন্দোলনের ক্ষমতা ও তাৎপর্য বিষয়ে সিঙ্গুর এক চমৎকার উদাহরণ।
২০০৬ সালের ১৮ মে এক প্রেস বিবৃতিতে টাটা গোষ্ঠী জানিয়েছিল যে সিঙ্গুরে তারা একলাখি ন্যানো মোটর গাড়ির কারখানা গড়বে। রাজ্য মন্ত্রীসভা বা রাজ্য বিধানসভা কেউই জানত না এই সিদ্ধান্তের কথা। ৩১ মে রাজ্য মন্ত্রীসভা সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। ২ বছরের অধিক সময়ের কৃষক আন্দোলন চলে। পরবর্তীতে ২০০৮ সালের ৭ সেপ্টেম্বর টাটা গোষ্ঠী প্রেস বিবৃতিতে জানায় তারা সিঙ্গুর প্রকল্প সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছে। ২৬ সেপ্টেম্বর রাজ্য মন্ত্রীসভা টাটাদের সিঙ্গুর ছেড়ে ‘চলে না যাওয়ার’ আর্জি জানায়। ৩ অক্টোবর রতন টাটা প্রেস কনফারেন্সে সিঙ্গুর পরিকল্পনা‘পরিত্যক্ত’ বলে ঘোষণা করেন। পরবর্তী সময়ে প্রায় ৮ বছর শুধুমাত্র অাদালতে মামলা ঝুলে থাকার পর ৩১ আগস্ট ২০১৬ সুপ্রীম কোর্টের রায়ে কারখানা ভেঙ্গে কৃষকদের জমি ফেরতের নির্দেশ দেওয়া হয়।
বিস্তৃত এলাকা জুড়ে নির্মিত আস্ত একটা কারখানা ভাঙার বিরুদ্ধে ছিলেন কেউ কেউ। সিঙ্গুরে কৃষিজমিতে শিল্প স্থাপনের পক্ষে যারা, স্বভাবতই তারা ছিলেন কারখানা ভাঙার বিরুদ্ধে। এমন কিছু মানুষও ছিলেন, যারা কারখানা না ভেঙে এবং অতীত তিক্ততা ভুলে কোনো একটা সমাধানে আসার পক্ষপাতী ছিলেন। অন্যদিকে ছিলেন কৃষক জনগণ ও গণতন্ত্র সচেতন অসংখ্য মানুষ, যারা বন্দুকের ডগায় নির্মিত রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট বহুজাতিকের এই বলদর্পী নির্মাণ ভেঙে দেওয়ার মধ্যে শেষপর্যন্ত ‘শুভের জয় ও অশুভর পরাজয়’কে প্রত্যক্ষ করলেন।
বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ সরকার সিঙ্গুর আন্দোলনকে ২০১৭ বর্ষ থেকে অষ্টম শ্রেণীর পাঠ্যসূচীভুক্ত করেছে। ‘সমকালীন ইতিহাসের’ এই পাঠ্যসূচীভুক্তির সমর্থক বহু মানুষ; বিরোধীরাও আছেন। এ রাজ্যের অষ্টম শ্রেণীর ইতিহাসে তেভাগা আন্দোলন, তেলেঙ্গানার সংগ্রামকে পাঠ্যভুক্ত করেছিল পূর্বতন বাম সরকার। খাদ্য আন্দোলন ও নকশালবাড়ির কৃষক সংগ্রামকে পাঠ্যসূচীভুক্তির দাবি থাকলেও তৎকালীন সরকার বিবেচনা করেনি। পশ্চিমবঙ্গের সীমানা ছাড়িয়ে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল “বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ” নকশালবাড়ি। দেশকে দারিদ্র-বঞ্চনা-শোষণ মুক্ত করতে স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম আন্তরিক প্রচেষ্টা ছিল নকশালবাড়ির আন্দোলনে। একদিকে কৃষকদের জাগরণ অন্যদিকে হাজার হাজার ছাত্র-যুব এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঘর ছেড়েছিলেন নতুন ভারতবর্ষ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে। এই আত্মাহুতি ঘিরে রচিত হয়েছে হাজারো নাটক, কাব্য-গান। আজও নকশালবাড়িকে নিয়ে সাংস্কৃতিক সৃজন অব্যাহত। পূর্বতন বাম আমলে অবশ্য পাঠ্যসূচীভুক্ত হয়নি এই কৃষক জাগরণ, গণতান্ত্রিক অভ্যুত্থান। সম্ভবত রাজনৈতিক কারনেই।
ইতিহাসের স্রষ্টা জনগণ। কৃষক জনগণের সিঙ্গুর আন্দোলনের পাঠ্যসূচীভুক্তি প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত। কিন্তু যেভাবে এই ইতিহাসকে উপস্থাপিত করা হয়েছে, তা “ইতিহাস বিকৃতি ও রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্টতার অন্যতম নিদর্শন” বলে অভিযোগ উঠেছে। নন্দীগ্রাম কেন সিঙ্গুরের সাথে অন্তর্ভুক্ত হল না সঙ্গতভাবে সে প্রশ্নও উঠেছে। একদল আছেন যারা সিঙ্গুরের এই স্বীকৃতির ঘোর বিরোধী। বামফ্রন্ট সরকারের আমলেই সিঙ্গুরে কৃষক উচ্ছেদ করে টাটা গোষ্ঠীর কারখানা নির্মিত হয়। সম্ভবত সিপিএমের অনেকেই চান কৃষক জনগণের সাথে দলের এই বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাসকে আড়ালে রাখতে। ঐ দলের গণসংগঠন এবিটিএ সিঙ্গুরের পাঠ্যসূচীর বিরোধিতায় জনমত সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে। গত ৯ মার্চ ২০১৭ এবিটিএ নেতৃত্ব এই উদ্দেশ্যে মৌলালী যুব কেন্দ্রে এক কনভেনশনও সংগঠিত করেন। ইতিমধ্যে এ রাজ্য আলোড়িত ভাঙড় ও ভাবাদিঘীর কৃষক আন্দোলনে। বিরোধী দল সিপিএম নতুন পর্বের এই কৃষক আন্দোলনগুলোর সাথে নিজেদের যুক্ত করতে যথাসাধ্য চেষ্টা চালাচ্ছে। এ সময় সিঙ্গুর আন্দোলন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি তাদের রাজনৈতিক
স্বার্থের অনুকূলে নয়, কারণ সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন উঠবে ভাঙড়-ভাবাদিঘীর কৃষক আন্দোলন যদি ন্যায়সঙ্গত হয়, সিঙ্গুরের কৃষকরা সেদিন কোন অপরাধ করেছিলেন “জীবিকা-সংস্কৃতি-গণতন্ত্র” রক্ষায় পথে নেমে। পরিস্থিতি এভাবেই উন্মোচিত করে স্ববিরোধিতা।
কৃষক আন্দোলনের অভিঘাতে ক্ষমতা হারানো সিপিএম পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াতে ও জনমনে হারানো বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরে পেতে ‘ভুল স্বীকার’ করে। সিপিএম দলের কেন্দ্রীয় দলিলে উল্লিখিত হয়, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের ঘটনায় গোটা দেশে পার্টির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রভাত পট্টনায়ক, অশোক মিত্রের মতো পার্টির ঘনিষ্ঠ বুদ্ধিজীবীরা সিঙ্গুরে বাম সরকারের ভূমিকায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ভুল স্বীকার করলেও পার্টি নেতৃত্বের স্বীকারোক্তি নীতিগত নয় কেবল বহিরঙ্গে, এটা আবার স্পষ্ট হল সিঙ্গুর নিয়ে এবিটিএ-র অবস্থানে। এই ভাঙড়-পর্বেও এরা মনে মনে বিশ্বাস করে যে অঙ্গরাজ্যের অধীশ্বর বামফ্রন্ট সরকার ‘মহান’ উদ্দেশ্যেই সিঙ্গুরে কৃষক উচ্ছেদ চেয়েছিল, কৃষকদের আত্মত্যাগে এগোত দেশ। একটু ধৈর্য্য ধরে করলে সিঙ্গুরের উচ্ছেদ কৃষকদের ভালোর জন্যই হত। আশ্চর্য স্ববিরোধিতা। আজও কেন জনগণ সিপিএম-কে বিশ্বাস করতে পারছে না, এর উৎসও সম্ভবত এখানেই।
এই প্রেক্ষাপটে সিঙ্গুর আঐন্দোলন তার স্বরূপ ও শিক্ষাগুলি আর একবার ফিরে দেখা প্রয়োজন।
২০০৬ সালের মে মাসে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় (বিধানসভায় ২৯৪ আসনের মধ্যে ২৩৫ আসনে জয়লাভ) ক্ষমতায় পুনপ্রতিষ্ঠিত বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের উন্নত বাম সরকার ‘নয়া অর্থনৈতিক নীতি’র সুযোগকে কাজে লাগাতে সিঙ্গুরের ১০০০ একর কৃষিজমিতে বহুজাতিক টাটা কোম্পানির ন্যানো মোটর গাড়ি কারখানা নির্মাণ করতে চাইল। শুরুতেই ২২ মে ২০০৬ এই প্রচেষ্টা গণরোষের মুখোমুখি হল। কৃষিজীবী মহিলাদের গণপ্রতিরোধের মুখে ফিরতে হল টাটা গোষ্ঠী ও রাজ্য সরকারের প্রতিনিধিদের। শুরু হল কৃষক আন্দোলন। গড়ে উঠল কৃষিজমি রক্ষা কমিটি, তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বে। এই কমিটির বাইরে থেকে আন্দোলনে সক্রিয় ছিল সিপিআই(এমএল) লিবারেশন। ২৫ সেপ্টেম্বর জমি দখলের প্রতিবাদে বিডিও অফিসের সামনে কয়েক হাজার কৃষকের শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচী চলছিল কৃষিজমি রক্ষা কমিটির ডাকে। পরদিন ভোর রাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে অন্ধকারে নেমে এল পুলিশের অত্যাচার। মারা গেলেন ২১ বছরের কৃষিমজুর যুবক রাজকুমার ভুল। আন্দোলন এতে থামল না। সিপিআই(এমএল) ও এসইউসিআই যৌথভাবে ২৯ সেপ্টেম্বর বনধ সফল করল সিঙ্গুরের মাটিতে, অত্যাচারের প্রতিবাদে।
কৃষকদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ আন্দোলন দেখেও পিছু হটতে রাজি হল না বুদ্ধবাবুর নেতৃত্বাধীন সরকার। জমি দখলের লক্ষ্যে বাড়তে থাকল প্রশাসনিক তৎপরতা। এপিডিআর সহ কিছু সংগঠনের উদ্যোগে কৃষিজমি রক্ষা কমিটি ও সংহতি কমিটির ব্যানারে ২৭ অক্টোবর গোপালনগর গ্রামে হাজার হাজার কৃষকের উপস্থিতিতে সংগঠিত হল গণশুনানি। মহাশ্বেতা দেবী, দীপঙ্কর চক্রবর্তী, মেধা পাটকর, বিচারপতি মলয় সেনগুপ্তর পরিচালনায় গণশুনানি তার রায়ে সিঙ্গুরের কৃষিজমিতে কারখানা স্থাপন বাতিল করে টাটাদের অন্য জমি দিতে সরকারকে আহ্বান জানায়। চাষের জমি, কৃষক ও গণতন্ত্র বাঁচানোর আবেদন জানায়।
রাজ্য সরকার কোনো প্রতিবাদেই কর্ণপাত করল না। টাটা ও রাজ্য সরকারের এই যৌথ জমি হামলায় সমর্থন জানায় আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠী। এই পরিস্থিতিতে জমি দখল রুখতে বাজেমেলিয়া, গোপালনগর, বেড়াবেড়ি, খাসের ভেড়ি, সিংহের ভেড়ি, দোবাঁধিতে কৃষকরা ক্যাম্প করে জমি পাহারা শুরু করল। বাজেমেলিয়ার বারো হাত কালিতলায় এমনই একটি ক্যাম্প সংগঠিত করে সারা ভারত কৃষিমজুর সমিতি এবং পশ্চিমবঙ্গ কৃষক সমিতি। ২ ডিসেম্বর জমি দখলের লক্ষ্যস্থির করল রাজ্য সরকার। অনেক আগে থেকে জারি করা হল ১৪৪ ধারা। সারা বাংলা থেকে পুলিশ এনে আন্দোলনকারী কৃষকদের ‘আউট নাম্বারড’ করতে চাইল সরকার। মাইক নিয়ে ঘোষণা করল সিঙ্গুরে ‘বহিরাগত’দের প্রবেশ নিষেধ। এসব সত্ত্বেও ১ ডিসেম্বর আগের দিনই সিঙ্গুরে উপস্থিত থাকল সিপিআই(এমএল)-এর কয়েকজন রাজ্য কমিটি সদস্য এবং ছাত্র সংগঠন এআইএসএ-র নেতৃত্ব সহ যাদবপুর ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু ছাত্র। হাজার হাজার কৃষক জমি দখল রুখতে মাঠে নামলেন। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্ব কৃষকদের প্রতিরোধ থেকে সরিয়ে আনতে চাইল, পিছু হটার পরামর্শ দিল নেতারা। কিন্তু কৃষকরা এই পরামর্শ না মেনে আন্দোলনে এগিয়ে গেলেন। পুলিশের দ্বারা কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট, ধানের গোলা জ্বালিয়ে দেওয়া, বাড়ি বাড়ি পুলিশী জুলুম, নির্বিচার গ্রেপ্তারি (৪৯ জন গ্রেপ্তার হন) চলল। গ্রেপ্তার হলেন বর্গাদার কন্যা দীপা মিত্র, গণআন্দোলনের কর্মী রাংতা মুন্সী, সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের রাজ্য স্তরের কৃষক নেতা তপন বটব্যাল প্রমুখ।
একদিকে গ্রামগুলি জুড়ে ৠাফ ও ব্যাপক পুলিশের উপস্থিতিতে হাজার একর কৃষিজমি ঘিরে চলল টাটার প্রাচীর নির্মাণ অন্যদিকে নির্মীয়মান প্রাচীর ঘিরে চলল কৃষক বিক্ষোভ, অবস্থান কর্মসূচী। আন্দোলনকারীদের প্রধান ভূমিকায় ছিলেন হাজার হাজার মহিলা। মেয়েদের ভয় দেখাতে টাটার প্রাচীরের রাতপাহারাদারদের দিয়ে ১৮ ডিসেম্বর নির্মীয়মান প্রাচীরের মধ্যে ভোররাতে ধর্ষণ করে পুড়িয়ে মারা হল বর্গাদার কন্যা -- আন্দোলনের অন্যতম মুখ তাপসী মালিককে। প্রতিবাদে সিঙ্গুর জুড়ে বিরাট মিছিল সংগঠিত হল ঐদিনই, নেতৃত্ব দেন সারা ভারত প্রগতিশীল মহিলা সমিতি ও এসইউসিআই সংগঠকরা। ১৯ ডিসেম্বর তাপসীর বাড়ি গিয়ে সংহতি জানালেন মেধা পাটকর।
কৃষক প্রতিরোধের এই কঠিন দিনগুলিতে প্রয়োজন ছিল সিঙ্গুরের মাটিতেই কৃষকদের জমি পুনর্দখল আন্দোলনকে শক্তিশালী করা। নন্দীগ্রাম সেই পথ দেখিয়েছিল। অন্যদিকে রাজ্য স্তরেও আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়া দরকার ছিল। সিঙ্গুরের মাটিতে প্রতিরোধের পাশাপাশি ধর্মতলায় অনশন অবস্থানে বসেন সিপিআই(এমএল)-এর নেতৃবৃন্দ। কিন্তু সিঙ্গুরে মাটিতে না থেকে নিরাপদ দূরত্বে ধর্মতলায় অনশনে বসলেন বিরোধী নেত্রী মমতা ব্যানার্জী। কৃষিজমি রক্ষা কমিটির প্রধান নেতৃত্ব তৃণমূল কংগ্রেসের এই পশ্চাদাপসারনের সুযোগ নিয়ে ৠাফ ও পুলিশ দাঁড় করিয়ে ২১ জানুয়ারী ২০০৭ টাটারা সুউচ্চ প্রাচীর ঘেরা জমিতে কারখানার নির্মাণ কাজ শুরু করল। মমতা ব্যানার্জীরা এ সময়ে সিঙ্গুরের আন্দোলনরত কৃষকদের নীরব দর্শকে পরিণত করতে চাইলেন। প্রধান বিরোধী দলের এই ভূমিকায় উৎসাহিত রাজ্য সরকার রাজ্যের অন্যত্রও শিল্পায়নের নামে কৃষিজমি দখলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। রাজ্য সরকারের টার্গেট এক লক্ষ পঁচিশ হাজার একর জমি। ২০০৬ ডিসেম্বরের মধ্যে নোটিশ জারি হয়ে গেল ৪০,০০০ একরের। নন্দীগ্রাম, হরিপুর, বারুইপুর, বারাসাত – সামনে আসতে লাগল নতুন নতুন নাম। হরিপুর সোচ্চার হল পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে। ৭ জানুয়ারী ২০০৭, ভরত মণ্ডল সহ ৩ জনকে হত্যার বিরুদ্ধে আন্দোলনে ফেটে পড়ল নন্দীগ্রাম। ১৪ মার্চ নন্দীগ্রাম গণহত্যার ঘটনায় চমকে উঠল গোটা দেশ। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধী ‘হাড় হিম করা সন্ত্রাস’-এর নিন্দায় মুখর হলেন। কলকাতায় সংগঠিত হল ঐতিহাসিক মহামিছিল।
সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম-লালগড়ের কৃষক আন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করলেন মমতা ব্যানার্জী। চমকের রাজনীতিতে অভ্যস্ত মমতা ব্যানার্জী ক্ষমতায় বসেই ২০১১ সালের জুনে বিধানসভায় পাশ করালেন সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন বিষয়ে বিল। যথাযথ দায়বদ্ধতার অভাবে আইনি অসঙ্গতিতে ভরা থাকল বিলটি। পরিণতিতে টাটাদের দায়ের করা মামলায় কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ খারিজ করল বিলটিকে। কৃষকরা সুপ্রীমকোর্টে জমি ফেরতের দাবিতে মামলা করলেন। মামলা পিছতে থাকল বছরের পর বছর। রাজ্যে সরকার বদল করেও জমি ফেরত না পেয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে উঠলেন কৃষকরা। মমতা ব্যানার্জী সিঙ্গুর যাওয়া বন্ধ করলেন। বললেন ‘কিছু করার নেই, জমি ফেরতে ৫০ বছরও লাগতে পারে’। মুখ্যমন্ত্রী সম্পর্কে দ্রুত মোহভঙ্গের পথে এগোতে থাকলেন কৃষক জনগণ। এমন সময়ই ৩১ আগস্ট ২০১৬ সুপ্রীম কোর্ট রায় প্রকাশ করল। জয় হল কৃষকদের।
ইতিহাস বই গৌরবান্বিত করেছে টিএমসির ভুমিকাকে, উপেক্ষিত বিরোধী অন্যান্য মুখ্য আন্দোলনকারীরা
“সুপ্রীম কোর্টের নির্দেশ যা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সিঙ্গুর অবস্থানকে বৈধতা দিয়েছে, সেই নির্দেশের ৬ মাস আগেই সিঙ্গুরে তৃণমূল কংগ্রেসের নানা সাফল্যের বিবরণ সমৃদ্ধ অষ্টম শ্রেণীর ইতিহাস রাজ্যের সর্বত্রই শ্রেণীকক্ষে পৌঁছে গিয়েছে। অথচ এই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠন সিপিআই(এমএল) লিবারেশন, এসইউসিআই সহ অন্যরা যারা বর্তমানে মমতা বিরোধী -- তাদের ১০ পৃষ্ঠার সিঙ্গুর অধ্যায় থেকে আশ্চর্যজনকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। ... ... অধ্যায়টির শিরোনাম ‘জমি, জল, জঙ্গল : জীবন জীবিকার অধিকার ও গণঅান্দোলন’-এর কেন্দ্রবিন্দুতে প্রায় সম্পূর্ণভাবেই সিঙ্গুরে মমতার ভূমিকা। সিঙ্গুরের উপর ৬টি পৃষ্ঠার ৫টিতে রয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি, বাকি ৪ পৃষ্ঠায় তেভাগা, তেলেঙ্গানা, চিপকোর মতো আন্দোলনের বর্ণনা রয়েছে।” – ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ২২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭
বিপ্লবী বামপন্থার স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখেই সিপিআই(এমএল) লিবারেশন সিঙ্গুর আন্দোলনে হস্তক্ষেপ করে। কৃষিজমি রক্ষা কমিটিতে তৃণমূল কংগ্রেসের একাধিপত্যের কারণে এই কমিটির মধ্যে স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখা সম্ভব নয়, এটা বুঝেই কমিটির অন্তর্ভুক্ত হয়নি সিপিআই(এমএল)। বাইরে থেকেই স্বাধীনভাবে আন্দোলন সংগঠিত করতে থাকে এবং কৃষক আন্দোলনের সংহতিতে ভূমিকা রাখে। এই অবস্থানকে সেদিন কেউ কেউ বাম সংকীর্ণতাবাদ বলে চিহ্নিত করেন। সেদিন যারা সিপিএমের মধ্যে ‘সামাজিক ফ্যাসিস্ট’ শক্তিকে প্রত্যক্ষ করে মমতা ব্যানার্জীদের হাত ধরতে দ্বিধা করেননি, পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে তাঁরাই আজ মমতা ব্যানার্জীর মধ্যে সেই ফ্যাসিস্টকেই প্রত্যক্ষ করছেন – কেবল সিঙ্গুরের বদলে ভাঙড়ে।
১। এটা ঠিক যে পরিস্থিতি সব সময় সোজাসাপটা থাকে না। উদ্ভুত পরিস্থিতির জটিলতায় সিপিআই(এমএল) লিবারেশন সংগ্রামের ময়দানে কৃষকদের সাথে এক থেকেও তার নিজের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা একই সাথে রক্ষা করেছিল।
২। জমি রক্ষা কমিটির বাইরে থেকে কৃষক আন্দোলনে ধারাবাহিক হস্তক্ষেপের কাজটি খুব সহজ সরল ছিল না। কৃষক জনগণ সহ গ্রামীণ মেহনতিদের সাথে সংগঠনের একাত্মতাই কঠিন কাজকে অনেকাংশে সহজ করে দেয়। প্রথম থেকেই সিপিআই(এমএল) সংগঠকদের কয়েকজন নীরব পরিকল্পনায় কাজটি এগিয়ে নিয়ে যান।
কৃষকদের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলিতে সিপিআই(এমএল) সর্বদা কৃষকদের পাশে ছিল। ১৮ মে ২০০৬ টাটাগোষ্ঠী সিঙ্গুরে কারখানা গড়ার কথা প্রেস বিবৃতিতে জানায়। ২২ মে সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত খবরটি মহিলাদের প্রতিরোধে আরও সামনে আসে। দ্রুতই সিপিআই(এমএল)-এর গণসংগঠন এআইএএলএ এবং আইপোয়া অধিগ্রহণের প্রতিবাদে ৩০ মে চূঁচূড়ায় জেলাশাসকের কাছে ডেপুটেশন দেয় এবং কৃষকদের মনোবল যোগাতে ৪ জুন সিঙ্গুরে পদযাত্রা সংগঠিত করে। এরপর ২২ জুন সিঙ্গুর স্টেশন চত্বরে ১২ ঘণ্টা ব্যাপী গণঅবস্থান ও বিডিও ডেপুটেশন কর্মসূচীর ডাক দেয়। ৯ জুলাই ৩ বিপ্লবী কমিউনিস্ট সংগঠন – সিপিআই(এমএল) লিবারেশন, কানু সান্যালের নেতৃত্বাধীন সিপিআই(এমএল) এবং সিপিআই(এমএল) এনডি যৌথভাবে সিঙ্গুর পদযাত্রা করে। এই তিন সংগঠন ১৮ আগস্ট স্টুডেন্টস হলে গণকনভেনশন সংগঠিত করে। পরবর্তী ৩ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গ গণসংস্কৃতি পরিষদ সিঙ্গুরে পদযাত্রা ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচী গ্রহণ করে। ২ দিন পরই ৫ সেপ্টেম্বর তিন শ্রমিক সংগঠন – এআইসিসিটিইউ, আইএফটিইউ এবং মজদুর ক্রান্তি পরিষদ সিঙ্গুরে যৌথভাবে পদযাত্রায় অংশ নেয়। এরপর ১৪ সেপ্টেম্বর হাজার হাজার সমর্থক জনগণকে সামিল করে সিপিআই(এমএল) লিবারেশন সিঙ্গুর অভিযান করে। কয়েক হাজার কর্মী-সমর্থক, আন্দোলনকারী কৃষকদের সমাবেশে সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য এবং তৎকালীন রাজ্য সম্পাদক কার্তিক পাল সহ নেতৃবৃন্দ সিঙ্গুরে টাটাগোষ্ঠীর ও বাম সরকারের জমিখেকো আঁতাত রুখে দিতে সিঙ্গুরের কৃষকদের হিম্মতকে সাবাশ জানান।
এরপর ঘটে ২৫ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। কৃষিজমি রক্ষা কমিটির ডাকে কয়েক হাজার কৃষক ঐদিন সিঙ্গুর বিডিও অফিসে ধর্ণায় বসেছিল। ভোররাতে পুলিশী সন্ত্রাস নেমে আসে। শহীদ হন কৃষিমজুর যুবক রাজকুমার ভুল। প্রতিবাদে ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ৯ অক্টোবর টানা কর্মসূচী গ্রহন করে সংগঠন। ২৬ সেপ্টেম্বর গ্রামে গ্রামে ঘুরে কৃষকদের সংহতি জানায় সিপিআই(এমএল) প্রতিনিধি দল। ২৭ সেপ্টেম্বর সিপিআই(এমএল) ও এসইউসিআই সিঙ্গুর বনধ সংগঠিত করে। ২৮ সেপ্টেম্বর জেলাশাসক দপ্তরের সামনে ১২ ঘণ্টার গণঅবস্থান চলে। ঐদিনই বিপ্লবী কমিউনিস্ট সংগঠনগুলির নেতৃবৃন্দ সংগ্রামী কৃষকদের সাথে গ্রামে এবং হাসপাতালে সাক্ষাত করেন। জেলবন্দিদের সাথেও দেখা করেন। ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১ অক্টোবর এআইএসএ সংগঠকরা সিঙ্গুরের বাড়ি বাড়ি প্রচার সংগঠিত করেন। ১ অক্টোবর ‘পিপলস হেলথ’ ও ‘উৎস মানুষ’-এর চিকিৎসকরা আহত কৃষকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা করেন। ২ অক্টোবর শহীদ রাজকুমার ভুলের শহীদ স্মরণ কর্মসূচীতে সামিল হয় এআইএসএ। এই পর্বে ৯ অক্টোবর সিপিআই(এমএল) লিবারেশন, সিপিআই(এমএল) নিউ ডেমোক্রেসি ও কানু সান্যাল নেতৃত্বাধীন সিপিআই(এমএল)-এর ডাকে সফল হয় বাংলা বনধ।
৩। 'অপারেশন বর্গা’র পার্টি সিপিএম নেতৃত্বাধীন সরকার ১৮৯৪ সালের অাইন অক্ষরে অক্ষরে মেনেই সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণের পথে এগোচ্ছিল। ফলে জমির মালিকরা ক্ষতিপূরণ পেলেও জমিতে বর্গাদারদের অধিকারকে অস্বীকার করা হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে বর্গাদারদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কৃষিমজুর সমিতি ও কৃষক সমিতি সহ যুব সংগঠন আরওয়াইএ ও ছাত্র সংগঠন এআইএসএ-র উদ্যোগে বাজেমেলিয়ার দরিদ্র বর্গাদার জয়দেব মালিককে দিয়ে অধিগৃহীত জমিতে লালঝাণ্ডা পোঁতা হয়। অধিগৃহীত জমিতে বর্গাদারদের প্রতীকি অধিকার প্রতিষ্ঠার এই উদ্যোগ ব্যাপক প্রচার পায়। শাসকদলের মধ্যেও ‘অপারেশন বর্গার পার্টির ভাবমূর্তি রক্ষা’ সংক্রান্ত সংকট তৈরি হয়। সরকার তড়িঘড়ি বর্গাদারদের জন্য ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ ঘোষণা করলেও অনথিভু্ক্ত বর্গাদারদের অস্বীকার করা হয়।
দৈনিক স্টেটসম্যান কাগজে মহাশ্বেতা দেবী লিখলেন -- ‘সিঙ্গুরে আনরেকর্ডেড বর্গাদাররা কিছুই পাবেন না, কেননা তাঁদের কোনো আইনগত স্বীকৃতি নেই। সংখ্যায় এরা বেশি, আর রেকর্ডেড বর্গাদাররা সংখ্যায় কম। ১৮৯৪-এর ব্রিটিশ প্রণীত আইনের পর ‘কৃষক’ নামটি ক্যাশ করে রাজ্য সরকার ‘তেভাগা’ প্রমুখ অনেক কৃষক আন্দোলনের ফসল ঘরে তুললেন, ক্ষমতা প্রতিপত্তি ইত্যাদি কত না তুলে নিজেরা অবস্থা গোছালেন, কিন্তু ভূমিসংস্কার শব্দটি ক্রমেই বিফল হল। বর্গাদারদের অতি অল্প অংশ কিছুটা পেল, অন্যদের অবস্থা?’
৪। জমি দখলের লক্ষ্যে সরকারী তৎপরতা বাড়তে থাকলে সারা ভারত কৃষিমজুর সমিতি ও পশ্চিমবঙ্গ কৃষক সমিতি জমি পাহারায় কৃষকদের উৎসাহিত করতে গোপালনগর বারো হাত কালিতলা মাঠে ক্যাম্প খুলে ৭ নভেম্বর থেকে অবস্থানে থাকে। এই ‘জমি বাঁচাও, কৃষি বাঁচাও’ ক্যাম্পের আদলে অন্যান্য গ্রামগুলিতে ক্যাম্প সংগঠিত করে কৃষক জনগণ। প্রতিরোধের লক্ষ্যে কৃষকদের প্রস্তুতি বাড়তে থাকে। এই সময় কৃষকদের আরও সংহত করতে এআইএএলএ ক্যাম্প সংলগ্ন মাঠেই সংগঠিত করে জনশুনানি।
৫। ২৯ নভেম্বর আন্দোলনরত গ্রামগুলি থেকে দুরে একটি বড় জনসভা সংগঠিত করে সিপিএম। জমি দখলের প্রস্তুতিতে এরপরই সরকার ঘোষণা করে সিঙ্গুর জুড়ে ১৪৪ ধারা, ‘বহিরাগত’দের সিঙ্গুর প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। বিরোধী নেত্রী মমতা ব্যানার্জী এসময় সিঙ্গুর এবং কলকাতা থেকে অনেক দূরে দলীয় কর্মসূচীতে। সরকারী নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সিপিআই(এমএল) রাজ্য সংগঠকদের কয়েকজন ও এআইএসএ নেতৃত্ব সিঙ্গুরে ১ ডিসেম্বরেই সমবেত হন। কৃষকদের সংগঠিত করেন। ২ ডিসেম্বর তৃণমূল নেতারা কৃষকদের প্রতিরোধ আন্দোলনে নামা দেখে পিছিয়ে আসতে পরামর্শ দেন। এসত্ত্বেও সিপিআই(এমএল) লিবারেশন সহ এপিডিআর ও অন্য কিছু গণসংগঠনের নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে হাজার হাজার কৃষক সরকারী বাহিনীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, গ্রেপ্তারবরণ করেন তপন বটব্যাল, রাংতা মুন্সীরা।
৬। ১৮ ডিসেম্বর ছিল আর এক কঠিন দিন। ধর্ষণ করে নিষ্ঠুরভাবে পুড়িয়ে মারা হয় আন্দোলনের মুখ তাপসী মালিককে। সেদিনও ছিলেন না তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ। গ্রামের মানুষ বিশেষত মহিলাদের একত্রিত করে এসইউসিআই সংগঠকরা এবং সিপিআই(এমএল)-এর মহিলা সংগঠন আইপোয়ার রাজ্য নেত্রী চৈতালী সেন প্রমুখের উদ্যোগে বিশাল প্রতিবাদ মিছিল দেখল সিঙ্গুর। সামিল হন সমাজকর্মী মধুছন্দা কার্লেকর সহ আরও অনেকে।
৭। ১৪৪ ধারা জারি ছিল সিঙ্গুরে। কৃষকদের সমস্ত প্রতিবাদ উপেক্ষা করে পুলিশী প্রহারায় পাঁচিল ঘেরা জমিতে কারখানার নির্মাণকাজ শুরু করে টাটা গোষ্ঠী। প্রতিরোধ কর্মসূচী গ্রহণ করে সিপিআই(এমএল), সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে। কর্মসূচীতে নেমে আসে পুলিশী দমন অভিযান, লাঠিচার্জ। সিপিআই(এমএল) সাধারণ সম্পাদক জমি দখল পূর্ববর্তী ১৪ সেপ্টেম্বরের হাজারো পার্টি সমর্থক ও কৃষক জনগণের সিঙ্গুর অভিযান কর্মসূচীতেও নেতৃত্বে ছিলেন। পরবর্তীতে জমি ফেরতে সুপ্রীম কোর্টের রায়কে স্বাগত জানিয়ে সংগঠিত ‘সিঙ্গুর চলো’ কর্মসূচীতেও নেতৃত্ব দেন সাধারণ সম্পাদক। নকশালবাড়ির কৃষক আন্দোলনের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির গর্ভেই জন্ম সিপিআই(এমএল)-এর। এ কারণেও সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য সহ পার্থ ঘোষ, কার্তিক পালরা বারবার সিঙ্গুর পৌঁছেছেন – আন্দোলনে এবং সংহতি উদ্যোগে।
১। সিঙ্গুর আন্দোলনকে ব্যবহার করে ‘কৃষক দরদী’ মমতা ২০১১ সালে সদ্য ক্ষমতায় বসেছেন। সিঙ্গুরের আন্দোলনকারীদের দাবিগুলি নিয়ে সিপিআই(এমএল) রাজ্য সম্পাদক পার্থ ঘোষের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধি দল সাক্ষাৎ করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর সঙ্গে। সিঙ্গুরে আন্দোলনকারীদের উপর থেকে মিথ্যা মামলাগুলি প্রত্যাহারের দাবি উঠল। তৎকালীন আইনমন্ত্রী মলয় ঘটককে ডেকে আনলেন মুখ্যমন্ত্রী, নির্দেশ দিলেন মামলা প্রত্যাহারের। পরবর্তীতে কেটে গেলে সাতটা বছর। মামলা প্রত্যাহারে বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেয়নি বর্তমান সরকার। এভাবেই সিঙ্গুরের কৃষকদের উপর মামলার জুজু অব্যাহত – আন্দোলনকারীদের চাপে রাখতে। মমতা ব্যানার্জীদের সম্পর্কে দোষারোপ যে মিথ্যা নয় বোঝা যায় যখন দেখি ভাঙড়ের আন্দোলনরত কৃষক ও নেতৃবৃন্দের উপর একের পর এক মিথ্যা মামলা, এমনকি ইউএপিএ ধারাও চাপাচ্ছে নেত্রীর সরকার।
২। কথা ছিল তাপসী মালিক, রাজকুমার ভুল সহ সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে হত্যা ও অত্যাচারের প্রতিটি ঘটনায় তদন্ত কমিশন করে অপরাধীদের চিহ্নিত করা হবে এবং নতুন রাজ্য সরকার এদের শাস্তি প্রদান করবে। কেউ শাস্তি পায়নি, কোনো তদন্ত কমিশনও গঠন করা হয়নি। নন্দীগ্রামের হত্যাকারী পুলিশ অফিসাররা অনেকেই বরং পদোন্নতি লাভ করেছে। এ আমলে, এমনকি শিলাদিত্যরা কৃষক স্বার্থে মুখ্যমন্ত্রীকে প্রশ্ন করার সাহস দেখালে জেলে পোরা চলছে মিথ্যা মামলায়। অপরাধীরা ঘুরছে নির্ভয়ে।
৩। সিঙ্গুর আন্দোলন সামনে এনেছিল এ রাজ্যের অসমাপ্ত ভূমিসংস্কারের প্রশ্নটি। দেখা গিয়েছিল, জমির সাথে সম্পর্কহীন অকৃষক মালিকরা টাটাগোষ্ঠীকে কারখানা গড়তে জমি দিতে এগিয়ে এসেছিল ঐ জমির প্রকৃত কৃষক অনথিভুক্ত বর্গাদারদের বঞ্চিত করে। এই বর্গাদার পরিবারগুলি ছিল জমি রক্ষা আন্দোলনের সামনের সারির সৈনিক। সুপ্রীম কোর্টের রায়ে ইচ্ছুক-অনিচ্ছুক সমস্ত কৃষক যখন টাকা সহ জমি ফেরতের প্রহর গুনছেন, সেসময় ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে সিঙ্গুরে আসা সজল অধিকারীর নেতৃত্বে সিপিআই(এমএল)-এর এক প্রতিনিধি দলকে অনথিভুক্ত বর্গাদাররা জানান, ‘এই মাঠে আমরাই চাষ করতাম। সেদিন আমাদের বঞ্চিত করে টাটা কোম্পানিকে জমি বেচে অর্থ পেয়েছিল মালিক। আজ সুপ্রীম কোর্টের রায়ে আবার জমি ফেরত পাচ্ছে মালিকরা। এরা অকৃষক। এরা সুযোগ পেলে জমি আবার বেচে দেবে। আবার অর্থ পাবে। জমি রক্ষায় আমরা বর্গাদাররা অনিচ্ছুক জমি মালিকদের সাথে আন্দোলন করলাম। জমি ফিরছে, কিন্তু আমরা কি পাব? কেন বিশেষ ক্যাম্প বসিয়ে এসময়ই অনথিভুক্ত বর্গাদারদের নথিভুক্ত করতে কোনো বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করল না ‘দিদির সরকার’?’
সরকারী ইতিহাসে কেবল লেখা রইল ‘এই আন্দোলন ‘জীবিকা ও সংস্কৃতি’ অভিমুখে গতিলাভ করল, অনিবার্যভাবে এতে উঠে এল এই রাজ্যের ভূমিসংস্কার, কৃষিতে স্বনির্ভরতা, খাদ্য সুরক্ষা ও সংকটের জরুরি প্রশ্নগুলি’। ভূমিসংস্কারের অসমাপ্ত কাহিনি, চোখে আঙুল দিয়ে সিঙ্গুর তুলে ধরলেও উদ্যোগ গ্রহণ করল না তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার – শ্রেণীস্বার্থেই তার এই অবস্থান।
৪। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে জমি ফেরতের সময় সিঙ্গুরের কৃষিমজুর, মেহনতিরা, জমির মালিক না হয়েও জমির উপর নির্ভরশীল বিশাল সংখ্যক আন্দোলনকারী রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলনে তাদের উপস্থিতির স্বীকৃতি ও অধিকার স্বরূপ ‘বিশেষ প্যাকেজ’ নিয়ে আশাবাদী ছিলেন। ২০১৪ সাল থেকে কার্যকর নতুন ভূমি অধিগ্রহণ আইন জমির উপর নির্ভরশীলদের অধিকারকে স্বীকারও করেছে। আইনি বাধা ছিল না মুখ্যমন্ত্রীর সামনে, ছিল সদিচ্ছার অভাব। এ কারণেই এদের সংগঠিত করতে সারা ভারত কৃষি ও গ্রামীণ মজুর সমিতি বিশেষ উদ্যোগ নিলে, দাবিপত্রে স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে শুরু করলে সংগঠকদের সিঙ্গুর থানায় তুলে নিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হয়। জনসভায় দূর্গাপুর হাইওয়ের মঞ্চে মুখ্যমন্ত্রী একবার মাত্র ‘কৃষিমজুররাও প্যাকেজ পাবেন’ কথাটি উচ্চারণ করে তখনকার মতো পরিস্থিতি সামলান এবং পরবর্তীতে বেবাক ভুলে যান।
৫। এই সমস্ত প্রাসঙ্গিক প্রশ্নগুলি যাতে জমানা বদলের পর সিঙ্গুরের মাটি থেকে না উঠতে পারে এজন্য বুদ্ধবাবু পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীও সমান তৎপর। এ কারণেই ২০১১ পরবর্তীতে সিঙ্গুরে আসা এক সিপিআই(এমএল) প্রতিনিধি দলকে সিঙ্গুর থানায় তুলে নিয়ে যায় নতুন জমানার পুলিশ। দীর্ঘক্ষণ থানায় আটকে রাখা হয় সিপিআই(এমএল) হুগলী জেলা সম্পাদক প্রবীর হালদার সহ অন্যান্যদের। একই সাথে বর্গাদার কৃষিমজুররা বিশেষ প্যাকেজের দাবিতে স্বাক্ষর সংগ্রহ শুরু করলে এই ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরেও থানা তুলে নিয়ে যায় স্থানীয় সংগঠক সনাতন মালিককে, ভয় দেখাতে। এইভাবে নতুন মুখ্যমন্ত্রী সিঙ্গুরের মাটিতে গণতন্ত্র হত্যায় তৎপর, অন্যদিকে আন্দোলনকে কখনও বাঁধতে চেয়েছেন আদালত নির্ভরতায়, কখনও বাঁধতে চেয়েছেন সিঙ্গুর লোকালে, কখনও ২ টাকা দরে চাল, ২ হাজার টাকার ক্ষতিপূরণের নাগপাশে।
সর্বোপরি, সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর সিঙ্গুরের ‘অনিচ্ছুক কৃষক’ যারা দীর্ঘ ১০ বছর ক্ষতিপূরণের অর্থ নেননি, তারা চেয়েছিলেন সরকার তাঁদের সুদ সহ জমির দাম ফেরত দিক। নীরব সন্ত্রাসে মমতা ব্যানার্জীরা এই সঙ্গত দাবিকেও পদদলিত করেছেন। আজকের সিঙ্গুরে কান পাতলে শোনা যাবে বিশ্বাসঘাতকতার এই কাহিনিগুলি।
সিঙ্গুর ছেড়ে যাওয়ার সময় টাটা গোষ্ঠী তার কর্মীদের ‘নিরাপত্তাহীনতা’র প্রশ্নটিকে সামনে এনেছিল। সিঙ্গুরের কৃষকদের জমি থেকে বিতাড়িত করে কারখানা গড়ার জন্য সিঙ্গুরের মানুষের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, মহিলাদের সম্ভ্রম, কৃষিজমি ও বাসস্থানের নিরাপত্তা ২০০৬ থেকে বছরের পর বছর পুলিশ ও শাসকদলের আক্রমণে বারবার পদদলিত হয়েছে, রক্তাক্ত হয়েছেন কয়েকশো মানুষ, আড়াই বছরের পায়েল বাগকে নিয়ে জেলে থেকেছেন সিঙ্গুরের মা, জেলবন্দী হয়েছেন অসংখ্য আন্দোলনকারী, মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন সিঙ্গুরবাসী; রাজকুমার ভুল ও তাপসী মালিকের মতো কৃষিমজুর-বর্গাদার পরিবারের যুবক-যুবতীদের শহীদ হতে হয়েছে, জীবন-জীবিকার অধিকার না থাকায় আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ৮ জন কৃষক ও মেহনতি মানুষ। এসব ঘটনা যখন ঘটেছিল তখন মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শব্দ উচ্চারণ করেনি টাটা গোষ্ঠী। নিরাপত্তা নিয়ে এদের দরদ তখন কোথায় ছিল? স্বাধীন দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোয় এ এক অনিবার্য প্রশ্ন।
আজ ভাঙড়ের কৃষিক্ষেত্রে প্রতারণার নতুন নতুন নজির সৃষ্টি করছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। তিনি বলছেন, তাঁর সরকার ২০১৪ সালের নতুন জমি অধিগ্রহণ আইন বলবৎ করার বিরুদ্ধে। তিনি বলছেন তাঁর সরকার কোথাও কৃষকের জমি অধিগ্রহণ করবে না। অন্যদিকে তাঁরই দলের আরাবুল পিস্তল দেখিয়ে কৃষকের জমি নামমাত্র মূল্যে ক্রয় করেছে কৃষকদের থেকে। ২০১৩ সালে মমতা ব্যানার্জীর আমলেই ভাঙড়ে পাওয়ার গ্রিড স্থাপনের নোটিশ পড়েছে। ২০১৪ সালের শুরু থেকেই কার্যকর হয়েছে নতুন আইন। এই আইনকে মান্যতা দিয়ে পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাব সংক্রান্ত কোনো জনশুনানি (এসআইএ) হয়নি। আইন মোতাবেক ৭০ শতাংশ মানুষের সম্মতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক হলেও মমতা ব্যানার্জীর রাজত্বে ভাঙড়ের মাটিতে মানা হয়নি কোনো নিয়ম। ভাঙড়ে শহীদ হয়েছেন মফিজুল, আলমগীরের মতো তরতাজা কৃষক সন্তানরা। সংগ্রামী কৃষক জনগণ ও নেতৃবৃন্দের উপর চাপিয়ে দিচ্ছেন ইউএপিএ আইন। ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার হয়েছেন ২২ জন আন্দোলনকারী।
একই ঘটনাক্রম হুগলীর গোঘাটের ভাবাদিঘিতে, যেখানে মানুষ দিঘি বাঁচানোর দাবিতে ঐক্যবদ্ধ। রেলের প্রকৃত নকশা অনুসারে দিঘির পাশ দিয়েই যাওয়া কথা রেললাইন। স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের কায়েমী স্বার্থে জোর করে রেলপথ নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে দিঘির উপর দিয়ে। এখানেও মিথ্যা মামলায় আন্দোলনকারী নেতৃত্বকে জেলে পোরা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী এখানে সরাসরি হুমকি দিচ্ছেন, ‘এই রেলপথ আমার স্বপ্নের প্রকল্প। দিঘির উপর দিয়েই রেলপথ যাবে। যাবেই, যাবেই, যাবেই’।
সিঙ্গুরকে কেন্দ্র করে কৃষক দরদী সেজেছেন মমতা ব্যানার্জী। এসত্ত্বেও সিঙ্গুর কিংবা ভাঙড়, ভাবাদিঘি -- কোথাও আড়ালে থাকছে না তার কৃষক-বিরোধী প্রকৃত অবস্থান। পারছেন না কৃষক অভ্যুত্থানকে স্তব্ধ করতে। একদা সিঙ্গুর নিয়ে বুদ্ধবাবুর স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছিল। মাপ পাবেন না নয়া মুখ্যমন্ত্রীও, যতই তিনি স্কুলপাঠ্যে নিজেকে ‘উদ্ভাসিত’ ‘আলোকিত’ করতে চাইবেন, ততই সামনে আসবে প্রকৃত ঘটনাবলী, এটাই সিঙ্গুর আন্দোলনের শিক্ষা।